জীবন যখন শুকায়ে যায়… করুণা ধারায় এসো…

0

গুলশান আরা:

“আমি যাবো, শুধু আপু যদি যায়, কারণ ওকে ছাড়া আমি ঘুমাতে পারবো না”, অথচ আজ ১৯ বছর আমাকে ছাড়া ঘুমিয়ে আছে।

আমার জীবনটাকে ওলটপালট করে দেয়ার প্রথম ধাক্কাটা হলো ওর চলে যাওয়া আমাদের জীবন থেকে। চূড়ান্ত রকমের দুর্দান্ত ছিল ছেলেটা। খেপে ক্রিকেট খেলতে যেত। তিন বছর বয়সে হাত ভাঙ্গলো, পঙ্গু হাসপাতালে ভাঙ্গা হাত নিয়েও পাশের বেডের ছেলের সাথে রেসলিং খেলতো। মা অধৈর্য হয়ে ডাক্তারকে বলেছিল ওকে ইনজেকশন দিয়ে রাখতে, নতুবা ছুটি দিয়ে দিতে মা বাসায় নিয়ে যাবে। সেই ভাঙ্গা হাত নিয়ে কী দুরন্তপনা ছিল তার! দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি বুঝতো আমাকে এই ছেলেটা। কোনদিন মায়ের কাছে শোবার জন্য বায়না করতো না, আমাকে ছাড়া একটা রাতও ঘুমাতো না সে।

ক্রিকেট খেলতে যেত। বাসায় আসার পর মায়ের মারের হাত থেকে বাঁচার জন্য জানালা দিয়ে আমাকে ডেকে বলতো, আপু দরজা খোল, ক্ষিদা লাগছে, ডিম ভেজে দে। এই রান্না না জানা আমি শুধুমাত্র ডিমটা ভাঁজতে পারতাম, কারণ ওর ক্ষিদে লাগলে, মা খাবার না দিলে আমাকে মার খেতে হতো ওর হাতে। কখনো কখনো যদি বলতাম ভেঁজে দিব না ডিম – হাত ধরে টেনে রান্নাঘরে নিয়ে যেত আমাকে, ডিম পেঁয়াজ মরিচ একসাথে দিয়ে বলতো, এবার ভাঁজ। পাশে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতো যেন না ভাঁজলে আমাকে মারবে। স্কুল কলেজ থেকে দেরি করে আসলে আমার মায়ের বকার ভয় যতটা না পেতাম তার চেয়ে বেশি ভয় পেতাম ওর বিরক্তি দেখে। এমন কোনদিন নাই যে পথের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকতো না, আর অস্থির হয়ে হাঁটাহাঁটি করতো না। না আমার দেরি হচ্ছে সেই টেনশনে না, আমার সাথে কাটানো সময়ে ঘাটতি পড়ছে তার সেই বিরক্তিতে।

মাত্র চার মাস পরে এইচএসসি পরীক্ষা সত্ত্বেও ওর বায়না মেটাতে, আমার সাথেই ঘুমাতে হবে ওকে সেই কথা চিন্তা করে গিয়েছিলাম কক্সবাজার মামার সাথে বেড়াতে।

চারদিনের বেড়ানো শেষে যেদিন ফেরার পালা, রাঙ্গামাটিতে আমাদের এক রাত থাকার কথা ছিল সেদিন। সব সময় বাসের জানালার পাশের সিটে বসা আমি সেইদিন ঝগড়া করে মামাকে বসালাম জানালার পাশে, আমি বসলাম ভিতরের দিকে। কী এক অদ্ভুত অস্থিরতায় সারাটা পথ জুড়ে শুধুমাত্র ঝগড়াই করলাম সকলের সাথে। রাজু এসে একটু পর পর আমাকে বললো, তোর কী হয়েছে আজকে? রাত আটটা, পিছনে সবার সাথে বসা রাজু আমাকে ক্রস করে সামনের দিকে যখন যাচ্ছে, জিজ্ঞেস করলাম, কই যাস? বললো, দরজার কাছে গিয়ে একটু দাঁড়াই, অস্থির লাগছে। দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো সে। সেই মুহূর্তে কোনো একটা কিছুর সাথে বাসটা ধাক্কা খাওয়া মাত্র প্রায় ৫০ জনের বাসের যাত্রীদের মধ্যে আমার প্রথম চোখটা গেল রাজুর চোখে – এক আশঙ্কা যা আর কোনদিনও কোন চোখে দেখিনি আমি, কিছু সেকেন্ডের জন্যে দেখতে পাওয়া ওই চোখে আশঙ্কা, উদ্বেগ, মায়া, ভয় সব দেখেছি আমি।

বাসটা গড়ানো শুরু করলো, মচ মচ শব্দে জানালার কাঁচগুলো ভাঙছে, আর বাসটা গড়াতে গড়াতে নিচে পড়ছে, চারিদিকে চিৎকার, হাহাকার, চেঁচামেচি, …. আমার মনে হলো আমাকে কেউ শক্ত করে জড়িয়ে বসে আছে, একটা আঘাত আমার গায়ে লাগলো না, এতোটুকু ব্যথা আমি পেলাম না, যেই সিটে যেভাবে বসেছিলাম, সেইভাবেই নিজেকে পেলাম বাসটা যখন পাহাড় থেকে ২০০ ফিট নিচে গড়িয়ে থামলো এক সময়। আমি জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে নিচে নামলাম। চারিদিকে নিকষ কালো অন্ধকারে শুধুমাত্র আমার কালো ভাইটাকে খুঁজলাম, মানুষ কত স্বার্থপর হয় বিপদের সময়, তার প্রমাণ দিলাম আমি।

একটা মেয়ে, যার সাথে পাঁচটা দিন কাটিয়েছি সে আমাকে দেখে বললো, মুক্তা আপু, আমার গায়ে কোন কাপড় নেই, অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম আমার গায়ে কাপড়, শাল, আমার জুতো, এমনকি মাফলারটাও একদম জায়গামতো ছিল। গায়ের চাদরটা খুলে ওকে জড়িয়ে দিলাম, না কোন মমতা নিয়ে দেইনি, খুব বিরক্ত হয়ে দিয়েছিলাম, কারণ রাজুকে খোঁজার পথে ও আমার একটু সময় নষ্ট করলো।

হঠাৎ কোন কিছু একটার সাথে ধাক্কা খেলাম, দেখলাম মামা পড়ে আছে, যে কিনা আজ সারাদিন আমার সাথে ঝগড়া করেছে কেন আমি তাকে জানলার পাশে বসালাম, অথচ আমরা দুইজনই কিন্তু জানালার পাশে বসতে পছন্দ করি। সেদিন জানালার পাশে বসাটা এতো অপছন্দ হয়েছিলো দুজনেরই! আজো জানি না কেন?

দেখলাম মামা মারা গেছেন। বিন্দুমাত্র কষ্ট পেলাম না, মনে হলো তাতে কী, সব্বাই মরে যাক, আমার রাজু বেঁচে থাকলেই হবে। একজন প্রেগনেন্ট মায়ের পেটে রড ঢুকে গেছে, স্থানীয় কয়েকজন মানুষ সেই মায়ের পেটের ভেতর থেকে রড বের করার চেষ্টা করছে॥ এমন বীভৎস দৃশ্য আমাকে এতোটুকুও বিচলিত করেনি… শুধু বিচলিত করছিল কেন রাজুকে এখনো দেখছি না আমি, কী বেয়াদপ ছেলেটা! এসে আমাকে দেখা দিলেই তো হয়! এমন থাপ্পর দিব পেলে!

হঠাৎ করে একটা জায়গায় একজন ডাক দিল, গুলশান, আমাকে একটু ধরে তোলো মামা, আমি তো একদম নড়তে পারছি না। দেখলাম বড় মামা যার সাথে আমরা বেড়াতে এসেছিলাম, পড়ে আছেন একটা খাদে, এতো বিরক্ত আমি খুব কমই হয়েছি জীবনে, কী অবিবেচক, আরে আমি রাজুকে পেলেই না ওকে নিয়ে সবাইকে সাহায্য করতে পারবো, মামাকে এক টানে তুলে ফেলবো!

এতোটুকু তার পাশে না দাঁড়িয়ে বললাম, অন্য কাউকে বলো, আমি রাজুকে ডেকে আনি আগে। দেখলাম যে প্রত্যেকেরই গায়ে অল্প অল্প আঘাত, এক আমিই কোন ব্যথাই পাইনি। চারদিকে চিৎকার, হাহাকার সবকিছু ঘিরে আমার রাজু ডাকটা প্রত্যেকের কানে পৌঁছলো। কী অদ্ভুত আমার যে কাজিনরা আঘাত পেয়েও ওদের বাবাকে ফেলে রেখে আমার সাথে রাজুকে খুঁজতে বেরুলো। আসলে নাছোড়বান্দা আমি ওদেরকে কোথাও যেতে দিচ্ছিলাম না।

প্রতিটা মানুষ আছে, মৃত হোক অথবা আঘাতপ্রাপ্ত হোক, শুধু আমার রাজু নাই, কেন? রাজীব ওর বাবাকে তুলতে যেতে চাইলো, স্বার্থপর আমি ওকে বললাম, মামা মরে গেলে মরে যাক, রাজুকে খুঁজে দে, ও তাই করলো। ওর বাবার কাছে না গিয়ে রাজুকে খুঁজতে বেরুলো। একটা পর্যায়ে চিৎকার করে উঠলো, মুক্তা, আমি পেয়েছি ওকে।

আমি দৌড়ে গেলাম, শেষবারের মতো আমি রাজুর মুখটা দেখার সাহস পেলাম বাসের নিচে ঘুমিয়ে আছে, বিন্দুমাত্র আঘাতের চিহ্ন নেই কোথাও, শুধু চোখ বোঁজা, মুখে একটু হাসি, শুধু কথা বলে না। আমাকে রাজীব বললো, ও বেঁচে আছে, তুই পিছনে গিয়ে বস, আমি ওকে নিয়ে আসি, রাজুকে বের করা হলো, ততক্ষণে একটা আর্মি বাস চলে আসলো ওখানে। হাসপাতালে নেয়ার জন্য বাসে উঠানো হলো রাজুকে, আমার সাহস হয়নি রাজুকে গিয়ে আরেকবার দেখার। আমাকে বলা হলো ওকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, বেঁচে আছে।

বাসায় এসে দেখি মায়ের সে কী কান্না, সেদিন বাবা আমাকে যেভাবে জড়িয়ে ধরেছিল, সেই জড়িয়ে ধরা মানে ছিল অসহায় এক বাবার আত্মসমর্পণ আমার কাছে। এক্সিডেন্ট এর পরের দিন থেকে নির্বাক আমাকে কথা বলানোর জন্য অর্বকে কোলে তুলে দেয়া হলো… সাত মাস বয়সের বাচ্চাটা আমাদের সবার চোখের মনি ছিল। বাবা শুধু বললো, সব ঠিক হয়ে যাবে মুক্তা যদি কথা বলে। অর্ব আমার কোলে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো, আর সব সময় যেটা করতো, আমার চোখের দিকে তাকিয়ে হাসলো। আমি প্রথম কাঁদলাম অর্বকে জড়িয়ে ধরে। আমাকে বলা হলো, রাজুকে শেষবারের মতো দেখতে যেতে…আমি যাইনি …চলে যাক ও আমাকে ছাড়া যদি ঘুমাতে পারে তো চলে যাক, গিয়ে ঘুমাক।

ওই শুরু হলো আমার জীবনের যুদ্ধ, বিধাতা বিন্দুমাত্র ছাড় আমাকে কোথাও দেননি। মাঝে মাঝে মনে হয়, রাজু আঁতাত করেছে আল্লাহর সাথে, ওকে ছাড়া শান্তিতে ঘুমাতে যেন না পারি, পদে পদে সেই বন্দোবস্ত করে রাখে ও। আজও আমার শান্তির ঘুম হয় না।

কতবার ওর কবরের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছি, কেন এমন করে, স্বপ্নে যখন তখন আসে, এসে শুধু হাসে, কিছু বলে না।

ভালো থাকিস, আজ তোর জন্মদিন। দেখবো কত দিন তোর আমাকে ছাড়া ঘুম আসে।

ওর সাথে কোন ছবি আমি রাখিনি, সব নষ্ট করে ফেলেছি। কিন্তু আমার সাথে অর্ব, পূষণ আছে, আমার সাথে আইদিন আছে।

কালো রাজুর চোখগুলো খুব সুন্দর ছিল, ও আমার কাছে আমার গায়ের রঙটা চাই তো, আর আমি ওর কাছে ওর চোখগুলো চাইতাম। ও কিন্তু ওই চোখ দুটো আমাকে দিয়ে পাঠিয়েছে আইদিনের সাথে … সেই বড় বড় চোখ, সেই লম্বা পাঁপড়ি, সেই নিষ্পাপ চাহনি।

শুভ জন্মদিন ‘রাজু’……… ধীরে ধীরে তোর সাথে দেখা হওয়ার সময়টুকু কমে আসছে আমার… আবার একসাথে ঘুমাবো আমরা।

শেয়ার করুন:
  • 469
  •  
  •  
  •  
  •  
    469
    Shares

লেখাটি ১,৩৮৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.