কেমন মা আপনি?

0

শাহমিকা আগুন:

“কেমন মা আপনি যে বাচ্চা দেখে রাখতে পারেন না! মা ভালো হলে বাচ্চা আবার এমন হয় নাকি! এই মহিলা জানেই না যে বাচ্চা কীভাবে কন্ট্রোল করতে হয়। আরে, বাচ্চাকে সময় দিলে বাচ্চা তো আর অটিস্টিক হতো না। বাচ্চাকে সময় দেবে কখন, এই মা তো ক্যরিয়ার নিয়েই ব্যস্ত। মহিলা নিজে পাগল, তাই বাচ্চা পাগল”।

আমাদের মতো যাদের বাচ্চা তথাকথিত সুস্থ নয়, বা তথাকথিত সুস্থ বাচ্চা জন্ম দিতে আমরা যারা ব্যর্থ হয়েছিলাম, কিংবা সুস্থ বাচ্চা জন্মদানের পর তাদের সুস্থতার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি পর্যায়ক্রমিকভাবে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলাম, তাদের মাতৃত্ব বিচারের দণ্ডভার সহজাত প্রবৃত্তি বশেই সমাজের প্রতিটি স্তরের প্রতিটি জীবরুপী প্রেতাত্মার ওপর বর্তায় বৈকি!

আমার বাচ্চার অটিজম ধরা পড়েছিল তিন বছর বয়সে। সেই থেকে বাসায়, স্কুলে, পার্কে, কিডস জোনে, মার্কেটে কোথায় না শুনতে হয়েছিল এসব কথা! বাচ্চা শুধু শুধু হাসছে, মায়ের দোষ, বাচ্চা শুধু শুধু কাঁদছে, মায়ের দোষ, বাচ্চা জেদ করছে, মায়ের দোষ, বাচ্চা সেন্সরি ইস্যুর কারণে কাপড় পরতে পারছে না, মায়ের দোষ, বাচ্চা হারিয়ে যাচ্ছে, পালিয়ে যাচ্ছে মায়ের দোষ, বাচ্চা রাতে ঘুমাতে পারছে না, মায়ের দোষ, বাচ্চা কথা বলতে পারছে না, মায়ের দোষ, বাচ্চার চিকিৎসার কারণে খরচ বেড়ে গেছে, মায়ের দোষ।

আমার ছেলের ডায়াগনোসিস হবার পর আমি ভেঙে পড়েছিলাম, অনেক কান্নাকাটি করেছিলাম। সেটাও আমার দোষ বলে গণ্য হলো। আমি নাকি অটিস্টিক ছেলেকে মেনে নিতে পারছি না। ওদের কথা শুনে মনে হতো বাচ্চার অটিজম ধরা পড়ার পর সব মায়েরই ধেই ধেই করে নৃত্য করার কথা।

দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এ ধরনের কথা শুনতে শুনতে এক সময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আর না। অবশ্য এর মধ্যে একটি ঘটনাও ঘটনাও ঘটেছিল।আমি আর ছেলে দাঁড়িয়ে ছিলাম বাস স্টপেজে। কোনো কারণে বাস আসতে দেরি করছিল। আমার ছেলে তখন এক জায়গায় বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। সাধারণত দশ পনের মিনিটের মধ্যে বাস চলে আসে, কিন্তু দশ, বিশ, ত্রিশ মিনিট চলে গেছে বাস এলো না। আমার ছেলেকে দশ মিনিট কন্ট্রোল করতে পারলাম, তারপর শুরু হয়ে গেল তার সমস্যাগুলো। সে শুরু করলো দৌড়াদৌড়ি, লাফালাফি। একজনের হাতে ট্যাটু ছিল। আমার ছেলে তার ট্যাটুতে হাত দিল।

ব্যস! আর যায় কোথায়। সেই নারী ঝাঁপিয়ে পড়লো আমার ওপর। তার সঙ্গে যুক্ত হলো বাস স্টপের আরো কিছু নারী। পুরুষগুলো তামাশা দেখলো। নারীদের কন্ঠস্বরের নর্তন কুর্দনের তীর্যকতায় জনসমক্ষে আমার মাতৃত্বের শ্লীলতাহানি টের পেয়ে আমার ছেলে তখন আতংকে ছটফট করছে। তার কান্নার তীব্রতায় ধরিত্রী দ্বিধা হলো কিনা জানি না, তবে আমি ও আমার ছেলে দুজনেরই আতংক রোগ দেখা দিল। আমরা ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিলাম। ছেলেকে স্কুলে নেয়া যায় না। বাইরে যাবার কথা শুনলেই তার বমি শুরু হতো।

আমি খুব বিস্ময়ের সঙ্গে আবিস্কার করলাম যে, এই পৃথিবীর কেউ আর আমাদের চায় না। বাচ্চাকে নিয়ে যেখানে যাই, সেখানেই কমপ্লেইন। ফলে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ কমতে শুরু করলো। এর মধ্যে আমি পিএইচডি ছেড়ে দিলাম, অটিস্টিক কেয়ার হোমের চাকরি ছেড়ে দিলাম, ছেলের স্কুলের এক বছরের ভলান্টিয়ার কাজ করার পর তাও ছেড়ে দিলাম। বন্ধু-বান্ধবরা এখন আর তেমন কেউ ডাকে না। আমাদেরকে আর কারো কোন প্রয়োজন নেই।

আমি বুঝতে পারলাম আমি একের পর এক ছেড়ে দিয়ে গুটিয়ে যাচ্ছি, হারিয়ে যাচ্ছি। মানুষের নিষ্ঠুরতা আমাকে ডুবিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল কোন অতলে আমি জানি না। ছেলের জন্য বেশ কিছু থেরাপির ব্যবস্থা করলাম, কিন্তু কিছু তেমন হলো না। প্রতিটি দীপশিখা নিভে যাচ্ছিল দপ দপ করে।

অটিজম নিয়ে ইংল্যান্ডে যতগুলো ট্রেনিং করানো হয়, সবই নিয়েছিলাম। তাতে কী! ওখানে আরো দশজন মায়ের কান্না আর হতাশার কথা শুনি। সবার একই গল্প। তেমনি আলো আঁধারির কোন এক ঘোর লাগা দিনে ছেলের স্কুলের টিচার বললো, কিছু মনে করো না। তোমার ছেলেকে যদি তুমি মানুষের মতো করে ট্রিট করো, তো তুমি কষ্ট পাবে। মনে করো যে ও একটা কুকুর। ওর বুদ্ধির দৌড় কুকুর বা পশুর মতো। ওকে প্রাণীদের মতো করে ট্রিট করো, দেখবে তুমিও ভালো থাকবে, ও ও ভালো থাকবে।

আমি স্তব্ধ হয়ে শুনলাম। কী বললো! আমার ছেলেকে কুকুর বললো! কিন্তু আমি অটিস্টিক, লার্নিং ডিসেবিলিটি বাচ্চার মা। আমার চুপ করে থাকাই শ্রেয়। তাই ছিলাম। ভিতরে দাঁত দিয়ে জিভকে এমন জোরে চেপে ধরলাম যে, জিভের অর্ধেকটাই প্রায় কেটে গেল। সেখান থেকে রক্ত ঝরলো। জিভ ফুলে ঢোল হলো। কিছুদিন মাতৃত্বের যন্ত্রণায় কাতর সেই জিভ দিয়ে কোন খাবার গলা দিয়ে নিচে নামানো গেল না। কোথাও কোন আশা নেই।

তবু কোনো এক অচেনা জেদ মনে সাই সাই করে উদ্বেলিত হলো। আমার অজান্তেই আমার দুহাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে শপথ নিল যে, আমার ছেলের পরিচয়
যদি এখন পশু বা কুকুর হয়ে থাকে মানুষের কাছে, তো এই ছেলেকে কুকুর থেকে মানুষের পর্যায়ে নেয়ার পথপরিক্রমা আমি শুরু করলাম, সে আমি যেমন মাই হয়ে থাকি না কেন। আমি কোথাও যাবো না। কারো পায়ে আর ধরবো না।এমন অনেক শপথ সেই অপমানে জর্জরিত আহত মা নিয়েছিল।

তেমনি সময়ে ছেলে স্কুলে গেলে পড়া শুরু করলাম অনেক অনেক বই। পড়তাম আর নোট নিতাম। অনেক দিন পর মনে হলো আমি কিছু একটা আঁচ করতে পারছি অটিজম নিয়ে। যা অনেকেই বোঝে না, আমি তা বুঝতে পারছি। এবার নোটগুলো ধরে শুরু হলো প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পালা। কিন্তু সেজন্য অনেক অনেক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। যদিও কোনো নিশ্চয়তা নেই যে ট্রেনিং নিলেই আমি ছেলেকে ভালো করে ফেলতে পারবো। অটিস্টিক ছেলে বলে ভালো চাইল্ড মাইন্ডাররা নিতে চায় না নানান বাহানা ধরে।

প্রথম দিকে অনেক ট্রেনিং এ আমি ছেলেকে নিয়ে যেতাম। আমি নিজের মতো করে ছেলের পরিচর্যা শুরু করলাম। ধীরে ধীরে ছেলের অবস্থার উন্নতি হওয়া শুরু করলো। এবার চাইল্ড মাইন্ডারও পেয়ে গেলাম। ছেলের লার্নিং ডিসএবিলিটি চলে গেল। বোধশক্তির উদয় হওয়া শুরু করলো। কথা বলা শুরু করলো। সেন্সরি ইস্যু চলে গেল। সে যেকোনো কাজে মনোযোগ দিতে পারলো।

ছেলের উন্নতি দেখে আরও মায়েরা জানতে চাইলো আমি কী করেছি। তাদের বাচ্চাদেরও সাহায্য করতে পারলাম। আমি আমার নিজের প্রোগ্রাম তৈরি করে ফেললাম। আমি বুঝতে পারলাম অটিজমের যারা চিকিৎসা করে, তাদের কাছে অটিজমের গল্প হলো অন্ধের হাতি দেখার মতো। একদল অন্ধকে হাতি দেখতে পাঠানোর পর একেকজন তার নিজের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী বলতে লাগলো একেক রকম গল্প। কেউ বললো কিছুই বুঝিনি, কেউ বললো হাতি দেখতে লম্বা। কেউ বললো চ্যাপ্টা, কেউ বললো তীক্ষ্ণ।

আমিও হয়তো তেমন কিছুই দেখেছি, অথবা হতে পারে হাতির অনেকটাই দেখেছি। আমার ঝুড়িতে এখন অনেক অনেক সার্টিফিকেট যেমন আছে, তেমনি অভিজ্ঞতা আছে, তেমনি আছে সফলতা।

এখন কেউ আর আমাকে বা আমার ছেলেকে কেউ মুখের ওপর যা তা বলে যেতে পারে না, বা সাহস করে না। কিন্তু আমি তো বিশেষ শিশুর মা। আমাকে ছেড়ে দেবে কেন! তাই এখন বলে অন্য কথা! এতো পড়াশোনা, ক্যারিয়ার নিয়ে থাকলে বাচ্চার আবার দেখাশোনা করে কখন! ছেলেকে নিশ্চয়ই সময় দেয় না।এ খুঁত সব চেয়ে বেশি খোঁজে ছেলের বাবার পরিবার। যদিও কিছু বলার থাকে না তাদের।

আমার ছেলে তাদের কাছে একদিন থাকুক, আর দশদিন থাকুক, তার তিন বেলার খাবার রেডি করে সাথে পাঠিয়ে দেই। ছেলে গান শেখে, অভিনয় শেখে, পিয়ানো শেখে, কারাতে শেখে, ফুটবল শেখে, স্টেজ শো করে। তার মানে হলো সপ্তায় পাঁচ দিন তাকে নিয়ে যেতে হয় আমাকে। ছেলেকে উইকেন্ডে বাইরে নেয়া, হলিডেতে নেয়া, ডাক্তারের কাছে নেয়া, স্কুলের মিটিং এটেন্ড করা, ছেলে স্কুলে অসুস্থ হয়ে গেলে গিয়ে নিয়ে আসা, সব কিছুই করে যাচ্ছি।

কিন্তু এখন শুরু হলো অন্য ধরনের সমালোচনা। নিজের ছেলেকে আসলে তুমি গ্রহণ করতে পারোনি, তাই মরিয়া হয়ে এতো ছুটে চলা ছেলের পরিবর্তনের জন্য। তুমি আসলে ক্যরিয়ার ফ্রিক। এতো পড়াশুনা আর ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত থাকলে আবার ছেলেকে সময় দেয় কখন!

সেদিন উইমেন চ্যাপ্টার এর এডিটর সুপ্রীতি ধর দিদির অনুরোধে এবং প্রতিদিন কতশত মায়েদের, বাবাদের যেসব ইমেইল জমেছিল, তার উত্তর দেয়ার জন্য উইমেন চ্যপ্টারে লাইভ করছিলাম। তাছাড়া বাংলাদেশে ২২ অগাস্ট দুটো সেমিনার করবো শিশু স্বাস্থ্য ও সফল হবার জন্য কীভাবে নিজের মাইন্ড সেট করবেন তা মানুষকে শেখানোর জন্য, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলার উদ্দেশ্যই ছিল এই লাইভে।

আমার পরিচয়ে যখন ব্যক্ত করলাম যে আমি অটিস্টিক বাচ্চার মা এবং কীভাবে বাচ্চাকে সাহায্য করেছি, এবং অন্যদের সাহায্য করার চেষ্টা করেছি, শুরু হলো আমাকে নানান কমেন্টের মাধ্যমে আঘাত করা। যার মূল বক্তব্য হলো, তুই অটিস্টিক বাচ্চার মা হয়ে কোন সাহসে লাইভে এসে আমাদের উপদেশ দেয়ার সাহস করিস! তোর তো তোর অটিস্টিক বাচ্চা নিয়ে ঘরে বসে কান্নাকাটি করার কথা! আমাদের কাছে তোর হেরে যাওয়া করুণারত জীবনের আহাজারি করার কথা! সমাজের কাছে তোকে, তোর ছেলেকে লুকিয়ে রাখার কথা! তুই কোন সাহসে লাইভে এসে বলছিস, তোর ছেলের অটিজম ডায়াগনসিস হয়েছিল এবং তুই আমাদের উপদেশ দিচ্ছিস! তুই সেমিনার করবি! তুই আমাদের কী শিখাবি! আমি লাইভে বলে যাচ্ছিলাম, কিন্তু মানসপটে সেইসব অপমান অবহেলা অপবাদের ছায়ারা দাপাদাপি করছিল।

শুধুমাত্র বাচ্চা অসুস্থ বলে প্রতি পলে পলে কণ্টকাকীর্ণ অপবাদ বিছিয়ে রাখা হয় আমাদের মতো মায়েদের ওপর। অনেক মাই আমাকে লিখেছেন, বাচ্চার অসুস্থতার পর স্বামী ও তার পরিবার কীভাবে নাজেহাল করে চলেছে মাকে। সব মায়ের ডিএনএ এর দোষ!

অনেক মা লিখেছেন, বাচ্চার অসুস্থতার পর স্বামীর বদলে যাওয়া চেহারার কথা। বাংলাদেশে বা বিদেশে একটা বাচ্চা ক্রনিক কোন রোগ ধরা পড়ার পর বাবা -মাকে কোন কাউন্সিলিং এ নেয়া হয় না। বাবা-মা দুজনেই গ্রিফ এবং শক এর ভেতর দিয়ে যেতে থাকে। পারসোনালিটি বদলে যেতে থাকে।

বাবারা সাধারনত অনেক বদরাগী মেজাজী হয়ে যেতে থাকে। মা হতে থাকে অসহায়। বাচ্চারা এনারজিটিকালি সবই ফিল করে। তাদের আচরণ আরো দুর্বোধ্য হতে থাকে। শিশুরা জানে তাদের বাবা-মায়ের কষ্টের কারণ যে সে।

আমার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান এ মায়ের ট্রমা রিলিজ এর প্রস্তাব থাকে। সেদিন এক মা ফোন করলেন, মাত্র দুহাজার টাকা চাওয়াতে শ্বশুর মশায় গায়ে হাত তুললেন, গলা টিপে ধরলেন। এ ধরনের মায়েদের ওপর পরিবারের সবার অত্যাচার বাড়তে থাকে। এই ভদ্রমহিলার স্বামীরও মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে।

আমার নিজের পরিণতি থেকে আমি শিখেছি একজন মায়ের নিজেকে উপযুক্ত এবং পাওয়ারফুল ফিল করা বাচ্চার সুস্থতার জন্য কতটা জরুরি! আপনার বাচ্চার জন্য আপনাকে দাঁড়াতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। আজ যে মানুষজন আপনাকে বলছে, কাল তারা আপনার বাচ্চাকে বলবে। আপনার বাচ্চা যখন স্কুল ছেড়ে কলেজ যেতে চাইবে, কলেজ ছেড়ে কর্মক্ষেত্রে যেতে চাইবে, নিজের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রসারিত, প্রচারিত হতে চাইবে, তখনও এরা বলবে।

আপনার নিজেকে, নিজের সন্তানকে সামনে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব আপনার। অনেক বাধা আসবে, থামা চলবে না। আমি যখন প্রথম আমার ছেলেকে গান আর অভিনয়ে ভর্তি করালাম, তখন কিছু মা কয়েক সপ্তাহ পর কমপ্লেইন করা শুরু করলো, আমার ছেলের কারণে তাদের বাচ্চারা একশত ভাগ শিখতে পারছে না। আমার কাছে এসে ছেলের নামে, শিক্ষকের কাছে, প্রতিষ্ঠাতার কাছে কত নালিশ! আমি এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দিতাম।

আমি জানি, আমি একা। অটিজম আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা জায়গা আছে।সবাই চায় আমার ছেলে ওখানে চলে যাক। আমি দিয়েছি আমার ছেলেকে বিশেষ স্কুলে, ওদের কথা শুনে। স্কুলে বড় ক্লাসের বাচ্চারা আমার ছেলেকে দেখলে হাসাহাসি করতো। ছেলের সেলফ ইস্টিম এর কথা ভেবে অনেক খুঁজে একটা বেস্ট স্কুল বের করেছি এবং মডারেট এবিলিটির অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে আমার ছেলেও সেই স্কুলে যায়।

কিন্তু আমি বারবার এদের কথা শুনে ছেলেকে গুটিয়ে নেবো, নিজেকে গুটিয়ে নেবো, তাতো হবার নয়। আমি চেয়েছি আলাদা করে নয়, এই শিশুদের সঙ্গে থেকে, এই স্কুল থেকেই আমার ছেলে শিখুক। আমি একটা বই নিয়ে গিয়ে বসতাম ছেলের ক্লাস চলাকালে। আমাকে ডেকে, বই থেকে মুখ তুলিয়ে ছেলের নামে কমপ্লেইন করার সাহস কারও হতো না। ধীরে ধীরে বেশ কয়েক মাস পর সবাই মেনে নিতে শুরু করেছে আমাদের।
আমার ছেলেও শিখেছে, তারাও শিখেছে।

সবচেয়ে বেশি কমপ্লেইন করতো এমন একটি মাই এসে পরে আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করলো। সে অনেক বড় প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার। লোকজন তার পেছনে চাকরি দেয়ার জন্য ঘুরঘুর করে। সে খুব অবাক হয়ে আবিস্কার করলো যে আমার ছেলে অটিস্টিক হবার পরও আমি তার প্রতিষ্ঠানের কাছেই আরেকটি বড় প্রতিষ্ঠান হারলে স্ট্রিটে মানুষের সুস্বাস্থ্য ফেরত আনার জন্য কাজ করি।

আমি আমার কাছে যত মায়েরা এসে কান্না করে তাদের সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করি যে, তোমায় বুঝতে হবে যে তোমার সন্তানের এই কন্ডিশন নিয়েই তুমি ও তোমার সন্তান এই সমাজের এই পরিবারের এই পৃথিবীর একটা অংশ। তুমি নিজের অধিকার ছেড়ে দিয়ে চলে গেলে কেউ সেই অধিকার তোমায় ফেরত দেবে না।

আমার ছেলে এখন স্টেজ শো করে। সে তাদের মিউজিক স্কুলের একমাত্র বিশেষ শিশু যে অন্য সাধারণ শিশুদের সঙ্গে এক স্টেজে দাঁড়িয়ে পারফর্মেন্স করে আজ চার বছর হলো। আমাদের এলাকায় তো অনেক বিশেষ শিশু আছে তাদের বাবা-মায়েরা আসে না, সাহস করে না নিজের সন্তানের জন্য জায়গা তৈরির পথচক্র শুরু করতে।

পিয়ানোর ক্ষেত্রে পিয়ানো টিচারকে আমার ছেলেকে সহজে শেখানোর টেকনিক বের করতে হয়েছে, একই ঘটনা ঘটেছে কেরাতের ক্ষেত্রে। এই শিক্ষকরা এর আগে কখনো এই ধরনের শিশু নিয়ে কাজ করেনি, কারণ কেউ নিয়ে আসেনি। বাসায় ছেলেকে অনেক সময় দিতে হয় আমায়। হাতে ধরে ধরে শেখাতে হয়। প্রতিটি শব্দের অর্থ বিভিন্ন এক্সপ্রেশনের সঙ্গে কীভাবে বদলে যায় তা শেখাতে হয়। নিঃসন্দেহে আমার ছেলে অনেক ভালো হয়েছে আগের তুলনায়। তবু এখনো শব্দের মারপ্যাঁচ বুঝতে পারে না, মানুষ নিয়ম ভাঙ্গলে মেনে নিতে পারে না। মানুষকে ক্ষমা করে দেয়ার ট্রেনিং দিয়ে যাচ্ছি তাকে।

আমার কাছে অনেক মায়েরা কেঁদে বলে কাউকে বলেনি সন্তানের অটিজমের কথা। মানুষ বা আত্মীয়রা টিপ্পনি কাটবে। সে অচ্ছুৎ হয়ে যাবে পরিবারের কাছে। আমার প্রশ্ন থাকে, যে সন্তানকে আপনিই গ্রহণ করতে পারছেন না, তাকে কি অন্যরা গ্রহণ করবে?

একবার ভাবেন তো আপনার মা যদি আপনাকে নিয়ে লজ্জা পেতো, আপনার কেমন লাগতো? কয়েকজন ডাক্তার আছেন, তারা বাচ্চার অটিজমের কথা লুকিয়ে রাখেন, নয়তো রোগী পাবেন না। আমি কিন্তু বাচ্চার অটিজমের কথা সবাইকে বলি। আমার ওয়েবসাইটেও দিয়েছি। আমার কিন্তু রোগী পেতে কোন অসুবিধা হয় না।

বলতে পারেন যে, আমার রোগী তো সবই অটিস্টিক। না। তা সম্পূর্ণ সত্য নয়। আমার কাছে একটা বড় অংশের ক্লায়েন্ট আসে যারা কিনা জীবনে অনেক সফল এবং আরও সফল হতে চায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, লন্ডন মেট্রো পত্রিকার সাংবাদিক, বেলে ডান্সার, স্কুল শিক্ষক, ব্যবসায়ী, কাউন্সিলর, ব্যাঙ্কার, রেস্টুরেন্ট এর মালিক এরকম অনেক অনেক মানুষ। তারা জেনেই আসে যে আমি বিশেষ শিশুর মা।

আমার কাছে কিছু মানুষ আসে যারা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধকতার শিকার, কিন্তু মানসিকভাবে নয়। তেমনি একজনকে গত এক বছর এর চেষ্টায় বিশ্বাস করানো সম্ভব হয়েছে যে সে কারো থেকে কম নয়। সে এ মাসে তার ওয়েবসাইট লঞ্চিং করেছে। সে হাঁটতে পারে না, কিন্তু তাতে কী! আমরা যারা হাঁটতে পারছি তারাই বা কোন বিশ্বজয় করে বসে আছি!

আমরা ভুলে যাই যে আমরা দেখতে পাই আলো আছে বলে। আলো না থাকলে এই দৃষ্টিশক্তি আর শক্তি থাকে না, কিন্তু যে মানুষটি অন্ধকারেই হাঁটতে শিখে গেছে, কাজ চালিয়ে যাবার জন্য যার আলোর প্রয়োজন পড়েই না, তার ক্ষমতাকে প্রতিবন্ধকতার লেবাস দিয়ে সত্যকে অস্বীকার করা মানুষগুলো আদতে নিজের পায়ের নিচের মাটিকে সরে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করাতেই ব্যস্ত।

আপনার অন্যরকম শিশুটিকে নিয়ে হতাশায় ভেঙ্গে পড়ার আগে একটু ভাবুন তো এতো বড় একটি দায়িত্ব আপনাকে কেন দেয়া হয়েছে? আপনার কি ধারণা প্রকৃতি মাতা বা গড ভুল করেছে? না। মোটেই না। আপনাকে এই বিশেষ শিশুটিকে দেখাশোনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এই কারণে যে, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড জানে যে আপনি কতটা যত্ন নিয়ে এই শিশুটিকে আগলে রাখবেন! এই অনেক কিছু না থাকা শিশুটির হাসিতেই আপনি নিজের বিশ্ব দেখবেন। পরিবার, সংসার, সমাজ থেকে অনেক কিছু সহ্য করেও দাঁত কামড়ে লড়াই করে যাবেন।

অন্যের কথায় নিজের মাতৃত্বকে খাটো করে দেখার কোন কারণ নেই। সুস্থ মানুষ নিয়ে পৃথিবীতে কোন গবেষণা হয়নি। পৃথিবীতে ভিন্ন রকম শিশু আসবে, তারা বড় হবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রকৃতি নিজের প্রয়োজনেই এরকম মানুষ তৈরি করে।

সবচেয়ে মায়াবী দায়িত্ববান মায়েদের হাতে এই শিশুটির দায়িত্ব দেয়া হয়। কোনো কারণে বাইরে যেতে হলে আপনি যেমনটি নিশ্চিত করেন যে, আপনার পরিবর্তে যে আপনার সন্তানকে দেখাশোনা করবে সে একশত ভাগ ভালবাসা ও দায়িত্ব নিয়ে আপনার শিশুটিকে দেখবে।

মহাবিশ্বের কাছে আপনার অবস্থাটিও সেরকম, অনেক উঁচুতে। তাই আপনাকে ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। কেমন মা আপনি? আপনি আপনার সন্তানের জন্য উপযুক্ত মা। নিজের সন্তান নিয়ে হাহাকার করে জীবন পার করে দেবেন, আর নিজেকে অন্যের করুণার পাত্র করবেন, নাকি আপাত দৃষ্টিতে আপনার অনেক কিছু না থাকা সন্তানের হাত ধরে তাকে তার এবিলিটি অনুযায়ী চলতে শেখাবেন, সে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব আপনার হাতে ছেড়ে দিলাম। ভালো থাকবেন। অনেক অনেক ভালবাসা।

শেয়ার করুন:
  • 760
  •  
  •  
  •  
  •  
    760
    Shares

লেখাটি ৪,০৮৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.