ধর্ষকের দায়ভার কী করে এড়ায় তার পরিবার!

0
সুদীপ্তা ভট্টাচার্য্য রুমকি:
ধর্ষণের শিকার সন্তানের বাবা, মা যে কেউ হয়ে যেতে পারে যে কোনো মুহূর্তে, এতে তাদের  কিছু করার নেই। কিন্তু ধর্ষকের বাবা, মা কেউ হুট করে হতে পারে না। এই ছেলেরা পারিবারিকভাবে কোনো মূল্যবোধ পেয়ে বড় হয় বলে আমি মনে করি না।
ধর্ষণ, হত্যা, নিপীড়ন করে ধরা পড়লে দেখবেন তাদের বাবা, মায়ের চোখেমুখে কোনো লজ্জাবোধ নেই, কোনো গ্লানি নেই, কষ্ট তো দূরের কথা! সব তথ্য-প্রমাণ নিজের চোখে দেখেও বলবে, আমার পোলায় যদি দোষ করে থাকে, তাহলে শাস্তি দিন!! এই “যদি” শব্দটাই enough proof রাখে তাদের কুশিক্ষার, যথেচ্ছ প্রতিপালনের!!
জন্ম থেকেই তারা বেড়ে উঠে লিঙ্গসর্বস্ব সর্বভুক প্রাণী হিসাবে। এরা তখন থেকেই শেখে লজ্জা নারীর ভূষণ আর নির্লজ্জ হওয়া পুরুষের ধরন। এরা মায়ের মুখেই শোনে, নারীর রাগে নারী বেশ্যা হয় আর পুরুষের রাগে পুরুষ হয় বাদশা। আত্মসংযম  নারীর একান্ত সম্পত্তি আর সম্ভ্রম শুধু নারীই হারায়।
তারা শেখে ‘পতিতা’রা সমাজে যাদের কারণে টিকে আছে তাদের নাম পতিত নয়।উঠতি বয়স থেকে তারা সিগারেট, মদ, মাদক, পর্নো এডিক্টেড হয়ে নারীঘটিত হাজার ঘটনার জন্ম দিয়েও মমতাময়ী মায়ের মুখেই শোনে ছেলেরা এমন করবেই, একটু এদিক ওদিক যাবেই, এটা সেটা খাবেই! বাবা, মায়ের লাই পেয়ে ধীরে ধীরে পুরুষ মানুষ হওয়ার পরিবর্তে এরা জন্তু পুরুষ হয়ে উঠে।
পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক উভয় পরিবেশই ভীষণ প্রভাব ফেলে চরিত্র গঠনে।নিজের ঘরে, পরিমণ্ডলে কী দেখে, কোথায় যায়, কার সাথে মেশে এগুলোর ভূমিকাও কম নয়।
বনানী ধর্ষণের ঘটনার নায়ক নামিদামি  জুয়েলার্সের মালিকপুত্রের কথা যদি  ধরি,  এইখানে এই বিকৃত রুচির পুত্রের উৎপত্তি কিন্তু পরিবারেই। বাবা ছিলেন দুশ্চরিত্রের আর মা দর্শক।
মা  বক্তব্যও দিয়েছিলেন, “বাবার কারণেই তার ছেলে এমন হয়েছে। উঠতি বয়স থেকেই সে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। তার চোখের সামনেই সে অনৈতিক আচরণ করতো বাবার অনুকরণে”। কী সুন্দর পুত্রের পক্ষে সাফাই গেয়েছিলেন সেই মা! অথচ মা হিসাবে তার করণীয় কী সেটা বসে বসে দেখা ছিল, নাকি দুশ্চরিত্র স্বামীর অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ছিল!
প্রতিবাদ যদি করতেন তাহলে ঐ ব্যক্তি তাকে নামকাওয়াস্তে স্ত্রী বানিয়ে ঘরে যদিও রাখতো না ঠিকই, কিন্তু এই বাবার সান্নিধ্যবঞ্চিত থাকলে ছেলেটা হয়তো মানুষ হতেও পারতো, যদি সে তার মাকে স্ট্রং চরিত্রের আত্মমর্যাদাসম্পন্ন অন্যায়ের প্রতিবাদকারী নারী হিসাবে ছোট থেকে দেখতো।
যে ছেলে জন্ম থেকে দেখবে বাবার যথেচ্ছ আচরণ আর মায়ের নির্বাক জীবন, বাবা মাকে মানুষ জ্ঞান করছে না, সেক্ষেত্রে সেও মনে মনে নারীদের উন্নত দৃষ্টিতে দেখবে বলে মনে হয় না।
আমার কেন জানি মনে হয় পরিবার ভালো মানুষ তৈরিরই শুধু নয়, নষ্ট মানুষ তৈরিরও সূতিকাগার হিসাবে কাজ করে। উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্ত যেধরনেরই হোক না কেন সেসব পরিবারে নারীকে সম্মান করার জ্ঞান এইসব ছেলেরা ছোট থেকেই  পায় না। মা’কে তথাকথিত সম্মান দেখাতে হয় বলে দেখায়, কারণ মাও তাদের আচরণের প্রতিবাদ না করে তাদের উচ্ছন্নে যেতে প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় দেন বলে।
কিন্তু যে ছেলে তার নিজের মাকে সত্যি সম্মান করবে, সে কখনো একটা মেয়েকে অসম্মান করতে পারে না। প্রকৃত ভণ্ড তো তারা, যাদের মায়ের প্রতি লোক দেখানো সম্মান আছে ঠিকই, কিন্তু পুরো নারী জাতি নিয়ে আছে নিকৃষ্ট চিন্তাধারা!
তারা তাদের প্রেমিকার সাথে হোটেল গমন, আর পল্লী ভ্রমণ করতে করতে  তাদের ধারণা হয় বিশ্বজোড়া খাদ্যশালা মোর সব নারীই মোর খাদ্য। এর মাঝে ধর্ষকামী মানসিকতা যারা পোষণ করে  তারা এতোকিছু করেও শান্তি না পেয়ে নিরপেক্ষ উদ্দীপক খুঁজে জোরজবরদস্তির মাধ্যমে তাকে ধর্ষণ শুধু নয়, মেরে ফেলার মাধ্যমে পরিতৃপ্তি অনুভব করে।
নারী মানেই তাদের কাছে একদলা মাংসপিণ্ড হোক ৫ কেজি কিংবা ৫০ কেজি ওজনের, হোক ৫ মাস কিংবা ৫০ বছর বয়সী। মেয়েরাও যে মানুষ, এদের যে প্রাণ আছে সেটা তারা বুঝে না। কতটুকু বিকারগ্রস্ত হলে ছোট্ট শিশুকেও তারা ছাড়ছে না এবং কী পরিমাণ হিংস্র হলে তারা ধর্ষণ করেই ক্ষ্যান্ত দিচ্ছে না, খুনও করে ফেলছে। এইসব পুরুষরুপী হায়েনার উপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিৎ আর তাদের পরিবারকে করা উচিৎ সমাজচ্যুত। পরিবার এই নরাধমের দায়ভার কোনভাবেই এড়াতে পারে না।
No excuse…অমানবিকের সাথে তো মানবিকতা দেখানোর কিছু নাই…বিচার-আচারের প্যাঁচে সময় নষ্ট করারও প্রয়োজন নাই। যত দ্রুত সম্ভব বিচার শেষে সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়ে দেখেন আকস্মিক সংযমের উদয় হবে। কুপুত্রের জন্য  বাবা-মায়ের বেশি কষ্ট হলে স্বেচ্ছায় পুত্রের সাথে সহমরণের অপশন রাখা যেতে পারে…।
এতো বিকৃত পুরুষগুলোর শাস্তি যদি না হয় তাহলে এদের মতো পিশাচের সংখ্যা চক্রবৃদ্ধি হারে  বাড়বেই, কমবে না..
শেয়ার করুন:
  • 40
  •  
  •  
  •  
  •  
    40
    Shares

লেখাটি ১৮৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.