বাসন্তীর দিনগুলি ও তার স্বপ্ন

0

বনানী, টরেন্টো থেকে:

বাসন্তী তখন তৃতীয় শ্রেণীতে পড়তো, আর ওরা থাকতো চট্টগ্রাম কলেজ এর শিক্ষকদের আবাসিক এলাকাতে। ওরা সবাই তৃতীয়- চতুর্থ কিংবা সপ্তম -অষ্টম শ্রেণীর একপাল প্রাণোচ্ছল ছেলেমেয়ে এবং আবাসিক শিক্ষকদের সন্তান।

বাসন্তীর দিনগুলি ছিল মধুর। স্কুল ছুটির পর উন্মুখ হয়ে থাকতো সে কখন নিচে খেলার কম্পাউন্ড এ যাবে, বন্ধুদের সাথে একসাথে খেলবে। কখনো সেভেন্টিজ (সাতটি চাঁড়ার মাধ্যমে খেলা ), কখনো কানামাছি, কিংবা রাজঁহাস -পাতিহাঁস। অথবা নিছকই চট্টগ্রাম কলেজ এর সেই লিচু বাগানের ঢালু টিলাতে শুধুই গড়িয়ে পড়ার পর খিলখিল হাসির নির্মল আনন্দ।

বাসন্তীদের এই কলেজ ক্যাম্পাস এর বিকেলগুলি ছিল বৈচিত্র্যে ভরপুর। কখনো কখনো ছোট গ্রুপদের সাথে বড়ো গ্রুপদের সাথে মতানৈক্যও হতো খেলার এলাকা নিয়ে। তখন সবার প্রিয় মমতাজ আঙ্কেল আসতেন এই দুই গ্রুপের মান ভাঙাতে।

বাসন্তীদের ছোটদের গ্রুপে ছিল পিয়াসা ও তিতাস (অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ এর মেয়ে ও ছেলে)। বাসন্তীরা ছোট ছিল, কিন্তু তখন একটু একটু করে শিখছে কীভাবে যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে বড়দের থেকে নিজেদের অধিকার আদায় করতে হয়।

১৯৭১ সালের প্রথমদিকের এক বিকেল বেলা, বাসন্তী যখন খেলার মাঠের দিকে যাচ্ছিলো তখন বড়ো গ্রুপের একটা ছেলে বাসন্তীকে বললো, “এই যে তুমি আর এখানে খেলতে পারবে না।”
বাসন্তী বলেছিলো, “কেন?”
তখন ছেলেটি (শিক্ষকেরই সন্তান) বলেছিলো, “কারণ তুমি হিন্দু।”
বাসন্তী বলেছিলো,”না, আমি হিন্দু নই।”
ছেলেটি আবারও বললো,”কিন্তু তুমি মুসলমানও নও।”

বাসন্তী ছোট ছিল, তাই এর প্রতি উত্তরে কী বলতে হয় জানতো না এবং মাথা নত করে সেদিন বাসায় ফিরে আসে, এমনকি পরিবার এর কাউকে এটা প্রকাশ করতে পারেনি। এর কিছুদিন পর বাসন্তীদের সেই মাঠে ট্রেন্স খোঁড়া হচ্ছিলো। ছোটরা সবাই ক্যাম্পাস বিল্ডিং এর ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দেখতো এই মাটি খোঁড়ার কাজগুলি। কিন্তু বুঝতে পারতো না ছোটরা, কেন এগুলি হচ্ছে বা কী হবে এগুলি দিয়ে!

স্কুল থেকে ফেরার পথে সেই বড়ো গ্রুপের ছেলেটি বাসন্তীকে দেখতে পেয়ে আরেকদিন বললো, “শোনো, এই ট্রেন্সগুলিতে সবাই থাকতে পারবে, কিন্তু শুধু তোমরা ছাড়া।”
ছোট্ট বাসন্তী বুঝতে পারেনি সেদিন বাসন্তীর বাবাই ছিলেন একমাত্র নন-মুসলিম সেই ক্যাম্পাসে এবং এই ট্রেন্সগুলি খনন করা হচ্ছিলো ২৫শে মার্চের কালো রাত এর থেকে শিক্ষকদের আত্মরক্ষার জন্য।

সুপ্রিয় পাঠক, উপরোক্ত দুটি দৃশ্যপটে সেই ছেলেটিকে কি আমরা মন্দ বা বখাটে আখ্যা দিতে পারি? না, পারি না। সেও ছিল এক নিতান্ত বালক। সে যদিও তথাকথিত একজন শিক্ষকের ছেলে, কিন্তু তার পরিবারের লোকজন বা তার মা – বাবার কাছ থেকে হয়তো শিখেছিল তারা মুসলমান এবং তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা অপরিহার্য ও সর্বাধিকার প্রাপ্ত। তাই তারাই পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক, আর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা আদিবাসীরা হলো দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।

২৫শে মার্চের রাতে ওই দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকদের বেঁচে থাকা, না থাকা মুখ্য কোনো বিষয় নয়। যদিও তাঁরা সহকর্মীর সন্তান বা পরিবার।

একটি শিশুর প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো শিশুটির পরিবার। মূল্যবোধ, সুকুমার বৃত্তিগুলির প্রকাশ ও প্রয়োগ, মানবিকতা, নৈতিকতার বিনাশ ও শুরু এই পরিবার থেকেই শিশুটি শিখে ধীরে ধীরে।

নেপোলিয়ন এর একটা বিখ্যাত উক্তি, “আমাকে একটা ভালো মা দাও, আমি তোমাদের একটা মহান জাতি দেবো।” নেপোলিয়ন এর এই উক্তিটি আমাদের সমাজের জন্য অচল। শুধু মা নয়, বাবাকেও একসাথে শিশুর পরিচর্যা করতে হয় তার মানসিক বুদ্ধিবৃত্তি বিকাশে ও সামাজিকীকরণে। শিশুকে পুঁথিগত শিক্ষা নয়, স্বশিক্ষিত করতে সাহায্য করতে হয় এই মা-বাবাকেই। তাই উন্নত বিশ্বে সন্তান ধারণ করার আগে মা-বাবাকে পেরেন্টাল ক্লাস করতে হয়।

শিশু মনোবিজ্ঞানী, গবেষক Dr. David Elkind তাঁর The Hurried Child: Growing Up Too Fast Too Soon পুস্তকে বলেছেন ,”Let children be children and to resist pushing them too fast and too hard.” অনুগ্রহ পূর্বক, একটি শিশুকে Hurried চাইল্ড তৈরি করবেন না, শিশুকে তার সুকুমার বৃত্তিগুলি বাড়তে সাহায্য করা উচিত আমাদের সকলের মা বাবা হিসাবে, শিক্ষক হিসাবে, প্রতিবেশী হিসাবে, ভাইবোন -আত্মীয়স্বজন হিসাবে।

একটি শিশুর সামনে বাবা মায়ের উচিত নয় পরিবারের অন্য সদস্যদের (চাচা -চাচী, মামা -মামী, কিংবা দেবর- ননদের) সমালোচনা করা। এতে শিশুর কোমল মনে সংশয় এর সৃষ্টি হয়, শিশু বুঝতে পারে না নিকট আত্মীয়স্বজনদের কিংবা তার পাশের বাড়ির প্রতিবেশীকে কী সে ভালোবাসবে নাকি ঘৃণা করবে?

সুধী পাঠক, এবার আবার ফিরে যাই সেই বাসন্তীর বেড়ে উঠার গল্পে। বাসন্তী স্বাধীনতার পর আরও স্বাধীন হলো। তার হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান এমনকি আদিবাসী বন্ধুও হলো। তারা ছিল শিরিন, পুতুল, শুক্লা, রেজওয়ানা, মীনা, শুভ্রা, শর্বরী, আফরোজা, রেকোয়েল, এথিন এবং আরো অনেকে। ১৯৭১ থেকে এখনও পর্যন্ত সবার সাথে বন্ধুত্ব অমলিন। এই বাসন্তীরা বাংলাদেশের প্রতিটা ধর্মীয় উৎসবে যেমন ঈদ, দুর্গাপূজা, বড়ো দিন, পূর্ণিমাকে নিজেদের উৎসব ভেবে অংশগ্রহণ করেছে। এদের পরিবারগুলোও বাসন্তীদের সব বন্ধুদের ধর্ম নিরপেক্ষতার সাথে বেড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। পরিবারগুলিও বাসন্তীর বন্ধুদের একজন মানুষ ভাবতে শিখিয়েছে, হিন্দু মেয়ে বা মুসলমান মেয়ে পরিচয়ে নয়।

বাসন্তী স্বপ্ন দেখে এখনো বাংলাদেশ তার জন্মভূমি, বাংলার মাটিতে একদিন মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। কারণ ধর্ম সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। ধর্মের জন্য মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হতে পারে না।

বাসন্তীর স্বপ্ন যেন একদিন সবার স্বপ্ন হয়। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলি, “ওগো বেদনা, প্রভু দাও মোরে আরো চেতনা, আরো আলো এই দুই নয়নে প্রভু ঢালো।”

July 27, 2019

শেয়ার করুন:
  • 116
  •  
  •  
  •  
  •  
    116
    Shares

লেখাটি ৫২৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.