‘দেশের মেয়েরা কেবল বরাতের জোরে বেঁচে থাকে’

0

সাজু বিশ্বাস:

২০১৫ সালে নেপালের দশরথ স্টেডিয়ামে এএফসি কাপ অনূর্ধ্ব -১৪ তে বাংলাদেশের কিশোরী ফুটবলাররা চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় আমার বন্ধু বাবলু একটা পোস্ট দিয়েছিল। কলসিন্দুরের একটা মেয়ে গোল দিচ্ছে, এমন একটি ছবির উপরে বাবলু লিখেছে,’মার লাথি…, পুরুষতন্ত্রের মুখে’!

বাবলু পুরোপুরি ঠিক বলেনি। আনন্দের মুখে হয়তো একটু বেশিই বলে ফেলেছিল সে। কারণ সেই টুর্নামেন্টের বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৪ জাতীয় দলের আঠারো জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ১০ জনই ছিল ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার কলসিন্দুরের একটি স্কুলের মেয়ে। আর এই মেয়েদের কোচ ছিলেন মফিজ উদ্দিন বলে একজন পুরুষ শিক্ষক।

২০১১ সালে যখন বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ শুরু হয়, কলসিন্দুর প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মিনতি রানী শীল ঐ স্কুলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর মেয়েদের নিয়ে একটি ফুটবল দল তৈরি করার কাজ শুরু করেন। তিনি সহকারি শিক্ষক মফিজ উদ্দিনকে এই মেয়েদের কোচ হিসেবে নিযুক্ত করেন। সেই বছর উপজেলা এবং জেলা পর্যায় পেরিয়ে এই মেয়েরা বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ জিতে নেয়। ব্যস, তারপর থেকে কলসিন্দুর গ্রামের মেয়েদের ফুটবলের যাত্রা শুরু হয়। জনাব মফিজ উদ্দিন এই গ্রামের দরিদ্র মেয়েগুলিকে ফুটবলে প্রথম লাথি মারতে শেখান।

কলসিন্দুরের মেয়েরা লড়াকু আছে। এমনকি একবার মেয়েদের অনুশীলন নিয়ে পাড়ার চায়ের দোকানে স্কুলের শরীরচর্চা শিক্ষক আর একজন অভিভাবকের মধ্যে হাতাহাতিও হয়ে গেছে। কিন্তু কলসিন্দুরের মেয়েরা থেমে থাকেনি। তারা এরপরে দেশের মাটিতেই একটানা তিনবার শিরোপা জিতেছে। এরপর নেপালের দক্ষিণ ও মধ্য এশীয় টুর্নামেন্টে তারা একটা গ্রাম থেকে দশজন জাতীয় দলের হয়ে খেলে সেই খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়।

যেখানে প্রতিদিন মেয়েদের পুষ্টিকর তো দূরে থাকুক, তিনবেলা ভালো করে খাওয়াই জুটে না, সেই রকম একটা জায়গা থেকে এই মেয়েগুলি ফুটবলের মতো একটি কঠিন শারীরিক পরিশ্রমের খেলাটি একজন সহকারি শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে রপ্ত করে ফেলেছে!

কিন্তু খেলার মাঠ আর বাইরের বাস্তবতার মাঝখানে হাজার আর লক্ষ মাইলের ব্যবধান। ২০১৬ সালে এএফসি অনূর্ধ্ব -১৫ এর বাছাই পর্বেও কলসিন্দুরের মেয়েরা চ্যাম্পিয়ন হয়। সেই খেলা শেষ হবার পর পরদিন সকালে কলসিন্দুরের সেই চ্যাম্পিয়ন মেয়েগুলি মহাখালী থেকে একটি লোকাল বাসে চড়ে ময়মনসিংহের দিকে রওনা হয়। তাদের শরীরে খেলোয়াড়ের পোষাকের কারণে লোকাল বাসের অনেক যাত্রী তাদের উদ্দেশ্য করে কটুকথা বলে। শুধুমাত্র পোষাকের কারণে এই কিশোরী মেয়েগুলি আরও কোথায় কতভাবে অপমানিত হয়েছিল, তার হিসেব কে জানে! সকালে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে বিকেল তিনটেয় এই মেয়েগুলি ময়মনসিংহের কলসিন্দুরে তাদের বাড়িতে পৌঁছায়। বাফুফে কি জানে, ঢাকা টু ময়মনসিংহ কত হাজার হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব! তারা একটা লক্কড় ঝক্কড় মাইক্রোবাসও এই মেয়েদের জন্য ব্যবস্থা করতে পারেনি!

পরের বছর ২০১৭ সালে ১৮ সেপ্টেম্বর যশোরের টুর্নামেন্ট শেষ হবার পর কলসিন্দুরের মেয়ে সাবিনা অসুস্থ হয়ে পড়ে। কিশোরী ফুটবলার সাবিনা তার বাবা মায়ের গরিবী ঘরে জ্বর নিয়ে টানা এক সপ্তাহ বিছানায় পড়ে থাকে। সেপ্টেম্বরের ২৬ তারিখ সাবিনা মারা যায়।

ইতিমধ্যে কলসিন্দুর স্কুলের যে ঘরে মেয়েদের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, মেডেল থাকতো– সেই ঘরটিতে কে বা কারা যেন আগুন লাগিয়ে দেয়। সেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় একটি স্কুলের ছোট্ট বাচ্চা মেয়েদের ঘাম ঝরিয়ে ঝরিয়ে প্রতিদিনের কঠোর অধ্যবসায় একটু একটু করে জড়ো করে খুঁজে পাওয়া সমস্ত সাফল্যের স্বীকৃতিগুলো! কেউ কিচ্ছু বলতে পারেনি সেই ঘটনা নিয়ে। কলসিন্দুরের মেয়েগুলো সেই পুড়ে যাওয়া মেডেল আর কাপের ছাই-ভস্ম পিছনে ফেলে আবার ছুটে গেছে জাতীয় লীগের মাঠের দিকে।

কয়েকদিন আগের ঘটনা।
কলসিন্দুরের দুটি সোনার মেয়ে সাজেদা আর মারিয়ার ডেঙ্গুজ্বর ধরা পড়েছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ বলেছে কোনও ব্যাপারই নয়, প্রথমবারের ডেঙ্গু, তাই ঝুঁকি কম।

সাজু বিশ্বাস

ক্রিকেট নিয়ে কত মাতামাতি হয়েছে এইতো কিছুদিন আগেই।
পাকিস্তানের বিপরীতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ আর ভারতের বিপরীতে পাকিস্তান ক্রিকেট প্রেম খাবি খেয়েছে বাংলাদেশের আনাচ কানাচ জুড়ে। আর আমাদের দেশের এক কোণায় এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে দুজন ফুটবলার মেয়ে মলিন বিছানায় শুয়ে ডেঙ্গু জ্বরের সাথে বাস্তব জীবনের লড়াই লড়েছে।

আমাদের দেশের মেয়েরা কেবল বরাতের জোরে বেঁচে থাকে। ক্রিকেটের মৌসুম চলছে। তাই বাফুফে বোধহয় শীতনিদ্রায় চলে গেছে! আর কিছুদিন পরেই ফুটবলের মরসুম আসবে। তারা পরের জাতীয় টুর্নামেন্টের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়বে কিছুদিন পরেই। এক একটা টুর্নামেন্টের অ্যারেঞ্জমেন্ট করতেই কত খরচ। চাকর- নোকর- কোচ- মাস্টার- সবার থাকা খাওয়া যাওয়া আসা উঠা- বসার কত কত খরচ! এর মধ্যে কলসিন্দুরের কয়েকটা সস্তা খেলোয়াড়দের কথা ভাবার সময় কোথায় পাবে তারা!

শেয়ার করুন:
  • 45
  •  
  •  
  •  
  •  
    45
    Shares

লেখাটি ১২২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.