অনেক বাধার দেয়ালে আটকে থাকে নারীর জীবন!

0

কাজী তামান্না কেয়া:

মানুষ বলে মরার পরে বেহেস্ত দোজখ অপেক্ষা করে৷ আমার কাছে তো মনে হয় বাংলাদেশই একটা আপাদমস্তক দোজখ৷ আগেই গালি দেয়া শুরু করবেন না যেন৷ আমেরিকায় থাকি বলেই কি এই কথাটা বলছি নিজের দেশ নিয়ে? উত্তর হ্যাঁ এবং না, দুটোই৷ আমেরিকায় থাকার কারণে বলতে পারি নিরাপত্তা কী জিনিস এবং কত প্রকার!
আর সমস্যা আছে বলেই এই লেখা লিখছি৷

আমি এখন যে শহরে থাকি, কলাম্বিয়া, এটা উত্তরের স্টেট মানে ওয়াশিংটন ডিসি, ম্যাসাচুসেটস বা নিউইয়র্কের রাজধানী শহরের মতো এতো উন্নত নয়৷ বরং ফরেস্টের আধিক্য থাকায় এখানে অনেকটা গ্রাম গ্রাম ভাব বা অনুন্নত৷ বেশিরভাগ রাস্তাঘাটে পায়ে হাঁটার পথ নাই, মাটির নিচে সাবওয়ে নাই, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা ভালো না যে কারণে অনুন্নত বলছি৷

ভাল দিকগুলো হলো রাস্তা ঘাটগুলোয় ডিভাইডার আছে, মানুষ ট্রাফিক আইন মেনে চলে, কেউ রাস্তা পার হতে গেলে আগে তাকে পার হতে দেয়, রাস্তায় ডিজিটাল বোর্ডে রোড এক্সিডেন্টে সাউথ ক্যরোলিনায় কত লোক মারা গেছে এ বছর তা লিখে রাখে।

এমন আরো অনেক কিছু উল্লেখ করা যায় যা রোড এক্সিডেন্টকে কমিয়ে দেয়৷ তাছাড়া ছেলে কিংবা মেয়ে ড্রাইভার বলেও আলাদা করে বলার মতো কিছু নেই৷ এ শহরে কাজে গেলে নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে যেতে হবে সে আপনি পুরুষ নারী যাই হোন না কেন৷ আর হ্যাঁ, কাজে যাওয়া মানে যে কোনো কাজ, সে অফিসে কম্পিউটারে বসে খটাস খটাস করুন, বা রেঁস্তোরায় খাবার পরিবেশন করুন, Going to work বা কাজে যাওয়াই বলে এদেশে৷

আমি নতুন গাড়ি চালানো শিখছি৷ গাড়ি চালানো শিখছি বলেই এদেশের আইন কানুনের প্রশংসা করছি, তা না৷ আমি শুধু ভাবছি এই কাজটা বংলাদেশে শুরু করলে আমি কতটা দুশ্চিন্তায় থাকতাম?
ঢাকার রাস্তার লেন কম সড়কেই আছে৷ তাই সামনে পেছনে চাপের সাথে ডানে বামের চাপ সহ্য করে গাড়ি চালাতে হবে৷ ঢাকা শহরে গাড়ি চলে একটার গায়ে আরেকটা লাগিয়ে৷ প্রতি মুহূর্তে ব্রেক কষে গাড়ি চালাতে হবে৷ আর একটু ঝামেলা হলেই একজন পথচারির জীবন শেষ৷ আছে রিকশা এবং ভ্যানের মতো মানুষ টানা গাড়ি৷ ঢাকার তিনটা বড় রাস্তায় রিকশা বন্ধ করেছে বলে কতো আন্দোলন হলো৷ যারা আন্দোলন করেছে তারা কি জানে প্রতিদিন কতজন পথচারি রাস্তায় চাপা পড়ে? শিবের গীত গাচ্ছি? শাট আপ!

তবে এসব কিছুর সাথে আরো আছে মেয়ে ড্রাইভার হবার বাড়তি চাপ৷ আজকাল রাস্তাঘাটে, ব্যবসা বাণিজ্যে সব জায়গায় বিভিন্ন মতের মানুষের ছড়াছড়ি৷ এরা অনেকেই ভালো এবং নিরীহ প্রকৃতির মানুষ৷ কিন্তু দিনকে দিন ওয়াজের মাধ্যমে, নামাজের খুতবায় এদের বড় একটা অংশকে নারীবিদ্বেষী করে তোলা হয়েছে বা হচ্ছে এখনও।

আবার বলছি, আমি সবার কথা বলছি না৷ কিন্তু আপনি কি অস্বীকার করবেন তাদের একটা বড় অংশ বিশ্বাস করে মেয়েরা বাইরে বেরোতে পারবে না! আর বেরোলে তারা তাদের জামা কেটে দেবে, গায়ে হাত দেবে, গায়ে পানের পিক/থুতু ফেলবে, আর যদি কিছুই করতে না পারে তবে কানের সামনে এসে অতি খারাপ কিছু শব্দ শুনিয়ে যাবে! এই বাজে কাজগুলি করার জন্যে তাদের কোন অনুশোচনা নেই, বরং এটা তাদের অধিকার বলেই মানে৷ একমাত্র জামা কাটা ছাড়া এর প্রতিটার শিকার আমি হয়েছি৷

যদি একজন মেয়েকে রাস্তায় বের হবার আগে এতো রকম গঞ্জনা নেবার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে বেরোতে হয়, সেখানে একটা মেয়ে ড্রাইভার এর মানসিক চাপটা কী রকম, আমরা কি তা জানি?

আমি আঙ্গুল তুলছি দেশের অর্ধেকের বিরুদ্ধে, যারা সবাই না হলেও একটা বড় অংশ মেয়েদেরকে রাস্তায় নাজেহালের চূড়ান্ত করে ছাড়ে৷ এরা দেখতে নিরীহ হলেও কাজে কর্মে মোটেও নিরীহ নয়৷ পুরো সমাজ ব্যবস্থাটাই যেখানে প্রচণ্ড রকম পুরুষবান্ধব, সেখানকার নারীরাও বহুলাংশে পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান ধারণা নিয়ে চলে৷ এইসব বাধার দেয়াল টপকে একজন নারী হয়ে বেঁচে থাকা বাংলাদেশে আদতেই কঠিন৷ নরক, সে কি আসলেই দূরে?

শেয়ার করুন:
  • 171
  •  
  •  
  •  
  •  
    171
    Shares

লেখাটি ৫৮০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.