স্পাইডারম্যান আসলো না!

0

সাবিনা শারমিন:

গুলশান ট্র্যাজেডিতে হত্যা হওয়া ডেডবডিগুলো যখন ময়নাতদন্ত করা হয়েছিলো তখন নারীদের শরীরগুলো দেখে ডাক্তাররা হতবাক হয়েছিলো। কারণ পুরুষদের তুলনায় নারীদের শরীরগুলোতে নাকি আঘাতের চিনহ অনেক অনেক গুণ বেশী ছিলো।

ডাক্তাররা বলেছিলেন, অল্পবয়সী জঙ্গি ছেলেগুলোর মাথার ভেতরে নারীদের প্রতি যে ঘৃণা রোপন করে দেয়া হয়েছিলো, ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া শরীর সেটাই প্রমাণ করে। হ্যাঁ, ঢাকার বড়লোকের জঙ্গি নাতিরা, ছেলেরা, নারীদের শরীরগুলো কুপিয়ে, খুঁচিয়ে, থেঁতলিয়ে, জখম করে জিঘাংসা মিটিয়েছিলো।

পুরনো প্রসঙ্গ কেন আনলাম? আমি সেই ডেডবডিগুলো দেখিনি, কিন্তু চল্লিশ বছরের রেনুকে যখন সন্তানের বয়সি হৃদয় সমস্ত শরীরের শক্তি প্রয়োগ করে লাঠি দিয়ে কোপাচ্ছিলো, তখন কল্পনায় আমি যেনো সেই দৃশ্য দেখতে পেলাম।এরকম ক্ষোভের নজির খাদিজা, তনু, নুসরাতের বেলাতেও দেখা গেছে। ছেলেধরা সন্দেহে পুরুষদেরকেও হত্যা করা হয়েছে, হচ্ছে, কিন্তু নিষ্প্রাণ হয়ে যাওয়ার পরেও রেনুর মৃত শরীরের উপর এতো জেদ এগুলো কীসের লক্ষণ?

একজন অচেনা অশিক্ষিত কিশোর সবজি বিক্রেতা সারাজীবন ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করা একজন সাবেক শিক্ষিকা নারীকে হাজার হাজার মানুষের সামনে বিষাক্ত সাপ পেটানোর মতো মারতে মারতে মারতে মাথার ঘিলু বের করে দিলো, হার্টের ভেতরে হাড় ঢুকিয়ে দিলো! আর আমরা দর্শকরা সেই ছবি ফেইসবুকে দেয়ার জন্য রেনুর শরীরের উপর ক্যামেরা ক্লিক ক্লিক ক্লিক করলাম। আমরা সদ্য হারানো শিশু সন্তানকে গিয়ে খুঁচিয়ে খুচিয়ে জিজ্ঞেস করি ‘তোমার মা এখন কোথায় আছো তুমি জানো?’ এই হচ্ছি আমরা কথিত সমাজ সেবক!

এতো হাজার হাজার মানুষের মধ্যে একজন দায়িত্বশীল মানুষ বা পুলিশ পাওয়া গেলো না যিনি এসে এই ছেলেকে বাঁধা দিতে পারতো! আমার প্রশ্ন, যে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার কাছে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো, তিনি একটি স্কুলের প্রধান হিসেবে কী দায়িত্ব পালন করেছিলেন? একজন মানুষের জীবনের নিরাপত্তার দায় তিনি নিজ কাঁধে নিতে পারলেন না? তার কাছে কি পুলিশের ফোন নম্বর ছিলো না? প্রধান শিক্ষিকা যথাযথ দায়িত্ব পালন করলে এমন ঘটনা হয়তো আমাদের নাও দেখতে হতো।

ভীড়ের মধ্যে সাদা শার্ট পরা একজন বয়স্ক লোককে এগিয়ে আসতে দেখেছিলাম। ভেবেছিলাম তিনি হয়তো বলবেন, আমার মেয়েকে তোমরা মেরো না! ও ছেলেধরা নয়, ও আমার মেয়ে! সমবয়সী নারীও দেখেছি, তিনিও কি বলতে পারলেন না ‘তোমরা থামো, সে আমার স্কুলের ক্লাসমেট! ওকে ছেড়ে দাও। থামো! কেউ থামালো না।

এক পর্যায়ে রেনুর নেতিয়ে পরা হাতটি নিয়ে যখন ছেলেটি পরীক্ষা করলো যে বেঁচে আছে কিনা, এবং তৎক্ষণাৎ আবার লাঠি দিয়ে পুকুরে মাছ কুচানোর মতো লাঠি দিয়ে কোপাচ্ছিলো, তখন ভেবেছিলাম, গ্রিক মিথলজিতে পাওয়া পালকের সাহায্য প্রথম আকাশে ওড়া বাবা ছেলে ডেডিলাস আর ইকারুস হয়তো উড়ে এসে রেনুকে পৌঁছে দেবে তাঁর সন্তানদের কাছে!
কল্পনায় দেখছিলাম, এখনি ওখানে স্পাইডারম্যান এসে ছোঁ দিয়ে রেনুর শরীরটি ওখান থেকে তুলে নিয়ে যাবে তাঁর মায়ের কাছে!
নাহ!

কিন্তু আসলো না স্পাইডারম্যান!

শেয়ার করুন:
  • 207
  •  
  •  
  •  
  •  
    207
    Shares

লেখাটি ১,৩০৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.