সাম্প্রদায়িকতার মুখোশ খুলে আয়নায় নিজেকে দেখুন

0

জুয়েল রাজ:

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় কারণে নির্যাতনের শিকার হওয়া ২৯ টি দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় নেতা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার অফিসে কথা বলেন। এতে বাংলাদেশি প্রিয়া সাহা ট্রাম্পের কাছে অভিযোগ করে বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ‘নাই’ (ডিসেপেয়ার এর মানে তো তাই) হয়ে গেছে। পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত নিপীড়নের বর্ণনাও দেন। বর্তমানে বাংলাদেশে ১ কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু রয়েছে উল্লেখ করে তিনি ট্রাম্পের সহায়তা চান। আর এই কারণেই সারা দেশের মানুষ ক্ষেপেছেন তার উপর। দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন প্রিয়া, এই অভিযোগে।

প্রিয়া সাহার বক্তব্যের প্রতিবাদে দলমত নির্বিশেষে যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন সত্যি বলছি, আমাকে আশাবাদী করেছে। কট্টর সাম্প্রদায়িক লোকটিও বলছে, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ, সংখ্যালঘুদের পুষ্পশয্যা বাংলাদেশ!

মানুষের চেয়ে সুন্দর এবং মানুষের চেয়ে বড় বিচারক পৃথিবীতে আর কেউ নাই। মানুষের আদালতে যে রায় হয় সেটাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রায়। আবার সেই মানুষই খুনি হয়, ধর্ষক হয়, আবার গণপিটুনিতে অংশ নেয়, দাঁড়িয়ে তামাশা দেখে, ভিডিও করে। প্রিয়া সাহা বনাম বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন পর্বের রায় মানুষের আদালতে বাংলাদেশ দিয়ে দিয়েছে। মানুষের এই দেশপ্রেমের কাছে প্রিয়া সাহা পরাজিত হয়েছেন। এই রায় আমাদের আশার আলো দেখিয়েছে।

প্রিয়া সাহার আগে কি এই কথাগুলো আর কেউ বলেনি? হুম, প্রিয়া সাহা যে কাজটা করেছেন সংখ্যার তথ্যগত ভুল করেছেন। তিনি ৩ কোটি ৭০ লাখের যে হিসাব দিয়েছেন সেই সংখ্যা নিয়ে দ্বিমত থাকতেই পারে। আমার নিজেরও দ্বিমত আছে এই সংখ্যা নিয়ে।

কিন্তু প্রিয়া সাহার এই মিথ্যাচারটুকু আমাকে আশাবাদী করেছে। আমরা যারা ৭১ দেখিনি, মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, আমরা দেখেছি যে কোন ইস্যুতে রাজনৈতিক বিভাজন। হত্যা খুন ধর্ষণ দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র যাই ঘটুক, সব বিষয়েই দুইটা তিনটা পক্ষ দাঁড়িয়ে যায়। একদল পক্ষে, অন্যদল বিপক্ষে আর তৃতীয় পক্ষ সুশীল। যারা, তবে, কিন্তু দিয়ে একটা জোড়াতালি দেয়ার চেষ্টা করেন। ৭১ এর যুদ্ধাপরাধী, মানবতা বিরোধীদের বিচারের ক্ষেত্রেও এখনো দুইটা পক্ষ বিরাজমান। দেশপ্রেম এইখানে বিভক্ত! এইবারই প্রথম প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে এক জায়গায় এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে বাংলাদেশের সব নাগরিক। তার মানে আমাদের সুযোগ আছে এক হওয়ার।

আমাদের বাল্যশিক্ষায় শেখানো হয়েছিল মিথ্যা বলা মহাপাপ, আবার স্কুলের ধর্ম শিক্ষায় শিখানো হয়েছিল, কোন মিথ্যা যদি জীবন রক্ষা করে তবে সেই মিথ্যায় পাপ নেই। প্রিয়া সাহার বক্তব্যের পর আমার মনে হয়েছে এই রকম মিথ্যায় পাপ নেই। একটি মিথ্যাচার অন্তত সারা জাতিকে এক করতে পেরেছে।

প্রিয়া সাহা বলার আগে আমেরিকা বা ডোনাল্ড ট্রাম্প কি এই তথ্য আদৌ জানতো ন? যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশ কোথায় সেটাই জানেন না ভাব ধরেছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও আর্জি জানিয়েছেন কাশ্মির সমস্যা সমাধানে মধ্যস্থতা করার।
ইমরান খান ট্রাম্পকে বলেছনে কাশ্মির সমস্যা সমাধান করলে ১০ কোটি মানুষ নাকী তাঁর কাছে ঋণী থাকবে। ভারত যদিও ট্রাম্পের দাবিকে নাকচ করেছে, বলেছে মোদী এই অনুরোধ করেননি। এই ঘটনায় পাকিস্তান, ভারতের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ কেউ তুলেছে বলে শুনি নাই।

কিন্তু বাংলাদেশের মানুষই শুধু প্রিয়া সাহার বক্তব্যকে নাকচ করে দিয়েছেন। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক তীর্থভূমি হিসাবে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশে কি আসলেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি বহমান?
সরকারের পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত নির্যাতনের সংবাদ কিছুই মানতে রাজী নন।
Office of the United Nations High Commissioner for Human Rights (OHCHR) এর সাইটে গেলে একটা ৪৬ পাতার পিডিএফ ফাইল পাওয়া যাবে যেখানে ‘silent ethnic cleansing’ নিয়ে একটা রিপোর্ট আছে, minority rights এর ওয়েবসাইটে গেলে ৩২ পাতার ‘challenges facing religious minorities in Bangladesh’ নামে আরেকটি পিডিএফ আছে। ওটাও দেখে নিতে পারেন।

কেউ কি এই তথ্যগুলো জানেন? কীসের ভিত্তিতে এইসব প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে, একবারও কি প্রতিবাদ জানিয়েছেন?

তাহলে প্রিয়া সাহার বক্তব্যে সমস্যা কী? সংখ্যাগত ভুল, নাকি পুরো বিষয়টা মিথ্যা, নাকী নামটা প্রিয়া সাহা বলে? এই বিষয়গুলো কেউ না বলে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের এক ধরনের মৌখিক নির্যাতন শুরু করেছেন। তাদের চৌদ্দ পুরুষ উদ্ধার করে দিচ্ছেন।

২০১৮ সালে খোদ বাংলাদেশে বসেই আমেরিকান হাই কমিশন ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা দিতে পারেনি বাংলাদেশ’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, তাও সাংবাদিকদের ডেকে, সেখানে উল্লেখ করেছিল, ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে চললেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দিতে পারেনি বাংলাদেশ। তাদের উচ্ছেদ ও জমি দখল হয়ে যাওয়া থেকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বৌদ্ধ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের বাড়িতে আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে।

পাঠ্যপুস্তকে ঐতিহ্যগত ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়গুলোয় তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাঠ্যপুস্তক থেকে অমুসলিম লেখকদের লেখা সরিয়ে ধর্মের সঙ্গে সম্পর্ক নেই—এমন সব বিষয়েও ধর্মীয় উপাদান যুক্ত করা হয়েছে।
২০১৭ সালে বাংলাদেশসহ প্রায় ২০০টি দেশের ধর্মীয় স্বাধীনতা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

আমেরিকান সেন্টারের একটি বিবৃতিতে বলা হয়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, যেমন: হিন্দু, বৌদ্ধ, ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষদের উচ্ছেদ ও তাদের জমি দখল হয়ে যাওয়ার বিষয়ে কার্যকর সুরক্ষা দিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
গত বছর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন, বিশেষ করে বৌদ্ধ ও হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। জুন মাসে দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চাকমাদের ৩০০ বাড়িতে আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে। ওই সময় ৭০ বছর বয়সী এক নারী হামলায় নিহত হোন। একজন মুসলিম ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনা থেকে আগুন-সহিংসতার সূত্রপাত ঘটে। ফেসবুকে ইসলাম অবমাননাকর পোস্ট দেয়ার অভিযোগে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা রংপুরে হিন্দুদের ৩০টি বাড়িতে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়।

এতে বলা হয় হয়, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বাংলা পাঠ্যপুস্তক থেকে দেশটির ঐতিহ্যগত ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়গুলোতে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। যেমন অমুসলিম লেখকদের লেখা সরিয়ে নেয়া হয়েছে এবং ধর্মের সঙ্গে সম্পর্ক নেই—এমন সব বিষয়েও ধর্মীয় উপাদান যুক্ত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে জঙ্গিবাদ নির্মূলে সরকারের পদক্ষেপের প্রশংসা করে বলা হয়েছে, দেশটির সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে উল্লেখ করা হলেও দেশটি ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে চলে। ধর্মীয় বৈষম্য নিষিদ্ধ করে সব ধর্মের জন্য সমতার কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ওপর জোর দিয়ে মার্কিন দূতাবাস বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা, বিশিষ্ট নাগরিক, বেসরকারি সংস্থা ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছেন।

নালিশের রাজনীতি নতুন কিছু নয়, পদ্মাসেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক, আমেরিকা সব জায়গায় নালিশ হয়েছে, আমেরিকায় বাংলাদেশের তৈরি পোষাকের শুল্কমুক্ত প্রবেশ সুবিধা বাতিলের দাবিতে স্বয়ং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চিঠি লিখেছিলেন। যুদ্ধাপরাধীর বাঁচাতে পৃথিবীর সব দেশেই লবিং হয়েছে। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা, আইন আদালত, সংবিধান কিছুই তারা মানতে রাজী নয়।

ইউটিউবে ভিডিওটি খুঁজলে এখনো পাওয়া যাবে, ব্যারিস্টার তুহিন মালিক লন্ডনে এক সভায় জাতির জনক, বাংলাদেশের সংবিধান সবকিছুকে জঘন্যভাবে আক্রমণ করে বক্তব্য দিয়েছিলো। লন্ডনে বিভিন্ন সংগঠন আছে যারা বাংলাদেশ রক্ষার নামে প্রতিমাসে এই দেশের মন্ত্রী, এমপি দের নিয়ে এখনও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন।

এবং অবাক করার বিষয় যে, এই অংশটাকেই দেখলাম প্রথম প্রিয়া সাহার বিরোধিতা শুরু করে। ঠিক এর একদিন আগে চট্টগ্রামে ইসকনের নামে গুজবের অবসান হয়। ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাংচুর করার পরে দৈনিক ইনকিলাব (রাজাকার মান্নানের পত্রিকা) উদ্দেশ্যে প্রণোদিতভাবে নিউজ করলো, ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙায় ঢাকার শাঁখারী বাজারে হিন্দুদের মিষ্টি বিতরণ। সারা দেশজুড়ে শুরু হয়েছিল তাণ্ডব।

কারো কাছে কি সেই হিসাব আছে কতো সনাতন ধর্মালম্বী সেই সময় দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল, কতো প্রার্থনালয় ধ্বংস হয়েছিল?
২০০১ সালের নির্বাচন, ২০১৪ সালের নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা, সাঈদীকে চাঁদে দেখার গুজবের পর সহিংসতা, সবকিছু দুর্বৃত্তদের নামে চালিয়ে দিয়েছে আমাদের গণমাধ্যম। বাংলাদেশে কয়টা মসজিদ ভাংচুর হয় আর কয়টা মন্দির ভাংচুর হয়, সেই হিসাবটা একবার নিলেই হবে।

প্রিয়া সাহা মিথ্যাচার করেননি, অর্ধসত্য বলেছেন, আর এর মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের একটি আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে গেল, হয় মুখ বুঁজে মানিয়ে চলতে হবে, না হয় পালাতে হবে, কিন্তু বিচার দিতে পারবেন না।
সিলেট অঞ্চলে একটা প্রবাদ আছে, ভাত দেয়ার মুরোদ নাই, কিল দেয়ার গোঁসাই (মানে ভাত দেয়ার যোগ্যতা নাই, কিন্তু বউকে মারধর করার ক্ষেত্রে
ঠিকই এগিয়ে)।

তবে যে ভুলগুলো করেছেন প্রিয়া, তাহলো ‘মুসলিম মৌলবাদী’ শব্দটা ব্যবহার করে। যদি বিএনপি-জামায়াত বলতেন, আওয়ামী লীগ মাথায় করে রাখতো, আর যদি শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের দোষ দিতেন, তাহলে জামায়াত-বিএনপি প্রিয়ার পক্ষে দাঁড়াতো। এই জায়গায় প্রিয়া সাহা ধরা খেয়ে গেছেন। প্রিয়ার দেয়া লজ্জাই যেন আমাদের শেষ লজ্জা হয়। বাংলাদেশে আর একটি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটবে না, এমনটাই আশা করতে চাই!

অনেকেই জানেন, পৃথিবীতে অভিবাসীর ক্ষেত্রে দুই ধরনের ফ্যাক্টর কাজ করে, Pull Factor এবং Push Factor। যারা উন্নত জীবনের আশায় ভালো কামাই l Factor রোজগারের আশায় দেশান্তরী হোন, তারা এই Pull Factor এর আওতায় পড়েন। আর যাদের জোর করে উচ্ছেদ করা হয়, বা দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়, তারা Push Factor এর আওতায় পরেন। সংখ্যালঘু যারা দেশান্তরী হয়েছেন, তাদের অধিকাংশই বাধ্য হয়েছেন।

সাম্প্রদায়িকতা এই উপমহাদেশে নতুন কিছু নয়, এইটা নিয়ে লুকোচুরির কিছু নেই, বরং দায় স্বীকার করে নিলেই বরং এর থেকে উত্তরণ সম্ভব। সমস্যাই যদি চিহ্নিত করতে না পারেন, সমাধান কীভাবে দিবেন!

জুয়েল রাজ, সাংবাদিক ও অনলাইন এক্টিভিস্ট

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, রক্তপাত, দেশ বিভাগ সবই তো সাম্প্রদায়িকতার ফসল। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাজউদ্দীন আহমদ নামটাই পাকিস্তান রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের জন্যে ছিল মাথাব্যথার। তাঁর বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে অজস্র, “তাজউদ্দীন ভারতে গিয়া হিন্দু হইয়াছেন” লেখা লিফলেট ছড়ানো হয়েছে শহরজুড়ে, পবিত্র কোরআনের হাফেজ একজন মানুষের নামের আগে শ্রী পদবী যুক্ত করে তাঁকে শ্রী তাজউদ্দীন নামে ব্যঙ্গ করা হয়েছে সবসময়।

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের মূল অস্ত্র ছিল ধর্ম। বাংলাদেশে এখনও শেখ হাসিনা এমনকি খোদ শেখ মুজিবের পূর্ব পূরুষ হিন্দু ছিল বলে প্রচারণা চালানো হয়। এবং কিছু মানুষ তা বিশ্বাসও করে।

১৯৭১ সাল দেড় কোটি মানুষ ভারতে শরণার্থী হয়েছিল বলা হয়। যার এক কোটিই ছিলেন হিন্দু, দেশ স্বাধীন হলো, একবুক আশা নিয়ে হিন্দুরা দেশে আসার পূর্বেই জানতে পারলো শত্রু সম্পত্তি আইন পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। এই আইন অনুসারে ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৬৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তারিখ পর্যন্ত যেসব পাকিস্তানি নাগরিক পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে গিয়েছিলেন, তাঁদের স্থাবর সম্পত্তি যা পাকিস্তান আমলে ‘শত্রু সম্পত্তি’ ও বাংলাদেশ আমলে ‘অর্পিত সম্পত্তি’ নামে অভিহিত হয়েছিল। তাই নিরাশ হয়ে ভিটেমাটি ছাড়া এক কোটি হিন্দু ভারতেই শরণার্থী হয়ে রয়ে গেল, হিন্দুদের নামে থাকা সকল শিল্পকারখানা জাতীয়করণ করা হলো, শিল্পপতি হিন্দুরা বাস্তুচ্যুত হলো, কিছু বলতে পারলো না, তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতা নষ্ট হবে। এবং শুধুমাত্র হিন্দুদের সম্পত্তিই ‘শত্রু সম্পত্তি’ হিসাবে গণ্য হয়েছে। তারপর ১৫ ই আগষ্টের ট্রাজেডি, সামরিক সরকারের সময় রাষ্ট্রকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামিক রুপ দেওয়া হলো। পৃথিবীর আর কোন দেশে এই শত্রু সম্পত্তি আইন আছে বলে আমি জানি না। যদিও বর্তমান সরকার আইনটি সংশোধন করে সম্পত্তি ফেরত নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।

লন্ডনে আমি হাজারটা উদাহরণ দিতে পারবো, প্রয়াত হাই কমিশনার মিজারুল কায়েসকে একবার বলেছিলাম এই যে সেমিনারের নামে যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের উত্তরসূরীরা বাংলাদেশকে প্রতিদিন বিক্রি করছে, আমি কয়েকটা সংগঠনের নামও সে সময় দিয়েছিলাম যারা এখনও লন্ডনে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, শাপলা চত্বরে হাজার হাজার মানুষের লাশ গুম, পিলখানা হত্যাকাণ্ড আওয়ামী লীগের নীল নকশা, ইত্যাদি নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সাথে অভিযোগ করছেন। এদের সদস্য সমর্থকেরা দেখলাম সবার আগে দেশদ্রোহিতার অপরাধে প্রিয়া সাহার শাস্তি দাবি করছেন। ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডায় যারা রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন একবার কি তাদের জিজ্ঞাসা করে দেখেছেন, দেশকে কতবার, কতভাবে, শুধু ভাবমূর্তি নয় হাজার হাজার মূর্তিতে ভেঙেছেন। একবার জানার চেষ্টা করবেন।

গায়ের জোরে অসাম্প্রদায়িক হতে পারবেন না। আগে বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রাণে ধারণ করুন। কথায় কথায় ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ, এই দেশে এই হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি চলবে না, হিন্দু লেখকের লেখা চলবে না, হিন্দু লেখা জাতীয় সঙ্গীত চলবে না, এইসব বন্ধ করেন।

৭২ এর সংবিধানে দেশ ফিরে গেল, আদালতের রায়ে সাবেক স্বৈরশাসকদের সব সংশোধনী বাতিল করা হলো, কিন্তু রাষ্ট্রধর্মের জায়গায় হাত দেয়া হয়নি। কারণ সেই সাম্প্রদায়িক মনোভাব। এতে হাত দিলেই আগুন জ্বলবে, সেটা এই সরকারও জানে।

এই সংবিধানে কি অন্য ধর্মের মানুষের রক্তের দাগ নেই? সেদিন কি কেউ দাবি তুলেছিলেন এই দেশ মানুষের, কোন ধর্মের না? এই সংবিধান বাংলাদেশের কোন ধর্মের না? করেননি। তাই আগে নিজে আয়নায় দাঁড়ান। সত্যিকার অর্থেই নিজে কতটা অসাম্প্রদায়িক সেইটা বুকে হাত দিয়ে যাচাই করেন।

জাতির জনক সেটি জানতেন, মানতেন, বিশ্বাস করতেন বলেই বলতে পারেন, “এই দেশ হিন্দুর না, এই দেশ মুসলমানের না। এই দেশকে যে নিজের বলে ভাববে, এই দেশ তার। এই দেশের কল্যাণ দেখে যার মন খুশিতে ভরে উঠবে, এই দেশ তার। এই দেশের দুঃখে যে কাঁদবে, এই দেশ তার। এবং এই দেশ তাদের, যারা এই দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দিবে”।

এই যে কথায় কথায় সংখ্যালঘুদের ভারত চলে যাওয়ার কথা বলা, কিংবা অনেকেই অসাম্প্রদায়িকতার পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছেন, আমরা তো তাঁদের খুব সম্মান দিয়ে রেখেছি এই দেশে, সরকারি চাকরিতে সুযোগ সুবিধা দিচ্ছি, এই বেঈমানদের দেশ থেকে লাত্থি দিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেয়া দরকার। এই হলো অসাম্প্রদায়িকতার নমুনা।

আরে ভাই তাঁর দেশে তাঁকে আপনি আলাদা সম্মান দিয়ে রাখবেন কেন? আপনি কে এটা দেয়ার? তাঁর মানে সমস্যা আছে কোথাও? আপনার সম্প্রদায়ের মানুষটির প্রতি আপনার যে সম্মান ভালবাসা, একই ভালবাসা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষটিও আশা করে। বাংলাদেশের জাতীয় কালী মন্দির থেকে শুরু করে এমন কোন মন্দির বা শ্মশান ঘাট আছে, যার ভূমি দখল হয়নি?

আরেকজন লিখেছেন, আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই নিখোঁজ মানুষগুলি বাংলাদেশের কত শত, হাজার কোটি টাকা পাচার করে ভারতে গিয়েছে। যারা সেখানে গিয়েছে, তাদের মধ্যে হাজার হাজার ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উচ্চ শিক্ষিত লোক রয়েছে। তাদের পেছনে রাষ্ট্রের কোটি কোটি খরচ হয়েছে। তাদের বলেন, সেগুলি ফিরিয়ে দিতে।

কেউ বা লিখছেন বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ, আমরা আসলে দুধ দিয়ে কালসাপ পুষছি। যুক্তি বটে! এবং এটাই বাস্তবতা, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ সংখ্যালঘু বা হিন্দু সম্প্রদায় নিয়ে অন্তরে এই বিষটুকু লালন করেন।

২০১৩ সালে কবি নির্মলেন্দু গুণ কবিতা লিখেছিলেন –

রাইতভর ঘুমাইতে পারি না
ওরা আবার কহন আহে,
যশোর মালোপাড়া, অভয় নগর,
ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নাসির নগর,
কক্সবাজারের রামু, নোয়াখালীর রাজাগঞ্জ, পঞ্চগড় এর দেবীগঞ্জ।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট

শেয়ার করুন:
  • 1.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.1K
    Shares

লেখাটি ১,৫২৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.