ছদ্মবেশ

0

সালমা সিদ্দিকা:

(১)
দুপুর দুইটা বাজতেই হামিদার বুক ধরফর করতে থাকে। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে সব কাজ এলোমেলো হতে থাকে, সহজ কাজেও ভুল হয়।
তার শাশুড়ি তাকে ধমকে যেতে থাকে, ‘কিতা বেটি, কামোর সময় মন খানো থাকে? খবিশ কুনখানোর।’

শাশুড়ির বকুনি সয়ে গেছে, কাজে মন লাগায় হামিদা। তিনটার সময় মাহবুব ঘরে ফিরে ভাত খায়। বাসী কোনো খাবার তার সামনে দেয়া যায় না।
সকালের নাস্তা নাকে মুখে উঠিয়ে রান্না করতে শুরু করে। দুপুর বারোটায় শাশুড়িকে খাবার দিতে হয়। তিনি ডায়াবেটিসের রোগী, সময় মতো খাবার খেতে হয়। উনার খাবার আলাদা করে রান্না করতে হয়।

লন্ডনের বেথনাল গ্রিনে থাকে ওরা। উডফোর্ডে একটা টেকওয়ের মালিক মাহবুব। গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে কাজ করতে হয়। সকালে অনেক দেরিতে ঘুম থেকে উঠে চা খেয়েই আবার বের হয়ে যায় টেকওয়ের রাতের পিজা কাবাব বার্গার রেডি করে রেখে আসতে। দুপুর তিনটার দিকে ফিরে ভাত খায়, ওই এক বেলাতেই বাসায় খায় মাহবুব।

দিনরাত প্রবল পরিশ্রমে হোক অথবা স্বভাব দোষেই হোক, মাহবুব ভীষণ খিটখিটে। হামিদা গায়ে মাখতে চায় না, তবু বুকের ভেতর কেমন জানি গভীর কষ্ট সব সময় কুরে কুরে খায়, একটু কি মমতা দেখাতে পারে না লোকটা? বিয়ের পর থেকে শুধু অবহেলাই পেয়ে গেছে।

হামিদা রান্না শেষে মেয়ের ঘরে আসে। এখন আড়াইটা বাজে, হাতে একটু সময় আছে, মেয়ের সাথে একটু গল্প করা যায়। মেয়েটা চোখের সামনে কেমন বড় হয়ে গেল, এখন কেমন অচেনা লাগে। সামনে এ লেভেল পরীক্ষা, সব সময় পড়া নিয়ে থাকে মেয়েটা।

হামিদা আয়েশার ঘরে ঢুকে দেখে দুলে দুলে পড়ছে মেয়েটা। এরকম বাচ্চাদের মতো পড়ে এতো বড় একটা মেয়ে? দুই হাতের মাঝখানে টেডি বিয়ারটাকে জড়িয়ে রেখেছে। এটা আয়েশার ছোটবেলার খেলনা।
‘কিতা পড়ছো আম্মা? বাত খাইলে না আইজ?’
‘বুখ নাই আম্মা, এক গ্লাস হট চকলেট বানায় দিবা নি?’ হামিদা পরম মমতায় মেয়েটার মাথায় হাত রাখে। বুকের গভীর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। সে তেমন বেশি লেখাপড়া জানে না, অল্প বয়সে লন্ডনি মাহবুবের সাথে বিয়ে হয়েছে ওর। সেজন্য আয়েশার লেখাপড়ায় তেমন সাহায্য করতে পারেনি হামিদা। স্কুলে হোমওয়ার্ক দিলে আয়েশা অনেক সময় অনেককিছু বুঝতে পারতো না, হামিদাকে জিজ্ঞেস করতো। হামিদার খুব লজ্জা করতো। যখন সময় হতো মাহবুবের কাছ থেকে জেনে নিত। মাহবুব ও কি সব সময় ঘরে থাকতো? দিন-রাত শুধু কাজ নিয়েই থাকে মাহবুব। তবে আয়েশা পড়া লেখায় ভীষণ ভালো। তার জিসিএসসি এর রেজাল্ট দারুণ। এ লেভেলেও নিশ্চিত ভালোই করবে।

তিনটায় বাসায় ফিরেই মাহবুব হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসে, গোগ্রাসে খাবার গিলে খায়। তারপর তাকে পান সাজিয়ে দেয়া লাগে।
আজকে খাবার টেবিলে মাহবুবকে একটু গম্ভীর লাগে। ব্যবসার কী জানি ঝামেলা চলছে। হামিদার কেমন যেন ভয় লাগে। খাবারে ঝাল লবণ ঠিক আছে তো? খাবারে কোনো উল্টাপাল্টা হলে মাহবুব খুব রেগে যায়। অনেক সময় বাটি প্লেট ছুঁড়ে মারে।
তার শাশুড়ি এই সময় খাবার টেবিলে ছেলেকে খাবার বেড়ে খাওয়ান, একটু গল্প গুজব করেন।

খাবার পরে মাঝে মাঝে হামিদাকে নিয়ে বিছানায় যায় মাহবুব। এই সময় ঘরের দরজা বন্ধ থাকে বেশ কিছুক্ষণ। হামিদার সংকোচ লাগে। ভালবাসাহীন কেমন মিলন, গোগ্রাসে ভাত গেলার মতো। হামিদার বড় লজ্জা লাগে। ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে। যেদিন এমন ঘটে, লজ্জায় পরে মুখ তুলে কারো দিকে তাকাতে পারে না। তাড়াতাড়ি গোসল করে। সন্ধ্যায় তার শাশুড়ি তার সাথে কথা বলে না, মুখ কালো করে রাখে, যেন হামিদা অনেক বড় অন্যায় করেছে। ছেলের সাথে ছেলের বৌ এর সান্নিধ্য কেন জানি উনি সহ্য করতে পারেন না।

খাবার শেষে মাহবুব শোবার ঘরে আসে। পান নিয়ে পেছন পেছন হামিদা ঢোকে।
পান নিয়ে খাটের উপর পা তুলে আরাম করে বসে মাহবুব। আয়েশ করে পান চিবোয়।
‘তুমি কিতা মনে কর? তুমার খুজ খবর আমি কুনতা জানি না?’ হামিদার বুকের ধড়ফরানি বাড়তে থাকে। ভাবতে থাকে, গোপন কিছু কি জেনে গেল মাহবুব? কী গোপন কাজ করেছে হামিদা ঠিক মনেও পড়ে না।
‘তুমি আমার টেখা আমারে না জানাইয়া বাংলাদেশো পাঠাও, তুমার কিতা ট্যাখার মেশিন আছেনি, না আমার মাতাত ট্যাখার গাছ লাগাইছ?’ মাহবুবের গলার স্বর উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে। হামিদার মনে হয় তার চোখের ভেতর তাকিয়ে তার ভেতরের সব কথা জেনে যায় এই লোকটা। মিথ্যা বললে আরো বেশি রেগে যাবে মাহবুব।

‘আব্বার শরীর বালা নায়, ডাক্তর দেখানি লাগব। তার লাগি সামান্য ট্যাখা পাটাইছি……’
‘একশ পাউন্ড তর কাছে সামান্য ট্যাখা নি? কুন নবাবর গরর তাকি আইছত? ডাক্তর তুই এখান তাকি দেখাইবে? তর রাম ছাগল বাইরে আমি কাম দেওয়ায়ছি, হে কিতা বইয়া বইয়া ডিম ফারের? হে টাকা দিতো ফারে না? আমার ব্যবসার কিতা অবস্তা তুই জানছ না? ফকিন্নির গরর ফকিন্নি। ফকিন্নি গর তাকি বিয়া খরি আনছি, পুরির তনে টেকা চাইন আমার শ্বশুর।’ চিৎকারে ঘর ফেটে পড়ে।

প্রচণ্ড ভয়ে হামিদার শীর্ণ শরীর কাঁপতে থাকে, মুখ ফুটে বলতে পারে না তার জমানো টাকা থেকে কিছু টাকা তার বাবার চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছে।
‘খালি পারছ বিন বিনাইয়া কানতে।’ এক হুঙ্কারে কথা গুলো বলে একটু দম নেয় মাহবুব।কিছুক্ষণ স্তব্ধ থাকে পরিবেশ। গলার স্বর এক ধাপ নিচে নামিয়ে বলে, ‘আয়েশার লগে বিয়ার মাত অইছেনি?’ আসল ব্যাপার তাহলে এটা। হামিদাকে টাকা পাঠানোর বিষয়টা নিয়ে দুর্বল করে আয়েশার বিয়ের ব্যাপারে কথা বলার কারণ মাহবুবের মনে হচ্ছে হামিদা এবং আয়েশা কেউই বিয়েতে রাজি না।

কিছুদিন আগে মাহবুব বলেছে দেশে তার বড় ভাইয়ের ছেলের সাথে আয়েশার বিয়ে দিতে চায়। সেই ছেলের লন্ডনে আসার ইচ্ছা। আয়েশার সাথে বিয়ে হলে ছেলের বাবা দেশে বেশকিছু জমি লিখে দেবে মাহবুবকে। সেই জমি বিক্রি করলে ভালো অঙ্কের টাকা পাওয়া যাবে। টাকাটা মাহবুবের দরকার। তার ব্যবসার অবস্থা ভালো না, অনেক ঋণ, পাওনাদাররা নানাভাবে চাপ দিচ্ছে। কিন্তু এই কথা হামিদা কীভাবে বলবে আয়েশাকে? মেয়েটা ইউনিভের্সিটিতে পড়তে চায়। বিয়ের কথা একবার উঠিয়েছিল হামিদা, মেয়েটা কেঁদে কেটে অস্থির। দুনিয়ার সবকিছু উল্টে গেলেও মেয়ের চোখের পানি একেবারেই সহ্য করতে পারে না হামিদা।
ভেতরের সব সাহস জড়ো করে হামিদা, বড় একটা দম নিয়ে বলে, ‘আয়েশারে বিয়া দিতাম নায়’।

মাহবুব অবাক হয়ে একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, তার হতভম্ব ভাবটা কাটতে বেশিক্ষণ লাগে না, হাতের সমস্ত জোর দিয়ে আচমকা একটা চড় বসিয়ে দেয় হামিদার গালে। হামিদা টাল সামলাতে পারে না, অনেকটা উড়ে গিয়ে পড়ে খাটের পাশে। কোনরকমে উঠে দৌঁড়ে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। একটা ভয়ংকর কিছু হবে এখন, সেটা আয়েশা অথবা মুনির কিছুতেই যেন দেখতে না পায়। তার ছেলেমেয়ে দুটো থাকবে সব পঙ্কিলতা মুক্ত।
কোনো রকমে নিজেকে একটু সামলায়। মাহবুব ঝড়ের মত এসে তীব্র একটা ঝাঁকুনি দেয় হামিদাকে।

‘পুরিরে ডাক্তর এঞ্জিনিয়ার বানায়তেনি? তর বেশি পাখনা হইছে, বান্দীর গরর বান্দী, শুওরর বাচ্চা ‘দাঁতে দাঁত চেপে তীক্ষ্ণ গলায় বলে মাহবুব। তার মুখের উপর হামিদা ‘না’ বলতে পারে এটা মেনে নেয়া তার পক্ষে সম্ভব না।

হামিদার চোখ বেয়ে পানি ঝরতে থাকে, হাত পা থর থর করে কাঁপতে থাকে। মনে হয় এখনি মাথা ঘুরে সব অন্ধকার হয়ে যাবে। ‘জনসনি আমি কিতা করমু? তর বাই যে এনো ইল্লিগাল, পুলিশরে কোই দিমু, পুলিশ তারে দরিয়া দেশো পাটায় দিবো, আর নায়তো জেলো দিব। এইটা যদি না চাছ তে জলদি আয়েশারে বিয়াত রাজি করা, বুজ্জত নি? বান্দীর গরর বান্দী.. অবিরাম বকতে থাকে মাহবুব।

হামিদার ভয় লাগে, বলতে চায়, ‘না, আপনি এটা করবেন না, দয়া করে করবেন না, আমার এই ভাইয়ের আয়ে দেশে আমাদের সংসার চলে, বাবার শরীর ভালো না, ছোট দুইটা ভাইবোন আছে, এই ভাই দেশের সব সম্পত্তি বিক্রি করে লন্ডনে এসেছে, তাকে এতো বড় বিপদে ফেলবেন না।’
কিন্তু কেমন করে মেয়েটার স্বপ্নগুলা ভেঙ্গে দেবে? তার সব দুঃসময়ে এই মেয়েটাই তো পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, হামিদার মাথায় হাত বুলিয়ে সাহস দিয়েছে।
ভেতরে কী একটা শক্তি এসে হামিদাকে দাঁড় করায়, নিভে যাওয়া ক্ষীণ কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠে বলে, ‘আয়েশা বিয়া খরত নায়, আমি তারে বিয়া দিতাম নায়।’
মাহবুব এবার আর চমকায় না, মনে মনে হয়ত তৈরি ছিল, দুম করে একটা লাথি বসিয়ে দেয় হামিদার কোমরে। হামিদা ছিটকে পড়ে।

আয়েশা কখন ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে ওরা খেয়াল করেনি। চিৎকার করে দৌঁড়ে আসে তার মাকে ধরতে, বলতে থাকে, ‘আপনি আমার আম্মারে আর একবারও ছোইবা নায়, একবারও না, আমি পুলিশ ডাকমু।’
মাহবুব দানবের মত মেয়ের মুখ চেপে ধরে, মুখ দিয়ে ইচ্ছা মতো গালি দিতে থাকে, হামিদা তীক্ষ্ণ একটা ব্যথা টের পায় কোমরে, উঠে দাঁড়াতে পারে না, আয়েশার গলা চেপে ধরেছে মাহবুব। হামিদা সব শক্তি জড়ো করে মাহবুবের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, আয়েশাকে বাঁচাতে হবে। দ্বিতীয়বার যখন লাথি এসে গায়ে পড়লো, হামিদা আর সহ্য করতে পারলো না, তার চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে গেলো।

(২)

শারমিনের সামনে যে মহিলা বসে আছে তার বয়স চৌত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হবে, বেশ শীর্ণ গড়ন, মায়াবী চেহারা। কপালের একপাশে কালশিটা বারবার ঘোমটায় লুকাতে চাচ্ছেন। হাত কচলানো দেখেই বোঝা যাচ্ছে মহিলা বেশ নার্ভাস। চোখ বার বার এদিক-সেদিক ঘুরছে, এসব কিছু লক্ষ্য করা শারমিনের কাজের অংশ. ভিকটিমের প্রতিটা আচরণ তার চরিত্রের অনেক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে।
‘কেমন আছেন আপনি?’
‘জি, বালা।’
‘আপনার শরীর এখন ভালো, হামিদা?’
‘জি…..’
‘দেখুন, এখানে নার্ভাস হওয়ার কিচ্ছু নেই। আমি আপনার সাথে গল্প করবো। আপনার কেসে আগে কাজ করছিল লরা, কিন্তু আমি আপনার কেসটা নিলাম, কারণ আপনি আমার সাথে বাংলায় কথা বলতে পারবেন, কোনো অনুবাদক লাগবে না। আপনি ফ্রি ভাবে আমার সাথে কথা বলেন, আমি কথা দিচ্ছি, আপনার অনুমতি ছাড়া আপনার কোনো কথা প্রকাশ করা হবে না।

কথাটা পুরোপুরি সত্যি না। অফিস থেকে শারমিনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, কারণ বাংলাদেশি ভিকটিমদের কেসগুলো সাধারণত শারমিন ভালো হ্যান্ডেল করে। ‘আমি শুনলাম স্বামীর বিরুদ্ধে আপনি স্টেটমেন্ট দিতে চাচ্ছেন না। আমাকে বলবেন কেন আপনি এরকম ডিসিশন নিয়েছেন?’
‘আফা, আমি আগেও খইছি, আমি ইতা আর বাড়াইতে চায়রাম না।’
‘আপনার গায়ে কিছু ইনজুরির চিহ্ন পাওয়া গেছে, আপনার মেয়ে স্টেটমেন্ট দিয়েছে, সে ছোটবেলা থেকেই দেখছে আপনার স্বামী আপনাকে মারধর করে।’ হামিদা একটু বিচলিত হয়েছে, তার ঠোঁট কাঁপছে। অনেক কষ্টে কান্না চেপে রাখছে বোঝা যাচ্ছে। তাকে কোনো চাপ দেয়া যাবে না, চাপ দিলে বেঁকে বসতে পারে।হামিদার স্টেটমেন্ট নেয়া খুব দরকার। কিন্তু হামিদাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে ভয় পাচ্ছে।
‘আফা, আমি তো কইছি, কুনতা হইছে না’
‘ঠিক আছে, আপনার কথা মানলাম, আপনার স্বামী আপনাকে মারেননি, কিন্তু উনার হয়তো কোনো মেন্টাল প্রবলেম আছে, উনি আপনার মেয়ের গলা চেপে ধরেছিলেন রাগের মাথায়। উনার হয়তো ট্রিটমেন্ট প্রয়োজন। আপনি যদি সবকিছু খুলে না বলেন, তাহলে তো অনেক বড় বিপদ হতে পারে আপনার এবং আপনার ছেলেমেয়ের। আপনি ভয় পাচ্ছেন আমি জানি, কিন্তু আমরা আপনাকে সাহায্য করবো।
‘তান জেল হই যাইবো’ মাথা নিচু করে ফিস ফিস করে বলে হামিদা।
‘কে বলেছে জেল হবে? আপনাকে তো আমি বলেছি, আপনার সব কথা গোপন থাকবে, কিন্তু আপনাকে তো আবার বিপদের মধ্যে ফেলে দেয়া যাবে না। আপনাকে আর আপনার ফ্যামিলিকে আমরা সাহায্য করতে চাই।’

হামিদার প্রতিটা কথা রেকর্ড হচ্ছে। হামিদার স্টেটমেন্টের ভিত্তিতে কেস ফাইল তৈরি করা হবে এবং সেই ফাইল কোর্টে হামিদার স্বামীর বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসাবে কাজ করবে। শারমিন যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করে, এদের কাজ করে এ ধরনের ভিকটিমকে সব ধরনের সাহায্য দেয়া। প্রথমে ভিকটিমের সব হিস্ট্রি আর স্টেটমেন্ট নেয়া হয়, ভিকটিমকে নিরাপদ কোথাও সরিয়ে নেয়া হয়, সে জায়গার ঠিকানা গোপন থাকে। ভিকটিমকে আইনি সাহায্য দেয়া হয়, তারপর মেয়েগুলোর স্থায়ীভাবে কোথাও থাকার এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করার সব ব্যবস্থা করা হয়। এরকম অনেক কেস শারমিন দেখেছে। এটা নতুন কিছু না।

বাংলাদেশি মেয়েগুলো স্টেটমেন্ট দেয় না, দিয়েও পরে কেস উইথড্র করে আবার হাসব্যান্ডের কাছে ফিরে যায়। যে গোপন জায়গায় তাদের থাকতে দেয়া হয়, সে জায়গার ঠিকানা হাসব্যান্ডকে বলে দেয়। ধরে নেয়, সব ঠিক হয়ে গেছে, আবার কয়দিন পরে কমপ্লেইন নিয়ে হাজির। সমাজিক পরিচয়, পারিবারিক সম্মান, ভয় আর আবেগের কাছে এরা পরাজিত হয়। নতুন পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে চায় না, ফেলে আসা যন্ত্রণার মধ্যেই আবার যেতে চায়।

শারমিনকে বেশির ভাগ বাংলাদেশি ভিকটিমদের কেস দেয়া হয়। মেয়েগুলো বাংলায় কথা বলে প্রাথমিক স্বস্তি পায়। শারমিনের ব্যক্তিত্ব এরকম, যে কাউকে কথা বলে আপন করে নিতে পারে। ভিকটিম যখন মানসিকভাবে একেবারেই ভেঙ্গে পড়ে, শারমিন কেমন করে যেন ওদের মধ্যে শক্ত হওয়ার ক্ষমতা তৈরি করে দেয়। শারমিন হামিদাকে সবকিছু বুঝিয়ে বলে। নতুন জায়গায় কিছুদিন থাকতে হবে, সেজন্য কাউন্সেলিং করে। পরে কবে এসে আবার শারমিনের সাথে দেখা করতে হবে বলে দেয়। শারমিন বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত হামিদার ফাইলটা রেডি করলো। সব মেডিকেল রিপোর্ট, স্টেটমেন্ট গুছিয়ে নিল।
সব কাজ শেষ করে বাসায় ফেরার ঠিক আগে ওর অফিসের দরজায় নক করলো গ্রাহাম।

গ্রাহাম জনসন এই অফিসের ডিরেক্টর। শারমিনের সুপারভাইজার। ‘এই যে আয়রন লেডি! তোমার কি বাসায় ফেরার খুব তাড়া? আমাকে কি একটু সময় দিতে পারো?’

এই অফিসে শারমিনের নিক নেম আয়রন লেডি! নামটা গ্রাহামের দেয়া। কিছুদিন আগে একটা কেস নিয়ে খুব খাটাখাটনি করেছে শারমিন। মাইনর মেয়ের সেক্সুয়াল অ্যাবিউজের জটিল কেস। এমনিতেই কেস তার প্রমাণ তেমন কিছু ছিল না, তার উপর পলিটিক্যাল একজন লিডার জড়িত থাকায় জটিলতা আরো বেশি। প্রমাণ করতে না পারলে উল্টো মানহানি মামলার ভয়ও ছিল। কিন্তু শারমিন হাল ছাড়েনি। দিনরাত পরিশ্রম করে কেস জিতে গিয়েছিল। ওই কেসের জন্য আইনের বই পড়তে পড়তে শারমিন অর্ধেক লইয়ার হয়ে গেছে!
এরপর থেকে শারমিনের নাম আয়রন লেডি। শুনতে খারাপ লাগে না ওর। নিজের উপর গর্ব হয়। মনে হয়, নামটা তার একটা অর্জন।
‘অবশ্যই গ্রাহাম, বলো, কী ব্যাপার?’
‘তোমার রিসেন্ট কেসটার কী আপডেট?’
‘প্রাইমারি স্টেটমেন্ট নেয়া হয়েছে, আমি ভিকটিমকে একটু সময় দিচ্ছি স্যাটাল হওয়ার, সে এখনই কিছু বলতে চাচ্ছে না, যেটা খুবই স্বাভাবিক। তবে আমি কেসটা দেখছি, কোনো সমস্যা হবে না।’
‘আমি জানি তুমি পারবে আয়রন লেডি’ একটু হালকা স্বরে বলে গ্রাহাম।’ শারমিন, তুমি কি জানো, অ্যাসিস্ট্যান্ট রিজিওনাল ম্যানেজারের একটা পজিশন ওপেন হয়েছে? আমি কিন্তু তোমাকে পজিশনের জন্য রেকমেন্ড করেছি।’
‘বলো কী! আমাকে তো কিছু বলোনি, এটা তো দারুণ খবর!’ শারমিন উত্তেজিত হয়ে যায়।
‘তুমি এই অর্গানাইজেশনের জন্য গত ছয় বছর যে পরিশ্রম দিয়েছো, তার জন্য তুমি প্রমোশনের যোগ্য। এখন কথা হচ্ছে এই পজিশনের জন্য আরো দুইজন প্রার্থী আছে, দুইজনই পুরুষ। তুমি একমাত্র নারী। তোমার সাথে সহজ আর ইনফরমালি একটা কথা বলি, এই ধরনের পজিশনের জন্য পুরুষদের প্রাধান্য দেয়া হয়। এই কাজে ব্যাপক ট্রাভেল করতে হয়, কাজের প্রেসার, রেস্পন্সিবিলিটি অনেক বেশি। তার উপর তুমি এশিয়ান, তোমাদের এমনিতেই ফ্যামিলির অনেক বাইন্ডিং থাকে। তবে আমার বিশ্বাস এই পদের জন্য তুমি সবচেয়ে বেশি যোগ্য।’

‘গ্রাহাম, অনেক ধন্যবাদ আমার উপর বিশ্বাস রাখার জন্য।’
‘শারমিন, তুমি হয়তো জানো, আগামী সপ্তাহে আমাদের একটা কনফারেন্স হচ্ছে। আমি চাই তুমি ওখানে মেয়েদের এবিউজ নিয়ে তোমার কেসগুলার উপর একটা স্পিচ দাও। কীভাবে এই এবিউজের হাত থেকে মেয়েরা বের হতে পারে সেটার উপর জোর দাও, আর আমরা কী কাজ করছি সেটার একটা প্রেজেন্টেশন করো।’

‘আমি অবশ্যই করবো সেটা।’
‘হেড অফিস থেকে একটা টিম এসেছে, ওরা আগামী দুই সপ্তাহ অ্যাসিস্ট্যান্ট রিজিওনাল ম্যানেজারের পজিশনের জন্য তুমিসহ বাকি দুইজনের ইন্টারভিউ নেবে। ওরা কনফারেন্স এ থাকবে। তোমার প্রেজেন্টেশন আর স্পিচ হয়তো তোমাকে সিলেক্ট করার ব্যাপারে সাহায্য করবে। আমি চাচ্ছি তোমার ইন্টারভিউ এর আগে তোমার কাজের একটা প্রেজেন্টেশন ওরা দেখুক, ওরা ইমপ্রেস হোক।’

‘আমি সব রকম চেষ্টা করবো প্রেজেন্টেশন ভালো করার।’
‘আমি জানি তুমি ভালো করবে, আর আমাদের মধ্যে এই কথাবার্তা নিয়ে অফিসে কাউকে কিছু বলার দরকার নেই, আজে বাজে কথা ছড়াতে পারে, আমি তোমাকে কোনো বাড়তি ফেভার দিচ্ছি না। তাই কিছু ফাইনাল হবার আগে চুপ থাকাই ভালো। তুমি তোমার কাজ করতে থাকো।’
‘গ্রাহাম, অনেক ধন্যবাদ।’
‘আয়রন লেডি, ধন্যবাদ দিতে হবে না, তোমার তাড়া না থাকলে অফিসের পরে কোথাও বসতে পারি প্লিজ?’
‘গ্রাহাম, আজকে থাক, বাসায় ফিরতে হবে।’
‘আসলে আমি তোমার সাথে প্রেজেন্টেশন নিয়ে আলাপ করতে পারতাম, অফিস আওয়ারে এসব নিয়ে আলাপ করা যায় না।’
শারমিন একটু ইতস্তত করে রাজি হয়ে যায়।

(৩)
বাসায় ফিরতে রাত নয়টা বেজে যায়। গ্রাহাম মানুষ ভালো, কিন্তু কথা বলে বেশি! ওর বকবকানি শুনতে হলো এতোক্ষণ ধরে, কী করবে শারমিন, তার প্রেজেন্টেশনে কী কী থাকলে ভালো হবে সেটা গ্রাহাম বুঝিয়ে দিচ্ছিল। সন্ধ্যা সাতটায় শারমিনের হাজবেন্ড ফয়সাল ট্যাক্সি চালাতে যায়, রাত দুইটা-তিনটা পর্যন্ত ট্যাক্সি চালায়। শারমিন ছয়টায় ঘরে ফেরা পর্যন্ত ফয়সাল ওদের মেয়ে দুটোকে দেখে। শারমিন ফিরে এলে ফয়সাল কাজের জন্য রেডি হয়। আজকে দেরি হয়ে গেল, ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শারমিনের কেমন জানি ভয় লাগলো। ঘরে ঢুকতেই ফয়সাল শারমিনের সামনে এসে দাঁড়ালো, চোখ লাল, জোরে জোরে নি:শ্বাস নিচ্ছে, রাগে মুখ কুঁচকে আছে।

‘কী, খানকি মাগি, রাতে আর বাসায় আসলি কেন, গ্রাহামের লগে শুইয়া থাকতি? কুত্তার বাচ্চা, মেয়ে দুইটারে ঘরে রাইখা ওই বুইড়ার সাথে লদকা লদকি করস, বেহায়া।’ ফয়সাল চিৎকার করে।
‘ফয়সাল, প্লিজ আস্তে কথা বলো, মেয়েগুলোর সামনে আর গালাগালি করো না, আমার একটা মিটিং ছিল।’ শারমিনের গলা ভীত, অসহায়।
‘মিটিং ছিল? আরে মাগী, তোর অফিসে ফোন করে শুনছি তুই গ্রাহামের লগে বাইরে গেছিলি, তুই মনে করছস তোর নষ্টামি কেউ জানবো না?’
শারমিনের বড় মেয়ে আনিকা দৌঁড়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। ফয়সাল বেশি রেগে গেলে মেয়েদের মারতে শুরু করে। আনিকা নিশ্চিত ঘরের ভেতর বসে কাঁদছে, আগে মেয়েটা বাবা মায়ের ঝগড়ার সামনেই চিৎকার করে কাঁদতো আর বলতো, ‘প্লিজ ডোন্ট ফাইট।’ এখন আর বলে না, নিজের ঘরে গিয়ে নিঃশব্দে কাঁদে। আনিকা তার ছোট বোন আরিয়াকেও তার সাথে নিয়ে যায়, বাবা যাতে আরিয়াকেও মারতে না পারে। বন্ধ দরজার ভেতর থেকে শুধু আরিয়ার কান্নার শব্দ শোনা যায়।

‘ফয়সাল, তোমার পায়ে ধরি তুমি গালাগালি করবে না, আমি মাফ চাচ্ছি।…’ শারমিন কথা বলতে পারে না। কান্নায় গলা ধরে আসে। নিজের ঘরে গিয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকে, ফয়সাল নিচে বসার ঘরে গালাগালি করতেই থাকে। ফয়সালের এইরকম আচরণ নতুন কিছু না। বিয়ের প্রথম থেকেই এমন, সব সময় শারমিনকে সন্দেহ করে ফয়সাল। প্রথম প্রথম ও নিজেও ঝগড়া করতো, কিন্তু শারমিন আর পারে না।

ফয়সাল শারমিনের দ্বিতীয় স্বামী। ওর প্রথম বিয়ে হয়েছিলো ফুপাতো ভাই ফিরোজের সাথে। বিয়ের প্রথম রাতেই ফিরোজ বলেছিল, ও আরেকজনকে ভালবাসে, পারিবারিক চাপে শারমিনকে বিয়ে করেছে।
সবাই বলেছিল, সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে, কিছুই ঠিক হয়নি। বিয়ের পরও ফিরোজ সেই আরেকজনের সাথে সম্পর্ক ছাড়েনি। পাঁচ বছর শারমিনের সাথে সংসার করার পরও না, বড় মেয়ে আনিকার জন্মের পরও না। ওভাবে নিজেকে আর ছোট করতে পারেনি। ফিরোজকে ছেড়ে চলে এসেছে।

শারমিনের বাবা মা এই ডিভোর্স মেনে নিতে পারেননি, দুইজনই মানসিকভাবে একেবারেই মুষড়ে পড়েছিলেন। ডিভোর্সের মাত্র তিন মাস পরেই ফিরোজ তার ভালবাসার মানুষকে বিয়ে করে ফেললো।
শারমিনের বিয়ে নিয়ে তার বাবা-মা পাগল হয়ে গেল, কিন্তু বিয়ের বাজারে শারমিনের ‘চাহিদা’ একেবারেই নিচের দিকে, একটা বাচ্চাসহ কে বিয়ে করবে ওকে?

একটাই ‘ট্রাম্প কার্ড’ তখন শারমিনের হাতে, তার ব্রিটিশ পাসপোর্ট। বাংলাদেশি ছেলেরা স্বপ্নের দেশ লন্ডনে আসতে চায়। সেইসব অতি আগ্রহী মানুষদের তালিকা থেকে ফয়সালকে বেছে নিলেন শারমিনের বাবা মা। ফয়সাল আসলে লন্ডনেই আসতে চেয়েছিল, শারমিনকে বা আনিকাকে কখনই মন থেকে গ্রহণ করতে পারেনি। বিয়ের পরে একদিন ফিরোজের সাথে ফয়সালের দেখা হয়েছিলো, এরপর থেকেই ফয়সাল কী একটা সন্দেহ করে, শারমিনের হয়তো ফিরোজের সাথে এখনো যোগাযোগ আছে। ফয়সালের সন্দেহের কারণ ফিরোজ অনেক বেশি হ্যান্ডসাম আর ক্যারিশমাটিক। তার পাশে ফয়সাল বাংলাদেশ থেকে আশা গ্রামের সাদামাটা একজন, শারমিনের পাশে বড়ই বেমানান। তার উপর শারমিনের হাই প্রোফাইল চাকরি, আর ফয়সাল ওই ট্যাক্সি চালানো ছাড়া আর কোনো কাজ করার যোগ্য না। সবকিছুই ফয়সালের কাছে ঈর্ষণীয়। শারমিন আর ফয়সাল দুইজনই বুঝতে পারে তারা আসলে খুবই ভিন্ন ধরনের দুইজন মানুষ।

শারমিনের মাঝে মাঝে মনে হয় এই নষ্ট ভালোবাসাহীন সম্পর্ক আর কতদিন চালানো সম্ভব? তার ইচ্ছা করে সব ছেড়ে মেয়ে দুটোকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যেতে। কিন্তু সেটা সম্ভব না, দ্বিতীয়বার আবার ডিভোর্স নেয়া যায় না, এই সমাজে দুইবার ডিভোর্সি আর সিঙ্গেল মা হয়ে দুইটা মেয়েকে বড় করা কত বড় কষ্ট হতে পারে সেটা শারমিন বোঝে।
তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার বাবা-মা। তারা কি কখনই শারমিনের দ্বিতীয় ডিভোর্স মেনে নিতে পারবে? তার ছোট বোনটাকে কেউ বিয়ে করবে বড় বোনের দুইবার ডিভোর্সের কথা জানলে? শারমিন চোখের পানি মুছে খাটের উপর ল্যাপটপ নিয়ে বসে। তাকে মেয়েদের এবিউজ নিয়ে একটা চমৎকার প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে হবে। কিন্তু চোখে কেন যে বার বার পানি চলে আসে, ল্যাপটপের পর্দায় সব ঝাপসা লাগে।

শারমিনের বেডরুমে একটা আয়না আছে, কারুকার্য করা ফ্রেম, বেশ দামী। ফয়সালের সাথে বিয়ের পরে শখ করে কেনা। শাড়ি পরে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখা যায় এমন একটা বড় আয়না কেনার খুব ইচ্ছা ছিল সবসময়। হঠাৎ আয়নায় চোখ পরে শারমিনের, ঝাপসা চোখে শারমিনের মনে হয় আয়নার ভেতর থেকে আয়রন লেডি তার দিকে বিদ্রুপের হাসি হাসছে।

শেয়ার করুন:
  • 161
  •  
  •  
  •  
  •  
    161
    Shares

লেখাটি ৯০৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.