অপরাধীদের আমরাই তৈরি করছি

0

সিফাত বন্যা:

একটি ছেলে শিশু দিনের পর দিন বলাৎকারের শিকার হয়ে বলাৎকারকারীকে খুন করে তার টিভি স্ক্রিনে লিখে রাখলো “শিশু ধর্ষণ বন্ধ করুন”…
এবং পুলিশকে বললো, “ওতো ধর্ষক, ওকে মেরে ফেললে কী হবে?”

এসব ঘটনা সাধারণত আমরা দেখে থাকি হিন্দি ক্রাইম বিষয়ক অনুষ্ঠানগুলোতে। কিন্তু আমি যে ঘটনাটি বললাম এটা ভারতের নয়, বাংলাদেশেরই ঘটনা। এখন ভাবতে থাকুন, আমাদের দেশের পুরুষদের লিঙ্গের কী পরিমাণ ধার, মানসিকতার কী পরিমাণ অবক্ষয় হয়েছে যে, তারা একটা ছেলে শিশুকেও বাদ দিচ্ছে না এবং তাকে খুনি হতে বাধ্য করছে।

এই গণপিটুনিতে যাদের হত্যা করা হচ্ছে, এটাকে কি আমরা শুধুই হত্যা মনে করতে পারি? আমার তো মনে হয় তা নয়। বিশেষ করে মেয়েদের পিটিয়ে মারার মধ্যেও থাকে এক ধরনের যৌন সম্পর্কিত বিকৃত উল্লাস। সবাই মিলে এক সাথে হয়ে কে কোথায় হাত দিয়েছে, কতটুকু দিয়েছে, সেটা নিয়ে আলোচনা, হাসি ঠাট্টা করে মানুষটিকে মারার পরই এবং মানুষটিকে মারার সময়ও অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে থাকে। পুরুষদের ক্ষেত্রে এমন হয়তো কিছুটা কম হয়, কিন্তু হয়।

সিফাত বন্যা

তাই গণপিটুনিটাকে শুধু হত্যা বললেও কম বলা হয়। এটাও এক ধরনের বিকৃত যৌন উল্লাস। এই যে পুরুষতান্ত্রিক বিকৃত যৌন লালসায় বেড়ে উঠছে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, এই রকম অসুস্থ একটা প্রজন্ম নিয়ে কতদূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে আপনার মনে হয়?
কখনো কি মনে হয় না, আমাদের আসল সমস্যা কোথায়?
শুধু ধর্ষককে ক্রসফায়ার দিলেই কি পরবর্তী সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে, আসলে কি তাই? সত্যিকার অর্থে আসলেই তাই নয়।।

যতদিন পর্যন্ত ধর্মভিত্তিক একপেশে শিক্ষা ব্যবস্থাকে না ভাঙা হবে, পাঠ্যপুস্তকে যৌনতা সম্পর্কে পাঠ না থাকবে, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হবে, সুস্হ সাংস্কৃতিক শিক্ষার প্রসার না হবে, ততদিন পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনা থেকে আমাদের রেহাই পাওয়া হবে না।

প্রতিটি বিদ্যালয় গড়ে উঠছে ফার্মের মুরগির খোঁয়াড়ের মতো, কোন খেলার মাঠ নেই, শিক্ষকরাও পড়ো পড়ো এবং পড়ো ছাড়া পৃথিবীটা যে আরও অনেক বড়, লেখাপড়ার পাশাপাশিও যে আরও অনেক বিনোদনের বিষয় আছে, এসব বলতেই নারাজ।

ঠিক তেমনি একটি শিশুর বাসার অবস্থা, নেই কোন খেলার সুযোগ, কোন বন্ধু নেই, কোন ধরনের বিনোদন নেই। একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে যাওয়ায় শেয়ারিংটা একেবারেই শেখা হয়ে উঠছে না শিশুদের। আর মাদ্রাসা শিক্ষার তো বলিহারি যাই। এসব শিশুদের তো জীবনের কী অবস্থা তা একটু মানবিক দৃষ্টি দিয়ে ভাবলেই বুঝা যায়।

যখন কোন শিশু একটি চরম বিনোদনহীন, বন্ধুহীন পরিবেশে বেড়ে উঠে, তখন সে প্রাকৃতিক উস্কানিতে তার শরীর ও মন যেটাকে বিনোদন মনে করে, সেই দিকেই ধাবিত হয়। এবং সেটা যেকোনো উপায়ে। বই পড়া, গান করা, আবৃত্তি করা, খেলাধুলা করাও যে কারো নেশা হতে পারে, বিনোদন হতে পারে, এগুলোও বেঁচে থাকার মাধ্যম হতে পারে, এসব কখনোই এরা বুঝে না বা ভাবতেই পারে না।

এই ভাবতে না পারার দায় অবশ্যই রাষ্ট্রের, পরিবারের।। কারণ আমরা সেই সুযোগ তৈরি করে দিতে পারছি না প্রকৃত মানুষ হওয়ার। তাই অপরাধীকে ঘৃণা করার আগে নিজেকেও ঘৃণা করা উচিত। রাষ্ট্রের এই ভঙ্গুর ব্যবস্থাপনাকেও ঘৃণা করা উচিত। অপরাধী হয়ে কেউ জন্ম নেয় না, অপরাধী তৈরি হয়। এবং তার জন্য আমরা সবাই দায়ী।।

শেয়ার করুন:
  • 743
  •  
  •  
  •  
  •  
    743
    Shares

লেখাটি ১,৪৩৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.