“রাষ্ট্র বনাম রেনু হত্যা”-রেনুর প্রকৃত হত্যাকারী কে?

0

স্নিগ্ধা রেজওয়ানা:

পত্রিকার পাতায় ও গণমাধ্যমে রেনুর জন্য মানুষের আবেগ দেখে আমি কিঞ্চিৎ বিচলিত বোধ করছি। আমার এই বিচলিত বোধ করার পিছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে।
প্রথম এবং প্রধান যে কারণ, কেন রেনুর হত্যা আপনাকে এতো বেশি আঘাত করেছে, যদি এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাই, তাহলে আমি নিশ্চিত, বাংলাদেশের ৮০ ভাগ মানুষের প্রথম উত্তর হবে, রেনু একজন মা এবং তার দুটি ফুটফুটে সন্তান আছে, তার এরকম মৃত্যু কীভাবে মেনে নেয়া যায়? তার সন্তানদের এখন কী হবে? মাবিহীন সন্তানগুলোর দিকে তাকিয়ে আপনার আবেগকে আপনি ধরে রাখতে পারছেন না।
আপনি ক্ষমা প্রার্থনা করছেন সেই ছোট্ট চার বছরের ফুটফুটে শিশু তুবার কাছে। আপনি ভেবে পাচ্ছেন না, কী করে মা ছাড়া বড় হবে, বেড়ে উঠবে ছোট্ট তুবা। আর আমাদের মিডিয়ার উপস্থাপন ভঙ্গি ও আমাদের এই বোধকেই বিনা দ্বিধায় প্রচার করে যাচ্ছেন।

কিছু মনে করবেন না, আমার একটি প্রশ্ন আমাদের এই যে আবেগ, তার মাঝে রেনু কোথায়? নাকি “মা রেনুর” জন্য আমাদের এতো হাহাকার! সত্যি আমরা অনেক স্বার্থপর। আমাদের মাতৃত্বকে মহান করাটাও আমাদের স্বার্থেরই অংশ। আমাদের মানবতাবোধ, চেতনাবোধ এ সকল কিছুই আমাদের স্বার্থের সাথে যুক্ত।

আমি বরঞ্চ একজন প্রতিবাদী, সম্ভাবনাময়ী রেনু হত্যার শোকে আহত।
যাই হোক আমার বিচলিত বোধ করা নিয়ে কথা বলার জন্য আমার এ লেখা নয়, বরঞ্চ কিছু বিষয় উপস্থাপন করা এই লেখার উদ্দেশ্য।

এইতো কিছুদিন আগেই ক্রসফায়ারে শিকার হয়ে যখন নয়ন মারা যায়, তখন অনেকেই, যারা আজকে রেনুর জন্য কষ্ট পাচ্ছেন, তারা সে সময় অনেক উল্লাস করেছেন।

অনেকেই হয়তো ভাবছেন, কোথায় সন্ত্রাসী নয়ন, আর কোথায় একজন “মা রেনু”? রেনু মারা যাবার পর বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমের অনেক প্রগতিশীল মানুষকে মন্তব্য করতে দেখেছি, ‘ধর্ষককে পিটিয়ে মারতে পারবে না, একজন নিরীহ মাকে ঠিকই পিটিয়ে মারতে পারবে”।

আপনি হয়তো ভাবছেন, কীসের সাথে কীসের তুলনা! তুলনার মূল জায়গাটি হলো বিনা বিচারে হত্যা। তুলনার জায়গাটি হলো আপনার আক্রোশ এবং আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ। তুলনার আরেকটি জায়গা হলো, বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থার দুর্বলতা অথবা অক্ষমতা।

যাই হোক রেনু প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আপনার কি মনে হয় গণ পিটুনিতে হতাহতের ঘটনা কেবল একদিনে সৃষ্টি হয়েছে? ভেবে দেখুন তো, একজন নারীকে সকলের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে এইভাবে মারার পরেও আশেপাশের কোনো মানুষের মধ্যে কোনো মানবিকতা বোধের জাগরণ ঘটেনি কেন? কেন সাধারণ মানুষের ওই তাৎক্ষণিক মনে হয়েছে, ছেলেধরা যেহেতু ধরা পড়েছে, তার ওরকম বিচার বা শাস্তি হওয়াই উচিত? কিছু লোকের কেন মনে হয়েছে এই নৃশংস চিত্রটি ভিডিও করার মতো সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়?

এর উত্তরগুলো খুব সাধারণভাবে যদি বলি, সাধারণ মানুষের সহ্যসীমার অবনতি, মানবিকতা বোধের চরম বিপর্যয় ও বিদ্যমান আইনি আইন শৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অবিশ্বাস।

এক্ষেত্রে আমি কোটাবিরোধী আন্দোলনের সময় সময়কালীন একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। আগেই বলে রাখি, আমি কোটা সংস্কার আন্দোলনের পক্ষে বা বিপক্ষে আমার কোনো অবস্থান থেকে এই বক্তব্য দিচ্ছি না, উদাহরণটা দিচ্ছি বর্তমান তরুণদের মাঝে যে ক্ষোভ প্রকাশের ঢং, সেটি প্রকাশে কতটা অমানবিক হয়ে উঠে তার প্রমাণস্বরূপ।

আন্দোলন চলাকালীন যখন বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী পর্যায়ের এক নারী শিক্ষার্থী অন্যান্য সাধারণ শিক্ষার্থীর প্রতি অন্যায় আচরণ করছে, সাধারণ শিক্ষার্থীরা সেই সময় উত্তেজিত হয়ে ওই নারী নেত্রীর প্রতি তার ক্ষোভ প্রকাশ করা শুরু করে। সেই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে অবস্থানরত সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঠিক যেভাবে রাত দুপুরে ক্ষমতাসীন দলের একজন নারী শিক্ষার্থীর ওপর চড়াও হয়েছিলেন, তাকে বিবস্ত্র করেছিলেন এবং তার গলায় জুতার মালা, মুখে কালি মেখে দিয়ে, কিল ঘুষি মারছিলেন, সেটি কোনভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কাম্য নয়। আমি ওই শিক্ষার্থীর ক্ষমতা চর্চার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছি না, বরঞ্চ তার বিপক্ষে আমার অবস্থান।
আমি যে বিষয়ে মনোযোগ দিতে চাচ্ছি তা হলো, কেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা সেই সময় এই আচরণটি করেছিলেন? এ আচরণের পেছনে, এর নেপথ্যে মূল কারণ কী ছিল? উত্তরটি হলো, কোটাবিরোধী আন্দোলনের সাথে যুক্ত শিক্ষার্থীদের প্রশাসনের উপরে এই নির্ভরতা বা আস্থার জায়গা ছিল না। তাই তাদের কাছে মনে হয়েছে এই মুহূর্তে ক্ষমতাসীন নারী নেত্রীর উপযুক্ত শিক্ষা দেয়াটাই তাদের নৈতিক দায়িত্ব এবং কর্তব্য। তথাপি শিক্ষার্থীদের এই আচরণটি ছিল অমানবিক।

এই প্রতিটি ঘটনার মূলে আসলে একই চেতনা কাজ করে। একবার ভেবে দেখুন তো কেন আপনার মনে হয় ধর্ষকদের প্রকাশ্য দিবালোকে গণপিটুনি দিয়ে মারা উচিত? কেন হারকিউলিস এর উত্থান হলে পরে আপনি খুশি হোন, যে কিনা ধর্ষকদের বিনা বিচারে নিজ দায়িত্বে হত্যা করছে? কেন নয়নদের ক্রসফায়ারে হত্যা হলে পরে আপনি “আলহামদুলিল্লাহ” বলেন?

তার কারণ আপনি জানেন, আপনি মানেন এবং আপনি বিশ্বাস করেন যে, প্রচলিত আইন ব্যবস্থায় বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোতে এ সকল সন্ত্রাসী, ধর্ষকদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আপনি এও মনে করেন অন্যায়কারীকে শাস্তি দেয়াটা আপনার নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, বিচার বহির্ভূত কোনো শাস্তি কখনোই কাম্য হতে পারে না। বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যার সমর্থন বা আপনার উল্লাস আপনার অমানবিকতাকেই প্রকাশ করে।

কথা প্রসঙ্গে বলছি, আমি বর্তমানে নিউজিল্যান্ডে বসবাস করছি। এখানের দু-একটা আইন সম্পর্কে একটু বলি। এখানে আপনি যদি বিনা কারণে কারো দিকে তাকিয়ে থাকেন এবং যার দিকে তাকিয়ে আছেন, আপনার তাকানো যদি তার জন্য অস্বস্তিদায়ক হয়, তাহলে সেটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। গায়ে হাত তোলা তো দূরের কথা।

এখানকার শপিংমলগুলোতে যদি বড় বড় দোকানগুলো কাউকে চোর হিসেবে সন্দেহ করে, সেই দোকানের সিকিউরিটি গার্ড থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ পর্যন্ত কারো অধিকার নেই, উক্ত ব্যক্তির গায়ে হাত দেয়ার। যতক্ষণ না পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আইনিভাবে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি না পাবেন, তারাও তার গায়ে হাত দিতে পারবেন না।

দুদিন আগে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদের হতাহতের ঘটনার পর, নিউজিল্যান্ডের স্থানীয় পুলিশের দায়িত্ব নিয়ে সরকারিভাবে তাকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করা হয়। একথাও সত্য নিউজিল্যান্ডের মতো একটি দেশে, যেখানে কিনা অপরাধীর অভাবে কারাগারগুলোকে বন্ধ করে দেয়া হয়, সেখানের পুলিশ বাহিনীর কাছে এই ঘটনাটি ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর, তবুও তাদের জবাবদিহি করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র যদি তার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে রাষ্ট্রের নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করতে পারে, প্রচলিত আইন ব্যবস্থার আওতায় যদি দোষী ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদান না পারে, সেটি প্রজাতন্ত্রের বিপর্যয় ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। রেনুকে গণপিটুনিতে হত্যা করার সময় অজ্ঞাতনামা শতাধিক মানুষের বিরুদ্ধে যেমন মামলা করার প্রয়োজন, ঠিক একইভাবে সংশ্লিষ্ট স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে, স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করাও প্রয়োজন। কেন তারা রেনুকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলো?
তারা কি এমন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন যে, ঢাকা শহরের একটি জনবহুল এলাকায় তাদের নিজস্ব নজরদারি থাকে না, তাদের কোনো খবরদাতা থাকে না, তাদের কোন দায়িত্ব থাকে না? নাকি বাংলাদেশ পুলিশের দায়িত্ব আশির দশকের বাংলা সিনেমার মতো হত্যার শেষে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথবা গুজবে কান দিবেন না আইন নিজের হাতে তুলে নিবেন না এইরূপ প্রচার করাই তাদের একমাত্র দায়িত্ব।

সবশেষে এটাই বলবো বিনাবিচারে হত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই সাথে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মানুষের মানবিকতা বোধের যেই চরম বিপর্যয় ঘটেছে, সেদিকে নজর দেয়া বরঞ্চ আমাদের জন্য খুব জরুরি।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বলে প্রশাসনের ফাঁকফোকর দিয়ে দিনের পর দিন অন্যায়কারীদের পৃষ্ঠপোষকতা করায় বাংলাদেশের মানুষ এক অসহনীয় অবস্থায় চলে এসেছে। মানুষের মাঝে মানবিকতা বোধের লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই। তাই যতক্ষণ না পর্যন্ত আইন ও বিচার ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করা হবে, এরকম ঘটনা ঘটতেই থাকবে এরকম রেনুরা মরতেই থাকবে।

শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:
  • 393
  •  
  •  
  •  
  •  
    393
    Shares

লেখাটি ৯৬৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.