বিপ্রতীপ সময়ের আরও এক পর্ব (মধ্যভাগ)

0

সুচিত্রা সরকার:

এ এক নতুন যাত্রা শুরু হলো। মন, চিন্তা, চেতনা, অভ্যাস, আবেগ- সবই একমুখী।

সময় এক সপ্তাহ এগিয়ে আনতে হলো। হুট করে কয়েকটা ঘটনা ঘটে যাবার পর।

১৬ তারিখ রাত তিনটায় গাইনি ডাক্তার দেখিয়ে বাসায় ফিরলাম। ২৭ তারিখ আমার ইডিডি ডেট।
ডাক্তার বললেন, ২৬ তারিখ ইনডাকশান দিয়ে ২৭ এ ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবেন। মানে কৃত্রিম ব্যথা উঠিয়ে।

নরমাল ডেলিভারির ঝক্কি প্রচুর। তবু চেয়েছি বহু সাহস করে। কিন্তু ইনডাকশান ব্যাপারটা পছন্দ হলো না।

১৭ তারিখ সকালে ফেসবুক খুলে দেখি একটা প্র্যাগনেন্সি গ্রুপে একটা খবর। আমার ডাক্তারের উত্তরা চেম্বারে রোগীকে অতিমাত্রায় ইনডাকশানের ডোজ দেবার পর গর্ভে শিশুর মৃত্যু। অতঃপর ভয়ে, ডাক্তারের হাসপাতাল থেকে বের না হওয়া।

অদ্ভুত যোগাযোগ বটে। যে রোগীর এ দুর্ঘটনা, আগের দিন যখন তার ব্যথা উঠানো হচ্ছিল, আমি তখন সেন্ট্রাল হাসপাতালে, ডাক্তারের চেম্বারে।
রোগীর বরের সঙ্গে ডাক্তারের ফোনে কথোপকথন এরকম- ‘অসুবিধা কিছু নেই। আমি আসার আগে হয়ে গেলে তো ভালই। আর অবস্থা ক্রিটিক্যাল হলে আসবো’।

সেই যাওয়া তিনি গেছেন ভোর ছটায়, এদিকের চেম্বার শেষ করে। এবং ব্যথার অতিরিক্ত ডোজে শিশুমৃত্যু। ডাক্তার হাসপাতাল থেকে সারাদিন বের হননি।

ভয় পেলাম প্রচণ্ড। যদি ডাক্তারের সহকারির কাছে ডেলিভারি করাতে হয়, আর ডাক্তার ফোনে নির্দেশনা দেন, তাহলে প্রশিক্ষিত দাইরা কী অপরাধ করেছে? কেন দশ মাস গুচ্ছের টাকা খরচ করে এরকম লক্ষ্মীর কাছে যাওয়া?

সারাদিন প্রচণ্ড টেনশনে গেল।
দীপা আন্টি বেশ ভালো সাজেশন দিলেন।
বিকাল চারটায় সিদ্ধান্ত নিলাম সেকেন্ড অপিনিয়ন নেবো।

ডাক্তার কনডিশন দেখেই বললেন, এরকম ওজন বাচ্চার, মায়ের ডায়াবেটিস, বিশ্বে দশভাগ ডেলিভারি নরমাল হয় এরকম কনডিশনে।

সিদ্ধান্ত হলো, পরদিন দুপুর বারোটায় ভর্তি হয়ে সিজার।

আবার ‘ওঠ ছুড়ি বিয়ের’ সিদ্ধান্ত।
আগের ডাক্তার বাচ্চার লাং ডেভলপমেন্টের ইনজেকশন সাজেস্ট করেনি। সেটা দেয়া হলো ওভার ডোজের।
প্রয়োজন ছিল।

এ নিয়ে তিন ডাক্তার পাল্টালাম। প্রথম জনের কাছে ভীড় প্রচুর থাকতো। এবং তিনি বিদেশে যেতেন প্রচুর। ঠিকমতো কথা বলা যেতো না। ইন্ট্রোভার্ট আমি, তার কাছে গেলে সব গুলিয়ে ফেলতাম।

দ্বিতীয়জন মধ্যরাতে রোগী দেখা শুরু করতো। সেখানে আরেক দশা।

দানে দানে তিন দান কেমন, দেখাই যাক।

কেমন করে রাত কাটলো, জানি না। ঘরটার জন্য মায়া লাগলো। সাদা দেয়ালগুলোর জন্য। মাকড়শার ঝুলগুলোর জন্য। লাভ বার্ডটার জন্য। ওকে জল খাওয়ালাম একটু। হয়তো শেষবার!

শাড়িগুলো কি আর পরতে পারবো?
নানা চিন্তা!
ইনজেকশানটা স্টেরোয়েড। শরীর জ্বলছিল সারারাত। ঘুম হলো না।

মোটামুটি তৈরি হয়ে বের হলাম যুদ্ধজয়ের উদ্দেশ্যে। অথবা জীবনের এসপার ওসপার পথে!

তিনটা থেকেই প্রক্রিয়া শুরু হলো। দুটো ফোন করলাম। শাশুড়ি আর বড় কাকাকে।

মায়ের কোলে শেষবার ঝাঁপিয়ে পড়লাম! ওটিতে যাবার আগে দেখি মায়ের ঠোঁট উলটাচ্ছে!
বললাম, আসি মা। বাবাকে একটু বইলেন তো আমার কথা!

ছাব্বিশ বছর আগের মৃত মানু্ষের কাছে মেসেজ মা কীভাবে পাঠাবে জানি না। মা ভেউ ভেউ করছে। আমিও।

অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তার হাজিবাজি মজার কথা বলছিল। সব কথার ব্র্যাকেট এই যে, আমার কাউন্সেলিং! তাই মজা পাচ্ছিলাম না। তবু ভাব দেখাচ্ছিলাম।

ডেলিভারিতে আমার শর্ত একটাই। বরকে রাখতেই হবে সর্বক্ষণ আমার পাশে। ভেতরের কষ্টটা না বুঝুক। দর্শক তো হতে পারবে! একটা বলবান হাত তো ভীতু মানুষটা পাবে!

অ্যানেসথেসিয়ার পর কোমড়ের নিচ থেকে ঝিমঝিম।
হঠাৎ প্রচণ্ড কষ্ট শুরু হলো। ‘নেই শরীর’ আর ‘আছে শরীর’ অনুভূতির দ্বন্দ্ব চলছে। চিৎকার করছি। এর মধ্যে প্রচণ্ড দমবন্ধ অনুভূতি শুরু হলো। অক্সিজেন দিল। তাতেও কমলো না।
বরং বমির ভাব বাড়লো।

কখন মুক্তি এ অনুভূতি থেকে? কত মিনিট? যদি এক যুগ লেগে যায়? হঠাৎ মনে হলো মরে যাচ্ছি!
এর মধ্যে পর্দার ওপাশ থেকে একটা মুখ বের হলো। ডাক্তারের হাতে ধরা! ডাক্তার বললেন, দেখো তো, কী সুন্দর বাচ্চা তোমার! এখনো কষ্ট হচ্ছে?’

বললাম, কোনো অনুভূতি নাই। ফিল করতে পারছি না। প্লিজ মুক্তি দিন আমায়!
সৌমিত্র বাচ্চাকে দেখতে গেল! আমি ধীরে ধীরে জ্ঞান হারাচ্ছি। অ্যানেসথেসিয়ার ডাক্তার মজা করছেন, তোমার মেয়েকে দেখো। কষ্ট কমে যাবে।

মনে হলো, মেয়ে বলছে কেন? আল্ট্রায় তো ছেলে বলেছিল?

আর কিছু মনে নেই।

জ্ঞান যখন ফিরলো, নড়ার শক্তি নেই। পেটে মনে হলো তিনটা ছুরি ভেতরে রেখে দিয়েছে। নড়লেই ছুরির খোঁচা!

এর মধ্যে বাবিনকে নিয়ে আসা হলো। ও হ্যাঁ, এবার বলাই যায়! ছ’মাস বয়স থেকেই তাকে আমি বাবিন ডাকি। সাড়াও পাই।

মায়ের কর্তব্য পালন করলাম! অন্যরকম অনুভূতি। প্রথম সব অনুভূতি যেমন বিটকেলে হয়, তেমন!

আমার জননী এলেন কাঁদতে কাঁদতে! বললেন, ‘ভগবান আমাকে দিয়েছে উপহার! আমি খুশি!’

আরো অনেক কথা। ছবিও তুললেন বাবিনের সঙ্গে তার দিদুন।

বর এলো। তার এখন দুটো পরিচয়। আমার সন্তানের বাবাও সে। ‘গুটুর গুটুর মটরভাজা’ আলাপ হলো তাঁর সঙ্গে।

আর সারারাত বাবিন বেবি কট থেকে আসছিলো আমার কাছে। তার রাজ্যের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বটা আমার হাতেই ন্যস্ত কিনা!

আজ ছ’দিন পর প্রথম দশ গজ হাঁটলাম।
লেখাটা সারাদিন ধরে লিখলাম।
যুদ্ধও গেল অনেক এ কয়দিন।

২৪. ৭. ২০১৯
রাত ৮. ৫৩ মিনিট
আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা

শেয়ার করুন:
  • 85
  •  
  •  
  •  
  •  
    85
    Shares

লেখাটি ৩১৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.