আমরা কি আসলেই বেঁচে আছি সবাই?

0

মলি জেনান:

আজকাল আর কারও কথা ভাবতে ইচ্ছে করে না। সবকিছুতে, সব জায়গায় নিজেকে খুঁজে পাই; এ এক ভয়ানক রোগ হয়েছে আমার!

গত দুদিন ধরে ফেসবুকে চোখ রাখা মাত্রই রক্তাক্ত বিধ্বস্ত এক নারীর মুখ নিউজ ফিডে ভাসছে, মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে হয়তো কোনক্রমে মুখটা তুলে বলছিল- ‘বাবারা, আমার দুইটা বাচ্চা আছে’।

আমি দ্রুত স্ক্রল করে উপরে উঠে যাই বা নিচে নেমে যাই, ছবিটা না দেখার ভান করি- তারপরও দেখে ফেলি, আর আমার সেই ভয়ানক রোগে আক্রান্ত হই; আমি সেই নারীকে দেখি না নিজেকে দেখি, নিজেকে ভাবি। দেখি, অফিস ফেরতা পথে বেশ দ্রুত হাঁটছি, বাসায় বাচ্চা রেখে আসছি। হঠাৎ কারও সাথে ধাক্কা লাগলো, সেই লোক আমাকে বলছে, চোখে দেখেন না? এই আপনার ব্যাগে কী? কথা কন না ক্যা? ধর ধর ছেলেধরা! আর সাথে সাথে কিছু ছেলে আমায় টেনে হিঁচড়ে নিতে থাকলো, আর লাথি, ঘুষি দিতে থাকলো। সাথে আরো আরো লোক জমে গেল- মার চলছে!

দিনের পর দিন অনলাইন মিডিয়ায় খুন-খারাবি, ধর্ষণ, হত্যা, গুম দেখতে দেখতে ফুঁসতে থাকা মানুষগুলো হাতের কাছে নিজের হাতে বিচার করবার একটা মোক্ষম সুযোগ প্রবলভাবে কাজে লাগাচ্ছে, যে যেভাবে পারছে। শেষ নি:শ্বাস নেবার আগে আমি মাথাটা তুলে শুধু বলতে পেরেছি, বাসায় আমার একটা বাচ্চা আছে।

মলি জেনান

প্রতি মুহূর্তে একটা ভোঁতা যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে আমি ঘর-সংসার-অফিস-বাচ্চা সামলাচ্ছি। সব করছি, কিন্তু কোথাও আমি নেই, ভাবতে চাইছি না তবুও ভাবছি- যদি আমি না ফিরি আর, বাচ্চাকে বিকেলের স্ন্যাকসটা কে করে দেবে, রাতের খাবার কিংবা যখন ওর দুধুন পাবে তখন কী করবে সে যদি আমি না থাকি!

আর আমাদের এতো এতো মিডিয়ার এতো এতো প্রতিভাবান(!) নামি দামি(!) সাংবাদিক ভাই-বোনেরা টিআরপি বাড়ানোর আশায় নিশ্চয় আমার আধো আধো বোল ফোটা বাচ্চাটার কাছেই জানতে চাইবে অনুভূতি! প্রশ্ন করবে, মা কোথায়? মার জন্য মন কেমন করে?

এ তো গেল একটা ঘটনা, আরো বহু ঘটনা ঘটছে এমন, আমি অন্যের ঘটনাগুলো নিজের মধ্যে দেখতে শুরু করেছি! এই ধরুন মিন্নির ঘটনা, মিন্নি মেয়েটাকে না চেনার কোনও কারণই নেই এখন আর। মেয়েটার বরকে প্রকাশ্যে হত্যার প্রথম ভিডিওটি আমি দেখিনি, কারণ দেখতে চাইনি। টিভি মিডিয়া ওর সাক্ষাতকার নিয়েছে আমি স্কিপ করে গেছি, কেবলি মনে হয়েছে এটা ওর সাক্ষাতকারের সময় নয়, এটা ভয়ানক ট্রমা থেকে বের হবার পথ খুঁজতে একটু শোক করবার সময়।

কিন্তু কয়েকদিন পরেই আরেক ভিডিও! যা দেখেই আপামর জনসাধারণ রায় দিয়ে দিচ্ছে, এই হত্যায় মিন্নি নিজে জড়িত! না হলে সে অমন ধীরে ধীরে হাঁটলো কেন? কুপাকুপির পরও নিজের ব্যাগের কথা ভুলে গেল না কেন? এমন আরো অনেক ‘কেন’?

আমি বহু সাহস সঞ্চয় করে দ্বিতীয় ভিডিওটা দেখলাম; আবার সেই রোগ! মিন্নিকে দেখি না, নিজেকে দেখি! আমি ফিরে যাই বছর তিনেক আগের দুর্ভাগ্যজনক একদিনের এক ভয়ানক ঘটনায়। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস যে ঘটনা আমাকে ট্রমাটাইজ করে রেখেছিল; দিনের পর দিন কাউন্সেলিং, থেরাপি, মানসিক পরিচর্যায় যে ট্রমা আমি কাটিয়ে উঠলেও পুরোপুরি বেরুতে পারি না তার থেকে।
কাউন্সেলিং ও থেরাপির এক পর্যায়ে আমার থেরাপিস্ট বলেছিলেন, আমি যেন সেই ঘটনা আর সেই সবদিনের কথা লিখবার চেষ্টা করি, যদি আমি লিখতে পারি তবে তার থেকে বেরুনো আমার জন্য সহজ হবে এবং এটা একটা প্রক্রিয়া।

আমি এখনও লিখতে পারিনি, পারি না। হয়তো লিখবো কোন একদিন;
কিন্তু মিন্নির দ্বিতীয় ভিডিও, তার প্রতিক্রিয়া ও পরবর্তি অবস্থা আমাকে আবার সেই ঘটনার মধ্যে নিয়ে যায়, আমার যাপিত জীবন ক্ষতবিক্ষত হয়। তাই কিছুটা লিখবার চেষ্টা করছি।

সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় আমি ও আমার বোন আমাদের দুই মেয়েকে হারিয়েছি! ওরা দুজনেই টুপ করে ডুবে গেছে পাথরের টুকরোর মতন আমার বোনের বাসার পুকুরে! ওরা দুইবোন সোফায় বসে মুটু-পাতলু দেখছিল, আমি গিয়েছিলাম বাথরুমে। বাথরুম থেকে গোসল সেরে ফিরে দেখি ওরা নেই, নেই তো নেই- ছাদে নেই, বাসার চারপাশে নেই, রাস্তায় নেই! আমি ছুটলাম লম্বা লন পেরিয়ে পুকুর ঘাটে; গিয়ে দেখি- দেখি আমার বোনের মেয়ে, আমাদের সবার খুব প্রিয় বাচ্চাটা উপুড় হয়ে ভাসছে! আর এক কোনে ভাসছে আমার ছোট্ট বাচ্চাটার একটা লাল জুতো! (এই যে আমি যত সহজে লিখছি, বিষয়টা অত সহজ কিছু নয়!)

এই দৃশ্য আমার ভেতর কী ঘটিয়েছিল, আমি কী ভাবছিলাম বা ভাবছিলাম কিনা কিচ্ছু বলতে পারবো না, শুধু জানি আমি পাগলের মতো মরনপণ চিৎকার করছিলাম কারও সাহায্যের আশায়; আমি বলছিলাম কে আছো, আমার দুইটা বাচ্চা পানিতে ডুবে গেছে, কে আছো!

কতক্ষণ? ৩০ সেকেন্ড, এক মিনিট, দুই মিনিট, জানি না! তারপর হঠাৎ মনে হলো আগে ওদের তোলা দরকার, সাথে সাথে নেমে গিয়ে ভাগ্নীকে টেনে ঘাট পর্যন্ত নিয়ে এলাম, ততক্ষণে চার-পাঁচ জন লোক চলে এসেছে। এর পরের ঘটনাগুলো নিশ্চয় লিখবো কোন একদিন।

কিন্তু আমার কী মনে হয় জানেন- এই যে আমি এখনো বেঁচেবর্তে আছি এবং এই যে লিখছি, তা শুধু পারছি কারণ সেদিন আমার চারপাশে কোন মোবাইল ক্যামেরা বা কোন সিসি ক্যামেরা ছিল না। তা থাকলে এই এতোদিনে হয়তো আমিই হয়ে যেতাম আমার বাচ্চাদের হন্তারক! ভিডিও ফুটেজ দেখে মানুষের সহানুভূতি ২৪ ঘন্টাও পার হতো না তারপরই সবাই হয়ে যেত ফেলুদা।

প্রশ্নের পর প্রশ্ন উঠতো- দেখা মাত্রই আমি সুপারম্যানের মতো পানিতে ঝাঁপিয়ে না পড়ে চিৎকার করে সময় নষ্ট করেছি কেন? ওই সময়ই আমাকে গোসলের জন্য বাথরুমে যেতে হলো কেন? গেলামই যদি, বাচচাদের নিয়ে যাইনি কেন? আমার চরিত্রের আগ-পাশ-তলা বিশ্লেষণ করতে সবাই হয়ে যেত দুদে গোয়েন্দা। জীবনের সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাতেও আমি স্বস্তি খুঁজছি আজকাল, ভাবছি বড় সৌভাগ্য(!) আমার তখন কোনো ক্যামেরা ছিল না।

এই যে লেখাটুকু লিখছি আমার দুইদিন পেরিয়ে গেছে এটুকু লিখতে, কেন সে ব্যাখ্যা আপনাদের দিতে যাবো না, কারণ এটা ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়।

শুধু ভাবছি মানুষ তার সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক সময়ে কী আচরণ করবে, তার মস্তিস্ক তাকে কোন পথে নেবে, তার বিচার করে লাইনআপ ঠিক করার আমরা কে বলুন তো?

আরো অনেক অনেক ভয়ঙ্কর নেতিবাচক খবর আমি আমার নিজের দিকে টেনে নিই। এক একটা বাচ্চা ধর্ষণের শিকার হয়ে বেঘোরে খুন হয়, আমি আমার বাচ্চাদের কথা ভাবতে থাকি, কেবল মনে হয় এ আমার হারিয়ে যাওয়া বাচ্চারা- কেউ হলুদ ক্ষেতে-ধান ক্ষেতে-রাস্তায়-মাদ্রাসায়-স্কুলে-বাসায় রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে! আর ইলেক্ট্রনিক-প্রিন্ট-অনলাইন সকল মাধ্যমে তাদের ছবি, নাম পরিচয়সহ খবর ছাপা হচ্ছে, সেইসাথে রসালো বর্ণনা কোথায় কেমন কামড়, আঁচড়, আর কাটাকুটি!

এক একটা ঘটনা ঘটে আর আমি সুমনকে (আমার বাচ্চার বাবা) জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কাঁদতে থাকি। এক সময় নিজের দুর্ভাগ্যতেও স্বস্তি খুঁজি, ভাবি ভালো হয়েছে আমার বাচ্চারা এই ভয়ঙ্কর অন্যায়গুলো দেখবার/জানবার আগেই মরে গেছে!

শেয়ার করুন:
  • 33
  •  
  •  
  •  
  •  
    33
    Shares

লেখাটি ২৫৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.