একজন প্রিয়া সাহা এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ

0

বিকাশ মজুমদার:

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের যাবতীয় শারীরিক এবং দাপ্তরিক কাজ করতো ইহুদি লোকজনরাই। লেবার ক্যাম্পে বন্দী ইহুদিরা ঠিকঠাক কাজ করছে কিনা তদারকি করাই ছিল তাদের দায়িত্ব।

তারা নিজেরাও বন্দী, কিন্তু অন্য বন্দীদের থেকে স্বাধীন বন্দী। তাদের নাম ছিল “কাপো”। গবাদি বহন করার ট্রেনে জার্মান দখলকৃত অঞ্চল থেকে ধরে আনা ইহুদিদেরকে শারীরিক পরিশ্রমের জন্য নির্বাচিত করা, অক্ষম এবং বুড়ো বা ভারসাম্যহীনদেরকে আলাদা করা, নারীপুরুষ ও শিশুদেরকে আলাদা করা ইত্যাদি কাজ করত কাপোরা। কাপোদের হাতে থাকতো চাবুক। সারি সারি বন্দী ইহুদিদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে গ্যাস চেম্বারের এক্সটারমিনেশন ক্যাম্পে সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ে যায় ইহুদি কাপোরা। এমনকি গ্যাস চেম্বারের সুইচটাও অন করে দিত কোন এক কাপো। শিশু-কিশোরদের চকলেট, খেলনা, কফির লোভ দিয়ে দ্রুত গ্যাস চেম্বারে নিয়ে যেত তারা। ইহুদি কাপোরা ইহুদি পোড়া ছাই ডাম্প করে নতুন ইহুদি পোড়ানোর জায়গা ফাঁকা করে দিত যত দ্রুত সম্ভব।

ইহুদিদের মতো মেধাবি না হলেও ইহুদিদের সাথে হিন্দুদের কিছু মিল আছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ে বসে আছে অনেক হিন্দু কাপো, যেমন মন্ত্রী, এমপি থেকে শুরু করে বিসিএস ক্যাডার পর্যন্ত। হিন্দুদের ঘরবাড়ি পুড়ে গেলে হিন্দু কাপোদের কাজ দ্রুত সিদ্ধান্তে চলে আসা যে শীতের জন্য আগুন পোহাতে হিন্দুরা নিজেরাই ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে।

হিন্দু খুন হলে সাংবাদিক ডেকে বিবৃতি দিয়ে বলবে, হিন্দু লোকটা সুখের ফ্যান্টাসিতে ভুগে নিজেই নিজের গলা কেটে ভূত হয়ে নিজের মাথাটা অন্য গ্রামে রেখে আসছে।

হিন্দুর জমি দখল হয়ে গেলে বলবে, নিশ্চয়ই হিন্দু লোকটা জমি দুইবার বেচে দিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে। হিন্দু মেয়ে রেইপ হলে বলবে, যৌন তাড়নায় বেশি সুখ পেতে গেছে। জোর করে ধর্মান্তরিত করলে বলবে, ভালোই হয়েছে চির শান্তির শায়াতলে চলে গেছে, এ নিয়ে রাজনীতি করার কিছু নেই।

হিন্দু কাপোদের কাজ দেশে হিন্দুরা কত সুখে আছে তার পরিসংখ্যান তুলে ধরা। হিন্দু কাপোরা জানে না ইহুদি কাপোরাও বাঁচেনি। ইহুদি কাপোদের কাপো বললেও হিন্দু কাপোদেরকে আমরা “খাপো” বলে সম্বোধন করতে পারি।

ফেসবুকের এখনকার গরম আলোচ্য বিষয়, প্রিয়া সাহা আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে বাংলাদেশ থেকে হিন্দু নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে মর্মে নালিশ করেছেন। সাথে সাথেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু সমাজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বেরিয়ে এসেছে থলের বেড়ালের মতো। প্রিয়া সাহা যদি শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরের তথ্য তুলে ধরে ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দুর নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার নালিশ করেন তাহলে বিষয়টা অতিরঞ্জন, কিন্তু তিনি যদি ১৯৪৭ সাল থেকে হিসেব করেন তাহলে সংখ্যাটা হবে ৪ কোটি ৯০ লাখ।

পাঠক, সংখ্যাগুরুলঘুর দ্বান্দ্বিক সংঘাত থেকে বেরিয়ে একবার নিরপেক্ষ চিন্তা করে বলেন তো, প্রিয়া সাহা কি আসলেই ভুল কিছু বলেছেন কী না? কারণ ড. শচী ঘোষ দস্তিদার তার Indian Subcontinent’s Vanishing Hindu and Other Minorities: Empire’s Last Casualty বইটিতে বাংলাদেশ থেকে দশক ধরে ধরে হিন্দু জনগোষ্ঠীর নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার শুমারি করেছেন।

শুমারি অনুযায়ী ১৯৪৭ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মাত্র ৭১ বছরে ৪ কোটি ৯০ লাখ হিন্দু জনগোষ্ঠী নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে যা অনেক দেশের মোট জনসংখ্যা থেকেও অধিক।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের হিসেবে শুধু বিএনপি এবং জামায়তে ইসলামের জোট সরকারের শাসনামলে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালেই বাংলাদেশে ইসলামীকরণের ধাক্কায় ৩১ লাখ হিন্দু হারিয়ে গেছে। এতো মানুষের নিশ্চিহ্ন হওয়ার কাহিনী নথিভুক্তি করা নিঃসন্দেহে শ্রমসাধ্য কাজ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বদ্বীপের পদ্মা মেঘনা যমুনা মধুমতী বিধৌত বাংলাদেশ ভূখণ্ড সযত্নে মুছে দিয়েছে সব রক্তের দাগ।

ড. শচী ঘোষ দস্তিদার তথ্য উপাত্তের মাধ্যমে রক্তের দাগ বইয়ের পাতায় আঁচড় কাটলেও পৃথিবীবাসী এই নীরব নিশ্চিহ্নকরণের বিন্দু বিসর্গ খুব কমই জানে এমনকি এই বাংলাদেশে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী নিজেরাও নিজেদের যন্ত্রণার কথা কোনদিন কোন আলোচনায় মুখে আনেনি।

হিন্দুদের উপর প্রতিনিয়ত চলমান হত্যা, খুন, ধর্ষণ, নিপীড়ন, জমিজমা ও ব্যবসা দখল, জোর করে ধর্মান্তরকরণ নিয়ে কোনদিন হিন্দুরা সোচ্চার ছিল না। একজন প্রিয়া সাহা যখন সাহস করে এমন প্রতিবাদ করেছেন তখন তার মুণ্ডুপাত চলছে সংখ্যাগুরুর চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে অফিস পাড়া পেরিয়ে রাজনীতির মাঠ পর্যন্ত। হিন্দু কাপোরাও জোরেশোরে তার বিচার দাবি করছেন, তার বিরুদ্ধে দেশোদ্রোহের মামলা চাচ্ছেন, দেশে এনে বিচার করতে বলেছেন।

প্রিয়া সাহার চরিত্র নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে গেছে। কেউ কেউ তাকে পর্নতারকা প্রিয়া রায়ের সাথে তুলনা করে ফেলেছে। তার ভিটেমাটি ইতিমধ্যে জ্বালিয়ে দিয়েছে অসাম্প্রদায়িক দাবিদার সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়। এরকম ঘটনা নিত্যদিনের, প্রিয়া সাহা এখানে একটা র‍্যান্ডম স্যামপ্লিং উদাহরণ মাত্র। কারণ বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িকতা সব থেকে সস্তা এবং বহুল ব্যবহৃত রাজনৈতিক কন্ডম। সব রাজনৈতিক দল একে ইচ্ছে মতো ব্যবহার করে প্রয়োজনমত ফ্ল্যাশ করে দেয়।

হিন্দু কাপোদের এহেন আত্মঘাতী চরিত্র দেখে একটা গল্প বলে লেখা শেষ করছি। এক গ্রামে এক লোক প্রতিদিন বউকে পেটায় আর পেটানোর সময় মুখ চেপে ধরে রাখে যাতে ব্যথায় চিৎকার করতে না পারে। কিন্তু একদিন বউকে পেটানোর ব্যস্ত মুহূর্তে বউয়ের মুখ চেপে ধরতে পারে না বউ তো সেই সুযোগে উচ্চস্বরে কেঁদে উঠে, এবং সুযোগ বুঝে লোকটার লুঙ্গি খুলে ফেলে। লুঙ্গিতে ভালো করে বাঁধতে বাঁধতে লোকটা বউয়ের মুখ চেপে ধরে বলে, “মাগি আস্তে কান্দেক, পাড়ার লোক শুনে যাচ্ছে। সমাজে আমার একটা ভাবমূর্তি আছে না?”

সেদিনের পর থেকে সেই বউ প্রতিদিন স্বামীর চ্যালা কাঠের আঘাতে ফেটে যাওয়া চামড়ার ক্ষতে আদর করতে করতে পড়ার লোকদের শুনিয়ে শুনিয়ে বলতো, “আমার দামান আমারে মারিছে, তাতে পাড়ার বেশ্যেদের কী?”

শেয়ার করুন:
  • 661
  •  
  •  
  •  
  •  
    661
    Shares

লেখাটি ১,৪১২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.