দোহাই লাগে, এবার থামুন

0

রীতা রায় মিঠু:

মৌসুমী নামের এক তরুণী গতকাল মেসেজ লিখেছে,

“দিদিভাই, আজকে সন্ধ্যায় পাশের ফ্ল্যাট থেকে আমার মাকে হুমকি দিয়ে গেল এখানে (নিজের ফ্ল্যাটে ই আমার মা থাকেন) ঘন্টা, শঙ্খ বাজিয়ে পূজা করা যাবে না।

মা ভীষণ ভয় পাচ্ছে। ফ্ল্যাটে আমার মা আর বাবা থাকে। দিদি, আমার খুব টেনশান হচ্ছে”!

[মেসেজটা পড়ে এক ঝটকায় চলে গেলাম ‘৯২ সালের ৮ই ডিসেম্বারের এক সন্ধ্যায়। দুই দিন আগে ভারতে বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার জের হিসেবে বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর, বিভিন্ন মন্দিরের উপর শুরু হয়েছিল তান্ডব!

আমরা থাকতাম ভূতের গলির এক পাঁচতলা বিল্ডিংয়ের দোতলায়। ঢাকা শহর থমথম করছে, বিকেলেই সন্ধ্যা নেমেছে। ফ্ল্যাটে আমাদের দুই শিশু কন্যা মৌটুসি, মিশা উত্তম আর আমি, ভয়ে জড়সড় হয়ে আছি।

হঠাৎ আমাদের দরজায় দড়াম দড়াম করে লাথি আর গালি, ” অই মা ——নের বাচ্চারা, দরজা খোল। লাত্থাইয়া তোগোরে বাইর করব। তোরা তোগো ইন্ডিয়া যা”!

মিশা অসুখে ভুগতে ভুগতে খুব ভীতু হয়ে গেছিল, এমন হুড়ুম দাড়ুম আওয়াজ আর গালিগালাজ শুনে ছোট্ট মিশা চীৎকার দিয়ে আমাকে জাপটে ধরে। মৌটুসিও ছোট, ও মিশাকে ধরে রাখে।

উত্তম তো ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহবল। তার কোলে দুই কন্যাকে বসিয়ে দিয়ে আমি নিঃশব্দে গিয়ে দরজার ফুটোয় চোখ রেখে দেখি, আমাদের বিল্ডিংয়ের তিনতলার ভাবীর কলেজ পড়ুয়া মেজ ছেলে, সাথে আর কিছু যুবক। শেষ লাথিটা দিয়ে সিঁড়ি টপকে নীচে নেমে যাচ্ছে।

ছেলেটাকে দেখে আমার দম বন্ধ হওয়ার দশা। এর মা কত ভাল মানুষ, ভাবীর কাছে আমি কত যাই। নারায়ণগঞ্জ থেকে মা ফোন করতে হলে ভাবীর নাম্বারে করে। খুব শান্ত অমায়িক মানুষ। এই ছেলে আমাকে দেখলে আদাব চাচী বলতো, আর এ কিনা আজ এমন অকথ্য ভাষায় গালি দিল, দরজায় লাত্থি মারলো, এই বাড়িতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থাকেন জেনেও?

সেই থেকে আমার বিশ্বাসের ঘরে অবিশ্বাসের বীজ রোপিত হয়ে গেল। সত্যি বলছি, সেই সন্ধ্যার ঘটনা আমার বুকে তীব্র অপমানের দাগ কেটে দিয়েছিল]

রীতা রায় মিঠু

আজকাল লীগের পরিচয়ধারীরা আমাকে ছাগী, পতিতা, খাসী আরও কত বিশেষণে ভূষিত করে! কেন আমি বাংলাদেশে থাকা হিন্দুদের হয়ে মাঝে মাঝে কথা বলি!
আমি প্রিয়া সাহার আমেরিকা গিয়ে নালিশ করা সমর্থন করিনি কথাটা শুরুতেই লিখেছিলাম। তবুও লীগাররা আমাকে প্রিয়া সাহার সমর্থক বানিয়ে কত রকমের জেরা করে চলেছে।

আমেরিকা বসে বাংলাদেশের লীগার ভাইদের মুখে গালি শুনে আমি মনে মনে হাসি, তাদের প্রতি করুণার হাসি দেই। কীইবা দেয়ার আছে, যারা কোয়ান্টিটি বুঝে কোয়ালিটি বোঝে না, তাদের অপরাধ করুণার দৃষ্টিতেই দেখার নিয়ম।

হিন্দুরা বাংলাদেশে মহাসুখে আছে। তা আছে, চাকরি করে, হাট বাজার করে, বিয়ে করে, সন্তান জন্ম দেয়— দশজন মুসলমান যা যা করে, দশজন হিন্দুও তাই তাই করে।

হিন্দুদের মহাসুখটা এক মুহূর্তে মহাদুঃখ হয়ে যায়। মুসলমানদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার মুখোশটা এক নিমিষে খুলে পড়ে যায় যখনই ভারতে কোন মসজিদ নিয়ে কিছু ইস্যু তৈরি হলে, কাঁটাতারের ভারতীয় সীমানায় বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশীর মৃত্যু হলে, ভারতের কতিপয় রাজ্যে গোমাংস নিষেধ হলে, ভারত বাংলাদেশ ক্রিকেট ম্যাচ হলে, ভারতের ক্রিকেট দলের অধিনায়ক বিরাট কোহলির অধিনায়কোচিত আচরণ নিয়ে ঝামেলা বাঁধলে অথবা একজন প্রিয়া সাহা সকলের অজান্তে আমেরিকা গিয়ে প্রেসিডেন্টের দরবারে অন্য ২৭ জন ভিনদেশীর সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে তোঁতলাতে তোঁতলাতে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা চাওয়ার মতো বোকামি করলে!

যেন এসব ঘটনা দুর্ঘটনার রিমোট কন্ট্রোল বাংলাদেশে মহাসুখে, জামাই আদরে থাকা হিন্দুদের লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে লুকানো থাকে!

তখন হিন্দুদের সুখ আর সুখ থাকেনা! সকল সুখ বৃদ্ধ বৃদ্ধার একাকী সংসারে শঙ্খ কাঁসর ঘন্টা বাজিয়ে পূজো করা যাবেনা হুমকির আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।

প্রিয়া সাহার ঘটনা ছিল ফালতু। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের খেয়ে দেয়ে কাজ নেই তিনি প্রিয়া সাহা, রোহিঙ্গা, চায়নিজ মেয়ের বিলাপ শুনে মাথায় হাত দিয়ে ভাবতে বসবেন! যত্তসব! এই প্রিয়া সাহা কারো মাথা ব্যথার কারণই ছিলোনা।

কিছু কলামিস্ট, ব্যারিস্টার, ধোপা, নাপিত, জমাদার, কিছু শিক্ষিত কিন্তু বোকা অধ্যাপক, লীগার মিলে মিশে ” দেশ গেল, জাত গেল, অসাম্প্রদায়িক চেতনা গেল, মান গেল” করে করে সত্যি সত্যি দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সম্পর্কটাকে অস্থিতিশীল করে ফেলেছে।

ঠিক এই মুহূর্তে হিন্দুদের মহাসুখ মহা আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। এই আতঙ্ক এমনই আতঙ্ক, ঠিক ২৭ বছর আগে আমরা অনুভব করেছিলাম তিনতলার ভাবীর ছেলে যখন তার বন্ধুদের সাথে নিয়ে আমাদের ফ্ল্যাটের দরজা লাথি মেরে ভাঙতে চেয়েছিল, চেয়েছিল লাথি মেরে আমাদেরকে ইন্ডিয়া পাঠিয়ে দিতে। সেদিন আমাদের মহাসুখ মহা আতঙ্কে পরিণত হয়েছিল। হ্যাঁ, এরপরেই আমরা দেশ ছাড়ার কথা ভেবেছি, তবে ইন্ডিয়া যাইনি। আমাদের সামর্থ্য ছিল তাই আমরা অস্ট্রেলিয়া চলে গেছি। কিন্ত যাদের সামর্থ্য নেই, তারা যাবে কোথায়! তাদেরকে তো নিজের দেশে জামাই আদরে থাকতে হবে, মহাসুখী মহাসুখী চেহারায়।

** প্রিয় কলামিস্ট, ব্যারিস্টার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ঝাড়ুদার, নাপিত, ধোপা —– আল্লাহর ওয়াস্তে এইবার আপনারা প্রিয়া সাহা প্যাঁচাল থামান। প্রিয়া সাহাকে কেউ চিনতো না, আপনারা প্রিয়া সাহাকে নায়িকা বানিয়েছেন, আপনারা প্রিয়া সাহাকে ভিলেন বানিয়েছেন। আপনাদের কারণেই আজ মৌসুমীর বৃদ্ধ বাবা-মাকে পাশের ফ্ল্যাটের মুসলমান প্রতিবেশী এসে ঘন্টা বাজিয়ে পূজো করা চলবে না হুমকি দিয়ে যায়।

দোহাই লাগে, মৌসুমীর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দোহাই লাগে, এবার থামুন।

শেয়ার করুন:
  • 3K
  •  
  •  
  •  
  •  
    3K
    Shares

লেখাটি ১১,৫২২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.