জোছনা করেছে আড়ি

0

লুতফুন নাহার লতা:

গভীর রাত্রি। চাঁদের আলোয় প্লাবিত এই রাত্রির চরাচর। যেন আকাশে আজ রুপোলী আলোর বাঁধ ভেঙেছে। অথচ আমার চারিদিকে বাতাস ঘুরে ঘুরে গাইছে সেই গানটা। সেই চাঁদের জন্যে, জ্যোৎস্নার জন্যে আকুলতার গান।
‘জোছনা করেছে আড়ি আসেনা আমার বাড়ি, গলি দিয়ে চলে যায় লুকিয়ে রুপোলী শাড়ি — চেয়ে চেয়ে পথ তারি হিয়া হয় মোর ভারী, রূপের মধুর মোহ বলো না কী করে ছাড়ি—জোছনা করেছে আড়ি, আসে না আমার বাড়ি, জোছনা করেছে আড়ি— জোছনা করেছে আড়ি—‘

ওই একই লাইন তেহাই দিয়ে দিয়ে ঘুরে ঘুরে গাইছেন বেগম আখতার। কেন এই গানে এতো আকুতি! জোছনার জন্যে কেন এই প্রবল আকুল করা হাহাকার! আজ রাতে কিন্তু জোছনা মোটেই আড়ি করেনি তবু আমার চাঁদের উঠোনে বেজে চলেছে সেই গান। না পাওয়া জোৎস্নার গান। সেই বেগম আখতার। সেই আকুলতা।

বসে আছি জলের পাশে একটা বেঞ্চিতে। অনেকটা দূর থেকে ওই আলোতে ঝিলিক ঝিলিক নূপুর বাজিয়ে নেচে নেচে দুরন্ত কিশোরীর মতো ছুটে আসছে অফুরান জলের ধারা। সে জল নিজেকে সমর্পণ করেছে দীর্ঘপথের শেষে এসে খাড়া ভাঙ্গনের কাছে। এই তো প্রপাত। বিষম সে প্রপাত। নায়াগ্রার জলপ্রপাত। এই মধ্য রাতের মায়া বিছিয়ে রয়েছে হিরণ্ময় জ্যোৎস্নায়। আমি জ্যোৎস্নার জলে সিনান করেছি চাঁদের সরোবরে। এই তুষার সাদা জলপ্রপাতের ধারার মতো আমার দীর্ঘ কোমল চাঁদের রেশম চুল মেলে দিয়েছি চাঁদের উঠোনে।

জানি আমি খুব জানি, চাঁদ নিয়ে আমারই মতো সবার রয়েছে এমনি সারা জীবনের স্বপ্ন। ভালোলাগা। প্রেম। মন দেয়া নেয়ার মতো হাজারও মরণ। আমাদের কালজয়ী সেই সব গান, গল্প, রূপকথা। আর এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সেই আদি রহস্যের কথা। চাঁদ ছিল তখনও। মিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে চাঁদ কেবল আলো দিয়েছে শুধু কি! ভেবে দেখুন কী সাংঘাতিক ভালোলাগা দিয়েছে। প্রেম দিয়েছে। কেমন রাতের আকাশ ভরে দিয়েছে গানে গানে।

পৃথিবীর বয়স আনুমানিক চার দশমিক পাঁচ বিলিয়ন বৎসর। ঠিক চাঁদেরও বয়স সমান। আর পৃথিবী থেকে মোটামুটি দৃশ্যমান বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পরিধি আনুমানিক তিরানব্বই বিলিয়ন আলোকবর্ষ। আমাদের এই সৌর জগতের মতো আরও মিলিয়ন বিলিয়ন সৌরজগত রয়েছে। বলা হয় সারা পৃথিবীতে যত বালুকণা আছে আরও চেয়ে বেশি আছে তারার দেশ! আহা এজন্যেই তো বাংলা ও বাঙালীর কবি নজরুল প্রিয়ার খোঁপায় দিতে চেয়েছিলেন তারার ফুল। আমারও ইচ্ছে হয় এতো যখন আছে তখন মুঠো ভরে এনে প্রেমিকের বুক পকেট ভরে দেই তারায় তারায়!

চাঁদকে নিয়ে রূপকথারও শেষ নেই। আফ্রিকান, আমেরিকান, চাইনিজ , জাপানিজ, রাশান সকল দেশ ও জাতীর রয়েছে রূপকথা। একটা স্প্যানিশ রূপকথায় পড়েছিলাম – এক ছোট্ট মেয়ে তার বাবাকে বললো চাঁদ ধরে আনতে। চাঁদকে আনতে বাবা বিশাল লম্বা এক মই বেয়ে বেয়ে বেয়ে ক্লান্ত হতে হতে চাঁদের কাছে পৌঁছে গেলো, কিন্তু চাঁদ তো এত্তো বড়, সে কেমন করে আনবে!
ছোট্ট মেয়েটিকে চাঁদও খুব ভালোবেসেছিল তাই সে আস্তে আস্তে ছোট হতে থাকলো। বাবা তখন তাকে নিয়ে এলো সেই মেয়েটির কাছে! চাঁদকে হাতে পেয়ে তো তার আনন্দ আর ধরে না। নেচে গেয়ে পাগল হতে থাকল। এদিকে চাঁদ তো একটু একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে হারিয়ে গেল। আবার মেয়ে কান্না জুড়ল, চাঁদ কোথায় গেল। এবার চাঁদ মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে দেখালো সে আছে থাকবে চিরদিন। এইভাবে পনেরদিন ধরে চাঁদ একটু একটু করে বড় হয় আবার পনের দিন ধরে একটু একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে ছোট হয়ে মিলিয়ে যায়।

বাংলার আকাশে চাঁদের বুড়ি চরকা কাটে এ গল্প কে না জানে। খুব ইচ্ছে হতো একবার চাঁদে গিয়ে দেখে আসি বুড়িকে। সেই চরকা কি মহাত্মা গান্ধীর চরকার মতন! খুব ইচ্ছে ছিল চাঁদে যাবো আর সেই বুড়ির সাথে গল্প জুড়ে দেবো। আমিও চাঁদের বুড়ি হবো। না, আমি তো যেতে পারিনি। আর তাই তো চাঁদের বুড়ির সাথে দেখাও আর হলো না।

সে আমি না হয় যেতে নাই-ই পারলাম, কিন্তু গিয়েছিলেন। পৃথিবীর ক্ষণজন্মা এস্ট্রোনমার তিনজন গিয়েছিলেন এবং জয় করে ফিরেছিলেন। ১৯৬৯ সালের ২০শে জুলাই, এপোলো ১১ মিশনে আমেরিকার ওহাইও অঙ্গরাজ্যের নীল আর্মস্ট্রং গিয়েছিলেন। তিনিই পৃথিবীর প্রথম মানুষ যিনি চন্দ্রে পদার্পণ করেছিলেন। তিনি চাঁদের মাটিতে পা রাখার পরপরই কয়েক মিনিটের মধ্যেই চন্দ্রযান ঈগল থেকে নেমে আসেন এডউইন বাজ অলড্রিন। আর মূল চন্দ্রযানে চাঁদের কক্ষপথে ছিলেন মাইকেল কলিন্স। সারা পৃথিবীতে সেই দিনটি ছিল এক অভূতপূর্ব দিন, এক অবাক বিস্ময়ের দিন। মানব জাতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন।

১৯৬৯ এর ১৬ ই জুলাই সকাল ৯ঃ৩২ মিনিটে তিন হাজার সাংবাদিক, সাত হাজার মান্যজন, এবং প্রায় আধা মিলিয়ন দর্শণার্থির সামনে, ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার এর ৩৯/এ কমপ্লেক্সে রকেট স্যাটার্ন ভি, এপোলো ১১ কে উৎক্ষেপণ করে। তিনদিনের দীর্ঘ জার্নি শেষে ১৯ শে জুলাই বেলা ১ঃ২৮ মিনিটে এপোলো ১১ চাঁদের কক্ষ পথে প্রবেশ করে। সারাদিন পরে নীল আর্মস্ট্রং ও এডুইন বাজ অলড্রিন মূল চন্দ্রযান থেকে ঈগ্লু নামে ছোট চন্দ্রযানে আলাদা হয়ে যান এবং চাঁদের বুকে নামার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। অবশেষে ২০শে জুলাই বিকেল ৪টা ১৭ মিনিটে ওঁরা ‘সি অব ট্র্যাঙ্কুইলিটি’ নামের এলাকাটিতে নিরাপদে অবতরণ করেন। আরও সাড়ে ছয় ঘন্টা পরে সোভিয়েত রাশিয়াকে পিছনে ফেলে রাত ১০টা ৫৬ মিনিটে নীল আর্মস্ট্রং নেমে আসেন এবং চাঁদের মাটিতে পা রাখেন। চাঁদের বুকে পৃথিবীর প্রথম মানব। একজন মানুষের এই ছোট্ট পদক্ষেপ সমগ্র মানবজাতির ইতিহাসে বিশাল গৌরবগাঁথা হয়ে রইলো।

বহু বৈজ্ঞানিক এক্সপেরিমেন্ট, নানা রকম স্যাম্পল যোগাড় করে নিয়ে আমেরিকার একটি ফ্ল্যাগ সেখানে উড়িয়ে দেন তাঁরা। ২ ঘন্টা ৩১ মিনিট চাঁদের মাটিতে আর সব মিলিয়ে মোট ২১ ঘন্টা ৩৬ মিনিট চাঁদের দেশে কাটিয়ে আবার ফিরে আসবার জন্যে তিনদিনের যাত্রা শুরু করেন এবং নিরাপদে পৃথিবীর বুকে ফিরে আসেন। ওরা কিন্তু ফ্লোরিডাতে বা হিউস্টনে আসেননি। এসেছিলেন দক্ষিণ-পশ্চিম হাওয়াইয়ের সমুদ্রে। সেখান থেকে তাদেরকে স্পেশাল কোয়ারেন্টাইনে সম্ভাব্য মুন জার্ম থেকে পৃথিবীর আবহাওয়ায় আবার সহনশীল করে তোলার পরে ফিরেছিলেন যার যার ফ্যামিলির কাছে।

বাংলাদেশে আমাদের অনেকেরই তখন টেলিভিশন ছিল না। যাদের ছিল তারা দেখতে পেয়েছিলেন কিনা জানি না। কিন্তু আমরা দলে দলে জড়ো হয়েছিলাম আমাদের পাড়ার মাঠে। চাঁদের দিকে চেয়েছিলাম অপলক ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেকথা মনে আছে। কিছু কি দেখেছিলাম! না দেখিনি। তবু জানতাম হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের স্বপ্নের চাঁদের দেশে আজ স্বপ্ন নয় সত্যিই মানুষের চরণ পড়েছে। সেদিনের সেই অনুভূতির কথা মনে করে আজো শিহরণ জাগে।

চাঁদে পৃথিবীর মানুষের পদার্পণের আজ পঞ্চাশ বছর হলো। মানবের ক্রমাগত অর্জনের ইতিহাসে চন্দ্র বিজয় একটি মাইল ফলক। জানি চাঁদ আর স্বপ্ন নয় কেবল। তবু চাঁদকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে চাই। তবু মানুষের মন গৃহত্যাগী জ্যোৎস্নার আশায় অপেক্ষমান। বেগম আখতারের কিন্নর কণ্ঠ তাই চাঁদকেই খোঁজে আকুল হয়ে সেই জোছনার আশায়। আর সারা পৃথিবীর মন ক্রন্দনোন্মুখ হয় এই ভেবে- ও কারিগর দয়ার সাগর ওগো দয়াময়- চান্নি পশর রাইতে যেন আমার মরণ হয়।।

শেয়ার করুন:
  • 117
  •  
  •  
  •  
  •  
    117
    Shares

লেখাটি ৮০৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.