প্রিয়া সাহার অভিযোগ কি খুবই অযৌক্তিক?

0

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

(১)
মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিদেশ দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা ও দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা এইগুলি ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে কোন ধারায় কিরকম অপরাধ আমি জানি না। (দণ্ডবিধিতে থাকতেও পারে। বলা যায় না। কলোনিয়াল আমলের দণ্ডবিধিতে বেশ কিছু বাজে বিধান আছে। আর এখনকার ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনেও থাকতে পারে) দণ্ডবিধিতে এইসব থাক বা না থাকে এই কথাগুলি আমাদের খুবই পরিচিত। কতবার যে কতজনের বিরুদ্ধে এইসব কথা বলা হয়েছে, যে বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্যে অমুকের শাস্তি হওয়া দরকার, বা দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির ষড়যন্ত্র হচ্ছে ইত্যাদি। লোকজনকে এইসব অভিযোগে গ্রেফতারও করতে দেখেছি।

এইরকম একটা উদাহরণ দিই।

২০০১ সালে বিএনপি জামাত নির্বাচনে জয়ের পড় সারা দেশে ভয়াবহ একটা সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস চলে দেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। মানুষের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া, হত্যা করা, লুঠ করা আর নারী ও শিশুদেরকে ধর্ষণ করা এইসব যেন একটা উৎসবের উপলক্ষ হয়ে গিয়েছিল কয়েক মাস ধরে। এইসবের উদাহরণ আপনারা জানেন। হৃদয়বিদারক সেইসব ঘটনার কথা আমি স্মরণ করিয়ে দিয়ে আপনাদেরকে কাঁদাতে চাই না। সেইসব অত্যাচারের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে এমন লোকজন অনেক আপনার আশেপাশে পাবেন। সেইসব ঘটনা নিয়ে অনেকে রিপোর্ট তৈরি করেছেন, দেশে-বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় সেইসব রিপোর্ট পাঠিয়েছেন।

সেই সময় একদিন সম্ভবত ২০০২ সনের কোন একদিন, ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে পুলিশ শাহরিয়ার কবিরকে গ্রেফতার করলো। শাহরিয়ার কবির ইন্ডিয়া হয়ে অন্য কোথাও যাচ্ছিলেন বা ফিরছিলেন। পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে, রিমান্ডে নিয়ে মারধোর করেছে, কী পর্যায়ের অত্যাচার যে তখন তার উপর করেছে সেটা সেই সময়ের খবরের কাগজে এসেছে, শাহরিয়ার কবির নিজেও কিছু বলেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কী ছিল? তিনি তাকি সাম্প্রদায়িক অত্যাচারের মিথ্যা তথ্য সম্বলিত ডকুমেন্টারি তৈরি করে বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে চেষ্টা করছিলেন। সেইসব ডকুমেন্টারির সিডি উদ্ধারও হয়েছে তার কাছ থেকে।

আওয়ামী লীগ থেকেও এই নিয়ে রিপোর্ট শ্বেতপত্র ডকুমেন্টারি এইসব হয়েছিল। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং তার লোকজন তখন বলতো যে এইসব সাম্প্রদায়িক অত্যাচারের কথা মিথ্যা, এবং আওয়ামী লীগ এইসব কথা বলে দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির ষড়যন্ত্র করছে ইত্যাদি।

(২)
সম্প্রতি এক ভদ্রমহিলা আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সাথে একদল বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে মিলে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষের দুর্দশা বর্ণনা করতে গিয়ে নানান কথা বলেছেন। বিপুলসংখ্যক ধর্মীয় সংখ্যালঘু দেশত্যাগ করেছে, এখনও দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার হচ্ছে ইত্যাদি। ফেসবুক জুড়ে দেখছি এখন লোকে এই ভদ্রমহিলাকে কীভাবে শায়েস্তা করা যায় সেই নিয়ে নানান পরামর্শ বিলিয়ে বেড়াচ্ছেন। একদল তো আছে যারা মেরে ফেলা উচিৎ, ধর্ষণ করে দেওয়া দরকার এইসব গালাগালি করছে। ওদের কথা না হয় বাদই দিলাম। এমনিতে যাদেরকে শোভন সুশীল এবং মানুষের অধিকারের পক্ষের মানুষ বলে জানি, ওরাও দেখি খেপেছেন।

আইনজীবী এবং আইনজীবী নন এইরকম একদল বলছেন, মামলা করতে হবে, রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা, আইনের আওতায় আনতে হবে ইত্যাদি। কেউ ফেসবুকে এইরকম বয়ান দিচ্ছেন, সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছেন। দুই একজন অতি তৎপর ব্যারিস্টার সাহেবকে হয়তো দেখবেন আগামীকাল হাই কোর্টে একটা পাবলিক ইন্টারেস্ট পিটিশন নিয়ে হাজির হয়েছেন। ঠিক আছে, মামলা করতে চান, করেন। কোর্টের দরোজা সবার জন্যে খোলা, চাইলেই মামলা করা যায়। মামলা করে হয়রানিও করা যায়। করেন।

তার আগে আমার এই বিশিষ্ট বুদ্ধিমান বন্ধুরা, আপনারা আমাকে মেহেরবানী করে কিছু তথ্য বের করে দিন। প্রথমত বলেন যে ১৯৪৭ সনের দেশ ভাগাভাগির পর, প্রথম দফা লোকজন পাকিস্তান ভারত এইভাবে স্থানান্তরের পর আমাদের এই ভূখণ্ডে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনুপাত জনসংখ্যার কত অংশ ছিল? আমি জেনেছি যে, তখন আমাদের জনসংখ্যার শতকরা ২৫ ভাগ ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। আমাদের স্বাধীনতার পর পর এই সংখ্যাটা কমে গিয়েছিল। কতোটুকু কমেছিল জানেন? শতকরা হিসাবে নাকি মোটামুটিভাবে ২০% এর মতো ছিল। আর এখন আমাদের মোট জনসংখ্যার শতকরা কতভাগ আছে হিন্দু জনসংখ্যা জানেন? আমি যতটুকু জেনেছি এটা এখন কমে শতকরা ১০ ভাগের নিচে নেমে গেছে।

এই পারসেন্টেজ পয়েন্টগুলিকে আপনি সংখ্যায় রূপান্তর করেন। পরিসংখ্যান যারা করেন, ওরা এটা করতে পারেন। এটা করলে দেখবেন বিশাল অংকের একটা হিন্দু জনসংখ্যা পাওয়া যাবে যেটা হিসাব অনুযায়ী আমাদের এখানে থাকার কথা ছিল, কিন্তু এখন নাই। মিসিং পপুলেশন। এখন আপনি মেহেরবানী করে এই মিসিং পপুলেশনের সংখ্যাটা বলেন, আর আমাকে বলেন, এই বিশাল হিন্দু ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠী কোথায় কীভাবে ডিসেপিয়ার করে গেছে?

(৩)
শোনেন, আপনার পছন্দ হয় না এরকম কথা শুনলে মেরে ফেলবো, ছিঁড়ে ফেলবো, কেটে ফেলবো, জেলে পুরে দিবো, ডিম থেরাপি দিবো, ধর্ষণ করে দিবো, এইসব বলা খুব সহজ কাজ। এইটার জন্যে হৃদয়ও থাকতে হয় না, মগজ তো নয়ই। এইসব বলার জন্যে একদল লোক আছেও আমাদের দেশে। এদের কারণে আমার এই প্রিয় মাতৃভূমিতে প্রতিদিন প্রতিবেলা হিন্দুদেরকে সন্ত্রস্ত থাকতে হয়।
অনলাইনে আপনি নানান জায়গায় এদের ‘উজ্জ্বল’ পদচারণা দেখবেন- ক্রিকেট খেলোয়াড়দের ফেসবুক পেইজগুলি একটা উদাহরণ মাত্র। কিন্তু যাদের চোখ- কান খোলা, যারা পড়তে-লিখতে জানেন, গণতন্ত্র জানেন, সেক্যুলারিজম জানেন, বঙ্গবন্ধুর কথা বলেন- আপনারা কেন এই দলে যোগ দিচ্ছেন?

ঐ ভদ্রমহিলা যেসব কথা বলেছেন সেগুলি তো সারবস্তুবিহীন কথা নয়। আমাদের দেশে তো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উপর নানারকম অন্যায় অবিচার হয়। অনেক আগে থেকেই এটা হয়ে আসছে- কখনো কম কখনো বেশী। ঐ যে ২০০১ সনের অক্টোবরের নির্বাচনের পরের ঘটনা বলেছি শুরুতে, সেই ঘটনার বীভৎসতা কি আপনারা ভুলে গেছেন? ঐ রকম প্রতিদিন হয় না বটে, কিন্তু আমাকে কি আপনি কোন একটা পূজার মৌসুমের কথা বলতে পারবেন যে পূজায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় মন্দিরে হামলা হয় না বা প্রতিমা ভাংচুর হয় না? কোন একটা বছর দেখাতে পারবেন যে বছর হিন্দু ধর্মাবলম্বী কোন মানুষের সম্পত্তি জবরদখল হয়নি? পারবেন না।

বাস্তবতা হচ্ছে যে এই দেশ থেকে প্রতিদিন হিন্দু ধর্মাবলম্বী কেউ না কেউ পালিয়ে যায়। দেশ ছেড়ে যাওয়া এই মানুষগুলির সংখ্যা ঐ ‘মিসিং পপুলেশনের’ মধ্যেই আছে। এরা সবাই মনের সুখে বা উন্নত বিশ্বে উন্নত জীবন বা পাকা পায়খানার জন্যে দেশ ছেড়ে যায় না। আপনার আশেপাশে চেনাজানা অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বী পরিবার পাবেন যাদের অর্ধেক এখানে, তো বাকি অর্ধেক ইন্ডিয়ায়। কেন গেছে এরা? একবাক্যে বললে নিরাপত্তার জন্যে গেছে। ওখানে গিয়ে সকলেই যে খুব আরাম আয়েশে থাকে সেটাও না। তবুও যায়। কেন? নিরাপত্তা।

একজন মানুষ যদি এই কথাটা, এই দুঃখের কথাটা সকলকে জানাতে চায়, আপনার এটা পছন্দ নাও হতে পারে। কেন অপছন্দ হবে? কারণ তার এই দুঃখের কথাটার সাথে আপনার উপর একটা কালিমা লাগে। সেকারণে আপনার কথাটা পছন্দ হবে না। কিন্তু তাই বলে সেই দুঃখী মানুষটাকে আপনি মেরে ফেলবো, ছিঁড়ে ফেলবো বলে ধমকাতে থাকবেন?

(৪)
এখন আপনি বলতে পারেন যে ভদ্রমহিলা আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে কেন বলতে গেল, আমেরিকা কি আমাদের প্রভু? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কি আমার প্রধানমন্ত্রীর উপরে? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কি আমার সুপ্রিম কোর্টের চেয়েও বড়? আমেরিকার সরকারকে কি আমি মোড়ল মেনেছি? এইখানে আপনার কথার খানিকটা হয়তো ভিত্তি আছে। খানিকটা বলছি কেন? কারণ আপনার আমার বা সংখ্যাগুরুর ব্যর্থতার জন্যে বা আমাদের দোষের কারণেই তো ধর্মীয় সংখ্যালঘুর লোকজনকে বিদেশে গিয়ে ধর্না দিতে হয়।

দেখেন, সংখ্যালঘুর প্রতি বৈষম্য পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই কম বেশী আছে। এদের সবাই নিজের দেশের বাইরে গিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা করে না। কেন করে না? কারণ অনেক দেশেই নিজেদের দেশেই সংখ্যালঘুর পাশে এসে ওদের সংখ্যাগুরুর একটা অংশ এসে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে বলে যে না, এটা অন্যায়। নানারকম উদ্যোগ নেয় যে, না, সংখ্যালঘু বলেই একদল মানুষকে তো আমরা হেয় করতে পারি না। সংখ্যালঘু বলেই ওদের নারীদেরকে আমরা মুফৎ গনিমতের মাল মনে করতে পারি না। ওরা সংখ্যালঘু বলেই ওদের প্রার্থনার জায়গাগুলিতে আমরা হামলা করতে পারি না। সরকারও এসে পাশে দাঁড়ায়, যে না, এইসব সহ্য করা হবে না ইত্যাদি।

সেইরকম পরিস্থিতি যেখানে থাকে, যে সংখ্যাগুরুর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ সংখ্যালঘুর পাশে দাঁড়ায়, সেখানকার লোকজনকে বিদেশে গিয়ে নিজের দেশের বিরুদ্ধে ভিনদেশিদের কাছে অনুযোগ করতে হয় না। নইলে এমনিতে নিজেদের দেশে উৎপীড়নের শিকার হয়ে বিদেশে বিদেশে ঘুরে ঘুরে দুনিয়ার মানুষের মধ্যে নিজেদের পক্ষে জনমত তৈরির জন্যে সংখ্যালঘুরা চেষ্টা তো করেই। রোহিঙ্গাদের কথা বাদ দিলাম, ওরা তো উৎখাত হয়ে দেশের বাইরেই থাকতে হচ্ছে। জাতিসংঘের অফিসগুলির সামনে, লন্ডনের বিভিন্ন জায়গায় আপনি দেখবেন কত দেশের লোকজন নিজেদের দেশের সংখ্যাগুরু ও সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে থাকে।

আপনার নিজের দিকে তাকান। নাসিরনগরের ঘটনায় আপনি প্রতিবাদে মুখর হয়েছিলেন? রামুর ঘটনায়? বা আপনার নিজের এলাকায় যখন কোন সাম্প্রদায়িক হামলা হয় তখন আপনি কি করেন? এই যে আমাদের পাহাড়ে এতো অত্যাচার নির্যাতন হয়, আপনি মুখ খুলে প্রতিবাদ করেন? করেন না। এই যে সামনে শরত কাল আসছে- মূর্তি ভাঙার মহোৎসব শুরু হবে। আপনি কি ওদের রক্ষায় থাকবেন? থাকবেন না। তাইলে আপনিই বলেন, সংখ্যালঘুরা, ধর্মীয় হোক বা এথনিক হোক, ওরা বিদেশে গিয়ে সহায়তা কেন চাইবে না?

(৫)
শোনেন, এই ভদ্রমহিলা কী বলেছেন, কী পরিসংখ্যান দিয়েছেন বা কোন ঘটনার কথা বলেছেন বা ব্যক্তিগতভাবে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কিনা সেসব তুলে আপনি নানান কূটতর্ক করতে পারেন। কিন্তু তাঁর যে মূল ক্ষোভ বা দুঃখের জায়গাটা, সেটা তো আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না। তাইলে আপনি ওকে গালাগালি, ধমকাধমকি করছেন কেন? এইটা তো উল্টা হয়ে গেল। একজনকে মারবেন, ধরবেন, আর সে কাঁদলে বলবেন, কান্দিস ক্যান! মার খেয়ে হাড্ডিগুড্ডি ভেঙে ক্রন্দনরত একজন যদি বলে যে, ওরে আমারে মেরে ফেললো রে, আপনি কি ওকে গিয়ে বলবেন যে এই ব্যাটা, তোর তথ্য সঠিক নয়, তুই কেন হত্যার অভিযোগে একজনের ভাবমূর্তি নষ্ট করছিস?

এরকম তো হয় না। পীড়িতজনের পীড়ার কারণ সন্ধান করবেন। সেটা নিবারণের চেষ্টা করবেন। তাই না? উল্টাটা যখন করবেন তখন তো আমার সন্দেহ হবে যে আপনি ঐ পীড়নকারীদেরই একজন।

শেয়ার করুন:
  • 13.5K
  •  
  •  
  •  
  •  
    13.5K
    Shares

লেখাটি ১৯,৪০৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.