বিপ্রতীপ সময়ে পাশে ছিলে যারা …

0

সুচিত্রা সরকার:

এই মুহূর্তে মনে পড়ছে সেইসব মানুষদের, যারা এই দশ মাসে আমার জীবনে একটা পশলা বৃষ্টি হয়ে এসেছিল।

আমার জননী। আমার মা। এই দশ মাস কী করেছেন, জানে তাঁর ঈশ্বর, জানি আমি। আর কিছু বললে তাঁকে ছোট করা হয়!

দিল্লীর আইআইএমসির কোর্স ডিরেক্টর সঞ্চিতা। আমি তখন সতেরো সপ্তাহ নিয়ে প্রচণ্ড নাকাল। ভীত। ক্লান্ত।
পেট আড়াল করতে ব্যস্ত। অসুস্থতাও। গাড়িতে উঠার আগে লাগেজ নামাবো, ওনি বাঁধা দিলেন। দারোয়ানকে বললেন নামিয়ে দিতে।
তাকালাম তাঁর দিকে। ফিসফিস করে বললেন, আমি বুঝেছি। খুব সাবধান থাকবেন সুচিত্রা। ভারী কিছু তুলবেন না।
চোখে জল ভরে এসেছিলো।

দুর্জয় স্যার। পরীক্ষার আগে আগে যখন এক গাদা বই নিয়ে ক্লাস করতে জাহাঙ্গীরনগর হাজির, অভিভাবকের মতো বললেন, এতো ভারী ব্যাগ কেন? চার ঘণ্টার পরীক্ষা কীভাবে দেবো, সাহস জোগালেন। এমনকি আমার অসাবধান ও অহেতুক দ্রুত হাঁটতে দেখে বললেন, ধীরে যাও। আস্তে (তখন পরীক্ষা চলছিল আমার)! এমন পিতৃসম স্নেহ কই পাবো?

হেনাদির বড় মেয়ে দীপা আন্টি। এতোটা স্নেহ করেছেন, বারবারই আমি আনন্দে ভেসে গেছি। পরম নির্ভরতায় তাঁকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে গেছি ছেলেমানুষের মতো। ব্যস্ততার মধ্যেও পরামর্শ দিয়েছেন। সাহসী করেছেন। যখন অনেক কথা বলার দরকার, ফোন করেছেন। আর বলেছেন, দরকার হলেই ফোন দেবে। আন্টি এতো ভালো কেন, জানি না।

মুন্নী, আমার বন্ধু। স্কুলের। কনসিভ করার পর থেকে আজকে পর্যন্ত আমার শত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে অক্লান্তভাবে। সাহস জুগিয়েছে। আমার কাউন্সিলর সে। সে না থাকলে আমি শেষ।

টিভি কোর্সের শিক্ষার্থী ফিরোজ। পাগলটা বেশ দৌঁড়েছে। রাজহাঁস খেতে ইচ্ছে করছিলো। বেশ খেটেখুটে গ্রাম থেকে তিন দফায় এনে দিয়েছে।

সাবরিনা, পুরো ভারত সফরে আমার নার্সের ভূমিকা পালন করেছে। দিল্লীর প্রচণ্ড শীতে ওর মোজা জোড়া এগিয়ে দিয়েছে। এসব খুব ছোট মনে হলেও, বিশাল। তখন খুব ওয়াশরুম ব্যবহার করতে হতো। মারুফ কতো যুদ্ধ করে ঠিকঠাক একটা টয়লেট খুঁজেছিল লালকেল্লায়, আমি জানি।

মানসীদি, বিরাট জোরের জায়গা আমার। কলকাতায় এয়ারপোর্ট চেকিং এ আমার নাজেহাল, বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে রেগে গেছিলেন। পুরোটা সময় অদ্ভুতরকম উপায়ে পাশে ছিলেন, দূরে থেকেও।

রিমা দাস, সেদিন ইনবক্স। চন্দ্রগ্রহণে কী কী করণীয়, জানিয়ে দিলেন। এতো কিছু পাবার কি কথা আমার?

সাঝমী, গান রেকর্ড করে পাঠালো, বাচ্চাকে শোনানোর জন্য।

মনিকাদি’কেও জ্বালিয়েছি বেশ। স্নেহের স্পর্শ পেয়েছি তারও।

বাসনা মাসী, যাকে সবাই শ্রাবণীর মা ডাকে, কতবার আমার জন্য রান্না করেছেন! সাধ খাইয়েছেন বাসায় নিয়ে। আমার বাসায় এসে কত কাজ করে দিয়েছেন। ঊনি টেকেন ফর গ্রান্টেড না। ঋণের পাল্লা আমার ভারী হয়েছে।

শ্বশুরের লাশ নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে সৌমিত্র যাচ্ছে। আমি একা। উবার ঠিক করে দিল একজন। দোলনের কাছে আগে থেকেই আমার ব্যাগটা ছিল। টিপ করে উবারেও চড়ে বসলো। আমাকে একা ফিরতে দেবে না। কত বললাম, আমি স্ট্রাগলিং ওমেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। ফল হলো এই, সে বাসা পর্যন্ত এসেছে আমার নিরাপত্তায়! আমি কি এতো পূণ্যবান?

হাসপাতালে জয়, ফখরুল, রাজিব ভাইরা যা করেছে, ভোলার নয়। ভুলবো না।

তানু সেই মিরপুর থেকে নবাবগঞ্জ এসে বাজার করে দিল। জোহা এক মুমূর্ষ দিনে সাহায্যে এলো।

সৌদ ভাই, ডায়বেটিস শুনেই সাহায্যে এগিয়ে এলেন। মানসিক শক্তি ও পরামর্শ দেবার জন্য তাঁর অর্ধাঙ্গি চন্দ্রলেখার কাছে আমি ঋণী।

রূপালী আমার ছাত্রী। আমাকে নিয়ে সে আগে যেমন ব্যতিব্যস্ত থাকতো, এখনও তাই। পরীক্ষার পড়া শিখতে তাকে নিয়েই দৌঁড়েছি।

স্বপ্ন চেইন মলে ক্যাশ কাউন্টারে প্রচুর ভীড়। আমার হাতে বাজার। তরঙ্গ তিতুমীরে অনার্স প্রথম বর্ষ। ক্যাশের ছেলেটাকে বললো, আপাকে আগে দেন। তারপর ইংগিতে দেখালো। এখন গেলেই এগিয়ে আসে, কী লাগবে, শরীর কেমন! ও আজ স্ট্রাগল করছে। আশীর্বাদ করি, অনেক বড় হোক!

কাল এক চানাচুরওলা বললো, দিদি সাবধানে থাইকেন। রাস্তার সাইডে দাঁড়ান গিয়ে। নামটা জানা হয়নি।

অফিসের জুনিয়র কলিগ রাসেলের বোন মা হতে গিয়ে গত বছর মারা গেছে। পুরোটা সময়, ও বেশ আন্তরিক ছিল আমার প্রতি।

মাইশা আর রাহাতকে একটা করে চাপড়। আমাকে ওদের আদর দেবার জন্য। ওরা আমার ছাত্রছাত্রী, কে বলবে! ওরা আমার গার্ডিয়ান ছিল, এ সময়। পিঠা খেতে ইচ্ছে করছে শুনে একগাদা আয়োজন। রাহাতের বাসায় আমার জন্য বানানো আমের আচারের বয়াম নিয়ে অপেক্ষা করছে রমাদি।

এই সেদিন ফলস পেইন উঠলো। ফেসবুকে দেখে দীপাদি ফোন করলেন। রাত যতোই হোক, গাড়ি নিয়ে পৌঁছে যাবেন, আশ্বাস দিলেন। জোনাকীদি বললেন, টাকা নিয়ে ভাবিস না। এক্ষণ হাসপাতালে যা!
সুমিত্রাদিও ইমার্জেন্সি ডাক্তারের নম্বর দিলেন। ওই সময়টায় এই তিনজন মানুষের কর্মকাণ্ড দেখে তাদের নামকরণ করেছি দেবদূত!

ছাত্র ইউনিয়নের ইলা, সুপ্রীতিদি বেশ সাহস জুগিয়েছে। ধন্যবাদ দিয়ে ছোটো করবো না তাদের।

আরো অনেক আছেন, যাদের নাম নিলাম না। তারা সকলে আমার দশ মাসের কাঁটাযুক্ত পথ ঘষে ঘষে মসৃণ করেছেন।

আরো অনেকের নাম নিলাম না, যাদেরকে আসলেই দশ মাসে পাবার কথা ছিল। যাদের পাইনি, তাদের এখনো চাই না। ওসব বাড়তি ঝামেলা। কারণ ওদের জন্য রয়েছে ঘেন্না। রয়েছে করুণা। তাই তাদের ক্ষমা করলাম!

ভাল থাকুন সকলে। সকলের মঙ্গল হোক।

১৯.৭. ২০১৯
রাত ১.২৫ মিনিট।
ললিত মোহন দাস লেন।

শেয়ার করুন:
  • 46
  •  
  •  
  •  
  •  
    46
    Shares

লেখাটি ৩০৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.