শুধু মিন্নি না, নয়নের গডফাদারের বিচারটাও চান

0

লিপিকা তাপসী:

অপরাধীর কোনো লিঙ্গ নেই। অপরাধ যে কেউই করতে পারে। অপরাধী নারী বলেই তাকে সমর্থন দিতে হবে আবার নারী বলেই তাকে শুলে চড়াতে হবে, তাকে প্রেম, বিয়ে বেশ্যা বলে গুস্টি উদ্ধার করতে হবে সেটা তো ঠিক নয়। মিন্নী খুনের পরিকল্পনায় জড়িত ছিল কিনা সেটা প্রমাণসাপেক্ষ।

একটা ভিডিও দেখে সিদ্ধান্তে চলে আসা যায় কিনা যে মিন্নি খুনের ঘটনায় জড়িত যখন সে সরাসরি খুনে অংশ নেয়নি। অন্যদিকে নয়ন গ্যাং সরাসরি খুনে অংশ নিয়েছে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার পিতৃতান্ত্রিক জনগণ মিন্নিকে ফাঁসি দিয়ে দিচ্ছে, মিন্নির একাধিক প্রেম, বিয়ে মুখরোচক গল্পও বানাচ্ছে। মিন্নি যতোই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিক না কেন, তা সে চাপের মুখে, নির্যাতনের মুখে দিচ্ছে কীনা, তা বের করা হোক, এই খুনের ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকলে তার যথাযথ তদন্ত হোক, বিচারও হোক। কিন্তু সব ছাপিয়ে তার বিয়ে, প্রেম, সেই মূল পরিকল্পনাকারী ধরে নিয়ে আপনারাই বিচার করে দিলে তো নয়ন গ্যাং আর তার গডফাদারদেরই শেষমেষ ফায়দা হয়।

লেখক: লিপিকা তাপসী

যারা রিফাত হত্যাকে শুধুই ত্রিভুজ প্রেমের গল্প মনে করছেন তাদের কাছে কয়েকটা প্রশ্ন রেখে গেলাম:
ধরে নিলাম মিন্নি নয়ন বন্ডকে ছেড়ে রিফাতকে বিয়ে করেছে। তাহলে নয়ন বন্ডের রাগ মিন্নির উপর হওয়ার কথা ছিল, মিন্নির উপর হামলাটা হওয়ার কথা। হামলাটা রিফাতের উপর হলো কেন?

নয়ন বন্ডের সাথে মিন্নির বিয়ে হয়েছে, ডিভোর্স হয়েছে এমন কথা তারা বলেনি। তাহলে দাঁড়ায় নয়ন এর সাথে মিন্নির বিয়ে হয়েছিল, তারপর আবার নয়নকে ছেড়ে রিফাতের সাথে বিয়ে করেছে। নয়নের স্ত্রী তার বন্ধুর সাথে আবার বিয়ে করছে এটা সে বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিলো? সে শহর কাঁপিয়ে বেড়ায়, মানুষজন তাকে ভয়ও পায়, কিন্তু তার বউয়ের দ্বিতীয় বিয়ের সময় কিছু বললো না, চুপচাপ দেখে গেল, কেন?

একটি সংবাদপত্রে রিপোর্ট অনুযায়ী নয়ন এবং রিফাত ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল, পরে মাদক ব্যবসার ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপে যোগ দেয় সেখান থেকেই তাদের মধ্যে ফাটল ধরে, শত্রুতার শুরু। তাহলে নয়নই তার স্ত্রীকে রিফাতকে বিয়ে করতে বাধ্য করেছে কিনা? যাতে রিফাতদের গোপন সংবাদ নয়ন পেতে পারে? নয়ন মিন্নিকে ব্ল্যাকমেইল করে আসছিল কিনা এই ঘটনায় সাহায্য করার জন্যে?

রিফাত শেষ হলে কার লাভ বেশি? রিফাত না মিন্নির? মিন্নি নয়নকে ছেড়ে এসে রিফাতকে বিয়ে করেছে, রিফাতকে খুন করলে মিন্নির লাভ কী? নয়নকে তো ছেড়েই এসেছে তাহলে তার সাথে যোগাযোগই বা কেন রেখে গেল?

প্রেমে ব্যর্থ হলেই কেউ দা নিয়ে কোপাকুপি করবে? নারীও তো প্রেমে ব্যর্থ হয়, তার স্বামীও তো একাধিক সম্পর্কে জড়ায়, বেশ্যালয়ে যায়, কই সেতো চাপাতি নিয়ে, দা দিয়ে কুপিয়ে রেখে আসে না। নারীরা কোপাকুপি শুরু করলে তো দা ব্যবসা নির্ঘাত একটা ভালো ব্যবসা হইতো। কিংবা অনেক পুরুষেরও প্রেমে ব্যর্থ হবার ঘটনা ঘটে কিন্ত প্রকাশ্যে কোপাকুপি করার সাহস কারা করে?
যে জানে প্রকাশ্যে কোপাকুপিতে তার কিছুই হবে না, সে পার পেয়ে যাবে। নয়নও তাই ভেবেছিল অন্যবারের মতো বের হয়ে আসবে। কাদের রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে সে এরকম বেপরোয়া হলো, এই সাহস সে কোথায় পেল? এরকম সন্ত্রাসী বলেই এই সাহস পেল কিনা! আর যারা তাকে সন্ত্রাসী হতে সাহায্য করলো তারাও দায়ী কিনা?

মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী ছোট্ট শহরে নয়নের গ্রুপের নাম ছিল ০০৭ বন্ড। নয়ন আর তার দলবল শহর কাঁপিয়ে বেড়াত। চুরি ডাকাতি, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, স্কুল-কলেজগামী ছাত্রদেরকে মাদকাসক্ত বানানো, তাদেরকে দিয়ে মাদক বিক্রি সবই ছিল তার নিত্য দিনের কাজ। শহরে একটি সুড়ঙ্গ তৈরি করেছিল কলেজে যাবার জন্যে। এই যে ওরা শহর দাপিয়ে বেড়াতো, কারা কারা এদের পিছনে ছিল? এদেরকে দুধ ফি মাখন খাইয়ে পেলে পুশে হৃষ্টপুষ্ট করেছে কারা? রাজনৈতিক দল আর পুলিশের সহায়তা ছাড়া এরকম একটি দল কীভাবে শহর কাঁপিয়ে বেড়ায়?

মিন্নিই যদি মূল হত্যাকারী হয়, তাহলে নয়নকে ক্রসফায়ারে দেওয়া হলো কাদেরকে বাঁচাতে? নয়ন বেঁচে থাকলে কারা কারা ভয়ে থাকতো? মিন্নিকে মূল দোষী দেখাতে পারলে নয়নের গডফাদারের বিষয়ে প্রশ্ন আসবে না। তাতে কাদের লাভ বেশি? মিন্নির যেহেতু কোন গডফাদারের খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি।

মিন্নি যাতে আইনজীবী না পায় তার জন্যে কারা চেষ্টা করছে, কেন করছে, কাদের ভয়ে মিন্নির আইনজীবী হতে কেউ রাজী হয়নি? মিন্নির ভালো আইনজীবী পেলে কাদের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে পারে? তাদের লাভ কি শুধু তারা অপরাধীর শাস্তি চায়? তাহলে অন্য যারা ধরা পড়েনি, তাদের নিয়ে কথা বলছে না কেন? অন্য আসামীদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়, সেটা নিয়ে কথা বলছে না?

যে প্রশাসন নয়নকে ক্রসফায়ারে দিয়েছে, যাতে থলের বিড়াল বের না হয়, যে প্রশাসন নয়নকে বিভিন্ন অপরাধে ধরে আবার ছেড়ে দিয়েছে, যে প্রশাসন নয়নদেরকে নির্বিঘ্নে একের পর এক অপরাধ করতে দিয়ে গেছে সেই প্রশাসন কতটুকু নিরপেক্ষ তদন্ত করবে?

রিফাতের আগেও নয়ন বন্ডের দল এরকম কয়েকজনকে কুপিয়েছে। তারা ভাগ্যগুণে বেঁচে গেছে। নয়ন ও তার দলকে পুলিশ ধরলেও পর পরই ছেড়ে দিয়েছে। তারা বাইরে এস আরো ক্ষমতাবান হয়েছে। এদরেকে প্রথম দফায় শাস্তি দিলে আজ প্রকাশ্য খুনের ঘটনা এড়ানো যেতে পারতো।

তাই এখনো এই খুন শুধু ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী ভেবে বসে বসে মিন্নির মুণ্ডুপাত করে মনের সুখ মেটাবেন না, আর অন্য বিষয়ে চুপ থেকে নিজের জন্য গর্ত নিজে খুঁড়বেন তা আপনার বিষয়। শুধু মিন্নিকে নিয়ে মাতামাতি করলে আপনার পিতৃতান্ত্রিক মনের সুখ মিটবে বটে কিন্ুঁ এই ঘটনার মূল হোতা নয়নকে তৈরি করেছে যারা, নয়নদেরকে পেলেছে, বাঁচিয়ে রেখেছে যারা, যে প্রশাসন থানা থেকে বার বার নয়নদের ছেড়ে দিয়েছে তারা বেঁচে যাবে।

তাদের এই কূকীর্তি নিয়ে কেউ আর কথা বলবে না। আর তাদের এই কূকীর্তি চাপা পড়ে থাকলে ক্ষতিটা আপনারই। আপনি চুপ থাকলে আরেক নয়ন চলে আসবে আগের নয়নের জায়গায়, এরা মুক্ত আলো বাতাসে আবার বিষবৃক্ষ হবে আর আপনার কলেজগামী ছেলেমেয়ে মাদক নেবে, টাকার জন্যে মারধোর করবে, চুরি করবে, হয়তো খুনও করবে, কোন মেয়ের ওড়না ধরে টান দেবে, আর কোনদিন হয়তো রিফাত বা নয়ন বন্ডদের মতো অবস্থা হবে। তাই যারা নয়ন, রিফাতকে তৈরি করেছে তাদের বিচারও চান, তাদের রাজনীতি শেষ হোক এইটাও দাবি করেন।

শেয়ার করুন:
  • 927
  •  
  •  
  •  
  •  
    927
    Shares

লেখাটি ২,০০৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.