ধর্ষণ প্রতিরোধে কোনটা বেশি প্রয়োজনীয়?

0

সাবরিনা স. সেঁজুতি:

আজ আমার দেশে গ্রামে-গঞ্জে, নগরে-বন্দরে, ঘরে-বাইরে শিশু থেকে বৃদ্ধা সকলেই অনিরাপদ জীবন যাপন করছেন। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা আর নিউজ পোর্টালে ভেসে ওঠা ধর্ষণের খবরগুলো আমার মনে যে অস্থিরতা তৈরি করে তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।

অস্থিরতা বিতৃষ্ণায় পরিণত হয় যখন ধর্ষণের পক্ষে যুক্তি হিসেবে নারীর বেশভূষা ও চরিত্রের বিচার-বিশ্লেষণ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। কখনও কখনও বিদেশি সিনেমা বা সংস্কৃতিকে দোষারোপ করে মানসিক প্রশান্তি লাভের ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়।
এই মানসিক বিকারগ্রস্থতার পেছনের গল্পটা যে বহু বছরের তা বুঝতে খুব কষ্ট করার প্রয়োজন হয় না।

বাংলাদেশের “মি-টু অন্দোলন” যদিও খুবই স্বল্পকালীন ও সংক্ষিপ্ত ছিল, তবু যৌন নিপীড়কের হাবভাব আর তার সহমত ভাইদের হাজারও যুক্তি দেখে খুব সহজেই দেশের সামাজিক অবক্ষয়ের আন্দাজ পাওয়া গেছে। কারণ আমরা শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে ভালোবাসি। ঐ সকল যৌন নিপীড়কের বিরুদ্ধে না ঘরে কথা বলেছি, না বাইরে। যৌন নিপীড়কেরা সমাজে পেয়েছেন সম্মান, আর ঘরে পেয়েছেন আদর। যে অপরাধের কোন সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় বিচার হয় না, সে অপরাধ পারিসাংখ্যিক হারে বাড়বে সেটাই স্বাভাবিক।

এখন যখন আমার ঘরের শিশুকন্যাটি ঐ সকল মানসিক বিকারগ্রস্থদের হাতে হেনস্থা হচ্ছে সেটা গোপন করছি ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ পর্যন্ত ধর্ষণের পর তাকে খুন না করা হচ্ছে। সম্ভব হলে খুনটাও ধামাচাপা দিয়ে ফেলতাম। হয়তো কেউ কেউ সকলের অগোচরে সেটা করছেনও।

নিঃসন্দেহে পত্রিকার পাতা আর নিউজ পোর্টালে ভেসে ওঠা ধর্ষণের খবরগুলো কোন বহিঃশক্তির বহিঃপ্রকাশ নয়। যখন অনেক বছর ধরে একটি সমাজে ধর্ষণ সংস্কৃতি চর্চা করা হয় তখন তার চূড়ান্ত পরিণতি আজকের বাংলাদেশ। সামাজিক মাধ্যম আর টেকনোলজির উন্নয়ন সাধনের দরুণ খবরগুলো ছড়িয়ে পড়ছে রাতারাতি। এটাকে আপনি উন্নয়নের জোয়ার বলবেন কিনা সেটা আপনার একন্ত ব্যাক্তিগত বিবেচনা। তবে উন্নয়নের জোয়ারে যে হারে অপরাধ প্রকাশ পাচ্ছে সেই হারে তার বিচার হচ্ছে না।

শত শত বছর আগে মানব সমাজে বিচার ব্যবস্থা চালু হয়েছিল যাতে সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল সম্ভব হয়। যাতে শাস্তির ভয়ে মানুষ তার ভিতরের অপরাধ প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। বিচার ব্যবস্থা আদৌ ধর্ষণের শিকার মেয়েটি বা তার পরিবারের জন্য কতোটা ন্যায় বয়ে আনবে সেটা বিশ্লেষণসাপেক্ষ, কিন্তু অপরাধীর শাস্তি হলে ভবিষ্যত অপরাধের হার যে কমবে তা মনে হয় প্রমাণিত।

এই দেশে যুগে যুগে নতুন-নতুন আইন প্রণীত হলেও তার প্রয়োগ খুব বেশি দেখা যায়নি। কারণ বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় দুর্নীতির হার ধর্ষণের সংখ্যার সাথে সমানুপাতিক হারে বাড়ছে বলেই বোধ করি। তবু বিচার ব্যবস্থার দোষ না দিয়ে আমরা যদি শুধু সামাজিক অনুশাসন আর মূল্যবোধের অবক্ষয়কে ধর্ষণের মতো নিকৃষ্ট অপরাধের একমাত্র কারণ মনে করি, সেটা হবে বোকামি। অবশ্যই সেটা একটা কারণ, কিন্তু একমাত্র কারণ নয়।

বিচার ব্যবস্থার অপারগতার পাশাপাশি আমি খালি চোখে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক শিক্ষাব্যবস্থায় যৌন শিক্ষার অভাবকেও আরেকটি বিশেষ কারণ বলে মনে করছি।

আপনি যখন আপনার সন্তানকে আগুনের সঠিক ব্যবহার সেখাতে ব্যর্থ হবেন, কিংবা আগুনের সাথে সঠিক পরিচয়ই করিয়ে দিবেন না, আগুন বলে এই দুনিয়াতে যে কোন বস্তু আছে তা তার কাছে গোপন করবেন, কিন্তু আপনি জানেন একটি বয়সে আপনার শিশুটির বেঁচে থাকার তাগিদেই আগুন ব্যবহার করতে হবে, তখন তার জন্য কি আর কোন রাস্তা খোলা থাকে? সে এখান-সেখান থেকে আগুন বিষয়ক জ্ঞানার্জনের চেষ্টা করবে সেটাই স্বাভাবিক।

যে জ্ঞান অসম্পূর্ণ হবার সম্ভাবনাই নিরানব্বই শতাংশ, ফলশ্রুতি আগুনের অপব্যবহার।
সেখানে যৌনতার মতো একটি অত্যাবশকীয় জ্ঞান থেকে মানবসন্তানকে বঞ্চিত করলে শুধু সামাজিক অনুশাসন আর রাষ্ট্রীয় আইন দিয়ে তাদের যৌন ক্ষুধাকে আটকে রাখা সম্ভব নয়। সঠিক শিক্ষা আর ন্যুনতম মানবিক আচরণের প্রশিক্ষণ অত্যাবশকীয়। আর এই প্রশিক্ষণ শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করলেই চলবে না, পাশাপাশি পারিবারিক অনুশাসনের আওতায় আনতে হবে। তার মানে পিতা-মাতা-অভিভাবকগণদের শিখতে হবে কীভাবে কিশোর-কিশোরী সন্তান লালন-পালন করতে হয়।

শিশুকালে আপনি ঠিক যেভাবে আপনার শিশুটিকে মুখে তুলে ভাত খাওয়া শিখিয়েছিলেন, কোলে করে টয়লেটে নিয়ে টয়লেট ব্যবহার করা শিখিয়েছিলেন, ঠিক সেভাবে তার কৈশোরে তাকে সঠিক যৌন শিক্ষা দেবার দায়িত্বও আপনার। তাই আপনাকে শিখতে হবে কীভাবে কিশোর/কিশোরীকে সঠিক উপায়ে যৌন শিক্ষা দিতে হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সকল শিশু-কিশোর-কিশোরীকে সঠিক প্যারেন্টিং-এর আওতায় আনা, প্রয়োজনে মনিটরিং এর ব্যবস্থা করা।

আমি জানি বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক অবকাঠামোতে প্যারেন্টিং এবং যৌন শিক্ষা কোনটাই গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয় না। সাক্ষর কিংবা নিরক্ষর, অল্প শিক্ষিত থেকে উচ্চ শিক্ষিত, বেশিরভাগ পরিবারেই শিশুর যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে কোনরুপ সুচিন্তা করার প্রয়োজনবোধ আমরা করি না। কিন্তু অতীতে যা হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না, বা হতে দেবো না, সেটা সঠিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়। আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে যদি শুধু নিজেদের পকেট ভারি করার কাজে ব্যস্ত থাকেন, আর কথায় কথায় – “ঘরে নিরাপত্তা দিতে পারবো না”, “রাস্তার নিরাপত্তা দিতে পারবো না”, বলেই নিজেদেরকে দায়মুক্ত করতে চান, তবে ধর্ষণের মতো অপরাধ কমার কোন সম্ভাবনাই আমি দেখছি না। তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে অতি দ্রুত প্রতিকার হিসেবে শাস্তি আর প্রতিরোধ হিসেবে যৌন শিক্ষা ও প্যারেন্টিং-এর সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

রাজার পুকুরে সবাই দুধ দেবে, আমি এক বাটি পানি দেই, কিছু হবে না, এরূপ ভেবে বসে থাকলে দিনশেষে দুধের পুকুর না, পানির পুকুরই কপালে জুটবে আমাদের। তাই পারিবারিক, সামাজিক, ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সকলের এগিয়ে আসা আজ সময়ের দাবি, আমাদের সম্মিলিত হস্তক্ষেপের মাধ্যমেই সম্ভব ধর্ষণের মতো নিকৃষ্ট অপরাধকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।

শেয়ার করুন:
  • 70
  •  
  •  
  •  
  •  
    70
    Shares

লেখাটি ২২১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.