দু:খ জলের লহরী কেটে বাজুক জীবন জয়ের গান

0

লুতফুন নাহার লতা:

‘একটা খুব ভালো খবর আছে। রিতার জন্য লিভার পাওয়া গেছে। এখন ওর অপারেশন হচ্ছে।
গতকাল একজন মারা গেছেন ব্লাকআউটের সময় তার অপারেশন চলছিল। তার লিভার রিতার সাথে ম্যাচ করেছে। মৃত ব্যক্তির বডি পার্টস ডোনেট করা ছিল। কী কাকতালীয় ব্যাপার, তাই না?-‘

গল্প নয়, নাটকও নয়, জীবনেরও অধিক এই কথাগুলো আমাকে আজ সন্ধ্যায় বলেছে শেলী।

হঠাৎ করেই প্রায় কোমায় চলে গিয়েছে রিতা। একজন মা, একজন মেয়ে, বন্ধু, সহকর্মী, লেখক কবি উজ্জ্বল উচ্ছ্বল এক মেয়ে রিতা। শুনেছি সে লেখালেখি করতে ভালোবেসে। বইও বেরিয়েছে দু’একটি! যতটা না লেখে, তারও চেয়ে লিখতে চায় সে বেশি। স্বপ্নগুলো তাঁর যতটা না দেখা, দেখতে সে চায় তারও বেশি। বুকের ভেতর ডানা মেলে উড়তে থাকে সোনালী সকাল।

আমরা একই শহরে থাকি, তবু আমি তাকে দেখিনি কখনো। কিম্বা দেখেছি, তবু জানিনি তার নাম। জানিনি কেমন তার দিনকাল। শুনিনি তার কোনো বেদনার গল্প। দিনমান বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে নায়াগ্রার জলপ্রপাত তার রুদ্র অবয়বে তবু কিছু বৃষ্টির মায়া মেখে রাখে, সেকি সেই মায়াভরা জলের ধারে গিয়ে কেঁদেছে কখনো! চাঁদের আলোয় বয়ে যাওয়া কলস্বনা নদীর মতো আহ্লাদিত হাসিতে ফিরে ফিরে চেয়েছে কি সন্তানের প্রিয়তম মুখে! দুরন্ত তুষার ঝড়ের রাতে নিউইয়র্কের সাবওয়ে ট্রেন থেকে নেমে একাকি হেঁটেছে যখন, ঘরে ফিরে যেতে যেতে দীর্ঘশ্বাস ছুটে গেছে কিনা সেই ঝড়ের সাথে, আমি তার জানি না কিছুই। আকাশ প্লাবিত মন জোছনায় কার মুখ মনে করে গুনগুনিয়ে গেয়েছে সে গান জানি না, জানি না, জানি না! আমরা জানি না কিছুই। কারো কিছুই জানি না আমরা। এমনি এক কালো আঠালো অন্ধকার খামচি মেরে ধরে থাকে আমাদের অক্ষম হাত। যাপিত জীবন নিয়ে আমরা কেবল ছুটছি আর ছুটছি। আমরা চিনি না কেউ কাউকেই।

তবু জানি এই শহরের প্রতিটি কোণে কোণে তুষারে তুষারে জমাট বেঁধে আছে তাঁর কান্না। মেয়েটি একা ছিল। মেয়েটি একটি শিশুকে বড় করে তুলছিল একা একা। মেয়েটি তাঁর মাকে এনে রেখেছিল কাছে। দিনের দীর্ঘ সময় কাজ করতো সে। মেয়েটি অল্প একটু টাকার জন্যে মেটাতে পারেনি তার চাওয়া, তার ছোট ছোট তার স্বপ্নগুলোকে। বাচ্চাকে দিতে পারেনি যতটা চেয়েছিল দিতে। মেয়েটির আকাশ ভরা স্বপ্নেরা দূর নক্ষত্রের মতো যোজন যোজন দূরে সরে গিয়ে মিটমিট করে জ্বলে রইলো শুধু সুদিনের আশায়। তবু কিন্তু মেয়েটি বসে থাকেনি। গড়ে তুলেছিল থিংকিং ফর হিউম্যানিটি নামে সাহায্য সংগঠন। তা নিয়ে বাংলাদেশে তার এলাকার মানুষদের সাহায্যের আনন্দে ভরিয়ে দিলো ভুবন।

হঠাৎ মেয়ের শরীর গেল ভেঙে। লিভার হলো নষ্ট। নিজের অজান্তেই দিনে দিনে নেতিয়ে গেল সে। এখন তো আর বাঁচানো যায় না! তাকে নেয়া হলো লাইফ সাপোর্টে। হ্যাঁ, লাইফ সাপোর্ট। কিন্তু কী আশ্চর্য আজ, এতোক্ষণে তার নবজীবন যোগের চেষ্টা চলছে। তার জন্যে ম্যাচ করে লিভার পাওয়া গেছে। কাল রাতে যিনি মারা গেছেন তাঁর দান করে যাওয়া লিভার।

এদেশে আসার কিছুদিন আগে নাট্যকার হুমায়ুন আহমেদের পরিচালনায় সন্ধানীর চক্ষু দান কর্মসূচির আওতায় একটি শর্ট ফিলমে কাজ করেছিলাম। ছবিতে আমার মেয়েটি (শীলা আহমেদ) অন্ধ। তার চোখে অন্য একজনের দান করে যাওয়া চোখ ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হয়েছে। আজ ডাক্তার তার চোখের ব্যন্ডেজ খুলে দিলে মেয়ে বলছে, ‘মা! আমি দেখতে পাচ্ছি! দেখতে পাচ্ছি মা!’ মা সেই আনন্দের মুহূর্তে দুঃখকে জয় করে, বিজয়িনীর খুশীতে এক ধরনের কন্ট্রোল্ড গুমরানো কান্না কাঁদছেন। পুরো ছবিতে কেবল ওই কান্নার শব্দটুকুকে আর্ট করে তোলাই ছিল আমার কাজ। তো, সেবার সেই প্রথম আমি সন্ধানীর সাথে কাগজে কলমে চুক্তি সই করে চোখ দান করেছিলাম।

এদেশে আসার পরে ৯৮ সাল থেকেই আমি অর্গ্যান ডোনার। বহু বছর পরে চলতি বছরে আবার যখন আইডি রিনিউ করা হলো, তখন আবার প্রয়োজন হলো নতুন করে চুক্তি সাক্ষর করে অর্গ্যান ডোনার হিসেবে নিজেকে আপগ্রেডেড রাখার। ডিপার্ট্মেন্ট অব মোটর ভেইকেল এর কাজ সেরে ঘরে ফিরে জীবনসঙ্গী মার্ককে জিজ্ঞেস করেছি, সে করেছে কিনা! অবাক হয়ে বলেছে, সে তো কখনো এভাবে ভাবেনি! অথচ আমি এতো আগে থেকে এই কাজে চুক্তি করে বসে আছি! লজ্জা পেয়ে সেও পরদিন নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে মৃত্যুর পরে তার দেহের অংশবিশেষ নিয়ে যাতে কেউ বেঁচে থাকতে পারে সেই চুক্তিতে সাক্ষর করে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স রিনিউ করে এনেছে। আমি তো একা সব করতে পারবো না। থাকুক না জগতের একটুখানি পরিবর্তনের কাজে সেও আমার পাশে!

তো, রিতার অপারেশন হয়ে গেছে ঘন্টাখানেক আগে। জানি না তার শেষ খবর। কেবল আজ এই গভীর রাত্রির শেষ প্রহর জেগে ওর কথা লিখছি যখন, তখন আশা করি রিতার অপারেশন সাকসেসফুল হয়েছে। রিতার ধমনিতে জীবনের সাড়া আসুক। উঠুক শিরায় শিরায় জীবনের ঐকতান। তারে তারে বেজে উঠুক টংকার। রিতা উঠুক বেঁচে। প্রাণখোলা হাসিতে আবার দু:খ জলের লহরী কেটে সবার সামনে এসে দাঁড়াক। আবার শুনি কেবল জীবনের গান, জীবন জয়ের গান!!

নিচে রিতার কবিতা
============================
গল্প এড়াতে গল্প
(HB Rita)
একদিন চিৎকার করে কেঁদে উঠবো!
ভূমিষ্টজাত নবজাতকের মত, এদিক-ওদিক হাত পা ছুঁড়ে
ঈশ্বরকে জানান দেব; আমি আসছি।
শিলনোড়ায় পিষে দিয়ে কামুক ক্ষুধিত লাজ
শব্দের চিৎকার ছুটে যাবে আঁধারে
মধ্যরাতে বালিশ চেপে লুটপাটের শরীর দেখে,
ঔর্ধ্ব-দৈহিকতায় পাশা খেলে যাবে বোবা কান্নার দল।
বুকে মাথা চারা দেয় হাজারো প্রশ্ন, তবে
লীলাবতীর শরীরের ভাঁজে শ্বাসচাপা গোঙ্গানী কেন?
নিজের ভিতর সমঝোতা টানি,
ওদিকে বরফ গলে যায় উষ্ণতার অভিলাষে।
রাত্রী গভীর হলে কানে ভাসে লীলাবতীর ফোঁসফোঁস আওয়াজ
অভিমানী মুখ গোপনে কাঁদে নির্লজ্জতায়
গল্প এড়াতে গল্প জুড়ে ঘরের থালা-বাসন; টুংটাং
মনে পরে দাদীমার বুলি,
বিশাল বক্ষ তলে পৃথিবী ধারণ করা আকাশের বুকে
একটিও নক্ষত্রের স্থায়ীত্ব নেই;
দিন শেষে সবই ফাঁকা, তুমি একা; আমিও একা।
একদিন তুমুল বর্ষণে পৃথিবীর জমিন ভিজিয়ে
চোরাবালি পথে নিষিদ্ধ রাত্রী বেছে নিয়ে,
চুপি চুপি বুকের নীলনদ হাঁটু জলে
নগ্নিকা হবো, শিরিষের গন্ধ মেখে নিঁখোজ হবো।
একদিন বুকে চাপা পাথর সরিয়ে;
চিৎকার করে কেঁদে উঠবো।

শেয়ার করুন:
  • 351
  •  
  •  
  •  
  •  
    351
    Shares

লেখাটি ৯৮৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.