অপরাধ নির্মূলে অপরাধ-মনস্তত্ত্বকে গুরুত্ব দিন

0

জাকিয়া সুলতানা মুক্তা:

ব্যক্তিগতভাবে মনে করছি একটা পরিসংখ্যান হওয়া এই মুহূর্তে জরুরি যে,
দেশের কোন কোন সেক্টরের লোকেরা গত কয়েক বছরে ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী সহিংসতা, প্রতারণা করে ধর্ষণ এবং এর পরবর্তী এমনকি হত্যাকাণ্ড সংঘটনের সাথে বেশি জড়িত।

একজন শিক্ষক হিসেবে নয়, দেশের সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে আমি আমাদের শিক্ষক সমাজের দ্বারা সংঘটিত এই ধর্ষণের ঘটনাগুলোকে বিবেচনা করে দেখেছি।
আমার পর্যবেক্ষণ বলে, শিক্ষকদের কাছে পরিবার ও সমাজ যে কাউকে অনেক বেশি নিরাপদ মনে করে এবং এই নির্ভরতাটুকুকেই কিছু প্রকৃতি-বিরুদ্ধ শিক্ষক-নামধারী অমানুষ সুযোগ হিসেবে নেয় আর সুযোগের অপব্যবহার করে থাকে।

তাদের অসৎ এই উন্মাদনা সাধারণের দৃষ্টিতে এখন যেভাবে বিবেচনায় আসতে বাধ্য হচ্ছে, তা হলো,
শিক্ষক সমাজ ধর্ষণে ও ধর্ষকামী মানস গড়তে অনেক বেশি এগিয়ে আছে।
হোক সে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা মাদ্রাসার শিক্ষক অথবা কোচিং সেন্টারের শিক্ষক!

এটা নারীর ক্ষমতায়নে, নারী-শিক্ষার প্রতি, নারীর অগ্রগতির পথে এক চরম অশনিসংকেত।
চূড়ান্ত শ্বাপদসংকুল পথ এই মুহূর্তে এদেশের নারীরা পার করছে।

ধর্ষণের এই মহামারীরূপ ধারণ একদিনে হয়নি।
এটা দীর্ঘদিনের পুরুষতান্ত্রিক আক্রোশের জঘন্য ফলাফল মাত্র।
ধর্ষকামী মানস একদিনে গড়ে ওঠে না।
এর জন্য একটা বৃহৎ পরিসরের প্রয়োজন হয়।

আমাদের সমাজ-আমাদের রাষ্ট্র-পরিবার-সাংস্কৃতিক বলয়, এইসব বিকৃতমনা ধর্ষকদের গড়ে তুলতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করে গেছে এবং যাচ্ছে।
কারণ, নারীর অবমাননাকে এখানে যথাযথ গুরুত্বের সাথে দেখা হয় না, নারীর অসম্মানকে এখানে নারীর জন্যই অসহনীয় বেদনার করে তোলা হয়।
আইন-কানুন, বিচারালয় থেকে শুরু করে ঘরে-বাইরে সব স্থানেই নারী নির্যাতনকে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করে; শেষ পর্যন্ত নারীকেই কিংবা নিপীড়িতকেই দোষী সাব্যস্ত করার আয়োজন করা হয়।

নারী নির্যাতন-রোধে কিছু আইনের উল্লেখ এখানে আছে বটে, কিন্তু সেটার সুফল সত্যিকারের নিপীড়িত-নির্যাতিত নারীদের ক্ষেত্রে খুব কমই প্রযোজ্য হচ্ছে।
তাই পারিবারিক-সামাজিক-রাষ্ট্রিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে আমি এটিকে একটা ভয়াবহ পুরুষতান্ত্রিক আঘাত বলে মনে করছি।

সামাজিক সচেতনতা ও রাষ্ট্রীয় সুস্থ উদ্যোগই পারে এই ধর্ষ-উন্মাদ বাংলাদেশকে রুখতে।

আমি আমার জায়গা থেকে আমাদের শিক্ষক সমাজের থেকে করা এইধরনের অমানবিকতা-অন্যায়ের প্রতিকারে, সেইসব বিকৃতমস্তিষ্ক শিক্ষক নামধারী উন্মাদগুলোকে প্রতিহত করতে উদ্যোগ নিতে চাই।

একজন শিক্ষক হিসেবে এই অমানুষগুলোর, দেশীয় আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি অতি দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করার জন্য জোর দাবী জানাই।

আশা করবো~
১. শিক্ষক সমাজের আমার যারা সহকর্মী আছেন, ওনারা সবাই এই বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ গণসচেতনতা নির্মাণে একটা কিছু করার উদ্যোগ নিবেন।
আমি-আমরা সেখানে কাজ করতে ইচ্ছুক।

২. অন্যান্য সেক্টর, যেমন- পরিবহন শ্রমিকদের সেক্টর, রাজনীতিবিদদের সেক্টর, কল-কারখানাসহ যেকোনো ব্যক্তি মালিকানাধীন ও সরকারি খাতের সেক্টরগুলোর সবাই এই ধর্ষকামী বাংলাদেশকে রুখে দিতে; নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান-সংগঠন থেকে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।

৩. রাষ্ট্রযন্ত্রকে বলতে চাই, দ্রুততার সাথে এসব অন্যায়ের প্রতিকার করুন।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সুষ্ঠুভাবে কাজে লাগান।
বিচার বিভাগকে দ্রুততার সাথে কার্যসম্পাদন করাতে আরও চৌকস কোন পদক্ষেপ নিন।

দয়া করে আপনারা আপনাদের নিজ নিজ দায়িত্ব এড়িয়ে যাবেন না।
অপরাধীকে প্রশ্রয় দিবেন না।
অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করুন।
পাশাপাশি অপরাধের মনস্তত্ত্বকে নির্মূল করতে সুস্পষ্ট ভূমিকা রাখুন।

অপরাধী নির্মূল মূলত তখনই সম্ভব, যখন আমি-আপনি-আপনারা অপরাধ-মনস্তত্বকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে সেই মানস-নির্মাণকে সামাজিক মূল্যবোধ জোরালো করে এবং আইনী শাসন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে প্রতিহত করার প্রয়াস নিতে পারবো।

সবার সচেতনতাই পারে, এই দুর্বিষহ অবস্থা থেকে আমাদের ও আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে।

শেয়ার করুন:
  • 253
  •  
  •  
  •  
  •  
    253
    Shares

লেখাটি ২৬০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.