ঈশ্বর, তুমি এবার পশ্চিম থেকে পূবদিকে যাও

0

তানবীরা তালুকদার:

প্রিয় ঈশ্বর/খোদা/ভগবান,

খুব ক্লান্ত বুঝি? ঘুমোচ্ছো? বিশ্রাম নিচ্ছো? অনেক অনেক কান্নার শব্দে তুমি পর্যুদস্ত কি? তনুকে ভাল্লুকে খেয়ে ফেললো, এই কষ্টে তনুর মা আজও বিলাপ করে কাঁদে, তনুর বাবা শয্যাশয়ী। এর মধ্যে আর কত শত বিলাপের রোল, সায়মা, বিউটি, নুসরাত, এক বছর ১০ মাস বয়সী শিশুর কান্না …।

তারা জানে সব তোমার ইচ্ছেতেই হচ্ছে, কিন্তু তারপরও অসহায় এই মায়েরা, এই পরিবারগুলো তোমার নাম নিয়েই বিলাপ করে চলছে, তোমার কাছেই লাগাতার তাদের ফরিয়াদ। এই পরিবারগুলো আর কখনও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে না, কখনও ঈদ, পূজা, বৈশাখ তাদের বাড়িতে সেই আনন্দ নিয়ে আসবে না। এমনকি তাদের পরের বংশধররাও এই জেনেই বড় হবে, তাদের ফুপি, খালা এই দেশে বিনা দোষে নির্যাতিত হয়ে মারা গেছে, যার বিচার পর্যন্ত হয়নি।

তুমি সব কেড়ে নিয়েছো জেনেও তোমাকেই বলছে, হে খোদা, তুমি এর বিচার করো। তোমার ইচ্ছেতে সব হারিয়েও তারা বিশ্বাস করে, তুমি ছাড়া তাদের আর কেউ নেই। পুলিশ তো নেই-ই, আইন নেই, দেশ নেই, মন্ত্রী নেই, তাদের কিছু নেই শুধু তুমিই আছো।

অনেকদিন তো পশ্চিমে আরাম করলে এখন তুমি পূর্বদিকে যাও, ওদের তোমাকে খুব প্রয়োজন। এখানে তো সব চলছে ঠিকমতো, আজকাল এরা তোমাকে নিয়ে মাথা ও ঘামায় না, তেমন চাহিদা বা যত্নআত্তিও নেই তোমার। ওদের বাজারে তোমার প্রয়োজন শেষ। যেদিকে তোমাকে সবাই সকাতরে ডেকে চলছে, সেদিকেই আছো তুমি মুখ ফিরিয়ে! কত চাহিদা তোমার ঐ বাজারে, তোমার অনুপস্থিতিতে তোমার নাম নিয়ে কত খেলাই না চলছে। তবুও “তুমি কি এমনি করে থাকবে দূরে?”

আচ্ছা, তুমি কি পূর্বের খবর কিছু রাখো? অত্যাচার-নির্যাতনের কারণ হিসেবে তারা মেয়েদের জামা কাপড়ের দোষ দেয়। তুমি তো অনেকদিন পশ্চিমে আছো, পশ্চিমের মেয়েদের জামা কাপড় কি তাহলে আকর্ষণীয় নয়? নাকি এখানকার পুরুষদের মধ্যে কিছু সমস্যা আছে? তারা কি যথাযথ পুরুষ নয়? তারা এসব স্বল্প বসনা মেয়ে দেখেও কেন তাদের আক্রমণ করার মতো যথেষ্ট উত্তেজনা অনুভব করে না?

মজার কথা কি জানো, পূর্বের এই বীর পুরুষেরা, যারা সেখানে ছয় গজ কাপড় পরা মেয়ে দেখেও নিজের উত্তেজনা সামলাতে পারে না, সেই তারাই পশ্চিমে এসে কোন স্বল্পবসনা মেয়ের দিকে সোজাসুজি তাকানোর সাহস পর্যন্ত করে না, পুলিশ ডাকলে খবর হয়ে যাবে সেই ভয়ে।

আমার অবাক লাগে, এই বীর পুরুষেরা নিজেদের পরিবার, বউ, বান্ধবী, প্রেমিকা, মেয়ে, বোন পাশে থাকার পরও সেখানে নিজেকে সামলাতে পারে না, কিন্তু প্রবাসে কেউ পাশে না থাকা সত্বেও নিজেকে সামলে রাখতে পারে, জানো? এখানে তারা “মানসিক”ভাবে ব্যালান্সড থাকে, অদ্ভুত লাগে না? উলটো হওয়ার কথা ছিলো না? সামথিং ইজ ভেরি রঙ, ইজ’ন্ট ইট?

অনেকেই বলে, তুমি নাকি ঈমানের পরীক্ষা নাও, ভগবান দুঃসময় দিয়ে পরীক্ষা করে দেখে। সত্যিই তাই? একটানা এই পরীক্ষা তুমি তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র থুক্কু উন্নয়নশীল দেশের ওপরই নাও কেন গো? এদের তোমার চোখে পড়ে না, হ্যাঁ, এদের কথাই বলছি, এদের, যেখানে তুমি গ্যাঁট হয়ে বসে ফায়ার প্লেসে আগুন পোহাচ্ছো!
আর যদিও তৃতীয় বিশ্বকেই গিনিপিগ ধরলে, তাহলেও অবিরাম পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি মেয়েগুলো, সংখ্যালঘু মেয়েগুলো, দরিদ্র শিশু-কিশোরী কিংবা মাদ্রাসা’র ছাত্ররা। এ কেমন অসম পরীক্ষা? তাদের তো এমনিই কিছু নেই, তাদের কী পরীক্ষা নাও তুমি প্রতিদিন? হ্যাঁ প্রতিদিন?

পরীক্ষা নিতে হয়, তাহলে নাও মন্ত্রী’র মেয়ের, বিত্তবান ব্যবসায়ী’র মেয়ের, কিংবা সামরিক বা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের মেয়েদের। তাদের তো অনেক আছে, তাদের ধরো তো দেখি। নাকি তাদের মেয়েরা যথেষ্ট আকর্ষণীয় পোষাক পরে না! তাদের বেলায় ঈমানী জোশ কাজ করে না? সব ক্ষমতা বুঝি দরিদ্রের মুখের হাসি কেড়ে নেয়ার বেলায়?

অভিনেতা মোশাররফ করিম একটি টক শো পরিচালনা করতেন, সেখানে তিনি দৃঢ় কন্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন, “সমস্যা পোষাকে নয়, সমস্যা মানসিকতায়”। আশ্চর্য হলেও সত্যি, সমস্ত মৌলবাদি জনগণ এই কারণে ক্ষেপে গিয়ে তাকে আক্রমণ করে। এর চেয়ে অত্যাশ্চার্য ঘটনা হলো, তার একজন সহকর্মীও তার পাশে এসে দাঁড়ায়নি তখন, তার পক্ষ হয়ে প্রতিবাদ করেনি। কিন্তু গাজী রাকায়েতের লুচ্চামি ধরা পরার পর তাকে সহায়তা দিতে প্রায় পুরো নাটকপাড়া তার পাশে দাঁড়িয়ে গেলো।

তুমি বুঝতে পারো কোথায় নেমেছি আমরা? এই দেশে মাত্র চল্লিশ বছর আগেও সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটেছে। শিল্পীরা তাদের গানে, কবিতায়, নাটকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে। পাকিস্তানী শাসকদের ব্যাঙ্গ করেছে, মুক্তিযোদ্ধারা তাদের থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে।
এই দেশেই গান হয়েছিলো, “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি, একটি ফুলের হাসির জন্যে অস্ত্র ধরি”, “ও, আমার সাত কোটি ফুল দেখো গো মালি, শক্ত হাতেই বাইন্ধো মালি, লোহারও ডালি”। এই বিপ্লব যারা ঘটিয়েছিলেন তাদের অনেকেই আজও সুস্থ সবল বেঁচে বর্তে আছে, কিন্তু টুঁ শব্দটিও করেনি।

আগা থেকে গোঁড়া পর্যন্ত যখন কিছু পঁচে যায় তখন তার ধ্বংসই ভালো। “শেষ থেকে শুরু যে এবার” — একটা প্রচণ্ড সুনামি, ভূমিকম্প কিছু দিয়ে তুমি সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে আবার একটি ভোর আনো, বিশুদ্ধ ভোর। পঁচে যাওয়া এই ভূখণ্ড তাকিয়ে আছে আজ একটি বিশুদ্ধ শুরু’র দিকে।

“ভোর হয়নি, আজ হলো না, কাল হবে কি না, তাও জানা নেই।“

এক বছরের, তিন বছরের, পাঁচ বছরের শিশুগুলোকে তুমি নির্যাতন করে না মেরে এমনিতেই ভূমিকম্পে মেরে ফেলো, তাদের পরিবারগুলো কোথাও সান্ত্বনা তো পাক। একটা তিন বছরের শিশু নির্যাতিতা হয়ে মারা গেলে তার বাবা-মা, ভাই-বোন কি কখনো আর স্বাভাবিক আচরণ করতে পারে? শিশুটি শুধু মারা যায় না, পুরো পরিবারটা জীবন্মৃত হয়ে যায়। শুধু নিঃশ্বাস নেবার নামই কি বেঁচে থাকা? ঠোঁট বাঁকা’র নামই হাসি?

পাকিস্তানী’রা আর দেয় না হানা, নেই তো রাজাকার
তবু কেন এ দেশ জুড়ে, লাশের পাহাড়
জেনেছো দেশ তো স্বাধীন, আছে ওরা বেশ
দুঃখ কষ্টের আর নেই কোন রেশ।
একদণ্ড নিরাপত্তা নেই সেখানে, নেই সান্ত্বনা
শরৎবাবু এ চিঠি পাবে কিনা জানি না আমি
এ চিঠি পাবে কিনা জানি না

শেয়ার করুন:
  • 2.7K
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.7K
    Shares

লেখাটি ৫,৫৩০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.