জনগণকে শান্ত রাখতে নয়া আমলের ‘জুয়া খেলা’

0

সুচিত্রা সরকার:

সিনেমায় দেখেছি, গল্পে পড়েছি। পাশের বাসার বৌদি বা ভাই ফিসফিস করে বলছে, শুনেছেন, অমুকে না রেসের মাঠে যায়!
হায় হায়! কী লজ্জা! কী লজ্জা! ভালো মানুষ কখনও ঘোড়দৌড়ের জুয়া খেলে? এতো সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে!
যে যুগ হয়েছে বাসী!

এ যুগ চতুরতার যুগ। আপনাকে খাওয়াবে বিষ, তবে কলার মধ্যে পুরে! বুঝবেনও না কী খাচ্ছেন, কখন খাচ্ছেন!

এই ধরুন- ‘দেশি পণ্য কিনে হও ধন্য’ টাইপ বিজ্ঞাপন প্রথম শুরু হয়েছিল আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। গান্ধীজী এ আন্দোলন শুরু করেছিলেন। বুদ্ধিমানরা জিততে গেলে এক কদম পিছিয়ে দু কদম আগায়! ব্রিটিশ, আমরিকাও তাই।

এখন সত্যাগ্রহ নেই, স্বদেশী আন্দোলন নেই। এখন মুক্তবাজার। পুরো পৃথিবীটাই তাদের বাজার! তাদের উপনিবেশ! এ বাজার ভাঙার মতো গান্ধীজী এ যুগে নেই।
তাই পুরো বিশ্বই আজ রেসের মাঠে যায়। ঘোড়ার উপর বাজি রাখে। জুয়া খেলে।

বোঝাতে পারলাম না?
ধরুন খেলা। টি টোয়েন্টি, ওয়ান ডে, টেস্ট ম্যাচ। বিশ্বকাপ। ক্লাবের হয়ে খেলা। অমুক দেশ তমুক দেশের সেরা খেলোয়াড়কে কিনে নিল। ক্লাবের হয়ে খেলাবে বলে! আসলে সে প্লেয়ারের বাজার ভালো (রেসে যেমন যে ঘোড়ার দম বেশি, সে ঘোড়ায় বাজি ধরে বেশি লোকে)! তাকে ঘিরে কত লোক পণ্য কেনা-বেচা করবে!

বাজারই তো! ভাবুন তো একটা খেলায় কত কী কেনা বেচা হয়? কোমল পানীয়, টিভি, ফ্রিজ, গেঞ্জি- আরো কতো কী! যেসব অচল মাল বিক্রি হবে না, তার সঙ্গে জাতীয় দলের অনুরূপ একটা জার্সি ফ্রি দিন! মাল হেঁটে নয়, দৌড়ে ভোক্তার বাড়ি চলে যাবে।

সেদিন একটা শিক্ষার্থী ভাইবা দিতে এসেছিল। গতকালের আলোচিত সংবাদ কী ছিল প্রশ্নের উত্তরে সে বলেছে ইতালির খেলার হার-জিতের বিশ্লেষণ। অথচ সেদিনই কুলাউড়ায় ট্রেনটা বগি নিয়ে জলে পড়লো। শত মানুষ মৃত্যুমুখে।

কদিন পরেই খেয়াল করলাম ব্যাপারটা! আগের সপ্তাহে ধর্ষণ। পরের সপ্তাহে খুন। এ অ্যাসিড মারছে। সে ক্রসফায়ারে যাচ্ছে। সমাজে অস্থির অবস্থা! জনগণ এই মারে তো সেই মরে! এর মধ্যে শুরু হয়ে গেল খেলা, দেশের খেলা।

ফেসবুকের বেবাক জনগণ ভুলে গেল আগের সব অঘটন। স্ক্রলডাউনে শুধু খেলা! দেশপ্রেম আটকে গেলো ওই এগারো জনের রান আর বল করায়! পুরো দেশের বড় বড় ঘটনা ঢাকা পড়ে যায় খেলার খবরে।

বিশ্বের কাছে দেশের মন্দ ইমেজ মুছিয়ে দেয় খেলা।

তাই দরকার আজ একটা খেলা। এই মুহূর্তে যখন গরিব মানুষ ভাত খাবার জন্য লড়াই করছে, মুখে রক্ত তুলছে, দরকার একটা খেলা।

যখন স্যানিটারি ন্যাপকিন, সঞ্চয়পত্র, গ্যাস বিল নিয়ে জনগণ নাজেহাল, দরকার একটা খেলা!

যখন বড় মানুষদের মাথা নত হয়ে যায় শিশুদের কাছে- যখন শিশুরা ধর্ষণের বিচার চায়- একটা খেলা প্রয়োজন।

কৃষকের ধানের দাম না পেয়ে জমিতে আগুন লাগায়। ঈদে বাচ্চাকে জামা কিনে দিতে না পেরে মায়ের আত্মহত্যা- এরকম ঘটনা জনগণ জানার পর পর একটা ম্যাচ ছেড়ে দিন।
বেবাক ঠাণ্ডা!

আর এই এখন। কাল বা গত পরশু থেকে রিকশা শ্রমিকরা পথ অবরোধ করেছে। শহর দ্বিধাবিভক্ত! চালু করে দিন একটা খেলা!

কাউকে জেলে পুরলেন, কাউকে ছাড়লেন, কাউকে মারলেন, কেউ মরলো- মোদ্দা কথা কোনো কিছু ঢাকতে, ইলুয়েশন তৈরি করতে নামিয়ে দিন একটা খেলা- জনগণ সব বাজে স্মৃতি ভুলে যাবে। কিছুদিন শান্ত থাকবে!

জনগণকে শান্ত রাখতে নয়া আমলের জুয়া খেলার জুড়ি মেলা ভার!

১০.৭.২০১৯
দারুস সালাম, ঢাকা

শেয়ার করুন:
  • 316
  •  
  •  
  •  
  •  
    316
    Shares

লেখাটি ১,৩১৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.