সম্পর্ক শেষ হলেও চরিত্রের ব্যবচ্ছেদ শেষ হয় না

0

লতিফা আকতার:

নারী- পুরুষের সম্পর্কের ইতি যেকোনো সময়ই ঘটতে পারে। নানান কারণেই এটা হতে পারে। সেটা হৃদয়ঘটিত বিষয় হতে শুরু করে বৈবাহিক সম্পর্কে সমানভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু এ সমাজের লোকজন সম্পর্কের পরিচর্যা করতে না পারলেও একটা জিনিস খুব পারে, তাহলো ঝুলে থাকা। জান চলে যেতে পারে, কিন্তু সম্পর্ক ধরে রাখতে হবে।

ধরাধরি’র নানান পর্যালোচনায় যতো সময় ব্যয় হয়, তার কিঞ্চিত সময়ও উভয়ের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যয় করা হয় না। আমাদের সমাজে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়াকে বিশাল ব্যর্থতা হিসেবে ধরা হয়। উভয়পক্ষের কেউই সহজভাবে নিতে প্রস্তুত থাকে না বিষয়টা।

আসলে এ সমাজের অধিকাংশ মানুষ ভালোবাসাহীন সম্পর্কের রুপ দেখে বড় হয়। এর প্রভাব পরে প্রজন্মের পর প্রজন্মের সম্পর্কে। সবচাইতে বেশি প্রভাব মস্তিষ্কে। তাই ভালোবাসা না থাকলেও সম্পর্ক চালিয়ে যেতে অভ্যস্ত এ সমাজের মানুষ।

এই মস্তিষ্কের ভুল শিক্ষা দুই লিঙ্গের জন্য দুইটা প্রশ্নের প্রচলন করেছে। এক, বউকে ধরে রাখতে পারলি না? দুই, তোর স্বামী তোকে খেদিয়ে দিলো? আরও বিস্তারিত বললে ‘ভাতারখাগি’ শব্দটা শুনতে হয় নারী জাতিকে। আর এই ধরনের প্রশ্ন মানুষের ইগোতে আঘাত করে চলেছে যুগের পর যুগ। তারই বিকৃত রূপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে প্রেমহীন সম্পর্কে টিকে থাকার প্রবণতা। ধুঁকে ধুঁকে শ্বাসকষ্টে মরে মরে সম্পর্ক বয়ে নিয়ে চলে বহু মানুষ।

আর কেউ যদি প্রেমহীন সম্পর্ক চালিয়ে নিতে অপারগতা প্রকাশ করে, তাহলেই আর রক্ষা নাই। পরিবারের সদস্যরা প্রবলভাবে উঠে পড়ে লাগে জোড়াতালি দেওয়ার জন্য। টিকিয়ে রাখার জন্য। সবার সকল উৎসাহে পানি ঢেলে কেউ কেউ সম্পর্ক থেকে মুক্তি পায়। কিন্তু মুক্তি পায় না সমাজের বিষাক্ত মুখ হতে। মানসিক নির্যাতন হতে।

ডিভোর্সি পুরুষ হলে কিছুটা রক্ষা। নিজের হারিয়ে যাওয়া ইগো পুনরুদ্ধারে অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে বিয়ে করে ফেলে। এবং সবার কাছে নিজেকে পুনরায় পুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে।

কিন্তু ডিভোর্সি যদি নারী হয়, তাহলে বিপর্যয়ের শেষ নেই। সে তখন ‘পাবলিক প্রপারটি’ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর রক্ষা স্বয়ং ঈশ্বরও করে না বা করতে পারে না। পদে পদে কৈফিয়ত দিয়ে চলতে হয় নারীকে। উঠতে, বসতে, খেতে, পরতে- আর সবচাইতে বেশি কৈফিয়ত তার চলন বলনের। হাসতে হয় মেপে মেপে। সাজতে হয় আরও মেপে।

আর সবচাইতে বড় বিষয় হলো- সমাজের কারণে, নিজেদের আলাদা হওয়া জায়েজ করতে ব্যক্তি উভয়ই উভয়ের চরিত্র ব্যবচ্ছেদে লিপ্ত হয়। সম্পর্ক আজীবন থাকবে, এমন মাথার দিব্যি কেউ কখনও দিতে পারে না। আবার সম্পর্কটাকে প্রতিদিন জল-সার দিয়ে তরতাজা রাখার পরিবর্তে ক্রমশ ক্ষয়ে যেতে থাকাটাকেই আঁকড়ে ধরে অনেকে। আর এটা করতে গিয়ে ব্যক্তি নিজেই সম্পর্কের মান রাখতে পারে না। সম্পর্কের অবনতি হতে পারে, উভয় ব্যক্তি একসাথে না থাকার সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। কিন্তু তাঁর সুন্দর সমাপ্তি দিতে পারে না। উভয় উভয়কে সম্মানের সাথে বিদায় বলতে পারে না। চরিত্রে কালিমা লেপন না হলে কেন জানি ভাঙ্গন জায়েজ হয় না।

এই লেপালেপিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সন্তান। দুজনের মাঝখানে ওরা যে কী ধরনের বিপর্যয়ে পড়ে তার আন্দাজ কেউ করতে পারে না। এমনকি তাদের মননের কোথায় রক্তক্ষরণ হয়, তা বোঝার চেষ্টা থাকে না কোনো পক্ষেরই। বাবা- মা সে যে রকমই হোক না কেন, তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক কথা শুনতে প্রস্তুত থাকে না বাচ্চারা। বিশেষ করে চরিত্র সংক্রান্ত তো অবশ্যই। ডিভোর্স পরবর্তী ব্যক্তির চরিত্র ব্যবচ্ছেদ দিশেহারা করে এক প্রজন্মকে। মনের ভেতরে অব্যক্ত কষ্ট নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

একটা বিষয় মনে রাখা উচিত যে কোনো সম্পর্কই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের শেষ পরিণতিটা সুন্দর, স্বাভাবিকভাবেই হওয়া উচিত। কাম্যও তা। সম্পর্ক ভাঙার পর উঠে পড়ে একজন আর একজনকে চরিত্রহীন প্রমাণের চেষ্টা হতে নিজেদের বিরত রাখাই মনুষ্যত্ব।

ভুল শিক্ষা হতে বেরিয়ে আসার দিন এসেছে। আপনার আচরণ আপনার সংস্কৃতি। ভালো বলতে না পারে, সম্মান দিতে না পারলেও নিদেনপক্ষে চুপ তো থাকা যায়। অন্তত আপনার একাডেমিক শিক্ষার আলোটা জ্বালিয়ে রাখুন। ভেঙে যাওয়া সম্পর্ককেও সম্মান করতে শিখুন, সুস্থ জীবনযাপন করুন।

শেয়ার করুন:
  • 488
  •  
  •  
  •  
  •  
    488
    Shares

লেখাটি ১,৯৭৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.