ধর্ষক তৈরি করলে ধর্ষণ বন্ধ হবে কীভাবে!

0

সামিনা আখতার:

আমাদের সমাজেই বিদ্যমান রয়েছে ধর্ষণের সমস্ত উপাদান। বাংলাদেশে বড় হওয়া প্রতিটি মেয়ে/নারীকে যদি প্রশ্ন করা হয়, সরাসরি তথাকথিত ধর্ষণের শিকার হওয়া ছাড়াও প্রতিদিন কতবার তারা হয় ধর্ষকামি দৃষ্টি, স্পর্শ, অংগভঙ্গি অথবা কথার শিকার হচ্ছেন, তাহলে বোঝা যাবে যে প্রকৃত ধর্ষণ ঘটনা ঘটার চাইতেও সমাজটা ভিতরে ভিতরে কতোটা ধর্ষক!

এই অসুস্থ সমাজটাতেই নারীর জন্ম হয়, বড় হয়, পড়াশোনা করে সংসার করে, আবার নারী সন্তানের জন্ম দিয়ে এই সমাজটাতেই তাকে ছেড়ে দিতে হয়। এই পুরো পথটাতে নারীকে যে কী বিরাট যুদ্ধ করতে হয়, আর নারীর হৃদয় যে কতটা ক্ষত-বিক্ষত হয় তা কেবল এই সমাজের নারীরাই জানে। এবং সবচাইতে অদভুত বিষয় হচ্ছে যে অধিকাংশ সময়েই এই যুদ্ধে তার সাথে থাকা তো দূরের কথা, তার বিরুদ্ধে অবস্থান করে তার নিজ পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র।

অদ্ভুত এই সমাজে বড় হওয়া আমাদের কাছে ‘মা’ এক পরম পূজনীয় আপন জনের নাম। মায়ের কোনো অসম্মান আমরা সহ্য করি না। এমনকি মাও কখনই তার দেবীর মতো উচ্চ স্থানটি হারাবার সাহস করেন না। সন্তান তার সাথে খারাপ ব্যবহার করলেও মা তা কাউকে বলবেন না, কারণ তাহলে এই সমাজ তাকেই বলবে, তুমি খারাপ। অসামান্য ধৈর্য্যের অধিকারী এক অতিমানবীর নাম “মা”।
কিন্তু সেই পূজনীয় মাকেও প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে রাস্তায়, পথে, ঘাটে, ট্রেনে, বাসে কতবার গালি দেয়া হয়, তোর মা কে…চু……? আপনার অথবা আমার সেই দেবীতুল্য মা কতবার ধর্ষণের শিকার হয়, হিসেব করে বলুন তো? অথচ আমাদের ভদ্র সমাজের ভদ্র পুরুষ মানুষগুলো (এমনকি বহুকাল ধরে পেশীবহুল বলে পরিচিত পুরুষ মানুষ) এসব শুনেও পাশ দিয়ে হেঁটে যায় চুপচাপ!

আমি, আমরা যারা মা হয়েছি এবং একটু হলেও সচেতনতার কারণে এই সমাজের ভঙ্গুর কাঠামোটাকে বুঝতে পারি, তারা পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার সময় ঠিক কতটা অসম্মানিত, কতোটা ধর্ষণের শিকার হই, সমাজ তার খোঁজ রাখে না। ধর্ষণের এরকম সামাজিকীকরণ চলতেই থাকে। এই সামাজিকীকরণ আমাদেরকে এতোটাই তার নিজের মতো পুতুল বানিয়ে ফেলে যে, আমাদের কখনো মনেই হয় না এইসবের প্রতিবাদ হওয়া উচিত, এসবের মধ্যেই নিহিত আছে একজন ধর্ষক তৈরি করার বীজ।

কিছুদিন আগের কোন এক নিরব দুপুরের কথা মনে পড়ছে। আমি ঢাকার সেন্ট্রাল রোডের ভিতর দিয়ে একা হাঁটছিলাম। রাস্তায় অন্য কেউ নেই, অন্যদিক থেকে একটা খালি রিকশা চালিয়ে আসছিল একটা ১০/১২ বছরের ছেলে। আমার সন্তানের চাইতেও কম বয়সি একটা শিশু। আমাকে ক্রস করার সময় সে গেয়ে উঠলো, চুমকি চলেছে একা পথে। রাগে আমার মাথায় আগুন জ্বলে গিয়েছিল। আমি খুব সহজেই কষে একটা চড় ওকে মারতে পারতাম। কিন্তু জানেন, আমার কেন জানি সেদিন ভীষণ কান্না পেল; মনে হলো, এই শিশুটিকে আমরাই সমস্ত উপাদান দিয়ে শিখিয়েছি নারীকে কীভাবে অসম্মান করতে হয়!

আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, আমাদের বিনোদন মাধ্যম সবকিছুতেই আমরা কমবেশি সেই ভয়ংকর উপাদান দিয়ে দিচ্ছি, যা একটা ছেলে সন্তানকে ধীরে ধীরে ধর্ষকামী মস্তিষ্ক তৈরি করে দিচ্ছে। তা সে ধর্ষণ ততোটা হোক আর না হোক।

শুধু এখানেই শেষ নয় বহুকাল থেকে চলে আসা, গড়ে উঠা সেই ধর্ষকামী সমাজকে মানুষ করবার কোনো পদক্ষেপ না নিয়েই আমরা উন্মুক্ত করেছি অবাধ পর্নোগ্রাফি!

আমি আমার চাকরির সুবাদে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে ছুটে বেড়াবার সুযোগ পাওয়াতে জানি যে গ্রামগুলোর অবস্থা কীরকম! তদুপরি একটা ছোট্ট গবেষণা কাজের জন্য কুড়িগ্রামের চর এলাকার কিছু কাজীর সাথে সাক্ষাতকার নেয়ার পর পেয়েছিলাম আরও কিছু ভয়ানক চিত্র।
সেই সাক্ষাতকারের উপর ভিত্তি করে আমি যদি বলি, যে, কিশোর-কিশোরীদের উৎসুক মনকে সঠিক পথে চালিত করবার কোনো পদক্ষেপ, সুস্থ বিনোদনের কোন ন্যুনতম কার্যক্রম গ্রামগুলোতে নেই, অথচ করপোরেটের এই যুগে তাদের হাতে তুলে দিয়েছি এন্ড্রোয়েড ফোন আর অবাধ পর্নোগ্রাফি, তাহলে কি ভুল বলা হবে? আমাদের দুর্ভাগ্য, আমাদের রাষ্ট্র কখনই জনকল্যাণে দক্ষ রাষ্ট্র হয়ে উঠতে চায় না!

আমাদের সামাজিক সংস্কৃতি, আর রাষ্ট্রের দুর্বল ভূমিকার পাশাপাশি ধর্ম আর একটি বিরাট ভূমিকা পালন করে নারীবিদ্বেষী এই সামাজিকীকরণকে টিকিয়ে রাখতে। আমি বাংলাদেশের কোন কোন চর এলাকায় দেখেছি, যেখানে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রায় নিভু নিভু করছে, সেখানে দশ-বারোটি মাদ্রাসা চলছে।
তো, এখন যদি প্রশ্ন করি, এই মাদ্রাসা থেকে তৈরি হওয়া মানুষের প্রতিদিনের ওয়াজ মাহফিলে ভেসে যাওয়া বাংলাদেশে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ কমে যাওয়ার কারণে প্রায় ৯০% মুসলিমের দেশ বাংলাদেশে অথবা হিজাবে হিজাবে ভেসে যাওয়া বাংলাদেশে ধর্ষণ বাড়লো কেন? উত্তর কী হবে?

এর উত্তর একটাই, এই পুরো সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় নারীকে মানুষ হিসাবে সম্মান করার কথা কোথাও শেখানো হয় না।

এখনও কি কেউ কেউ নারীর পোশাকেই ধর্ষণ বন্ধের উপায় খুঁজে বেড়াবেন? নাকি এবার অন্ততঃপক্ষে বুঝবেন যে, ধর্ষণ করার মানসিকতাই ধর্ষণের জন্য দায়ী! আর এই মানসিকতা সমাজেই তৈরি হয়।

আবার আমাদের এই সমাজেই এমন অসংখ্য মানুষ তৈরি হচ্ছে যার মানসিকতায় ধর্ষণ নেই। এবং এর জন্য নারীর পোশাক, নারীর স্বাধীনতা, নারীর চলাচলের কোন শর্ত তাদের দরকার নেই।

শেষে একটি কথা বলবো যে, আমরা যারা (বিশেষ করে নারীরা) এই ঘুণে ধরা সমাজ, সংস্কৃতি, সামাজিকীকরণ, ধর্মান্ধতা এইসবের বিরুদ্ধে কথা বলি, লেখি, তখন এক দল মানুষ আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সমাজবিষয়ক কোন বিষয়ে দ্বিমত থাকতেই পারে, কিন্তু তাদের ব্যবহৃত ভাষা আমাদেরকে অন্য বার্তা দেয়।

এরা কারা? এরা কার পক্ষে কাজ করে? এরাও কি মুখোশের আড়ালে ধর্ষণকেই টিকিয়ে রাখতে চায়?

শেয়ার করুন:
  • 148
  •  
  •  
  •  
  •  
    148
    Shares

লেখাটি ৫১৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.