ধর্ষণের প্রতিবাদের ভাষা যেন ধর্ষককে প্রশ্রয় না দেয়

0

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

ঢাকার ওয়ারীতে শিশু সায়মার হত্যাকারী হারুন গ্রেফতার হয়েছে। হত্যার আগে সাত বছরের বাচ্চাটিকে ধর্ষণ করে ধর্ষক ও খুনি হারুন। লোমহর্ষক এ হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা পড়ে কোনো মানুষ সুস্থ থাকতে পারে না।

একের পর এক শিশু নিপীড়ন আর ধর্ষণের খবরে আমাদের জন্য সময়টা যতোটা বেদনার, যতোটা ক্ষোভের ততোটাই উদ্বেগের, আতংকের।

নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ।
প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে নানাভাবে যে যার ক্ষোভ আর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছি আমরা। সেই সাথে উদ্ভট, কাণ্ডজ্ঞানহীন কিছু মন্তব্য গত কয়েকদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরতে দেখছি।

যারা লিখছেন, জানি কেউ ধর্ষকের পক্ষে না, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, হত্যার এক ভয়াবহ চিত্র আমাদেরকে আতংকিত করে তুলেছে বলেই ধর্ষক, অপরাধীর বিচারের দাবিতে প্রতিবাদে ভেতরটা ফুঁসছে বলেই দিশেহারা হয়ে এসব মন্তব্য লিখছেন। তবু বলবো, যা খুশি তাই লিখতে পারছি বলে আমরা যেন ধর্ষণ, হত্যার মতো অপরাধ নিয়ে এভাবে “যা খুশি তাই” লিখে নিজের অসংবেদনশীলতা প্রকাশ না করি।

” আমার মেয়েকে ধর্ষণ করলে করেন দয়া করে হত্যা করবেন না ”

ধর্ষণের ভয়াবহতার কথা একবার গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝবেন এ অপরাধকে নৃশংসতায়, বর্বরতায় ‘হত্যার চেয়ে শ্রেয়’ ভাবার কোনো কারণ নেই। ধর্ষকের হাতে অপশন তুলে দিয়ে দয়া করে আর পরোক্ষভাবে তাকে আশকারা দেবেন না।

“কন্যা সন্তানদের আত্মহত্যার সময় এসে গেছে”

কোন দুঃখে আত্মহত্যা করবে আমাদের কন্যারা?
কন্যা সন্তানে ভরে যাক পৃথিবীটা। বরং ধর্ষকের ধ্বংস কামনা করুন। ধর্ষকপুত্রের মৃত্যুদণ্ড চেয়ে রাস্তায় নামুক তাদের মায়েরা।

“এখন মনে হচ্ছে আমি সৌভাগ্যবান যে আমার কোনো কন্যা সন্তান নেই।”

এমন স্বার্থপর মন্তব্য করতে লজ্জা পাওয়া উচিৎ।
বোধবুদ্ধি বিবেক কতোটা লোপ পেলে মানুষ এ কথা বলতে পারে! বোধবুদ্ধি হারিয়েছেন বলেই আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন যে, আপনার পুত্র সন্তানও যৌন নিপীড়নের শিকার হতে পারে। কন্যা সন্তান নেই বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস না ফেলে বরং খেয়াল রাখুন আপনার বংশের প্রদীপ, সৌভাগ্যের চাবিকাঠি পুত্রসন্তান যেন যৌন নিপীড়নের শিকার না হয়। সেইসাথে তাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও আপনার দায়িত্ব যেন সে ভবিষ্যৎ ইভ টিজার, পেডোফাইল, নির্যাতক বা ধর্ষক না হয়ে ওঠে।

“দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে যৌনপল্লী নির্মাণ ধর্ষণ কমাতে পারে”

“এতোই যদি খায়েশ, টাকা দিয়ে যৌনপল্লীতে যান, বাচ্চাগুলোকে রেহাই দিন।”

ঈশপের একটি গল্প মনে পড়ে যাচ্ছে। মিলিয়ে নেবেন।
এক শিকারীর ফাঁদে একটি পাখি ধরা পড়লো।
পাখিটি বাঁচার জন্য অনেক অনুনয় করতে লাগলো এবং বললো যে, ‘দয়া করে আমাকে যদি ছেড়ে দেন, তাহলে আমি আমার সঙ্গী-সাথী আরো অনেক পাখিকে আপনার ফাঁদে এনে হাজির করবো।’
সব শুনে শিকারী বললো, যে নিজে বিপদমুক্ত হতে অপরকে বিপদে ফেলতে পিছপা হয় না, তার মতো স্বার্থপরের মুক্তি না পাওয়াই উচিৎ।

কোন যুক্তিতে ধর্ষকের খায়েশ মেটাতে আপনি পথ বাতলে দিচ্ছেন ভেবে পাই না। আর কত বিনোদনের ব্যবস্থা করলে বেজন্মা ধর্ষকগুলো তুষ্ট থাকবে বলে আপনার মনে হয়? কয়জন মেয়ে সেধে সেধে যৌনকর্মী হয় বলে আপনার ধারণা?
আপনার হয়তো মনেই নেই যে, ভাগ্যের ফেরে যারা আজ যৌনকর্মী, তারাও কারো না কারো আদরের সন্তান। বিনোদন দিয়ে সমাজে ধর্ষক পোষার কুচিন্তা বাদ দিন।

“আংকেল, প্লিজ ডোন্ট রেইপ মি”

ছোট্ট শিশুর হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন প্রতিবাদের এই প্ল্যাকার্ড! আমি এই প্রতিবাদেরই প্রতিবাদ জানাই।
ধর্ষককে আংকেল ডেকে অনুরোধ করে ধর্ষণ প্রতিরোধ! তাই দেখে আবেগে ভেসেও যেতে হবে! নিকুচি করুন আবেগ- অনুনয়ের। ধর্ষকের জন্য কোনো সম্মান বা সম্বোধন বরাদ্দ না রেখেই ধিক্কার জানান।

কিছুক্ষণ আগে খবরে পড়লাম, শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় ধর্ষণ মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামি পৌর মেয়রের ছেলে মাসুদ ব্যাপারি গ্রেফতারের এক সপ্তাহের মধ্যে জামিনে মুক্ত। ধর্ষণের শিকার মেয়েটি ও তার পরিবার আতংকিত সময় পার করছে।

বলছিলাম সময়টা আতংকের, উদ্বেগের। তাই সময়টা ভীষণভাবে একজোট হবার।
আইন ও রাষ্ট্র, কান খুলে শোনো আমাদের আর্তনাদ, আমাদের চিৎকার –
ধর্ষকের এমন বিচার দাবি করছি যেন আর কোনো ধর্ষক আমাদের সন্তানদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর মতো স্পর্ধা দেখাতে না পারে। আতংকে দিন পার করুক ধর্ষক, আমাদের সন্তানরা নয়।

শেয়ার করুন:
  • 249
  •  
  •  
  •  
  •  
    249
    Shares

লেখাটি ২৯৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.