কন্যাটির জীবন দুর্বিষহ করার জন্য আপনি নিজেই দায়ী না তো!

0

লতিফা আকতার:

আমার পরিচিত দুইজন ব্যক্তি তাদের জীবন নিয়ে চমৎকার দুইটা কথা বলেছেন। একজন নিজের লালন পালন সম্পর্কে বলেছে- আমাদের বাবা-মা এমনভাবে বড় করেছে যাতে এক পোটলা থেকে নিরাপদে আরেক পোটলায় (শ্বশুরবাড়ি) পৌঁছে দিতে পারে।

আর একজনের উপলব্ধি হলো, বাবা-মা তাদের পড়াশোনা করিয়েছে বিয়ের জন্য, যেন একটা ভালো পাত্র পাওয়া যায়। মানে বিয়েটা জানি ভালো হয়। এই দুজন আমার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ নারী। এবং তাঁরা একটা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে নিজের জীবনের উদাহরণ টেনে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছে।

এই ব্যাখ্যা আশি-নব্বইয়ের দশকের আমাদের মতো অনেক মেয়েদের জীবনের বাস্তবতা। কন্যাদের জীবনে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তখন নানান ক্যাম্পেইন চালু হয়। প্রচার প্রচারণাটা একেকজন একেকভাবে নিলেও সত্যি কথা বলতে কী, তখন থেকেই নারী শিক্ষার হার বাড়তে শুরু করে। মেয়েদের স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য না হলেও, নিদেনপক্ষে শিক্ষিত করার জন্য বাবা-মা সচেতন হয়ে ওঠে। ভালো একটি পাত্র পাওয়ার আশায়, ভালো থাকবে এই আশায়।

লতিফা আকতার

কিন্তু কন্যাশিশুর আর বাকি সব বিষয় নিয়ে বাবা মায়ের সচেতনতা সেই একই জায়গায় স্থির থাকে। সেই স্থিরতা কন্যা শিশুর মানসিক বিকাশ হতে শুরু করে, পারিবারিক জীবন যাপনের সবকিছুতে পরিলক্ষিত হয়। শৈশব হতে কৈশোরে উত্তীর্ণ হওয়ার ক্রান্তিকালে মেয়েটির নিজেকে ঢেকে রাখার নানান প্রক্রিয়া শেখাতে ব্যস্ত থাকে একজন মা। কিন্তু সে ব্যস্ততার কিঞ্চিতও শিশুটিকে মনের দিক দিয়ে শক্ত হয়ে ওঠার জন্য দেখানো হয় না। তাকে অনাকাঙিক্ষত স্পর্শগুলো সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি-ব্যক্তি, সে যেই হোক না কেন তার বিপক্ষে আওয়াজ তুলতে এই শিক্ষা দেওয়া জরুরি থাকলেও আদতে তা হয় না। বরং আপনার সামাজিক সম্পর্ক ঠিকঠাক রাখতে মেয়েটিকে চুপ করিয়ে দেন। একজন মা হিসেবে যা করা একদমই ঠিক না।

এই চুপ করিয়ে দেওয়া চলতে থাকে মেয়েটির নারী জীবনেও। নতুন পরিবেশে একটা অচেনা পরিবারে নিগৃহীত হচ্ছে একথা শুনতে প্রস্তুত থাকে না মেয়েটির পরিবার। মানিয়ে চলতে হয়, স্বামী ভরণপোষণ দেয় বলে দুই একবার গায়ে হাত তুলতেই পারে। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে এবং পিতৃগৃহের তথাকথিত ‘ইজ্জত’ বা ‘সম্মান’ রক্ষার জন্য বহু নারীর এই এক জীবন- শুধুই অপচয়ের খাতায় উঠে যায়। আর এটা হয় শুধুমাত্র নিজ পরিবারের (?) অসহযোগিতার কারণে।

অথচ পুত্র সন্তান পালনে আপনার বিপরীত চরিত্রের দেখা মেলে। কেননা আপনি/ আপনারা লিঙ্গবাদী। এটা আপনার ছবির এলবামের দিকে তাকালে পরিস্কার হয়ে যাবে। খালি গায়ে, উলঙ্গ ছেলে বাচ্চার ছবি আপনাকে গর্বিত করে। এই গর্বে অন্ধ আপনার চোখ এড়িয়ে অনেক কিছু ঘটে যায়। বড় হতে হতে তার দ্বারা করা অনেক অপকর্ম আপনার চোখে পড়ে না। বাড়ির কাজের মেয়ে দুই একবার বলতে চাইলে সেই এক শব্দ-” চুপ।”
চারদিকের হাজারও নালিশ এলেও তা আপনার বোধগম্য হয় না। কেননা আপনার নিজের চোখে তখন ভবিষ্যত নিরাপদ জীবন আর সেইসাথে সুসজ্জিত খাট, তার কাঁধে দেখতে পান। যদিও সেই খাটে আপনি নিথর, গন্তব্য অজানা। অজানা গন্তব্যে পৌঁছাতে আপনি চেনাজানা জগতের যা অবহেলা করেন, তার প্রভাবেই গড়ে ওঠে এই সমাজ। এভাবে এড়িয়ে গিয়ে আপনি সমাজের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করেন। আপনার, আমার অবহেলায় গড়ে ওঠে এক জটিল সমাজ। যা আপনার মেয়েটিকে দাসী আর ছেলেটিকে এক কর্তৃত্ববান পুরুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। মানুষ হতে নয়।

আপনার/আমার লালন পালনের ব্যর্থতাই একদিন সমাজের গায়ে ঘা হয়ে দেখা দেয়। চেতন- অবচেতনভাবে আমরাই এক ধরনের পরিবেশের সৃষ্টি করি, যা পরবর্তীতে আমাদেরই কন্যার জীবনে প্রভাব ফেলে। আমরা পুত্র এবং কন্যা লালনে মানসিক বৈষম্য এখনো ধারণ করি। আমরা সামাজিক সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে অনেক অস্বাভাবিকতা মানিয়ে নিতে কন্যাটিকে বাধ্য করি।

যতোটা সময় কন্যার ওড়না নিয়ে টানাটানি করছেন, সেই সময়টা মেয়ের মানসিক শক্তি বাড়ানোতে ব্যয় করা সমুচিত। নোংরা স্পর্শ, সে যতো কাছের লোকেরই হোক না কেন, চিৎকার দিয়ে জানান দিতে হবে।
স্বামী গায়ে হাত তুললে তাকেও দুই চারটা দিয়ে চলে আসার পরও তার জন্য পিতার ঘরের দরজা খোলাই থাকবে।

শুধু ভালো পাত্র নয়, স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য পড়াশোনা করানো হচ্ছে এটা বুঝিয়ে দিতে হবে। মেয়েকে পাহারা দেওয়ার জন্য পুত্রটিকে ব্যবহার করবেন না। তাকে বরং বোনের গাইড, মনোবল বাড়ানোর শিক্ষা দিন। মেয়েদের সম্মান দিতে শেখান। হোক না সে কাজের মেয়ে বা বোন। ঘর দিয়েই শুরু হোক তার যাত্রা।

আর ব্যস্ততার যুগে ঘরে বাইরে কাজ করা এই যুগে নতুন করে ভাবার আছে। সচেতনতা বেড়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে নিজেদের ব্যস্ততায় আমরা হয়তো শিশুটিকে সময় দিতে ভুলে যাচ্ছি। তার সমস্যা মন দিয়ে শোনার ক্ষেত্রে অবহেলা করছি। খাওয়া থেকে শুরু করে মানসিক সবকিছুতে আমরা বাইরের উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি না তো!!

ফাসর্ট ফুড, ডিভাইস, রাউটার সব মিলিয়ে কাটানো এই জীবনে- মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের সন্তানদের জীবনের বিপর্যয়ের জন্য কোনো না কোনোভাবে আমরাই দায়ী নই তো?? কেননা ধর্ষক এবং ধর্ষণের শিকার উভয়ই কারো না কারো, তথা এ সমাজের সন্তান। আর কন্যা সন্তান লালনে আমাদের মনের ভিন্নতা কোনো না কোনোভাবে তাদের জীবনে নেতিবাচক হয়ে আসে। তাদের জীবন হয়ে ওঠে এক দুর্বিষহ অধ্যায়ের নাম।

শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares

লেখাটি ৩,৫১৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.