ধর্ষক একদিনে হয় না, আপনারাই ওদের তৈরি করছেন

0

নাঈমাহ তানজিম:

একটা জিনিস বুঝলাম না। ‘ধর্ষণ’ বন্ধ করতে সবকিছু করা যাবে। মানে, কন্যাশিশুদের আগলে রাখতে হবে, নিজের সন্তানকে মাদ্রাসায় দেওয়ার আগে দশবার ভাবতে হবে, নিজের আপন ভাইয়ের কাছেও বাচ্চাকে একলা রাখা যাবে না, ১০০ হাত দূরে দূরে ব্রথেল খুলতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু ধর্ষণ যে করে, সেই ‘ধর্ষক’ উৎপাদন বন্ধ করতে কিচ্ছু থেকে কিচ্ছু করার নাই কেন?

ধর্ষক সাইফুল তো এখনও বেঁচে আছে, এবং জেলেই আছে। ওর উপরে রিসার্চ হয়েছে? ও কোন পরিবেশে বড় হয়েছে? কীভাবে করে তার এই ধর্ষকামী স্বভাব গড়ে উঠলো? সে কি বরাবরই শিশুকামী ছিলো? নাকি সেই মুহূর্তের পরিস্থিতির সুযোগে নিজের নিষ্ঠুরতার ১০০% দেখিয়ে দিয়েছে?

প্রথমদিনেই কেউ সাড়ে তিন বছরের বাচ্চাকে রেপ করে, তার যৌনাঙ্গে ব্লেড চালানোর মতন দুঃসাহস বা হিংস্রতা রাখে না।

শুরুটা হয় আপাতদৃষ্টিতে ‘নিরীহ’ ইভটিজিং দিয়ে, নারী জাতিকে অসম্মানসূচক গালি দিয়ে, অথবা কোনও একটা অ্যাবিউজিং সম্পর্ক দিয়ে।

এই জাতীয় ‘ছোট্ট’ ঘটনা যখন ঘটে, তখন আপনি, আমি, তৃতীয় ব্যক্তি এবং রাষ্ট্র কে, কী ভূমিকা নেন?

সাথে সাথে চিহ্নিত করতে পারেন? এবং সেটার বিরোধিতা করতে পারেন? নাকি, ‘ছেলেরা এরকম একটু করেই’ বলে হেসে উড়িয়ে দেন?

আপনি মেয়ে বাচ্চার জন্য হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল কিনেন, আর ছেলে বাচ্চাকে দেন বন্দুক, যুদ্ধবিমান। মেয়ে বাচ্চাকে পারলে দু্ইটা পাখা লাগিয়ে একদম পরী বানিয়ে চুপটি করে বসায়ে রাখেন। আর ছেলে বাচ্চাকে ব্যাট-বল কিনে দেন, সে দুষ্টামী করলে সেইটা নিয়ে আদিখ্যেতা/ন্যাকামি করেন, খামোখাই বেয়াদবি করলে, ‘একদম ব্যাটা মানুষের মতন শক্ত হচ্ছে’ ভেবে মনে মনে খুশি হোন।

কলেজ পাশ করার পর আপনার পুত্রধন রাত ১১টা পর্যন্ত বাইরে আড্ডা দিলেও আপনি গা করেন না। কিন্তু আপনার ইউনিভার্সিটি পাশ করা কন্যাসন্তান রাত ১০টার পর বাসায় না ফিরলে আপনি ১০০ বার ফোন দেন।

একটা ছেলেকে আপনি প্রকাশ্যে প্যান্টের চেইন খুলে, রাস্তায় হিসু করতে দেখেও ততটা আঁৎকে উঠেন না, একটা মেয়েকে জিনস আর কোমরের উপরে টপস পরতে দেখলে যতটা বাঁকা চোখেঁ তাকান।

মনে হচ্ছে না এগুলোতে কি আসে যায়? এরকমই তো হচ্ছে, হয়ে আসছে, অথবা হওয়া উচিৎ?

অথবা, এগুলো তো খুব ছোটখাটো বিষয়, এগুলোকে এতো গুরুত্ব দেওয়ার কী আছে?

গুরুত্ব দেওয়ার আছে, এগুলো কিছু ‘সাইলেন্ট সোশ্যাল মেসেজ’ দেয়। যেগুলো ছেলে এবং মেয়ে, নর ও নারী, মহিলা ও পুরুষ এই দুইটা আলাদা শ্রেণী বানায়।

এই দুইটা শ্রেণীর একটাকে দেয় প্রভুত্ব, আরেকটাকে দেয় দাসত্ব। একটাকে বানায় শক্তিশালী, আরেকটাকে বানায় ‘নাজুক’, ‘কোমল’, ‘অবলা’।

অতএব এখন থেকেই ‘ধর্ষক উৎপাদন প্রক্রিয়ায়’ নিজের অংশগ্রহণ করা বন্ধ করেন।

আপনি নারী হোন, অথবা পুরুষ হোন, আপনার কোন বন্ধু যদি খুব পৌরুষ দেখিয়ে বলতে আসে, সে ছোটবেলায় কয়জনের গায়ে হাত দিয়েছে, অথবা এখন কয়টা মেয়ে নিয়ে ঘুরে, তাকে ‘চটাশ’ করে থাপ্পড় মারতে না পারলেও, কঠিন একটা জবাব দেন, এবং তার কাজটা যে ভুল, সেটা বোঝানোর জন্য তাকে সরাসরি বয়কট করুন।

আপনার পরিচিত কেউ তিন বছরের কন্যাশিশুকে বোরখা-হিজাব পরিয়ে ছবি আপলোড করলে তাকে একটা রামধমক দেন। তিন বছরের বাচ্চার ঋতুস্রাব অথবা বীর্যপাত কোনটাই হয় না। অর্থাৎ সে এখনও শারীরিকভাবেই নারী বা পুরুষ কোনটাই হয়ে উঠে নাই, মানসিকভাবে তো অনেক পরের কথা। তাকে হিজাব পরিয়ে, নিজের বাচ্চাকে নিজেই, ‘জোর করে নারী’ বানায়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রকাশ করার কী দরকার, একটু জিজ্ঞেস করেন।

ধর্ষক কেউ এমনি, আঁৎকা একদিনে হয় না, ধীরে ধীরে হয়। ধর্ষক বানানোর প্রক্রিয়া কয়েক হাজার বছর ধরে, খুব সুন্দর করে, গোটা পৃথিবী জুড়েই চলছে। আর আপনি আমি, গাধার মতন না বুঝেই সেইসব প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছি, ধর্ষক বানিয়েছিও।

গত কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসের সবগুলো গালি শুধুই নারীকেন্দ্রিক কেন?

‘বেশ্যা’র কোনও পুরুষবাচক শব্দ নেই কেন? খা*কির পুংলিঙ্গ কী হবে?

এইসব প্রশ্ন করেছেন কখনও?

শেয়ার করুন:
  • 44.8K
  •  
  •  
  •  
  •  
    44.8K
    Shares

লেখাটি ৬৯,১১৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.