মাদ্রাসা বন্ধ করলেই ধর্ষণ কমে যাবে?

0

সালমা লুনা:

কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জের একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষক আরিফ ২০ জন ছাত্রী এবং এক মাকে ধর্ষণ করলে পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মাধ্যমে ঘটনা জানাজানি হলে উক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়।

এর পরপরই জানা গেলো নারায়ণগঞ্জের এক ক্যাডেট মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা এবং অধ্যক্ষ আল আমিন দেড় বছর ধরে বারোজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করেছেন।আগের খবরটি আলোড়ন তুলেছিলো বলেই ওই ক্যাডেট মাদ্রাসার তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী তার মাকে প্রশ্ন করেছিলো, ‘ওই শিক্ষককে পুলিশ ধরলে আমাদের শিক্ষককে পুলিশ ধরছে না কেন?’
অতঃপর মা মেয়ের কাছ থেকে সব ঘটনা জেনে পুলিশের কাছে গেলে একইভাবে মোবাইল চেক করে ঘটনার সত্যতা পেয়ে এই মাদ্রাসা শিক্ষক আল আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এদিকে আজকের খবর হলো, নেত্রকোনার এক কওমি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা এবং অধ্যক্ষ আবুল খায়ের বেলালী পাঁচ থেকে এগারো বছর বয়সী ছয়জন শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করেছে দীর্ঘদিন ধরে। সে নাকি যৌন নিপীড়ন শেষে ওই শিশুদের কোরআন ছুঁইয়ে শপথ করাতো যেন কাউকে এই ঘটনা না বলে।

কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। এখানেও প্রথম শ্রেণীর এক ছাত্রী তার বড় বোনকে ঘটনা জানালে এটিও জানাজানি হয়ে সে ধরা পড়ে। সে আবার স্থানীয় মসজিদের ঈমাম। তার খুতবা শোনার জন্য নাকি শুক্রবারে মসজিদে ভীড় হয়ে যায়!

মাদ্রাসার শিক্ষকদের ধর্ষণের এই ঘটনাগুলো জেনে বাংলাদেশের জনসাধারণের সরব প্রতিক্রিয়া হলো, মাদ্রাসাগুলো সব অপরাধের আস্তানা, জঙ্গি তৈরির কারখানা এবং যৌন নিপীড়ক শিক্ষকে ভরা। এছাড়াও মাদ্রাসা শিক্ষা অপ্রয়োজনীয় ও মূলধারার শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যহীন, তাই সব মাদ্রাসা বন্ধ করে দিতে হবে।

অতই সোজা?
যে শিক্ষাব্যবস্থা এই উপমহাদেশে চালু হয়েছিলো আজ থেকে সাড়ে সাতশো বছর আগে, সেই শিক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়া যাবে স্রেফ ফেসবুকে দুআঙ্গুলে টিপে ?
যারা মাদ্রাসা বন্ধ করতে চান তাদের মাদ্রাসা শিক্ষার সূত্রপাত কেন, কোন প্রেক্ষাপটে কী করে হয়েছিলো এসবের পাশাপাশি কিছু জরুরি জিনিস সম্পর্কে জানতে হবে।
এই যেমন আলিয়া মাদ্রাসা কী, সেখানে কী শেখানো হচ্ছে, দেওবন্দী বা কওমী মাদ্রাসার জন্ম কী করে হলো, এরাই বা কীভাবে চলে। স্বতন্ত্র মাদ্রাসা কীভাবে আসলো, মসজিদগুলোতে যে মাদ্রাসা আছে, তারা মাদ্রাসা শিক্ষা পদ্ধতির কোন অংশ, ফোরকানিয়া আর হাফেজিয়া মাদ্রাসায় কারা পড়ায়। সেখানে পড়লে কী ফায়দা, তাদের কার কী শিক্ষা পদ্ধতি, কী-ইবা কারিকুলাম এসব ছাড়াও কোন ধরনের মাদ্রাসায় পড়লে সরাসরি মূলধারার শিক্ষা পদ্ধতিতে যোগ দেয়া যায়। কোন মাদ্রাসা এসবের বাইরে থেকেও সরকারি চাকুরি বা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দাবি করছে, এমনকি আশ্বাসও পাচ্ছে এসব জেনে তারপর মাদ্রাসা তুলে দিতে বললেই তুলে দেয়া যাবে কীনা সে বিবেচনা করা ভালো।

আর মাদ্রাসার শিক্ষকরা অবাধ যৌনাচারে লিপ্ত, এই কথা দিয়ে সারাদেশের বাংলা মিডিয়াম ইংলিশ মিডিয়াম এর স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তদ্বীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীদের যৌন হয়রানির দায় থেকে মুক্তি দেয়া অসম্ভব। তারা মূলধারার শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও যৌন নিপীড়নের ক্ষেত্রে এইসব মাদ্রাসা শিক্ষকের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।

তখন তো দাবি উঠে না এগুলো বন্ধ করে দিতে হবে! কেউ তো তখন বলে না অভিভাবকরা কেন এইসব প্রতিষ্ঠানে সন্তানদের পাঠায়!

ভিকারুন্নিসার পরিমল ধরা পড়লে দাবি উঠেনি ভিকারুন্নেসা বন্ধ করে দেয়া হোক বা বাংলা শিক্ষাতেই গলদ। তেমনি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষক বিশজন ছাত্রীর ধর্ষক তাই ইংলিশ মিডিয়ামেই সমস্যা, ওগুলো বন্ধ হোক। জাহাঙ্গীরনগরে যখন সেঞ্চুরিয়ান ধর্ষকের খোঁজ মিলেছিলো বা শিক্ষকদের কারো কারো বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ শোনা গিয়েছিলো, তখনো কেউ বলেনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন অভিভাবকরা সন্তানদের পড়তে পাঠায়! বা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হোক।

নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন ছাত্র জঙ্গি হয়েছে অথবা শিক্ষকদের কেউ কেউ যৌননিপীড়ক, তাই বন্ধ হোক ওই বিশ্ববিদ্যলয়টিও- এটি কেউ বললে লোকে অট্টহাসি হাসবে। অথচ এদেরও শত শত বছর আগে এই মাদ্রাসা শিক্ষা এদেশে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষা হচ্ছে এই উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন শিক্ষা। তখন অনেকেই ভারি উত্তেজিত হয়ে যান। কিন্তু কথটি সম্পূর্ণ সত্য।
টিটকারি দিলেও একটি সত্যি কথা কেউ বলে না, আর তা হলো এই প্রাচীনতম শিক্ষা পদ্ধতিটি প্রয়োজনে সংশোধন করতে হবে। কিছু জিনিস সময়ের সাথে সংযোজন বা বিয়োজন করার দরকার হলে করতে হবে।

কেউ বলছে না মাদ্রাসা ধর্ষণমুক্ত করতে মাদ্রাসা বন্ধ না, ধর্ষক মুক্ত সমাজ চাই আমরা। আমরা চাই রাষ্ট্র এমন আইন, এমন বিচার ব্যবস্থা রাখুক যাতে একটি পুরুষও ধর্ষক হয়ে উঠতে ভয় পায়। যদি একটি ধর্ষণও ঘটে তবে এমন বিচার হোক যেখানে কোন দীর্ঘসূত্রিতা না থাকে। ধর্ষণের মহামারীর এই জঘন্য সময়ে আমাদের যেন বেগতিক দেখে ধর্ষকের ক্রসফায়ার চাইতে না হয়।

এতকিছুর মধ্যেও আশা, চারিদিকের ভীষণ অন্ধকারে একটি আলোর রোশনি দেখা যাচ্ছে। সেটি হচ্ছে ওই সাত থেকে এগারো বছর বয়সী মেয়েগুলি, যাদের জন্য এই শিক্ষক নামের কলঙ্ক ওই তিন ধর্ষক ধরা পড়লো।

আমাদের এখন ওই তিনজনের মতো কন্যাদের সংখ্যা বাড়াতে হবে। আমাদের কন্যাদের শিক্ষিত করতে হবে কখন কোথায় প্রতিবাদ করতে হবে, যৌন নিপীড়ককে কীভাবে চেনা যাবে, চিনলেই বা কী করতে হবে। তাদের ভয়ে মুখ বন্ধ রাখার বদলে কীভাবে এদের মুখোশ খুলে দিতে হবে এসবই শেখাতে হবে।
ধর্ষকবান্ধব এই দেশে ধর্ষকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তো সর্বত্র সারাজীবন ধরেই করতে হবে ওদের। হোক স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা হোক না নিজের ঘর।

নিজের চেনা গণ্ডিতেও তো তারা আর নিরাপদ না।

গতকাল সন্ধ্যায় ওয়ারিতে সাত বছরের একটি কন্যাশিশুর ধর্ষিত মৃতদেহ পাওয়া গেছে। ছয়তলার নিজ বাসায় মা-বাবা সন্তানের অপেক্ষায় ছিলো, কারণ বাচ্চাটি ‘একটু আসছি’ বলে ওই ভবনের আরেকটি মেয়ের বাসায় গিয়েছিলো। তাকে একই বাসার নয়তলায় কেউ ধর্ষণ করে মেরে ফেলে রেখে নিরাপদে চলে গেছে।
তাই আমাদের কন্যাদের শেখানোর পাশাপাশি আমাদেরও অভিভাবক হিসেবে সচেতন হতে হবে। আরো অনেক বেশি সচেতন।

আরেকটা ঘটনা বলে যাই।

আমাদের পাশের দেশ মিয়ানমারে তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ জানাতে প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নেমে এসেছে। তারা তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশ্বাস করে না, বিচারে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে বলে প্রকাশ্যে এই বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। তারা মনে করে একটি সভ্য দেশে তিন বছর বয়সী শিশু ধর্ষণ চলতে পারে না। এটি অসম্ভব ঘটনা। এর জোর প্রতিবাদ করতেই তারা রাস্তায় নেমেছে। আমাদের দেশে তিন মাসের শিশু থেকে শুরু করে ষাট বছর বয়সের নারীদের এতো এতো ধর্ষণ ঘটনা নিয়ে আমরা কী ভাবছি ?

#মাদ্রাসা_বন্ধ_করলেই_ধর্ষণ_কমে_যাবে ??

শেয়ার করুন:
  • 3.4K
  •  
  •  
  •  
  •  
    3.4K
    Shares

লেখাটি ৪,৩৯১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.