‘শুভ বিবাহ’

0

দিলু দিলারা:

আমি শলার ঝাড়ুটা হাতে নিয়ে বিছানা ঝাড়ু দিতে দিতেই দেখলাম আমাদের একমাত্র মেয়ে অন্তরা ওর বাবার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়েই পাশের চেয়ারে ধপ করে বসে পড়লো। খেয়াল করলাম ওর বাবা ভাঁজ করা কাগজটা খুলে চোখের সামনে ধরলো, আর কিছুক্ষণ পরই তার কপাল কুঁচকে দুই ভ্রু একসাথে জোড়া লেগে গেল।

কাহিনী কী বোঝার জন্যে আমি ঝাড়ু হাতে নিয়েই এগিয়ে গেলাম, আর ওর শান্তশিষ্ট বাবা আমার দিকে কাগজটা এগিয়ে দিল। আমি খেয়াল করলাম, এই কাগজ পড়তে গিয়ে আমার নিজেরও কপাল কুঁচকে যাচ্ছে।

কাগজে লেখা না বলে একে আসলে লিস্ট বললেই যথার্থ হবে-

আমি দেখলাম এই লিস্টে লেখা আছে:

নাম্বার ওয়ান

এংগেজমেন্ট অনুষ্ঠান: বরের জন্যে হিরার আংটি

মেনু, কাচ্চি বিরিয়ানি, বোরহানি। মেহমান ২৫ জন (এরা আমার বন্ধু) তোমাদের মেহমানদের হিসাব আলাদা

ড্রেস গারারা

স্থান ড্রয়িং রুম এবং বাসার ছাদ

নাম্বার দুই

মেহেন্দি সন্ধ্যা ## পার্লার থেকে বাসায় হাতে মেহেন্দি পরাতে আসবে। বান্ধবী সাত জন আসবে, বন্ধুরা আসবে না। কারণ ওরা বলেছে, এটা নারীদের অনুষ্ঠান। মেনু তেহারি করলেই হবে।

স্থান বাসার ছাদ

নাম্বার তিন

হলদি নাইট ## ড্রেস এক প্যাঁচের কাতান শাড়ি। কাঁচা ফুল বাদ, কারণ এতে ফুল ন্যাতা ন্যাতা হয়ে যায়। কাপড় দিয়ে বানানো রঙ্গিন ফুল দিয়ে সাজবো। হলদি নাইট হলেও কোন হলুদ গায়ে দেওয়া হবে না। হলুদের মতো করে বেসন রাখা থাকবে। হলুদ দিলে চেহারা কালো দেখাবে। তাই আগে থেকে বলে রাখা হবে যেন হাতের পিঠে একটু বেশন লাগিয়ে দেয়। হলুদ সন্ধ্যা হবে কমিউনিটি সেন্টারে। সেখানে পালকি থাকবে। আমি পালকি থেকে নামবো। এটা করা হবে বিশেষ করে ফটো সেশন করার জন্যে। রাজকীয় একটা ব্যাপার থাকবে। আর থাকবে ডিজে পার্টি। সবাই নাচবে। আমিও সাথে নাচবো। হলুদের অনুষ্ঠান বর এবং বউ পক্ষ এক সাথে করবে। (ইচ্ছা করলে তোমরা নায়ক সিয়ামের ভিডিওটা দেখতে পারো), ডিজে পার্টিকে পঞ্চাশ হাজার দিলেই চলবে।

নাম্বার চার

বিয়ের দিন আমি লেহেঙ্গা পরবো। নো শাড়ি। শাড়ি আমার কাছে ব্যাক ডেটেড লাগে। গহনা দিতে হবে মিনিমাম ২০ ভরি। আমি এমন পার্লার থেকে মেকাপ করবো, সেখানে সাজলেও বোঝা যাবে না আমি আলগা মেকাপ করেছি, মানে আমাকে মেকাপ করলেও চেনা যাবে। তাই ফি একটু বেশি হলেও মাত্র ১ লাখ টাকা লাগবে। আর ক্যামেরাম্যান এ কয়দিন আমার সাথে সাথে থাকবে। কারণ সারাক্ষণ আমার সবকিছু তারা শুট করবে। বিভিন্ন এক্সপ্রেশন। হাসি কান্না সব। আমি খবর নিয়েছি দুই লাখ হলেই ওরা করে দিবে।

আমি লিস্ট হাতে নিয়ে থ হয়ে বসে থাকি। আমি অনেক রাগী। মনে হচ্ছিল এই বিছানা ঝাড়ু ওর পীঠে ভাঙি। আমার এই মেয়েটা এতো বেয়াদব হলো কবে থেকে! রাগে আমার কান্না চলে আসতে থাকে। ওর বাবার দিকে তাকানো যাচ্ছে না।

নিজেকে কন্ট্রোল করে মাথা ঠাণ্ডা রাখলাম।

নিজেকে স্থির রাখি। শাহানার সাথে এই নিয়ে কথা বলতে হবে। সব করতে হবে বুদ্ধি খাঁটিয়ে।

তোর কি হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেয়েছে অন্তু? আমি চিবিয়ে চিবিয়ে বলি। তোর বাবা এখন অবসরে। কত টাকার ব্যাপার হিসাব করে দেখেছিস? আর এই সব বিজাতীয় কালচার তুই কই থেকে পেলি!

আম্মা, এই সব এখন সবাই করে। না করলেই সবাই ভাববে, আমাদের ক্লাস নেই। আর আমি তোমাদের একটাই মেয়ে, এই সব করতেই হবে। আমার অনেক বন্ধুর এমন হয়েছে। না করলে আমি মুখ দেখাতে পারবো না। বলেই হন হন করে ও ঘরে চলে যায়।

আমার মেয়ে অন্তরার বিয়ের কথা পাকা হয়ে গিয়েছে। আমারই সখি বাল্যবন্ধু শাহানার ছেলে সাজিদের সাথে। আমরা দুই পরিবারেই খুবই সাধারণ থাকতে পছন্দ করি। অন্তরার বাবা গত বছর এলপিআর এ গিয়েছে। আমরা এখনও ঢাকায় ভাড়া বাসায় থাকি। শাহানাদের গোরানে ছোট একটা বাসা আছে। সাজিদ বরাবরই সিম্পল একটা ছেলে। একটা এনজিওতে প্লানিং এক্সিকিউটিভ হিসাবে কাজ করছে। একটাই ছেলে। এটা সমন্ধ করে বিয়ে। শাহানাই একদিন হাসতে হাসতে বললো, ‘আয় আমরা বিয়াইন হই’।

আমি একটু একটু করে টাকা জমিয়ে গাজীপুরের দিকে শ্রীপুরে দুটো মাটির ঘরসহ দেড় বিঘা জায়গা কিনেছিলাম তাও ১৮ বছর আগে। তখন সস্তা ছিল। বিভিন্ন গাছ লাগিয়েছি। মাঝে মাঝে গিয়ে বিশ্রাম নেই খোলা বাতাসে শ্বাস নেই। ওর বাবা অবসরে যাওয়ার পর যে টাকা পেয়েছিলেন, সেখান থেকে কিছু টাকা দিয়ে পাশেই একটা পুকুর কিনেছি। মাছের চাষ করেছি। পাশেই এক মহিলাকে দায়িত্ব দিয়েছি। সেই দেখাশোনা করে রাখে। আমার এই শ্রীপুরের বাড়ির পাশেই শাহানাও আমার দেখাদেখি খানিকটা জমি কিনেছে। ইচ্ছে ছিল মেয়ের বিয়ে দিয়ে ওই বাড়িতে গিয়ে থাকবো। এই মেয়ের জন্যে কি সব আবার বিক্রি করে দিতে হবে নাকি!

আমি জানি অন্তরার এই সব বায়না শাহানা বা সাজিদ কেউ পছন্দ করবে না। দেখলাম ওর বাবা উঠে গিয়ে শুয়ে পড়লো। আমার মাথায় তখন আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে।

বিয়ের সবকিছু রেডি। ৭ই ডিসেম্বর বিয়ে।

অন্তরা তাড়া দিতে থাকে কবে শপিং শুরু করবো, টাইম নেই।

আমি বিয়েতে কার্ড করি না। ফোন করে জানিয়ে দেই আত্মীয় স্বজনকে। আমার কথা শুনে ওনারা অনেক অবাক হন। খুব ই আগ্রহ প্রকাশ করেন বিয়েতে আসার। আমি তাঁদের বলে রাখি যদি না আসেন কনফার্ম করবেন কারন খাবার যেন নষ্ট না হয়।

এই ফাঁকে অন্তরার জন্যে কিছু কেনাকাটা করে ফেলি ও অনেক কিছু কিনতে চাওয়ায় আমি বলি সব শাহানা আর সাজিদ কিনবে তুই চিন্তা করিস না।

বিয়ের দশ দিন আগে আমরা সবাই শ্রীপুরের বাড়িতে চলে আসি, অন্তুকে বলি, চল বেরিয়ে আসি, তোর ভাল লাগবে। এখানে এসে দেখলাম ও প্রতিদিন বেশ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠছে। গাছপালা ছুঁয়ে দেখছে। মোবাইল দূরে সরিয়ে রাখছে। যে মেয়ে সকাল দশটার আগে ঘুম থেকে ওঠে না। সারাক্ষণ হাতে মোবাইল। ভালো লক্ষ্মণ। ভিতরে ভিতরে খুশি হয়ে উঠি। আমি আমার বিয়ের হলুদের এলবাম ইচ্ছে করে ওর সামনে ছড়িয়ে রাখি। খেয়াল করলাম সে খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছে।

এক ফাঁকে একদিন আমাকে এসে বললো, ‘মা হলুদে তোমাকে কী সুন্দর লাগছে’।

তোকেও লাগবে মা, তুই আমার কতো সুন্দর একটা রাজকন্যা।

চার দিন পার হয়ে যাওয়ার পর একদিন হিম হিম ভোরে আমি আমাদের দিঘির পারে অন্তরাকে নিয়ে বসি। শীতের ঝিরিঝিরি হাওয়ায় আমরা মা-মেয়ে আনমনা হয়ে যাই। একটা সময় ওর হাত ধরে বলি, ‘মারে তুই আমাকে ভুল বুঝিস না। তুই একটা বুদ্ধিমতি মেয়ে। তুই কি বুঝতে পারছিস মা? তোকে এখানে কেন এনেছি? দেখিস, তোর অনেক ভাল হবে, কিছুক্ষণের চাকচিক্যে বালি থাকে বেশি, ভেঙ্গে পরে ধপ করে। অন্তরা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ছোটবেলার মত বুকের মাঝে ওম খুঁজতে খুঁজতে বললো, ‘মা আমার মা। তুমি আমার ভাল মা’। আমাদের মা মেয়ের গায়ে টুপটাপ শিশির কণা ঝরে পরে।

হলুদের দিন দুপুর বেলা

বাড়ির বাইরে কিছু মহিলার গলার আওয়াজ শুনতে পেয়ে বেরিয়ে এসে দেখি আমার বাপের বাড়ির মধুর মা আর তার সাথে কোমর বাঁকা হয়ে যাওয়া সুফিয়া খালা। ওদের আমি ই খবর দিয়ে আনিয়েছি। ওরা বিয়েতে দারুণ গীত গায়। আমার বিয়েতে সুফিয়া খালা নেচে নেচে বিয়ের গীত গেয়েছিল। আমার মেয়ের বিয়েতেও গীত হবে।

দুপুরের পর থেকেই বিয়ের গীত শুরু হয়ে গেল। সুফিয়া খালা আর মধুর মা একে একে গীত গাইতে লাগলো।

কান তাতানি কান তাতানি

কান তাতেয়া দে

সিদা ভরা সেন্দুর দেমো

কান তাতেয়া দে

*************

বরের বাপের ভ্যাল্কা খাওয়া দাঁত

কি সেকো ড়ৈ সেকো

গোরুর ভুরি বাজিয়া আছে তাত

কি সেকো ড়ৈ সেকো

*********************************

কন্যা চলি যায় বাপও মাওক ছাড়ি

এমন সোনার কন্যা যায়

পাল্কিত স্বামির বাড়ি

কোনদিন আসপেন সোনার কন্যা

কয়া থুয়া যাও

বাপে কান্দে মায়ে কান্দে

শাড়ির অঞ্চল ছাড়ি

ওদের গীতে কন্যা বিদায়ের হাহাকার চতুর্দিকে ছড়িয়ে যেতে লাগলো …আমার বুকের ভিতরটা হু হু করতে লাগলো।

উঠানে জল চৌকিতে বসে হলুদ শাড়ি আর গাঁদা ফুলে অন্তরাকে কী যে সুন্দর লাগছে! সেই সময় হই হই করে ওর কয়েকজন বন্ধু বাড়িতে উপস্থিত। নিমিষেই পরিবেশ বদলে গেল সবাই হই হই করতে করতে হলুদ মাখানো শুরু করে দিল। সাথে ক্লিক ক্লিক ছবি তোলা। আসলে আমিই ওদের ফোন করেছিলাম এখানে আসার জন্যে।

এদিকে পুকুরে জাল ফেলা হয়েছে বিশাল সাইজের রুই মাছ তোলা হচ্ছে । ওর বাবা পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে তদারকি করছেন। ঘরে দই পাতা হয়েছে। গফরগাঁও থেকে বিশাল সাইজের বেগুন চলে এসেছে আগামিকাল দুপুরে বিয়ের খাবারের মেনু করা হয়েছে আমন চালের ভাত, সোনা মুগের ঘন ডাল, বেগুন ভাজা, রুই মাছ আর দই। এখানকার একটা বৃদ্ধাশ্রম আর এতিম খানার বাচ্চাদের জন্যে দুপুরে কাচ্চি বিরিয়ানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

গাছের মাথায় মাইক বাঁধা হয়েছে। সেখানে একটার পর সেই বিখ্যাত গান বাজছে ‘কাজ নেই আজ আমার ভালবেসে, ‘নিঝুম সন্ধ্যায়’। দেবদারু পাতা আর কলাগাছ দিয়ে বিয়ের গেট সাজানো হয়েছে।

এসবই আমি আর শাহানা দুই বন্ধু মিলে প্লান করে করেছি সাথে সাজিদ।

এই মুহূর্তে আমার মেয়েটা দুই হাতে ঘরে বাটা মেহেদি লাগিয়ে, পায়ে আলতা দিয়ে, হলুদ শাড়ি পরে সারা ঘর ঘুর ঘুর করছে। কী যে সুন্দর লাগছে আমার মেয়েটাকে। চেহারা দিয়ে যেন আলো ঠিকরে বের হচ্ছে! আমি আনন্দে চোখ মুছি।

অন্তরা হঠাৎ এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে,

এই সর সর, মেহেদির হাতে তো আমাকে লেপটে দিবি

যাক লেপটে!

মা !

হু বল

ও মা !

আহা বল!

মা মা আমার মা!

আহা কী বলবি বল না!

মা আমি কিন্তু বিয়েতে তোমার বেনারসিটা পরবো।

তুমি কিন্তু না করতে পারবে না!

আমি স্বপ্ন দেখছিনা তো!

ভাগ্যিস আসার সময় বুদ্ধি করে বেনারসিটা সাথে করে এনেছিলাম!

রচনাকাল

২২ আষাঢ় ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

শেয়ার করুন:
  • 82
  •  
  •  
  •  
  •  
    82
    Shares

লেখাটি ১,৩৭৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.