ধর্ষকদের প্রতিরোধের এখনই সময়

0

শাহরিয়া খান দিনা:

সাম্প্রতিক সময়ের ধর্ষণের ঘটনাগুলোতে বেরিয়ে আসছে চরম বিকৃত এবং অসুস্থ এক সমাজের চিত্র। কে নেই এই ধর্ষক তালিকায়? স্কুল কলেজের শিক্ষক, মাদ্রাসার শিক্ষক/হুজুর, আমাদের আশেপাশের শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব ধরনের মানুষজন। আর এইসব বিকৃতির শিকার হচ্ছে আমাদের শিশুরা, আমাদের কন্যা সন্তানেরা, নারী, বৃদ্ধা সবাই।

গত ছয় মাসে ৩৯৯ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের। অবস্থা কতটা ভয়াবহ, কতটা জঘন্য বলার অপেক্ষা রাখে না। ছোট বোনের বয়সী, মেয়ের বয়সী, নাতির বয়সী মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে আমাদের বয়স্ক নাগরিকদের দ্বারা। এইসব ধর্ষনের ঘটনা সবাই ঘৃনা করে। সবাই শাস্তি চায়।

তবে কারা করে এইসব? যারা করে তারা ভিনগ্রহের প্রাণী নয় নিশ্চয়ই! আপনার আমার মতোই স্বাভাবিক মানুষের চেহারা নিয়ে আমাদের আশেপাশেই বাস করে তারা। কেন ধর্ষণ করে? উগ্রতা? পোশাক? আচরণে উদ্বুদ্ধ?

উত্তর হচ্ছে, নাহ! এসব কিছুই না। একটা ছোট বাচ্চার পোশাকে এবং আচরণে এমন কিছুই থাকতে পারে না যা একজনকে তার প্রতি কামোত্তেজিত করে।
যে লোকটি একটি শিশুর প্রতি যৌন আকাঙ্খা বোধ করে এবং শিশুটিকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে, জোড়-জবরদস্তি করে নিজের কামনা চরিতার্থ করে বা করার চেষ্টা করে, তাকে সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ বলা যায় না কোন অবস্থাতেই। সে মানসিক বিকারগ্রস্ত এবং ভয়ংকর রকম অপরাধী।

অনেকেই পেডোফিলিয়া সম্পর্কে জানেন। এটা এমন একটা মানসিক রোগ যাতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা শিশুদের, এমনকি নবজাতকদের প্রতিও যৌন আকর্ষণ বোধ করে। এমন বিকৃত রোগে আক্রান্ত পেডোফাইলরা শিশুদের যৌন নিগ্রহ থেকে শুরু করে ধর্ষণ অনেক সময় হত্যা পর্যন্ত করে থাকে। উন্নত দেশে ধর্ষক এবং বিশেষ করে পিডোফাইলদের কঠিন শাস্তি দেয়া হয়। শাস্তির মেয়াদ শেষ হবার পরও যতদিন তারা জীবিত থাকেন, তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারির আওতায় থাকতে হয়। কারণ পিডোফাইলদের বিশ্বাস নেই। একবার শাস্তি পাবার পরও তারা জীবনের যেকোন সময় আবার সেই একই কাজ করতে পারে।

আমরা হয়তো প্রচলিত আইনে শাস্তি দিয়ে, ক্ষেত্রবিশেষে ক্রসফায়ার দিয়ে এদের দুই/একজনকে নির্মূল করতে পারবো। কিন্তু সবাইকে নির্মূল করা সম্ভব না। কারন আপনি সবাইকে চিহ্নিত করতেই পারবেন না। এরা আমাদের আত্মীয়স্বজন কিংবা আমাদের পরিচিত জনের ছদ্দবেশে আমাদের আশেপাশেই আছে। হয়তো ধর্ষনের বিরুদ্ধে সে-ও আজ কঠিন কথা বলছে, নিজের কঠোর অবস্থান জানিয়ে ফেইসবুক জ্বালাময়ী পোস্ট দিচ্ছেন ; কিন্তু তার পরিচিত অনেকেই জানেন, তার চোখের দৃষ্টিতে, মুখের কথায় এবং চিন্তায় তিনিও একজন ধর্ষকই।

একজন ধর্ষকের বাস ব্যক্তির মনে, তার চিন্তায়, তার শিক্ষায়। সেই চিন্তার জায়গাটায় চিকিৎসা দরকার। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের জ্ঞান এবং শিক্ষা দরকার। পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকাও ধর্ষণ বাড়ার অন্যতম কারণ হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে নারীকে উপস্থাপনও করা হচ্ছে বিকৃতভাবে। নারীর যৌনাঙ্গ শুধুই যৌনসুখের আঁধার। যা খুশি তা করা যায়। যেন এখানে বয়স বা যন্ত্রণার কোন ব্যাপার নেই।

যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিরাও এই ঘৃণ্য অপরাধের অপরাধী, তাই বলা যায়, সামগ্রিক সমাজের মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা তথা কাউন্সেলিং দরকার। আর এই চিকিৎসা বা কাউন্সেলিং হচ্ছে ধর্ষকের কঠিন এবং দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি। ক্রসফায়ারের মতো রাতের আঁধারের সহজ মৃত্যু নয় বরং দিনের আলোতে লোকচক্ষুর সামনে রেখেই তীব্র যন্ত্রণায় তিলে তিলে শেষ করে দেয়া।

এমন উদাহরণ সৃষ্টি করা যাতে একটা ধর্ষকের মরণ যন্ত্রণা দেখে অন্য ধর্ষকামী যেন চোখের পাতা বন্ধ করে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে না পারে। যতটা শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক যন্ত্রণা একজন নির্যাতিত/ধর্ষণের শিকার মেয়ে ও তার পরিবারের মোকাবিলা করতে হয়, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি যেন একটা ধর্ষক এবং তার পরিবারের সদস্যদের সম্মুখীন হতে হয়, সেটা নিশ্চিত করা।
কারণ ভয়ের চেয়ে বড় কোন আবেগ নাই যা মানুষের অপরাধী মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সমাজের সবার কাছে যদি বার্তা পৌঁছে যায় তার বিকৃত কৃতকর্মের জন্য সে নিজে তো বটেই, তার পরিবারকেও খেসারত দিতে হবে, তবেই সে অপরাধ করার আগে দ্বিতীয়বার ভাববে।

আমাদের শিশুদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদের। আমাদের তথা অভিভাবকদের এবং রাষ্ট্রের। কিন্তু আপনি আমি নিরাপত্তা দিতে গিয়ে বাচ্চার রঙিন শৈশব খাঁচাবন্দী করে ফেলতে বাধ্য হচ্ছি। আমরা তাকে পাশের বাসায় খেলতে যেতে দেই না, ছাদে উঠতে দেই না, একা চলতে দেই না, কেউ কেউ আবার পরিবর্তন আনছেন বাচ্চার পোশাকেও!

এসব করে লাভ নেই আদতে, বরং সর্বস্তরে এই বিকারগ্রস্তদের প্রতিরোধ করা জরুরি। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ সুনির্দিষ্ট হলে সম্মিলিতভাবে তাকে আইন এবং বিচারের আওতায় আনতে হবে। ধর্ষণের মতো এমন জঘন্য মহামারি নিয়ে একটা সমাজ, একটা দেশ চলতে পারে না, চলতে দেয়াও ঠিক না। নিরাপদ জীবন হোক প্রতিটি নাগরিকের।

শেয়ার করুন:
  • 888
  •  
  •  
  •  
  •  
    888
    Shares

লেখাটি ৪০২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.