আমি একজন নারীবাদী: করজোড়ে ক্ষমা চাইছি প্রিয় সুশীল সমাজ

0

মুশফিকা লাইজু:

সর্বজনবিদিত যে নারীবাদ কোন পেশা নয়। এটা একটা মানবিক দর্শন। নারীর স্বপক্ষে ন্যায্যতার সোপান। কেউ নারীবাদী হয়ে জন্ম নেয় না। সময়, পরিস্থিতি, অর্জিত জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং মানবতার প্রতি অঙ্গিকারের ফলস্বরূপ একজন মানুষ নারীবাদী হয় বা হয়ে উঠে।

আমি আপনাদের বিচারে তেমন একজন ব্রাত্যজন। অসময়ে-অফলা জমিতে অংকুরিত হয়েছি। নারীবাদ মূলত একটি আদর্শ। যে আদর্শের কারণে ‘সমাজ, কর্মক্ষেত্র এবং পরিবারে নারীদের উপর যে নির্যাতন ও শোষণ হয়, সে সম্পর্কে সচেতনতা এবং এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য সচেতন উদ্যোগ গ্র্রহণ করা’।

আর একটু স্পষ্ট করে যদি বলি, নারীর সার্বিক প্রকাশ এবং বিকাশে পুরুষতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণকে সরাসরি অস্বীকার করা বা চ্যালেঞ্জ করার আদর্শই নারীবাদ। ব্যাখ্যাটি এমন যে সাধারণ সমাজে, কর্মক্ষেত্রে, পরিবারে বস্তুগত ও ভাবগত পর্যায়ে নারীর শ্রম, সৃজনী শক্তি, শরীর ও যৌনতার উপর পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, শোষণ ও নির্যাতন সম্পর্কে সচেতনতা এবং বর্তমান পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য নারী ও পুরুষের মাঝে সচেতন কার্যক্রম পরিচালনা। অর্থাৎ নারীর প্রতি হওয়া সকল মানবাধিকার লঙ্ঘনের, অন্যায় এবং বঞ্চনার প্রতিরোধ ও প্রতিকার করা।

মুশফিকা লাইজু

উপরোক্ত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যদি কোন মানুষ তার নিজ পরিসরে লিঙ্গবৈষম্য, লৈঙ্গিক আধিপত্য এবং পুরুষতান্ত্রিকতার উপস্থিতি উপলব্ধি করে এবং তার প্রতিকারে কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন; তবে তিনিই হচ্ছেন একজন নারীবাদী। নারীবাদী হতে হলে বিশেষ কোন লিঙ্গের অধিকারী হওয়ার প্রয়োজন নাই। নারী, পুরুষ, উভয়লিঙ্গ, রূপান্তরকামী যে কেউ সংবেদনশীল মানুষ হলেই হয়।

এবার তুলসি তলায় ধুঁয়ো দেয়া দরকার! সমাচার এই যে, নারীবাদী হওয়ার দোষে দুষ্ট এই আমি প্রতিদিন সুশীল সমাজের ধিক্কারে প্রাণ ওষ্ঠে নিয়ে ঘুরে বেড়াই। আড্ডায়, আলোচনায়, চাকরির পরীক্ষায়, সাক্ষাৎকার বোর্ডে, ব্যাংকে, পাবলিক পরিবহনে, ফেইসবুকে, ইনবক্সে, ইমেইলে সর্বত্রই এই ধিক্কার শুনতে হয়। মধ্যবিত্ত নারীবাদী, সুবিধাবাদী নারীবাদী, মনোযোগ শিকারী, ফালতু-ফাজিল, বেশি বোঝা, নাস্তিক, চাড়াল, ন্যাংটা- এরকম বহু বহু বিশেষণে ভূষিত হতে থাকি।

আমার তথা আমাদের যাপিত জীবন নিয়েও থাকে নানা প্রশ্ন। আলো-আঁধারি কৌতুহল। যেমন- নারীবাদীদের কি বিয়ে হয়? তাদের স্বামী কি আদতেই থাকে? তারা কি মা হয়? রান্না করে? গুরুজনদের মান্য করে? ইত্যাদি ইত্যাদি।

প্রশ্ন হলো চলমান পৃথিবীতে বহু মতবাদ আছে। অসংখ্য আদর্শে দীক্ষিত মানুষ। একাগ্র চিত্তে তাদের কাজ করে যায়। যেমন মানবতাবাদী, পরিবেশবাদী, জীবনবাদী, যুক্তিবাদী, আধ্যাত্ববাদী, সুফিবাদী, ভাববাদী, বস্তুবাদী, নৈরাশ্যবাদী। এরা আমাদের দেশেই প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় নিজ নিজ আদর্শে কখনও যৌথ, আবার কখনও একাই কাজ করে যায়। কিন্তু তাদের নিয়ে সাধারণ জনগোষ্ঠির এতো কৌতুহল নেই, নেই এতো পৈশাচিক নিগ্রহ করার মানসিকতাও।

তবে নারীবাদীর প্রতি কেন এই যুদ্ধ যুদ্ধ মনোভাব? কেন এই দমনস্পৃহা, কেন এতো প্রতিহিংসা? কারণ আমাদের সকলের হয়তো জানা নেই। মূল কারণ হলো, ভীতি- মসনদ হারানোর। অত্যাচারের কৃপাণ হারানোর ভয়ে পুরুষতান্ত্রিক এজেন্টরা সন্ত্রস্ত হয়ে আছে। লক্ষ-কোটি বছরের অত্যাচারের সিংহাসন যদি ভেঙে যায়! বঞ্চিতরা যদি নারীবাদের কারণে বোধিপ্রাপ্ত হয়ে উঠে! যদি মুছে ফেলতে চায় লক্ষ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস! যদি নতুন করে শুরু হয় সমতার পৃথিবী! তবে তো আর মূল্যবিহীন নারীশ্রমকে, নারীর উদ্ভাবনকে ভোগ করা যাবে না। তাই তাবৎ পুরুষকুল এবং পুরুষতন্ত্রের চর্চাকারীরা প্রশ্ন করে করে বাধা দিয়ে দিয়ে অন্ধকারে ভরিয়ে দিতে চায় নারীর চেতনা। রুদ্ধ করে দিতে চায় নারীর স্বাভাবিক বিকাশ। থামিয়ে রাখতে চায় নারীর অগ্রযাত্রা। পাছে হারাতে হয় তাদের নিজেদের গড়া পার্থিব স্বর্গ।

তারা নারীকে দেখতে চায় শুধুই শ্রমিক হিসেবে। তারা চায় নারী থাকুক প্রজনন শ্রমিক, যৌনশ্রমিক, কর্পোরেট শ্রমিক, সভ্যতা ধারণকারী শ্রমিক হিসেবে। নারী হয়ে থাকুক তাদের মৌলিক প্রয়োজনের শর্তহীন শ্রমিক। নারী তাদের আবেদন যুগিয়ে যাবে ভোগের, বাসনার। তাই তো তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার রকমের প্রসাধনী। সুঁচালো পাদুকা, কামনাময় সুগন্ধি এবং সাথে ছেলে ভোলানো শক্ত ভালবাসায় মোড়ানো চাবুক। তৈরি হয়েছে লাস্যময়ী দীর্ঘ গাউন, যৌন আবেদনময়ী সংক্ষিপ্ত পোষাক।

আবার অন্যদিকে বুদ্ধিবৃত্তি যাতে প্রকাশ না পায়, নারী যাতে নিজেকে হীন ভেবে করুণা প্রাপ্তির জন্য হস্ত প্রসারিত করে থাকে, তার জন্য আপাদমস্তক আবৃত ঘনকালো অন্ধকারময় পোষাক।

একদল নারীকে বলেছে, তোমার পা দেখানো যাবে না, তাতে আমাদের মহামূল্যবান বীর্যপাত হয়ে যাবে। আর একদল বলছে, আমাদের হাতের মুঠোয় নারী। তোমাদের মুক্তি আছে তোমার শরীর উম্মোচন করে আমরা চড়ামূল্যে তা উপভোগ করবো। তুমিই হবে আমাদের অর্থনীতির নির্ভার পুঁজি। তোমার যৌবন আমার জুয়া। সুতরাং নারী তুমি ঢেকেও শ্রমিক, তুমি উন্মুক্ত অবস্থায়ও শ্রমিক। আর এই হীন ব্যর্থ উপায়হীন শ্রমিক বানানোর কাজে ব্যবহার করেছে নিজেদের স্বার্থে রচিত পারিবারিক কণ্টক বেষ্টনী, সামাজিক আইন, ধর্মিয় জুজু। যা বেশির ভাগই এসেছে কল্পিত আকাশ থেকে এবং তার সব ক’টির আগমন হয়েছে ঐ সেই হীনস্বার্থ চরিতার্থের নায়ক পুরুষের মাথা বেয়ে।

কেন আমার দিকে আঙুল তোলা হয়, আমি নারীবাদী বলে? কেন আমাকে আলাদা করে দেয়া হয় মূলস্রোতধারা থেকে, আমি রহস্যময়ী নই বলে? আমি পুরুষের কষা শুভঙ্করের অংকটা বুঝতে পারি বলে? কারণ আমি শিখে গেছি আমার শ্রমের মূল্য! আমি বুঝে গেছি আমার পার্থিব জন্মের যথার্থ অর্থ কী?

একজন নারী থেকে যখন নারীবাদী হয়ে উঠলাম, পুরুষতন্ত্রের এজেন্টরা বুঝতে পারলো আমাকে ঠকানো যাবে না। নারীবাদের আদর্শের আলো আমি জ্বালিয়েই যাবো- ঘর থেকে বাইরে আর বাইরে থেকে দূর দিগন্তে।

প্রিয় সুশীলেরা, আপনারা যখন মদিরা মাখানো ঢুলুঢুলু চোখে আলোচনা করেন- বাংলাদেশের নারীবাদ আজ কোন পথে? আপনাদের আলোচনার আসরে ঠাঁই পায়- মধ্যবিত্তের নারীবাদ, করপোরেট নারীবাদ, নারীবাদের আদিঅন্ত্য ইত্যাদি ইত্যাদি।
তবে শুনুন, নারীবাদের আদি আছে, এর কোন অন্ত্য নেই, এই আদর্শ বিরাম-যদি ও অন্ত্যহীন।
আর এই অন্ত্যহীন আদর্শ বলেই আমি আমার চেতনায় এবং অঙ্গিকারে অবিচল থাকি। এই যে আমি অচ্ছুত, আব্রুহীন, দ্বিধাহীন প্রকাশিত। আমি কিংবা আমরা আপনাদের গোষ্ঠিগত নই। আপনাদের অন্দরমহলে বিপ্লব ঘটানো ছাড়া আমাদের আর কোন কাজ নেই। যখন তখন আমরা পানিতে আগুন লাগিয়ে ফেলি। তবুও কেন দেশের কোথাও কোন নারীর প্রতি সহিংসতা হলে আমরাই ফুটপাথে ধর্ণা দিয়ে ন্যায্যতার জন্য চিৎকার করি!

আপনি-আপনার মতো অনেকেই আমার (হয়তো অন্য নারীবাদীদেরও) ফেইসবুকের ইনবক্সে লিখে পাঠান, কই নারীবাদীরা এখন কই! কই #মিটু আন্দোলনকারীরা কই! অর্থাৎ কিনা আপনার অবচেতন মন মেনে নিয়েছে বা জেনে গেছে আমার আদর্শের, আমার দর্শনের, আমার বিশ্বাসের ভিত অনেক বেশি শক্তিশালী এবং গভীর। তাইতো দুর্বলচিত্তের পুরুষতান্ত্রিক ধজ্বাধারীরা সামনে না এসে নারীবাদের ছায়াতলে আশ্রয় আশা করেন।

ধরেই নিয়েছেন, আপনারা সমাজের কেউকেটা হলেও সকল অন্যায়, সকল অন্যায্যতা প্রতিকার আমরাই চাইবো-আমরাই করবো। খুব প্রচ্ছন্ন হলেও আমরা নারীবাদীরাই আপনাদের এক রকমের গতি, এক রকমের প্রশ্রয়।

সুতরাং আমাকে তিরস্কার করবেন না, পুরস্কৃত করুন। আমাকে ভয় পাবেন না, আধুনিক সভ্যতার মূলস্রোতে গ্রহণ করুন। আমাকে জায়গা ছেড়ে দিন। আমিও পৃথিবীতে আমাদের অবদানের স্বীকৃতি চাই। আমার শ্রম, আমার ঘামের মূল্য আমি বুঝে নিতে চাই। কারণ আমরা গত কয়েক শতাব্দি ধরে প্রমাণ করেছি, আমরা পুরুষের অনুগত কেউ নই। আমাদের জন্ম আপনাদের হাতে গন্ধম তুলে দেওয়ার জন্য নয়। আপনার পাঁজরের বাঁকা হাড় দিয়ে ডুগডুগি বাজানো আমার কাজ নয়।

সৃষ্টির উদ্দেশ্যই ছিল আমাদের সহযোদ্ধা, সমবোদ্ধা হিসেবে তৈরি করার। নোংরা ঘৃণ্য পুরুষতন্ত্রে রাজনীতির শিকারের দিন শেষ। না বোঝা থেকে বোঝায়, অন্ধকার থেকে আলোর রেখায় এসে দাঁড়িয়েছে এই শতাব্দির নারীরা, তারা আর থামবে না। একটা ফেইজ পার করছে মাত্র। আপনাদের সুবিধার জন্য লিখিত পবিত্র গ্রন্থ এবং আপনাদের তান্ত্রিক চাবুক রাখার জন্য যাদুঘর তৈরি করুন।
বিনীত নিবেদন, এই যে আমি একজন নারীবাদী।

নারী নেত্রী ও উন্নয়নকর্মী

শেয়ার করুন:
  • 784
  •  
  •  
  •  
  •  
    784
    Shares

লেখাটি ১,৮০২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.