ঋতুকালীন স্বাস্থ্যসেবা নারীর অধিকার

0

সঙ্গীতা ইয়াসমিন:

যে দেশে সূর্যোদয় হয় শিশু, নারী, যুবতী, কিশোরীদের হত্যার খুনে রাঙা লালে, যে দেশে ধর্ষণ পান্তাভাতের মতো সহজপাচ্য, যে দেশে ক্ষমতার প্রভাব রাতকে দিন দিনকে রাত বানায় চোখের ইশারায়, সে দেশে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর অতিরিক্ত করারোপে বাজেট প্রবর্তকেরা সংবেদনশীল হবেন, এমন প্রত্যাশাই অবান্তর।

আমাদের কর্মকাণ্ড, নীতি নির্ধারণের কেন্দ্রে যদি নারী, শিশু, কিংবা মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়গুলি সেন্টার পয়েন্ট হতো, তবে যেকোনো কর্মসূচিতেই আমাদের মাথায় প্রথমেই আসতো নির্দিষ্ট নীতির বলে আমাদের নারী, শিশু, দরিদ্র কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কিনা! তাঁদের নিত্যদিনের জীবনে ভোগান্তি বাড়ছে কিনা! যা কি না একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর নীতি নির্ধারণের মূলমন্ত্র।

দুঃখজনকভাবে চরম সত্যটা হলো, আমাদের রাজনীতিকেরা “রাজার নীতি” অবলম্বন করেই রাজনীতি করেন, সেখানে জনগণের মতামত, অংশগ্রহণ, সুবিধা-অসুবিধা গুরুত্ব পাবার কথা নয়! বরং সেই নীতিতে জনসাধারণেরা ক্রমাগত নিষ্পেষিত, নির্যাতিত হতেই থাকেন, ক্রমাগত ঝুঁকির মুখেই জীবন পাত করেন। আর একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যেকোনো ধরনের ঝুঁকিতে প্রথমেই দুর্বলেরা বিপদাক্রান্ত হবে।

নারী-কন্যাশিশুরা আমাদের সমাজে দুর্বলের প্রতিনিধিত্বই করে বৈ তো নয়! প্রতিবছর বাজেটের পরে তাই নিম্ন আয়ের প্রান্তিক মানুষদেরকে জীবনের অত্যাবশ্যকীয় অনেক প্রয়োজনকে জলাঞ্জলি দিতে হয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সাথে আপোষ করতে গিয়ে।

বলা বাহুল্য, আজকের সময়ে ‘স্যানিটারি প্যাড’ তেমনই একটি অত্যাবশ্যকীয় গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্যসামগ্রী, যা সরাসরি প্রজনন স্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কিত। যেটার অপ্রতুল ব্যবহারের কারণে, অস্বাস্থ্যকর ঋতুস্রাব ব্যবস্থাপনার ফলে জরায়ু মুখের ক্যান্সারসহ হতে পারে ইউরিনারি ট্রাক ইনফেকশনের মত নানা ধরনের জটিল ব্যাধি। যা একজন নারীর জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিই নয় কেবল, আগামী প্রজন্মের জন্যও এক ভয়াবহ বার্তা। কেননা আজকের কন্যা শিশুই আগামীকালের মা।

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, “আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।” এই শিক্ষিত মা আকাশ থেকে টুপ করে পড়বে না। একজন নারীকে মা হয়ে ওঠার জন্য তাঁর জীবনের পেছনের ধাপগুলিতে চারাগাছের মতনই যত্নআত্তি করে বাড়তে দিতে হয়, তবেই সেই নারী সুস্বাস্থ্যে ভরা সুসন্তান জন্ম দিতে পারেন!

দুঃখের বিষয় হলো, আমরা যখন গাভী থেকে দুধ চাই, তাকে বাড়তি খাবার দিই, যে মুরগিটা ডিম দেয়, তাকেও বাড়তি খাবার দিই, যে গাছটায় লাউ ধরে, তারেও প্রতিদিন জল-তেলে, সারে ভরিয়ে রাখি যাতে উচ্চফলন পাই। সংসারে নারীই একমাত্র হতভাগা, যার প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজ এখনও কুসংস্কার, বৈষম্য, লজ্জা, দ্বিধা সংকোচের বেড়াজালে আবদ্ধ রয়েছে।

নারী নিজেও সেই চক্রের পিষ্টনে পড়ে লজ্জার অবগুণ্ঠনে গুটিয়ে থাকেন নিজেরই শরীরের ভেতরে। খুবই আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করতাম, প্রতি মাসের মুদি বাজারের তালিকায় রাখা স্যানিটারি প্যাডের আইটেমটি দোকানী একটু নিচুস্বরে পড়তেন, আলাদা একটি প্যাকেট অতি যত্নে এবং লুকিয়ে সব শেষে আমার ব্যাগে পুরে দিতেন। তাঁর এহেন আচরণের মানে জেনেও বার কয়েক আমি জিজ্ঞেস করেছি কেন তিনি এই কাজ করেন? তাঁর নিরুত্তর মুখচ্ছবি আমায় যে জবাবটি দিয়েছিল সেটি অস্পষ্ট হলেও অনেকটা এমন-“কয় কী নির্লজ্জ নারী! আমি তো তাঁরে লজ্জার হাত থেকে বাঁচাতেই এই কাজ করি…”! এই হলো আমাদের শহুরে (ঢাকা) জীবনের সংস্কৃতি! এতে সারাদেশের অবস্থা বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়।

নারীর মা হয়ে ওঠার মূল চালিকাশক্তিই হলো মাসিক বা ঋতুচক্র। এই ঋতুচক্র যেমন একটি অতি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, তেমনি এর সাথে সংশ্লিষ্ট নানাবিধ ধর্মীয় এবং সামাজিক ট্যাবুর ফলে এই বিশেষ দিনগুলোতে রক্তপ্রবাহ ব্যবস্থাপনার যথাযথ পরিবেশ, তথ্য, এবং সামগ্রী পায় না আমাদের মেয়েরা, কিশোরীরা কিংবা কর্মজীবী নারীরা। বাড়ির বাইরে, স্কুলে কিংবা কাজের জায়গায়ও তাঁদেরকে পড়তে হয় নানারকম বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে, কোনোরকম গবেষণা ছাড়াই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বলেই এ কথা বলা যায়।

উল্লেখ্য বিদেশ থেকে আমদানিকৃত কাঁচামালের কারণেই যখন অতিরিক্ত ভ্যাট আরোপ করতে হয়, তখন এই অতি অত্যাবশ্যকীয় পণ্যটিকে “পিঙ্ক ট্যাক্স” এর খোলস থেকে মুক্ত করে কেনো আমরা দেশীয় প্রযুক্তিতে, উন্নত মানের, স্বাস্থ্যসম্মত, এবং স্বল্প মূল্যে স্যানিটারি প্যাড তৈরির পরিকল্পনা করবো না সেই প্রশ্ন অবান্তর নয় মোটেই!

আমাদের দেশে গার্মেন্টস শিল্পের ঝুট ব্যবহার করে আজকাল বাসায় ব্যবহার্য নানারকম দ্রব্যসামগ্রী তৈরি হচ্ছে। স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারে এমন কিছু ভাবা কি অসম্ভব? যখন আমাদের বিজ্ঞানীরা পাট থেকে ঢেউ টিন আবিস্কার করেন, আমাদের দেশে নিউমোনিয়ার সহজলভ্য চিকিৎসা আবিস্কৃত হয়, যখন বাংলাদেশি সায়েবা মেথড মায়ের জীবন বাঁচাতে সারা বিশ্বে জনপ্রিয়তা পায়, যখন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীই ডায়রিয়া প্রতিরোধে খাবার স্যালাইন আবিস্কার করেন, তখন আমাদের দেশীয় কাঁচামালে সম্পুর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে স্বল্প খরচে এই স্যানিটারি প্যাড বানানোও সম্ভব।

কীভাবে? শুধু ভালোবাসা থাকলেই সেটি সম্ভব। গোটা নারী জাতির প্রতি আপনার ভালোবাসা যদি থাকে, যদি আপনি বিশ্বাস করেন সুরক্ষিত প্রজনন স্বাস্থ্য নারীর অধিকার তবে এই কর্মটি অতীব সহজ।

ভালোবাসার কথা উঠলেই প্রাসঙ্গিকভাবেই একটি নাম মনের পর্দায় ভেসে ওঠে, তামিলনাড়ুর অরুণাচালাম! যিনি তাঁর স্ত্রীর ঋতুকালীন বিশেষ দিনগুলোতে স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাপনার কথা মাথায় রেখেই তৈরি করে ফেলেছেন স্বল্পমূল্যে সহজলভ্য স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরির মেশিন। যা সাড়া ফেলে দিয়েছে গোটা বিশ্বে, তিনি টেলিভিশন টক শো ছাড়াও জায়গা করে নিয়েছেন টেড টকের ট্যালেন্ট সার্চে নিজ কৃতিত্বের বলে। যার এই উদ্যোগকে নিয়েই ‘প্যাডম্যান’ মুভিটি তৈরি হয়েছে! বস্তুত তিনি এক সুপার হিরো, সুপারম্যান, একজন নমস্য পুরুষ। স্ত্রীকে ভালোবেসে শুরু করলেও সমগ্র নারী জাতির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবনত ভালোবাসাই তাঁকে তাড়িত করেছিল এমন একটি পণ্য তৈরিতে উদ্বুদ্ধ হতে। যা তিনি পৌঁছে দিতে চেয়েছেন গোটা ভারতের সকল শ্রেণির নারীর হাতে তাঁদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যেই।

দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশে অরুণাচালামদের বড় অভাব! তবে আমাদের ওয়াহিদা বানু আছেন! হ্যাঁ, স্যানিটারি প্যাডের এই আন্দোলনের কথা আসতে সর্বাগ্রেই মনে পড়ল তাঁর কথা! যিনি স্বপ্ন দেখতেন, একদিন দেশীয় কাঁচামালেই দেশীয় প্রযুক্তিতে স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি হবে সারাদেশের মেয়েদের জন্য; যা প্রতি প্যাকেট ৪-৫ টাকায় পাওয়া যাবে এই বাংলাদেশে! ধনী-দরিদ্র, পথশিশু, ভিক্ষুক সকল নারীই ব্যবহার করতে পারবেন সেই ন্যাপকিন! এমন স্বপ্নবান, হৃদয়বান মানুষের জন্য দরকার কেবল উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার!

২০১৫ সালে মারজিয়া প্রভার কাছে দেওয়া তাঁর একটি সাক্ষাৎকারে জেনেছিলাম এই লক্ষ্যে তিনি দেশি-বিদেশি অনেকের সাথে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা চেয়েও খুব বেশি দূরে এগোতে পারেননি। যদিও কাজের সূত্রে তাঁর এই স্বপ্নের সাথে আমার যোগাযোগ আরও বহুদিন আগে থেকেই।

যে দেশে অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা নারী, আর সেই নারীর স্বাস্থসম্মত ঋতুকালীন ব্যবস্থাপনার সাথে প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি ছাড়াও জড়িয়ে আছে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, অনুপস্থিতি, এবং বাল্যবিবাহের মতো আরও সব জটিল সমস্যা। যার ধারাবাহিকতা অর্থনৈতিক উৎপাদনে নারীর ভূমিকাকে হ্রাসই করে, ফলত, অগ্রগতি হয় বাধাগ্রস্ত, পিছিয়ে পড়ে সমাজের অর্ধেক!

২০১৪ এর হাইজিন সার্ভের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের শতকরা ৮৬ ভাগ নারী ঋতুকালীন ব্যবস্থাপনায় স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন না। আর্থিক কারণ ছাড়াও সামাজিক ট্যাবুর কারণেই নারীদের এই স্বাস্থ্যাভ্যাস গড়ে ওঠেনি।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শতকরা ৪৫ ভাগ স্কুলে টয়লেট সুবিধা থাকলেও মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেট রয়েছে শতকরা পাঁচ ভাগেরও কম। যেখানে ন্যাপকিন ব্যবহারের পরে ফেলে দেওয়াসহ উপযুক্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থাও অপ্রতুল!

২০১৫ এর অক্টোবরে প্রথম আলো ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত কিশোরী শক্তি ও সক্ষমতা-২০৩০ রূপকল্প শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনায় উঠে এসেছে যশোরের ঝিকরগাছার এক কিশোরীর স্কুলে থাকা অবস্থায় হঠাত অসহ্য ব্যথা এবং প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে মারা যায়, পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে তাঁর জরায়ুতে দুটি সাপের বাচ্চা পাওয়া যায়।
ধারণা করা হয়, তাঁর মাসিকের পুরোনো কাপড় শুকাতে দিয়েছিল কোনো স্যাঁতসেঁতে জায়গায়। সেখান থেকেই হয়তো সাপের বাচ্চা দুটো কাপড়ে লেগে জরায়ুর মুখ গলিয়ে ভেতরে চলে গেছে। সংবাদ ঘাঁটলে এমন অসংখ্য গল্প হয়তো আমরা পাবো, যা নিম্ন আয়ের অনেক কিশোরীর, নারীর জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে কেবল ঋতু সংক্রান্ত অব্যস্থাপনা, অস্বাস্থ্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক ট্যাবুর কারণেই।

উল্লেখ্য, দেশব্যাপী আন্দোলনের তোপের মুখে সরকার স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর থেকে সকল প্রকার আমদানী শুল্ক প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপন জারি করে দিয়েছেন ইতোমধ্যে।

তবুও গত বছরের বহাল ভ্যাটও বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রহণযোগ্য নয়। বর্তমান বাজার মূল্যও সকলের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেই। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠির ‘প্রাক্টিক্যাল জেন্ডার নিড’কে দেশীয় শিল্পের সাথে সংযুক্ত করে সল্প মূল্যে সর্বস্তরের নারীদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।

এজন্য দরকার আন্ত:মন্ত্রণালয়সহ সমন্বিত বাজেট প্রবর্তন। যেখানে প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপ এবং কর্পোরেট সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটিও হয়ে উঠতে পারে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক!

আসুন আমাদের সমন্বিত উদ্যোকে নারী পাক হ্যাপি ব্লিডিংয়ের আনন্দ বার্তা, প্রতিটি নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য হোক সুরক্ষিত!

শেয়ার করুন:
  • 183
  •  
  •  
  •  
  •  
    183
    Shares

লেখাটি ১৮০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.