আমি স্তম্ভিত, আমি বাকরুদ্ধ!

0

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

ধরণী দ্বিধা হও।

স্তম্ভিত হয়ে শুনলাম আওয়ামী লীগের মাননীয় সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধী, জামায়াত ইসলামী করা, সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে জড়িত ছিলো যারা, ৪৭ বছর বছর পরে নাকি তা মনে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই! সেই সব বেইমান, দেশদ্রোহীদের বংশধরদের দলে নিতেও নাকি কোনো বাধা নেই!

আমি কি ভুল শুনলাম? না, ভুল তো শুনিনি! ভুল শুনলেই বরং ভালো ছিলো।
লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে।
ধরণী দ্বিধা হও।

৪৭ বছরে বুঝি ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের ঋণ শোধ হয়ে গেছে! তবে কী ৪৭ বছরে শহীদ পরিবারগুলো পেরেছে স্বজন হারানোর বেদনার ভার বুক থেকে চিরতরে নামাতে? আর বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধারা? তাঁদের মধ্যে কতশত জনাই তো জীবন্ত লাশ হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ছিলেন, বা আছেন লোকচক্ষুর আড়ালে। কেউ জীবন সায়াহ্নে, কেউ বা অনন্তলোকে। তাদের শরীর থেকেও এ্যাদ্দিনে নির্ঘাত ঝরে গেছে কেটে ফেলা স্তনের যন্ত্রণা, নিশ্চিহ্ন হয়েছে যোনিপথে বেয়োনেট আর ছুরির ফলা ঢুকিয়ে যাবতীয় বর্বর নির্যাতন।

আর যে মহান পিতার উদাত্ত আহবানে জেগে উঠলো বীর বাঙালি? রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে জন্ম নিলো একটি স্বাধীন দেশ? সেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা তবে কারা করেছিলো? তবে কী ভুলে যেতে হবে পিতৃ হন্তারকদেরও?
ধরণী দ্বিধা হও।

পুত্রশোককে শক্তিতে রূপান্তর করা, রাজপথে নেমে গণ আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হওয়া, তারুণ্যকে পথ দেখানো এক আলোকিত বাতিঘর শহীদ জননী জাহানারা ইমাম –
সেই শহীদ জননীর কাছে কী জবাব দেবো আমরা? ধরণী দ্বিধা হও।

লাখো বীরাঙ্গনা মায়ের প্রতিনিধিত্ব করে, সমাজের শৃংখল ভেঙে নিজের জীবনের একাত্তর ব্যক্ত করা, উন্নতশিরে সে গৌরবগাথা বিশ্বকে জানান দেয়া সাহসী নাম ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। মানচিত্রের লাল সূর্যটা কপালে এঁকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শামিল হয়েছেন সকল আন্দোলনে, প্রজন্মকে উজ্জীবিত করতে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে গেছেন অবিরাম। কী জবাব দেবো দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা, আশায় বুক বাঁধা সেই মাকে?
ধরণী দ্বিধা হও।

বধ্যভূমিতে মায়ের চোখ উপড়ানো, ছিন্নভিন্ন নিথর দেহ খুঁজে পাওয়া বাকরুদ্ধ শিশু সন্তান কিংবা নিখোঁজ পিতার পথ চেয়ে থাকা ওই যে প্রজন্ম একাত্তর – মুক্তিযুদ্ধ তো ওঁদের কাছে শুধু আত্মত্যাগ আর অহংকার নয়, যাপিত জীবনের এক অদম্য বাস্তবতা। ৪৭ বছরে যদি সব ভুলে যাওয়া যায় তবে আজো কেন বধ্যভূমিতে, শহীদ মিনারে, স্মৃতিসৌধে হারানো স্বজনকে খুঁজে ফেরে ওঁরা?

সেদিন যারা চায়নি স্বাধীন, সার্বভৌম, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্ম হউক, তারা আজো চায় না বাংলাদেশ। আজো তারা মেনে নিতে পারেনি আমাদের বিজয়। একাত্তরে লুটপাট, গণহত্যা, ধর্ষণ অগ্নিসংযোগ, ধ্বংসযজ্ঞ চালানো অপশক্তি সুযোগ পেলেই খামচে ধরেছে আমাদের রক্তে অর্জিত পতাকাকে।

অতীতে যুদ্ধাপরাধীদের এদেশে পুনর্বাসিত করার লক্ষ্যে কুখ্যাত গোলাম আজমকে নাগরিকত্ব দেয়া, রাজাকারের গাড়িতে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর মতো আস্পর্ধা দেখানো দল বিএনপিকে ঘৃণা ভরে পরিত্যাগ করেছে এদেশের মানুষ।

আজ অবধি কোনো যুদ্ধাপরাধী, রাজাকারের সন্তানসন্ততি বা পরিবারের কোনো সদস্য কী কোথাও, কোনোদিন এতোটুকু লজ্জিত হয়েছে তাদের পূর্বসুরীদের পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের জন্য?
বরং কেউটে সাপের বাচ্চা কেউটেই হয়েছে।
তবে আজ হঠাৎ কোথা থেকে তাদের গঙ্গাজলে স্নান করে পূতপবিত্র আবির্ভাব?

মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা দুর্নীতি করে টাকার পাহাড় গড়তে শেখেনি, চুরি-ডাকাতি, দম্ভ শেখেনি। পিতামাতার কাছ থেকে নিঃশর্ত নিরন্তর ভালোবাসতে শিখেছে দেশটাকে।

সাতচল্লিশ বছর কেন সাতচল্লিশ হাজার বছরেও ওদের হাত থেকে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের দাগ মিলাবে না।
৪৭ বছর ভুলে যেতে হলে ধরণী দ্বিধা হও। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে দাও।

শেয়ার করুন:
  • 64
  •  
  •  
  •  
  •  
    64
    Shares

লেখাটি ৩৪১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.