সফলতার সিক্রেট আপনাতেই নিহিত

0

শাহমিকা আগুন:

আজ আমি লিখছি তাদের জন্য যারা ভাবছেন যে জীবনের কাছে আপনি হেরে গেছেন। হতে পারে আপনি কোন রোগাক্রান্ত, বা আপনার সন্তান রোগাক্রান্ত, বা আপনি ব্যবসায় ফেইল করেছেন, বা সংসার বা সম্পর্ক ভেঙ্গে গেছে, বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দের বিষয়টিতে সুযোগ পাননি, বা পাশ করেছেন এখন জানেন না যে কী করবেন।

আজ যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলবো তা একটু অন্যরকম। সফলতার সিক্রেট। আমি জানি না কতজন বাংলাদেশি সিক্রেট বইটি পড়েছেন বা ফিল্মটি দেখেছেন। আমি পড়েছি, শিখেছি এবং প্রতিদিন প্র্যাকটিস করছি আজ বহু বছর হলো।

রন্ড্রা বাইন প্রথম জনসম্মুখে নিয়ে আসে সফল মানুষদের সিক্রেট। আমার লেখা পড়ার পর বেশিরভাগ মানুষই ছুটবেন বইটি কেনার জন্য। পড়বেন টানটান উত্তেজনা নিয়ে। কিছুদিন বইতে যা লেখা আছে তা নিয়ে প্র্যাক্টিস করবেন এবং তারপর হতাশ হয়ে বলবেন, সবই ভুয়া, কিছুই আসলে কাজ করে না। আমি জানি কারণ আমি নিজেও তা করেছি। পাশ্চাত্যে আজ প্রায় দশ বছর হলো মানুষ চেষ্টা করেছে সিক্রেট প্র্যাক্টিস করতে। ফলাফল অবশ্যই মিশ্র।

আমার জীবনে সিক্রেট প্রাপ্তি যখন আমি মহিলা রেফুজ ক্যাম্পে। না, কোন ভিসাজনিত জটিলতা নয়, পুলিশ রেস্কিউ করে নিয়ে গিয়েছিল শেল্টার হোমে, আমি আর আমার তখনকার সিভিয়ার অটিস্টিক ছেলে আমরা চব্বিশ ঘন্টা সিসি টিভি নিয়ন্ত্রিত শেল্টার হোমে ত্রিশটি আরও নিঃস্ব নারী ও তাদের সন্তানদের সঙ্গে মিলে মিশে থাকি, যাদের মধ্যে অনেকেই ড্রাগ এডিক্ট, এলকোহলিক, প্রাক্তন দেহ ব্যবসায়ী, মানসিক রোগী।

অথচ আমি তখনও আমার লোকাল কাউন্সিলে সোশ্যাল সার্ভিস বিভাগের ড্রাগ ও এলকোহল টিমের সঙ্গে পুষ্টিবিদ হিসেবে টিনেজারদের জন্য কাজ করছিলাম। যাদেরকে সাহায্যের জন্য কাজ করছিলাম, তাদের সঙ্গে এক ঘরে থাকতে হবে তা কখন দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি।

এখন অবশ্য মনে হয় আমি অটিজমকে বোঝার জন্য যদি তাদের সঙ্গে থেকে কাজ করতে পারি, তাহলে ড্রাগ এডিক্ট বা অন্যদের সঙ্গে নয় কেন! নিরাপত্তার কারণে তখন কোথাও যাওয়া নিষেধ। তার ওপর আমার আবার আত্মহত্যা করার ইচ্ছা প্রবল তখন জীবনের এরকম চরম পরিণতি দেখে।

ডিপ্রেশন কমানোর জন্য ঔষধ খাচ্ছি চল্লিশ মিগা করে, কিন্তু তেমন কোন কিছু হচ্ছিল না। কাউন্সিলিং নেয়ার পর আত্মহত্যার প্রবণতা আরো বাড়ছিল। কারণ অনেক সত্যকে সত্য বলে মানতে বলা হচ্ছিল আমাকে, যা আমার মন তখন মানতে প্রস্তুত ছিল না।
বারবার মনে হচ্ছিল, ‘আমার সাথে কেন এমনটি হলো? আমি কী অন্যায় করেছি? আমি আমার আগের জীবন ফেরত চাই’। আমি জানি আমাদের সঙ্গে যখন ভালো কিছু হয় না, তখন আমরা এরকমটাই ভাবি।

জীবন যখন কুপির স্যাঁতস্যাঁতে প্রজ্বলিত শিখায় ধীয়মান, সেরকম একটি থমথমে সন্ধ্যায় আমার আগের কাউন্সিলের আমার ম্যানেজার আমাকে ফোন করলো। আমি নিথর। শুধুই কাঁদছি। সে প্রথম আমাকে বললো, তুমি সিক্রেট বইটি পড়ো। বইটি কিনলাম, পড়লাম, তারপর কিছুদিন ঘোরের ভেতর ছিলাম। তারপর সিদ্ধান্ত নিলাম ঘুরে দাঁড়াবো। বললেই তো আর হলো না। আমার কোন রোজগার নেই। যে পরিমাণ ট্যাক্স দিয়েছিলাম তা সরকার ফেরত দেয়া শুরু করলো, কিছুটা সরকারি ফান্ডিং পাচ্ছি, কিন্তু তাতে কিছু হবে না।

আমি দীর্ঘ তিনবছর বীরমাতাদের রাষ্ট্রীয় সম্মান ও অধিকার দেয়ার দাবিতে সম্পূর্ণ নিজের খরচে একটি আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলাম। তার ওপর ন’বার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি, শরীর ভীষণ খারাপ ছিল, ডাক্তাররা কোনকিছু খুঁজে না পেয়ে শেষে ক্যাপ্সুল ক্যামেরা টেস্ট দিল দুবার। মানে হলো ক্যামেরা কিনতে হয়েছিল!
তাদের ধারণা হয়তো সাইকোসোমাটিক অথবা ক্যান্সার। তার ওপর আমার আন্ডারেক্টিভ থাইরয়েড, সবকিছু অবশ লাগে। সবচেয়ে বেশি আমাকে যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিল, তা হলো আমার কিছু মনে থাকতো না। ভিটামিন এ কী কাজে লাগে আমার তাও মনে ছিল না।

আমি ভেবেছিলাম যে, আমার নিউট্রিশান ক্যারিয়ার আর হয়তো হবে না। আর পিএইচডি তো আগেই ছেড়ে দিলাম অটিজমকে বোঝার জন্য, শেখার জন্য। পিএইচডি ছেড়ে দিয়ে অটিজম, লারনিং ডিজ্যাবিলিটি, মানসিক জটিলতা আক্রান্ত টিনেজদের কেয়ার হোমে কাজ নিয়েছিলাম তাদেরকে দেখাশোনা করার জন্য।

আমার ছেলের অটিজম এবং লারনিং ডিজ্যাবিলিটি, আর এডিএইচডি তখন বর্ডার লাইনে। সে গায়ে কাপড় রাখতে পারে না, কথা বলতে পারে না, কিছু শব্দ কপি করে, নাক দিয়ে হু হু করে রক্ত পড়ে, হে ফিভার এর কারণে বাইরে যেতে পারে না, রোদে যেতে পারে না, বাইরে গেলে পাগলের মতো ছোটাছুটি করে, পালিয়ে যায়, হারিয়ে যায়, বারবার ইনফেকশন হয়, প্রায় প্রতি মাসে তার এন্টিবায়োটিক লাগে, রাতে ঘুমায় না, বেশি হলে দুঘন্টা ঘুম, তারপর জেগে বসে থাকা, সে ভাত খাক বা পাতা খাক তাতে কোন ফারাক পড়ে না, খাবার সেনসিটিভিটি তুঙ্গে, পান থেকে চুন খসলেই বমি করে, শুকনা পাটকাঠির মতো চামড়া, এক জায়গায় বিশ সেকেন্ডের বেশি বসতে পারে না, ভীষণ হাইপার এক্টিভ, সুযোগ পেলে বাচ্চাদের মারে, ধাক্কা দেয়, কাউকে না পারলে আমাকে মারে, আমার মাথার চুল ছেঁড়া ছিল তার নিত্য নৈমিত্তিক কাজ।

কী আর করা! যেমন মা তার তেমন ছেলে!

আমার জীবনের সেরকম ভয়ঙ্কর সময়ে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি আমার অবস্থার পরিবর্তন ঘটাবো এবং আমি জানি না তা কীভাবে। আমি সিক্রেট এর থেকে দুজন মাষ্টার কে পছন্দ করলাম যাদের থেকে ট্রেনিং নিব ভাবলাম । কিন্তু তাদের কোর্স ফী শুনে আমার মাথায় বাজ ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা। আমি তখনো শেল্টার হোমে।টাকা পয়সা নেই, আয় রোজগার নেই। আমার সঙ্গে যারা শেল্টার হোমে ছিল সবাই প্রায় চলে গেছে ন’মাসের মধ্যে। আমার অবস্থা তখনো সুবিধাজনক না, তাই আমাকে রেখে দিল ষোল মাস।

ভাবলাম বইতে যা লেখা আছে তা চেষ্টা করে দেখি। শুরু করলাম। কিন্তু এরকম একটা নেগেটিভ পরিবেশে থেকে তা সম্ভব নয়। আমি একটু এগোই, আবার কিছু একটা ঘটে তো আবার পিছিয়ে যাই। চারপাশে হতাশ আর হেরে যাওয়া মানুষের হাজার হাজার উদাহরণ। একসময় আমি রিফিউজ এ থাকা অবস্থায় কোর্সে ভর্তি হয়ে গেলাম। একটাই লক্ষ্য, আমাকে এই চক্রব্যুহ থেকে বের হতেই হবে।

আমি যে সংখ্যক ট্রেনিং নিয়েছি আমার একাডেমিক পড়াশোনা ও ডিগ্রি অর্জনের পেছনে, সেই সংখ্যক ট্রেনিং নিয়েছি ব্রেইন এক্টিভেশান, লাইফ ট্রান্সফরমেশন এর জন্য এবং সেই সংখ্যক ট্রেনিং নিয়েছি মেডিটেশন এবং আধ্যাত্মিকতার জন্য। আমি যে পরিমাণ টাকা আমার পড়াশোনার পেছনে খরচ করেছি তা দিয়ে ইংল্যান্ডে দুটো বাড়ির মর্টগেজ নেয়া যায় খুব সহজে।

অনেকের ধারণা যে বাইরে সব পড়াশোনা ফ্রিতে করা হয়। উচ্চতর লেবেলে সব পড়াশোনা নিজের খরচে করতে হয়, কমপ্লিমেন্টারি সকল পড়াশোনা নিজের খরচে করতে হয়, সেমিনার- ওয়ার্কশপ নিজের খরচে করতে হয়।

আমি আমার ইনভেস্টমেন্ট এর ফলাফল পেয়েছি। ফলাফল হলো আমি শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ। আমার কোন রোগ শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েনি, আমি আত্মহত্যার চিন্তা থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত, সম্পূর্ণভাবে ডিপ্রেশন মুক্ত, সম্পূর্ণভাবে থাইরয়েড মুক্ত, আমার স্মৃতিশক্তি এতো প্রখর হয়েছে যে আমি একসাথে চারটি ফুলটাইম কোর্স করেছি এবং প্রত্যেকটিতে আমার মার্ক্স এসেছে নব্বই একশত এর মধ্যে।

এবার আসি ছেলের কথায়। আমার ছেলের শারীরিক যতগুলো জটিলতা ছিল তার একটিও এখন নেই। তার অটিজম আছে কী নেই, সেই বিতর্কে আমি যাবো না, আমি জানি যে বেশকিছু বছর ধরে সে ভালো আছে। সে কথা বলে, গান করে, অভিনয় করে, পিয়ানো শেখে, কারাতে শেখে, সাঁতার শেখে, ঘোড়া চালায়, স্টেজ শো করে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে।

আমি এক বছরের কোর্স করেছি এন্ট্রপ্রনার হবার জন্য এবং বিজনেস আমার ক্ষমতার বাইরে ছিল,  বারো টা এসাই্নমেন্টের একেকটা দু হাজার শব্দের রেফারেন্সসহ, সাথে প্রেজেন্টেশন, সেই সঙ্গে ক্লাস করা, আমার অন্য কোর্স, রোগী দেখা, সিঙ্গেল মা হিসেবে ছেলের ও ঘরের সব দায়িত্ব আমার, তবু আমি এন্ট্রপ্রনার এর প্রতিটি এসাইনমেন্ট এ গড়ে পঁয়ষট্টি করে পেয়েছি। বেশিরভাগ ছাত্রই ফেইল করেছে। অনেকে হতাশ হয়ে কোর্স ছেড়ে দিয়েছে।

যারা ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করেছেন, তারা সবাই জানেন এখানে একটি বিষয়ে পাশ করাটাই কত কঠিন, আর আমি একসাথে চারটি বিষয়ে পরীক্ষা দিয়ে হাই স্কোর নিয়ে পাশ করেছি, সেই আমি যে কিনা ভিটামিন এ কী কাজে লাগে ভুলে গিয়েছিলাম!

সবই ব্রেইন এক্টিভেশান আর অবচেতন মনকে তৈরি করার বিষয়। আমি এখন হোলিস্টিক প্র্যাকটিশনার, নিউট্রিশনিস্ট, নেচারোপাথ, মাইন্ড-বডি কোচ, আধ্যাত্মিক কোচ, অটিজম স্পেশালিস্ট, কিনেজিওলজিস্ট, ট্রমা রিলিজ প্রাক্টিশনার, এন্ট্রাপ্রনার হিসেবে কাজ করি। যেহেতু আমার অনেক অনেক ট্রেনিং নেয়া আছে, আমি যা খুশি তাই নিয়ে কাজ করতে পারি। আমার সেই স্বাধীনতা আছে।

আমি হারলে স্ট্রিট এ প্র্যাক্টিস করছি, অনলাইনে প্র্যাক্টিস করছি। নিজের বিজনেস নিজে দাঁড় করিয়েছি, সেই সঙ্গে দাঁড় করিয়েছি বাংলাদেশে পারিবারিক রেস্টুরেন্ট কেফে আরাফা। বিজনেস পরিকল্পনা আমার, শ্রম দিচ্ছে আমার বাবা -মা, ভাই আর আমাদের কর্মচারিরা। চলছে সফলভাবে। সেই বাবা -মা, যাদের ব্যবসা সম্পর্কে কোন ধারণা নেই, যারা বার বার ভর্তি হচ্ছিলেন হাসপাতালে, বাবার আছে ডায়াবেটিস, কিডনি ফেইলিউর ছিল,  ডিমেনশিয়া প্রাথমিক স্টেজে ছিল, চোখে তেমন দেখতে পান না, চলা ফেরাতেও কষ্ট, কিন্তু রোজ গিয়ে বসেন রেস্টুরেন্ট এ।

আমার এই জার্নিতে আজ পর্যন্ত কারও কাছে হাত পাততে হয়নি। আমি নিজেও জানি না কীভাবে এতো কোর্স ফি ম্যানেজ করেছি, শূন্য থেকে নিজের ব্যবসা দাঁড় করিয়েছি, ছেলের এতো এক্টিভিটিজ এর খরচ দিয়েছি, প্রফেশনাল চাইল্ড মাইন্ডার রাখতে পেরেছি। শুধু জানি আমি যা যা করতে চেয়েছি তা সব হয়ে গেছে বা তার থেকে আরো ভাল কিছু হয়েছে।

আমি মনে করি জীবনের সবচেয়ে দুঃসহ পর্যায়ে আমি খুব সঠিক কিছু সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলাম। আমি শিখেছি সিক্রেট। এসব সম্ভব হয়েছে, কারণ আমি ফলো করেছি সিক্রেট। আমি আমার আর আমার ছেলের মস্তিস্কের বিভিন্ন স্তর এবং অংশকে নিয়ে কাজ করেছি। জন কনফিল্ড, জন আসারাফ, আমান্ডা রবার্টস, এন্ডি হেরিংটন, লুসি জন্সন, মাহমুদ মাওজিদের কাছ থেকে নেয়া ট্রেনিংগুলো বিফলে যায়নি। এরা প্রত্যেকে অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্মেছেন এবং অবচেতন মন ও ব্রেইন ট্রেইনিং এর মাধ্যমে ঘুরিয়ে দিয়েছেন নিজেদের ভাগ্য।

মাহমুদ মাওজি অনেক বড় হবার পর কথা বলতে শিখেছেন তাও আবার তোতলাতেন। অনেক বুলিং এর শিকার হয়েছিলেন। এখন তিনি বিশ্ববিখ্যাত পাবলিক স্পিকার।

আমরা সবাই বুঝেছি নিজের মস্তিস্কের চিন্তা কীভাবে হাই ভাইব্রেশন এবং লো ভাইব্রেশন তৈরি করে, যা কিনা প্রভাবিত করে ল অব এট্রাকশানকে। আপনি যা খাবেন তার বাইরে আপনি আর কিছু নন। আপনি যা ভাবেন তার বাইরে আপনি আর কিছু নন। আপনি যা ভাবেন, আপনি তাতেই পরিণত হন। আবার আপনি যা চান না, তাতেও আপনি পরিণত হন। আমরা যারা ব্রেইন নিয়ে ট্রেনিং নিয়েছি আমরা শিখেছি কীভাবে শুধু যা চাই, তার ওপর ফোকাস করতে।

সিক্রেট শেখার আগে আমি অনেক কিছু চেষ্টা করেছি আমার ছেলের জন্য। ওকে সুস্থ করার জন্য। কিন্তু কিছুটা ভাল হতো, আবার হয়তো একটু ঠাণ্ডা লেগে গেল, সেখান থেকে ইনফেকশন বা দাঁতে ব্যথা বা অন্য কিছু আবার সব কিছু পিছিয়ে যেত। আমি তখনও ওকে সাপ্লিমেন্ট, থেরাপি দিচ্ছিলাম, কিন্তু কোন মাসে ভালো তো কোন মাসে আবার কিছু না কিছু হতো।

অনেক রোগী আমার কাছে এসে একই কথা বলে। আমি যখন থেকে নিজের ব্রেইন ওয়ার্ক এবং মাইন্ড ওয়ার্ক করা শুরু করেছি, দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করলো। আমি খুব দ্রুত পরিবর্তন দেখতে পেলাম এবং ওর স্বাস্থ্য উন্নত হওয়া শুরু করলো।

এতোকিছু বললাম যে সিক্রেট নিয়ে এবার আসা যাক, এই সিক্রেট আসলে কী! সিক্রেট এর প্রথম শর্ত হলো, বিশ্বাস। দ্বিতীয় শর্ত হলো, সারেন্ডার করা। তৃতীয় শর্ত হলো, প্রকৃতির সবকিছুকে, সব মানুষকে, যে যে পর্যায়ে, যে বিশ্বাসে, জীবন যাপন করছে সে হিসেবে তাদের গ্রহণ করা। চতুর্থ শর্ত হলো, আপনি যে অবস্থায় যেভাবে আছেন তার জন্য সন্তুষ্ট থাকা।

যত সহজ মনে হোক না কেন তত সহজ নয়। আমরা আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী পরের ঘটনাবলী যাচাই করি। যেকোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের অবচেতন মনে একটা বিশ্বাস তৈরি হয়, কিছু প্রোগ্রাম তৈরি হয়, হয়তো আপনি হেরে গেছেন একবার , আপনার মনে প্রোগ্রাম তৈরি হয়ে যেতে পারে যে, আমি আসলে অত ভাল না। তারপর হয়তো আবার হেরে যান। পরিণত হয় বিশ্বাসে। তারপর জীবনে হেরে যাবার অনেক অনেক ঘটনা বারবার ঘটতে থাকে।

সিক্রেট হল ল অব এট্রাকশান। তা পরিচালিত হয় আপনার অবচেতন মন দ্বারা। আপনি যা বিশ্বাস করেন, তাই এট্রাক্ট করেন। আপনার অবচেতন মন আপনাকে ৯৫ ভাগ পরিচালিত করে। মাত্র পাঁচ ভাগ আপনার কনশাস মাইন্ড। অবচেতন মনকে পরিবর্তন না করে যারা সিক্রেট প্র্যাক্টিস করার চেষ্টা করেন, তারা সফল হোন না এবং তখন বলেন যে এটা কোন কাজ করে না।

অনেকে হয়তো সারা দিন বলছেন যে, আমি অনেক টাকা চাই, বা আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হতে চাই, কিন্তু হয়তো আরো বেশি দরিদ্র হচ্ছেন বা বেশি অসুস্থ হচ্ছেন। কারণ আমি অনেক টাকা চাই বা সুস্থ হতে চাই মানে, আপনার একই টেপ রেকর্ড চালু করছেন যে, আমার আসলে টাকা নেই বা আমি সুস্থ নই। ফলে আপনি এট্রাক্ট করছেন আরও দারিদ্রতা বা আরো অসুস্থতাকে।

অসুস্থ হলে আপনাকে চিকিৎসা করাতে হবে, সেখানে টাকা খরচ হবে, আপনার বাজেটে টান পড়বে, আপনার ভয় লাগা শুরু হবে যে কীভাবে আপনি মাস চালাবেন, স্ট্রেস হরমোন সিক্রেট হওয়া শুরু করবে, এবার ভয়টা ফিজিক্যালি আপনাকে আঘাত করছে, আপনি বিমর্ষ হওয়া শুরু করবেন, এবার পরিবারের সঙ্গে খিটমিট শুরু হবে হয়তো, এবার হয়তো আপনার কাজের পারফরমেন্স খারাপ হওয়া শুরু করবে। সমস্যা গভীর থেকে গভীরতম হতে থাকে। আপনি হয়তো সব সমস্যার কারণই জানেন, কিন্তু জানেন না এর থেকে পরিত্রাণের উপায়!

সিক্রেট সম্পর্কে সব সময়ই সারা পৃথিবীর বড় বড় মনিষীরা জানতেন। খৃস্টপূর্ব তিন হাজার শতকে ও প্রাচীন নথিপত্রে সিক্রেট সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাচীন মিশরীয়রা এবং ব্যাবিলনীয়রা জাতিগতভাবে সিক্রেট প্র্যাক্টিস করতেন এবং মনে করা হয় যে এ কারণেই তারা পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য পিরামিড এবং ব্যাবিলনের ঝুলন্ত বাগান এর মতো জিনিস সৃষ্টি করতে পেরেছেন।

ব্যাবিলনীয়রা ছোট একটি জাতি হলেও তারা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ধনাঢ্য জাতি। মাস্টার ট্রেইনারদের তথ্য অনুসারে আমেরিকার নাসা, অলিম্পিক টিম ব্যবহার করে সিক্রেট বা বডি -মাইন্ড টেকনিক।

আমি নিজেই প্রথম দিকে অবাক হতাম আমার কাছে যখন বিখ্যাত মানুষরা আসা শুরু করেছিলেন ট্রিট্মেন্ট নিতে। তারা তো সফল! পরে বুঝতে পারলাম তারা প্রত্যেকে সব সময় ভিজুয়ালাইজেশন টেকনিক ফলো করে, অবচেতন মন বদল করে, ভিশন বোর্ড ফলো করে, প্রতিটা নতুন প্রজেক্ট এর আগে তারা এসে মাইন্ড সেট করে যায়।

আমার ক্লায়েন্ট দের মধ্যে একজন আছেন যিনি ম্যারাথনে তৃতীয় হতে পেরেছিলেন। এতো বেশি নার্ভাস ছিলেন যে, যেতে চাচ্ছিলেন না। বেশ কিছু সেশনের পর তিনি কনফিডেন্স এর সঙ্গে দৌড়ালেন এবং তৃতীয় হলেন।

একজন স্টুডেন্ট এসেছিলেন যিনি বারবার ফেইল করছিলেন এবং তার পাশ করাটাই বেশ কঠিন ছিল। বেশকিছু সেশনের পর যে পরীক্ষা দিলেন, তাতে উনি খুব ভালো স্কোর নিয়ে পাশ করেছেন এবং এখন পিএইচডি করছেন। আরেকজনের কথা না বললেই নয়, যিনি চাকরি হারানোর পর আর চাকরি পাচ্ছিলেন না, এনগেজমেন্টও ভেঙ্গে গিয়েছিল। মা ও ভাই এর সঙ্গে চরম ঝগড়া চলছিল। আমার কাছে যখন এসেছিলেন তখন অনেক হতাশ। কিছু সেশন নেয়ার পর পার্টনার ফেরত এলো, মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হওয়া শুরু করলো, দুবাই এর এক বিখ্যাত কোম্পানিতে চাকরি হয়ে গেল। সবই সম্ভব হয়েছে মাইন্ড এক্টিভিশনের মাধ্যমে।

আজকের এই লেখার কারণ এক দায় থেকে। মানুষ আমাকে অনেক লেখে। অপরিচিত মানুষ তাদের জীবনের গল্প লেখে। সাহায্য চায়। আমি খুব করে অনুভব করছি আমার সফলতার সিক্রেট মানুষকে জানানোর জন্য। কত মানুষ আমাকে লেখে! অনেকে আমার লেখা পড়ে উপকৃত হয়েছেন, অনেকে তাদের জীবনের গল্প আমাকে জানান, অনেকে সাহায্য চান। ইচ্ছে করে সবাইকে সাহায্য করতে।

কিন্তু আমাকেও নিজের জীবিকা অর্জন করতে হয়। আমি একা লড়াই করে বিদেশের মাটিতে জিতে গিয়েছি। কত মানুষ প্রতিদিন হার মেনে নিচ্ছে, মানসিক রোগীতে পরিণত হচ্ছে বা আত্মহত্যা করছে। আমি অনেককেই আত্মহত্যার প্রবণতা থেকে বের করে আনতে সফল হয়েছি। সবচেয়ে কঠিন ছিল এক ছেলে যার বাবা আত্মহত্যা করেছে যখন তার বয়স বাইশ বছর ছিল। আমার মনে হয় প্রত্যেকের মাইন্ডসেট টেকনিক জানা দরকার।

আমি বাংলাদেশে ২২ আগস্ট বৃহস্পতিবার বিকাল তিনটা থেকে শাহবাগে মাইন্ডসেট নিয়ে সেমিনার করাবো মাইন্ড শিফটিং করানোর জন্য। এটা কোনো আলোচনা সভা নয়, যে আমি শুধু বলে গেলাম, আর আপনারা শুনে গেলেন, এটা প্রপার মাইন্ডসেট ট্রেইনিং। মাত্র তিন হাজার টাকা ডিনারসহ। আমি এই ট্রেনিংগুলো শিখেছি কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে। আমার ক্লায়েন্টরা অনেক টাকা ফিস দিয়ে আমার কাছ থেকে সেশন নেন। আমি জানি বাংলাদেশের সবার পক্ষে এই টাকা দেয়া সম্ভব নয়। তাই অনেক ভেবে আমি সেমিনার এর আয়োজন করছি। যে কোনো একটি বিষয় ঠিক করে আনবেন যা আপনি এই মুহূর্তে খুব জরুরি মনে করেন আপনার জন্য।

একই দিনে আমি শিশু স্বাস্থ্য নিয়ে সকাল বেলা আরেকটি সেমিনার করছি। খাবারের পুষ্টিগুণের পাশাপাশি শেখানো হবে কীভাবে কিছু থেরাপির মাধ্যমে শরীরের জরুরি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করাতে সক্ষম হবেন, শরীর বিষাক্ত পদার্থ নিজে থেকে কীভাবে বের করে দেবে। বাংলাদেশে যে পরিমাণ ভেজাল খাদ্য-দ্রব্য খাওয়া হয়, আমার মনে হয় সবার এধরনের টেকনিকগুলো জানা প্রয়োজন। এই সেমিনারের রেজিস্ট্রেশন ফি মাত্র এক হাজার টাকা।

মনে রাখবেন, আপনি যা খাবেন আপনি তাই, আপনি যা ভাবেন, আপনি তাই। আমি অনুরোধ করবো সেমিনারগুলো বুকিং দিতে। বাংলাদেশে হয়তো সেমিনারের মাধ্যমে ট্রিটমেন্ট এর কনসেপ্টটি নতুন। কিন্তু পাশ্চাত্যে অনেকদিন ধরেই চলছে।

মনে রাখবেন নিজের সুস্বাস্থ্য ও সফলতার জন্য এটা আপনার অনেক বড় পদক্ষেপ। জীবনে সবসময় অন্যের ওপর নির্ভর না করে বা অন্যকে দোষারোপ না করে কখনো কখনো নিজের দায়িত্ব নিজেকে নিতে হয়। আমাকে ফেসবুকের মেসেঞ্জার এ মেইল করতে পারেন। আমি বারবার বলি জীবনে হেরে যাওয়া বলে কিছু নেই। এক জার্নি শেষ হয় তো আরেক জার্নি শুরু। পরের জার্নিটি যেন আগেরটি থেকে ভালো হয় সেই চেষ্টা করাটাই শ্রেয়। অনেক ভালবাসা সবার জন্য।

E-mail: [email protected]

শেয়ার করুন:
  • 6.6K
  •  
  •  
  •  
  •  
    6.6K
    Shares

লেখাটি ১৭,২৮১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.