ব্রোকেন ফ্যামিলি, এক নিষ্ঠুর নিয়তি!

0

তাসলিমা শাম্মী:

“শুধুমাত্র বাবার মতো দেখতে হয়েছি বলে আমাকে কেউ ভালবাসে না এই পৃথিবীতে।”

কথাগুলো বলছিল প্রমা। শায়লার মতো প্রমার সাথেও আমার পরিচয় হয় পেন্সিলে। একদিন ম্যাসেঞ্জারে প্রমা আমার সাথে কথা বলতে চায়।
কথা না ঠিক, সে আমাকে লিখে…
“আপু আমাকে একটা কল দিবেন প্লিজ! আমি একটু কাঁদবো।”

আমি খুব অবাক হই এই মেসেজটা পেয়ে। সত্যি কথা বলতে একা একা থাকাতে মাঝে মাঝে আমারও খুব ইচ্ছে করে ভার্চুয়ালিই হোক না কেন, অনুভূতি সম্পন্ন কিছু মানুষের কাছাকাছি হতে।

প্রমার বয়স উনিশ। উনিশ বছরের প্রমা তার বুক জুড়ে কষ্টের হিমালয় বহন করে চলছে।

আমার ধারণা, কিছু কিছু মানুষের কষ্টটুকু মাপার জন্যই বিধাতা মনে হয় মেঘ সৃষ্টি করেছেন! কষ্টের মেঘগুলো ভারী হতে হতে মনে হয় বৃষ্টি হয়ে নেমে আসে! কষ্টের বিশালতা বুঝানোর জন্য সম্ভবত তিনি সমুদ্র বানিয়েছেন! জোয়ার ভাটার সাথে নিজেকে কিছুটা হালকা করতে চায় সেই কষ্টগুলো! বুকে জমতে থাকা পুঞ্জিভূত জমাটবাঁধা কষ্টের খণ্ড বিখন্ড হওয়া দেখাতে গিয়ে মনেহয় বিধাতা শিলাবৃষ্টি ঘটিয়ে যান সময়ে সময়ে!

প্রমা সেদিন একা কাঁদেনি। প্রমা যখন কাঁদছিল, চিৎকার করে কাঁদছিল, হাজার হাজার মাইল দূরের কোন এক শীতের দেশের কফির মগের বিকেলটাকে ভারী করে আমার চোখেও কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি জমেছিল।

প্রমা একটা বোকা মেয়ে। বোকা না হলে কি মানুষ এমন করে সম্পূর্ণ অজানা অচেনা একজন মানুষের কল্পনার কয়েকটা লাইনের গল্প পড়ে পড়ে আকুল হয়ে তাঁকে ভালবেসে ফেলে!

“জানেন আপা, শুধুমাত্র আমার বাবার মত হয়েছি বলেই আমি কোনদিন কারো ভালবাসা পাইনি! কিন্তু আমার কী দোষ ছিল বলেন? আমি কোনদিন কারও কাছে এই উত্তরটা চাইনি যে, আমার দোষটা কী?

মায়ের কাছে শুনেছি আমার বাবা নাকি মাকে প্রচণ্ড রকমের ভালবেসে বিয়ে করেছিল। পরে বড় হতে হতে বুঝতে পেরেছি কেন আমার মা ভালবাসা, প্রেম এসবের কথা শুনলে অবিশ্বাস নিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিত!

মা আমাকে খুব ভালবাসে। মা তো তাঁর সন্তানকে ভালবাসবেই এটা নিয়ে আমার কিছু বলার নাই। কিন্তু মাঝে মাঝে দেখতাম আমার মুখের দিকে তাকালে মায়ের চোখে কষ্ট দানা বেঁধে উঠতো। মা হয়তো সহ্য করতে পারতো না আমার চোখ আর মুখ জুড়ে থাকা বাবার ছায়াটাকে। অথবা বলা যায়, মাঝে মাঝে মন খারাপের ক্ষণগুলোতে আমার দিকে তাকালে মায়ের মনে পড়ে যেত তাঁর ভালবাসার মানুষটাকে। মায়ের চোখমুখের সেই ছোপ ছোপ নীরব কষ্টটাকে আমি ভীষণ রকমের ভয় পেতাম। নিজেকে আয়নাতে দেখতে ভয় হতো আমার। কোন অপরাধ না করেও ভীষণ রকমের অপরাধী মনে হতো নিজেকে।

আমার মা ছিল নানা নানু আর মামাদের ভীষণ আদরের। বিয়ের পর মাকে তাঁর নতুন সংসারের মানুষগুলো ঠিকমতো আপন করে নিতে পারেনি।

কিছুদিন যেতে না যেতেই বাবার সেই আকাশ সমান ভালবাসা মাটিতে নুয়ে পড়তে শুরু করে। আমার মাও বিশ্বাসভঙ্গের কষ্টে কষ্টে পাথর হয়ে যেতে শুরু করে। ভালবাসার মানুষটার কাছ থেকে অবহেলা কি মানুষ সহ্য করতে পারে বলেন?

আচ্ছা আপা, একজন মানুষের ভালবাসা কীভাবে এতো দ্রুত শুকিয়ে যায়? আমার কি মনে হয় জানেন? আমার মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল হচ্ছে মানুষের মন! এত্তো এত্তো সমীকরণের ভিড়ে জটিল আর কুটিলতায় ভরা হচ্ছে মানুষের মন। আমার বাবার মনটা যদি সেসময়ে পরিবর্তন না হতো, তাহলে আজকে আমার জীবনটা অন্যরকম হতেও পারতো!

প্রচণ্ড কষ্টে কষ্টে মা শুকিয়ে যেতে থাকে। সবচেয়ে বেশি কষ্টটা মা পেয়েছিল আমার স্বার্থপর বাবার কাছ থেকে। বাবা নাকি পরিবারের অন্যদের কাছে নিজেকে সুপুরুষ প্রমাণ করার জন্য মায়ের সাথে কাপুরুষের মতো আচরণ করতো। বাবা আমার মাকে সবার সামনেই চড় থাপ্পড় থেকে শুরু করে শাসনের নামে অপমান করতেও ছাড়তো না।
আমি তখনো মায়ের পেটে, আমার আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা মাকে বাবা একদিন প্রচণ্ড মারে, প্রচণ্ড মারে আপা। মার সহ্য করতে না পেরে আমার মা এক কাপড়ে, খালি পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসে। নানুর বাসায় আসার পর আমার ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, ক্ষুধার্ত মাকে দেখে তাঁর বাবা মা আর ভাইয়েরা ক্রোধে ফেটে পড়ে।

সেদিন থেকেই মূলত আমি আমার জন্মদাতা পিতার পাপের অংশীদার হয়ে যাই! মায়ের শরীরের ভিতরেই আমি আমার আজন্ম পাপটুকু নিয়ে পৃথিবীতে আসার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি।

দুঃখিত আপা, আমার খুব কান্না পাচ্ছে। কিছুক্ষণ কাঁদবো।”

প্রমা কাঁদুক। আমারও বুকে বাষ্প জমতে শুরু করেছে ততক্ষণে।

প্রমা একজন ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তান।

“ব্রোকেন ফ্যামিলি” – এই শব্দটা নিয়ে আমার একটু দ্বিধা আছে। ব্রোকেন ফ্যামিলি বলে কি আসলেই কিছু থাকে? একজোড়া দম্পতির যখন একসাথে থাকাটা অসম্ভব হয়ে পড়ে, দুজনে তখন তাদের নিজ নিজ পথ খুঁজে নেয়। তাঁরা আলাদা আলাদা করে নিজেদের জীবনকে পূর্ণভাবে গুছিয়ে নেয়। কেউ তখন আর ব্রোকেন লাইফে থাকে না। কিন্তু প্রমারা সারা জীবন এই অভিশপ্ত “ব্রোকেন ফ্যামিলি” নামক দুঃখবোধটাকে বয়ে চলে!

প্রমার জন্মের পরেই ওর বাবা-মার বিচ্ছেদ হয়ে যায়। প্রমার মা পরিবারের আশ্রয়ে থেকে পড়াশুনাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অথবা বলা যায়, নতুন করে নিজেকে গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নানুর বাসার সাহায্যকারী মেয়ের কাছে যত্নআত্তিতে বেড়ে উঠতে থাকে অবুঝ প্রমা। নানুর বাসার অন্য মানুষদের যত্নেরও কমতি ছিলো না। কিন্তু যত্নের চেয়েও একজন মানুষ আদরের কাঙ্গাল থাকে বেশি!

একটা ভয়ংকর সত্য কথা কি জানেন? জন্মগতভাবে আমরা মা বাবার দুজনেরই ভালবাসার অধিকার নিয়ে জন্মাই।

আপনি যখন পাশের মানুষটাকে আর সহ্য করতে পারবেন না বা যখন ভাববেন যে আপনার পাশের মানুষটি আপনার জন্য আর নিরাপদ নয়, তখন খুব জরুরি নয় সেই সম্পর্কটাকে টেনে নিয়ে যাওয়া।

কিন্তু ভুল মানুষটির সাথে আপনার সন্তানটির একটা বন্ধন! এটা একটা অদৃশ্য নিয়তি…যা ছিন্ন করার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা নিজের হাতেই নিয়ে খেলছেন! কী হবে তার! সেই উত্তর আমার জানা নাই।

প্রমা আবার বলতে শুরু করে…

“আমার যখন পাঁচ বছর বয়স, মায়ের বিয়ে হয়ে যায়। সেই সময়টাতে রাতের বেলা আম্মুকে খুব মিস করতাম আপু, কিন্তু কাউকেই কিছু বলতাম না।

আমি খুব শান্ত বাচ্চা ছিলাম আপু, দুষ্টুমি করতাম না। সবার সব কথা শুনতাম। কেউ কখনোই আমাকে বকা দিত না। মামা-মামি আর নানু-নানারা কিছু চাওয়ার আগেই কিনে দিত, কোথাও যেতে পারমিশনের জন্য জোরাজুরি করতে হতো না।

আমার নিজের একটা রুম ছিল, আমার দুনিয়া ছিল সেটা। সেই দুনিয়াতে আমিই ছিলাম আমার সবকিছুর একমাত্র সাক্ষী।

আমি সাক্ষী আপু, আমার খুব বকা খেতে মন চাইতো। আমার খুব ইচ্ছে করতো বন্ধুদের সাথে বেড়াতে যাবার অনুমতি নিয়ে বাবা আর মায়ের কাছে আবদার করতে।

আরো অযুত লক্ষ নিযুত বলতে না পারা কষ্ট! নীরব কষ্ট, শব্দে বন্দী না হতে চাওয়া কষ্ট আছে আপু। জীবনে প্রথমবারের মতো শুধু আপনাকেই কেন জানি খুব বলতে ইচ্ছে করছে সেসব!

আমি কোনদিন কাউকে বলিনি আপা, কেন আমি আমার মায়ের সংসারে যাই না। মায়ের সুখের সেই সংসারে আমার কোন অযত্ন নাই। কিন্তু আমার নিয়তি! আমার চেহারা জুড়ে যে পুরোটাই বসে আছে আমার মায়ের অতীত! মায়ের ভুলতে চাওয়া কষ্টের অতীত!

এতো বললাম অদৃশ্য নিয়তির কথা! দৃশ্যত ভয়ংকর সত্যটা হচ্ছে, সেই সংসারে আমার পরিচয় “রমার আগের ঘরের মেয়ে!” এটা সহ্য করতে পারি না আপু।

এ লেভেল দেওয়ার পর বাবার সংসারে যাই কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে। বাবারও বিশাল সাজানো সংসার। প্রচুর মানুষ ঘোরাফিরা করছে, হাসছে, কথা বলছে, আমাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে, ভালবাসা দিচ্ছে। কিন্তু কোথায় যেন কিছু একটা নাই, যেটা থাকার কথা ছিল!
অদ্ভুতভাবে সেই সংসারেও শুনতে পাই, আমি বাবার আগের ঘরের বাচ্চা!

সে বাড়িতে দুইদিন থাকার পর এক বিকেলে বাবার সহধর্মিণী আমাকে নিয়ে উনার মনের অজানা আশঙ্কার কথাটি জানায়। উনি আমাকে ঘরের এক কোনে টেনে নিয়ে বলে, আমার চেহারা দেখতে যে অবিকল আমার বাবার মতো, এই সুযোগটা যাতে আমি না নিই! এটা নিয়ে উনারা খুব ভয়ে আছেন।

আমার কী দোষ! কী অপরাধ আমার? আমি কেন এই পৃথিবীতে এসেছি আপু, বলতে পারেন? আমি তো নিজে নিজে তো কারো ঘরের দরজা ঠেলে ঢুকে পড়িনি! তাহলে কেন আমি অনাহুত সবার কাছে!

বাবা দিবস, মা দিবসের ভিড়ে আমাদের বুকের ভিতরে যে গভীর একটা ক্ষত আছে, সেসব নিয়ে কেন কোন দিবস নাই আপা বলতে পারেন? আমরা ব্রোকেন ফ্যামিলির বাচ্চারা যে অপূর্ণতা নিয়ে বেঁচে থাকি সেসব কষ্ট নিয়ে কি কোন কাব্য হয় না? কোন গল্প হয় না?”

প্রমা কাঁদছে…..আকুল হয়ে কাঁদছে। প্রমা কাঁদুক।
আমার ক্ষমতা নাই প্রমার নিয়তি বদলে দেবার।
প্রমাকে সান্ত্বনা দিয়ে কিছু বলার ক্ষমতাও আমার নাই।

প্রমার মায়ের একটা পূর্ণ ফ্যামিলি আছে।
প্রমার বাবার একটা পূর্ণ ফ্যামিলি আছে।
শুধু প্রমারাই “ব্রোকেন ফ্যামিলি” সিল কপালে আর মহাশূন্যের সমান হাহাকার বুকে নিয়ে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকে। কী অদ্ভুত, তাই না?

আমি প্রমার গল্প লিখিনি কিন্তু। প্রমাদের কষ্টের গল্প কোন শব্দে বন্দি করার ক্ষমতা আমার নাই।

শেয়ার করুন:
  • 4.6K
  •  
  •  
  •  
  •  
    4.6K
    Shares

লেখাটি ৯,১৩৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.