শুধু পদ্মা সেতু নয়, স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারও উন্নয়ন!

0

সামিনা আখতার:

সেদিন ফেসবুকে একটা পোস্ট দেখে খুব হতাশ হয়েছিলাম। পোস্টটা ছিল আমার পরিচিত এনজিও সেক্টরেরই একজনের। তার সাথে আমি সরাসরি কাজ করিনি, কিন্তু একসাথে ট্রেনিং করেছি। তার নাম উল্লেখ না করি।

এনজিওগুলোতে কর্মিদেরকে নারী বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে যথেষ্ট উদ্যোগ নেয়া হয়। আর সেজন্য কর্মিরা বিশেষ করে ঊর্ধ্বতন পদে যারা কাজ করেন, তারা নারীবাদি না হলেও অন্ততঃপক্ষে তাদেরকে সরাসরি দোষারোপ করে কথা বলেন না। কিন্তু সেই লেখাটাতে ওনার আক্ষেপ ছিল যে, অনেক নারীবাদি দুর্যোগের ত্রাণ সামগ্রীতে স্যানিটারি প্যাড যোগ করেন, কিন্তু যা কাজে লাগে না, কারণ ঐ দুর্যোগপীড়িত মানুষেরা আসলে প্যাড ব্যবহারে অভ্যস্ত নয়। ওনার কথায় এই প্রকল্পগুলো শেষে ব্যর্থ হিসাবে পরিগণিত হয়।

বাংলাদেশে ত্রাণ সামগ্রীতে স্যানিটারি প্যাড সংযোগ করা নিয়ে অনেক গল্প, কিছু ট্রল আবার অনেক সত্য ঘটনা আছে আমি জানি। তবে এনজিও সেক্টরে ২০ বছর কাজ করার সুবাদে আমি এও জানি যে, শুধুমাত্র প্যাড প্রকল্প ছাড়াও কত শত অন্য প্রকল্প বাংলাদেশে ব্যর্থ হয়েছে।

সামিনা আখতার

আমার নিজের করা এক প্রকল্পের অভিজ্ঞতার কথা বলি। কুড়িগ্রামে আমরা তখন নদীর কাছাকাছি যে স্কুলগুলোতে সব সময়ই বন্যাক্রান্ত মানুষ আশ্রয় নেয়, সেগুলো আপগ্রেড করলাম। তার মানে ঐসব স্কুলে প্রয়োজন মাফিক পায়খানা, গোসলখানা, প্রতিবন্ধীদের জন্য উঠার সিঁড়ি ইত্যাদি করলাম। কিন্তু দেখা গেল যে, বন্যা শুরু হতে না হতেই গ্রামগুলোর স্বেছাসেবীদের কাছ থেকে ফোন আসতে শুরু করলো, ‘আপা, অমুক পরিবার স্কুলে চলে যেতে চাচ্ছে, এখন কী করবো?’

আমি আমার ব্যবস্থাপনা দক্ষতা দিয়ে আপাতত সামলিয়ে নিয়ে বললাম, ‘এই সিদ্ধান্ত নেবে স্থানীয় সরকার, এখনি স্কুল বন্ধ হয় এমন কোনো উদ্যোগ নেয়া যাবে না।’

ঐ প্রকল্পকে ব্যর্থ বলা যাবে না, কিন্তু এটা নিশ্চিত যে শিক্ষার উপর প্রভাব ফেলার জন্য সেটা ‘পুল ফ্যাক্টর’ হিসাবে কাজ করেছে। এরকম আরও অনেক উদাহরণ দেয়া সম্ভব। সুতরাং সব দোষ নন্দঘোষের মত নারীবাদিদের দোষ টেনে আনা মানে সেই পুরুষতান্ত্রিকতারই পরিচয় দেয়; যেটা মানবিক নয়, তাই কাম্যও নয়। আর নারীবাদ শুধুমাত্র নারীরা বলছে এমন কোন মতবাদ নয়, এটি একটি মানবিক মতবাদ, তাই পুরুষ নারী যে কেউ এর পক্ষে কথা বলা, লেখা বা কাজ করতে পারে। করছেও।

২০১১ এর শেষে খুলনা সাতক্ষীরায় জলাবদ্ধতা নিয়ে আমি কাজ করি। সেখানে আমাদের কাজের আওতার বাইরেও আমি কয়েকটি কিশোরী দল, নারীদের দলের সাথে কথা বলেছিলাম এইটি জানার জন্য যে, এই দুরবস্থায় তারা কিভাবে তাদের পিড়িয়ডকে ম্যনেজ করছে! সেই সময়েই আমি পেয়েছিলাম প্রায় ৭০ শতাংশ নারী ‘নিরাপদ’ নামের একটি অপেক্ষাকৃত সস্তা প্যাড ব্যবহার করে। আমিও সেসময় অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। যতদূর মনে পড়ে তখন ৩০/৩৫ টাকা দাম ছিল ওই প্যাডের।

তবে সেখানেই শেষ নয়, ওই আলোচনা করতে গিয়ে বেরিয়ে এলো আরও সব ভয়াবহ বিষয়। তারা জানালো, এই প্যাড নিয়ে এখন তারা বিপদে আছে, কারণ ব্যবহারের পর সেটি ফেলার জায়গা নেই, যেহেতু চারিদিকে পানি আর পানি। স্বাভাবিক সময়ে তারা এই প্যাড মাটির নিচে পুঁতে ফেলে। কিন্তু এখন তো পুরো এলাকা জলাবদ্ধ। আরও গভীরে আলোচনা করে বুঝতে পারলাম, এই নোংরা পানি তাদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতায় ব্যবহার করে অনেকেই নানান চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছেন।

আমাদের এনজিও বিশ্বে “অংশগ্রহণ” একটা কথা আছে। এর অর্থ হলো যার জন্য কার্যক্রম তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমেই তার সমাধান করতে হবে। সেটা সত্য, কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি মানুষের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের সাথে একাডেমিক জ্ঞানের মিলনের মাধ্যমেই সমাজের সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হয়।

আমি সেদিন ওই প্রত্যেকটি দলেই প্রশ্ন করেছিলাম, “এই প্যাড ব্যবহারের পর ফেলার সমস্যার বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা যায়?” এর সঠিক কোনো সমাধান সেদিন ওরা কেউই দিতে পারেনি। পারবে কীভাবে! কারণ বিশ্বের বড় বড় দেশগুলোতে সাধারণ সময়ে ময়লা ব্যবস্থাপনা (Waste Management) কীভাবে করা হয় আর বিশ্বের খ্যতিমান সংস্থাগুলো বড় বড় দুর্যোগে কীভাবে এই ব্যবস্থাপনা করছে, তার ধারণা ওদের কেন, আমাদেরই নেই।

আমি উপরের কথাগুলো বললাম এইজন্য যে, আমরা অনেক সময় একটা ধারণা নিয়েই পড়ে থাকি, বদলাতে চাই না। অথচ সমাজের জন্য ভালো কিছু করতে হলে প্রতিনিয়ত সমাজের চাহিদাগুলোকে মাথায় রেখে নতুন ও বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হয়। নতুন নেয়া পদক্ষেপের ভালমন্দও যাচাই বাছাই করতে হয় প্রতিনিয়ত।

আগের প্রজন্ম স্যনিটারি প্যাড ব্যবহার করেনি বলে পরের প্রজন্মও ব্যবহার করবে না? তাহলে প্যাড ব্যবহারের সাথে কি উন্নয়নের সম্পর্ক নেই? উন্নয়ন কি সব পদ্মা সেতু নির্মাণে? অথচ নারীর এই বিষয়টাকে মাথায় রেখে এর উপর সরকারের ভর্তুকি দেয়া উচিত; অন্ততঃপক্ষে দরিদ্র পরিবারের জন্য। সচেতনতা সৃষ্টিতেও আরও যথেষ্ট পরিমাণে কার্যক্রম নেয়া জরুরি।

শেষ করার আগে বলি, সেদিন ওই কিশোরী দলে আলোচনায় যে কয়টি মেয়েকে পেয়েছিলাম প্যাড ব্যবহার করে না, তাদের একজনকে কেস হিসাবে নিয়ে তার সাথে আলাদা বসেছিলাম তার অবস্থাটি আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য। বাবা দিনমজুর,পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি। তিন চারজন ভাইবোন আর মা নিয়ে ওদের সংসার। সংসারে অভাব লেগেই আছে। তার প্যাড কেনার বিষয়ে পরিবারে কখনই কোন আলোচনা হয়নি, কিন্তু সে কেমন করে যেন বুঝে নিয়েছে, তার প্যাড তার পরিবার কিনে দিতে পারবে না। যদিও সে জানে তার প্রতিবেশি মেয়েরা অনেকেই প্যাড ব্যবহার করে। আর ওরাও জানে সে প্যাড ব্যবহার করে না। আর একটু এগিয়ে আলোচনায় জানলাম, বাবা বিড়ি বা সিগারেট খায়। “দিনে কয়টা খায়?” “অনেক বার”।

ফিরে আসবার পুরোটা পথে ওর পুষ্টিহীন শীর্ণ শরীর আর অসহায় দুটো বড় বড় চোখ আমি ভুলতে পারলাম না। আর মনে হোলো ঐ ছোট্ট দরিদ্র পরিবারটিতেও উপার্জনকারী বাবাই রাজাধিরাজ। তার সারা মাসের সিগারেটের টাকা জুটলেও একটা স্যানিটারি প্যাডের টাকা জুটে না। ওর ছোট্ট দুটো হাত প্রতিদিন সামলায় এই রক্তের স্রোত।

ঐ দরিদ্র পরিবার আর আমার রাষ্ট্রের মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে?

শেয়ার করুন:
  • 616
  •  
  •  
  •  
  •  
    616
    Shares

লেখাটি ৬১১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.