যদ্দিন মেয়ে জন্ম, তদ্দিনই দুর্ভোগ

0

সরিতা আহমেদ:

কেয়া দাসকে খুন হতে হলো, কারণ – জিন্স প্যান্ট – টিশার্ট পরা ও পরিবারের সম্মান রক্ষা।
জায়রা ওয়াসিমকে অভিনয় ছাড়তে হলো, কারণ – ঈমান রক্ষা।

আপাতভাবে ভিন্ন ধর্মে ঘটা দুটো আলাদা ঘটনা, শিকারি – গোঁড়া পুরুষতন্ত্র, শিকার – নারী এবং ফলাফল – মৃত্যু।
কেয়া দাসের আত্মহত্যা (যদিও প্রমাণ সাপেক্ষ) যেমন মার্ডার। তেমনি জায়রা ওয়াসিমের সিদ্ধান্তও তাঁর মানবাধিকারের মার্ডার।
শুধু বায়োলোজিক্যালি নিশ্বাস বন্ধ হওয়াই মৃত্যু না, স্পিরিচুয়াল ডেথকেও মৃত্যুই বলা হয়।

জায়রা ওয়াসিম আজ কোরান উদ্ধৃত করে যা বলছেন ” “কোরানের বিশাল এবং ঐশ্বরিক জ্ঞানের মধ্যে আমি তৃপ্তি এবং শান্তি খুঁজে পেয়েছি। প্রকৃতপক্ষে হৃদয় তার সৃষ্টিকর্তার জ্ঞান, তাঁর গুণাবলী, তাঁর করুণা এবং তাঁর আদেশের জ্ঞান অর্জনে শান্তি পায়।” সেটা তাঁর মুখ দিয়ে বলিয়ে নিচ্ছে প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাসের গোঁড়ামি যার কাণ্ডারি মোল্লাতন্ত্রের জনক-স্রষ্টারা যাঁদের কুটিল মন্ত্রণা পরিচালিত ও যুগে যুগে বাহিত হচ্ছে ব্রেনওয়াশ হওয়া নারীদের দ্বারাই।

ঠিক যেরকম কেয়া দাসের শ্বশুর বাড়ির লোকজন একই রকম পর্দাপ্রথা ও গোঁড়ামিকে লালন পালন করছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ছড়িয়ে দিচ্ছেন মা, জ্যেঠিমা, কাকীমা এই জাতীয় নারীদের আচার সর্বস্ব নিয়ম কানুন দিয়েই; যেগুলো আবার সৃষ্টি করেছে কোনও না কোনও পুরুষ (বাবা/মুনি/ঋষি/ ঠাকুর ইত্যাদি বিচিত্রবীর্য রূপে) তাদের নিজস্ব সুবিধাবাদী মতামত দিয়ে।

জায়রা যা বলছেন তাতে তাঁর ঈমান কি ‘দঙ্গলে’ নেমেই খর্ব হয়েছে? ঈমান কী?
আল-কোরানের সূরা #বাকারা-তে ২ থেকে ৪ আয়াতে ঈমান সম্পর্কে এই বিষয়গুলি উল্লেখ করা হয়েছে।

‘ঈমান শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘দৃঢ় বিশ্বাস’।
ইসলাম ধর্মে ঈমানের অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক।
ঈমানের ছ’টি স্তম্ভ হচ্ছে —

১. একক উপাস্য হিসেবে আল্লাহকে বিশ্বাস করা।
২. আল্লাহর ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস করা।
৩. সমস্ত আসমানী কিতাব সমূহতে বিশ্বাস।
৪. সকল নবী ও রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস।
৫. ভাগ্যের ভালো মন্দের প্রতি বিশ্বাস।
৬. আখিরাত বা পরকালের প্রতি বিশ্বাস।

এবার এতো রকম ‘বিশ্বাস করা’কে জায়রার মতো কিশোরীর পক্ষে ‘রক্ষা করা’ সত্যিই কি খুব বিশ্বাসযোগ্য ব্যাপার?
জায়রার মতো মেয়ে দুনিয়াদারির সবকিছু (ষড় রিপুসহ)ছেড়ে শুধু আল্লা আল্লা করলেই ১৪০০ সাল থেকে চলে আসা এতোসব বিশ্বাস রক্ষা পাবে?
আর জায়রা অভিনয় করলেই এইসব বিশ্বাস এক ফুঁয়ে ‘ঘ্যাচাং ফুঃ’ হয়ে যাবে?
মানে ইসলাম তার তাবৎ বিশ্বাসের খুঁটিকে এতটাই ঠুনকো ভাবে গড়েছে?
স্বয়ং আল্লা (!) কি এই যুক্তি মেনে নেবেন – সন্দেহ আছে!

‘দঙ্গল’, ‘সিক্রেট সুপারস্টার’ এবং ‘দ্য স্কাই ইন পিঙ্ক’ -এর মতো সুপার মুভিগুলোতে অভিনয় করে জায়রা একজন স্বতন্ত্র ধারার অভিনেত্রী হিসেবে ছাপ ফেলেছিলেন।

যেকোনো উপাস্য (যদি সত্যিই সেরকম কেউ মানুষের হিতৈষী বলে থেকে থাকেন) তাঁর উপাসকের এহেন সাফল্যে তো গর্ববোধই করবেন, সেটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
কিন্তু জায়রার আল্লা নাকি তা করেন না – কারণ ৬ নাম্বার ঈমানে তিনি পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখতে বলে ইহকালের তাবৎ সাফল্যকে বেবাক নস্যাৎ করেছেন (অন্তত আল্লার তাঁবেদার মোল্লারা তাই ইনিয়ে বিনিয়ে বলে-লিখে -ছড়িয়ে জায়রার মত কচি মেয়েদের মাথা খেয়েছেন)।
আর এভাবেই নানা চেহারার নানা ধর্মের মোল্লাতন্ত্রের শিকড় তার বিপুল আগ্রাসী থাবা নিয়ে পরিবারের মেয়েদের প্রথায় বেঁধেছে।
বোরখা-ঘোমটা-হিজাব-শাঁখা-সিদূঁরের প্রথা মানা মেয়ে ভাবছে ‘ধর্ম রক্ষা করতে পারছি, জান্নাতের/ পুণ্যের/স্বর্গের টিকিট পাক্কা!” ওদিকে ভগবানেশ্বরাল্লা মুচকি হাসছেন।

সরিতা আহমেদ

ফলত – কেয়া দাসের নি:শ্বাস চিরতরে বন্ধ হচ্ছে;
জায়রা ওয়াসিমের বোরখা নামক চলন্ত কফিনে শ্বাস চলছে।

এই যা ফারাক!

বাকি টাইগ্রিস, ইউফ্রেটিস, সিন্ধু, দামোদর বা কালিন্দি যাই-ই হোক – নিয়মমতো ধারায় বইছে- শুকাচ্ছে- ভরছে- উঠছে -নামছে।

ওই শুধু খবর হচ্ছে মাঝে মাঝেই, মেয়েরা একটা একটা করে নাকি বেবাক হারিয়ে যাচ্ছে!
তা’বলে দুনিয়ার ট্রাডিশানচক্র কিন্তু থামছে না একই ভাবে ঘুরছে। ২০১৯ এও, ৯০২১ এও। দ্য শো মাস্ট গো অন …।যদ্দিন মেয়ে জন্ম, তদ্দিন দুর্ভোগ

ভুলিও না দেশ,
যদ্দিন মেয়ে জন্ম, তদ্দিন দুর্ভোগ দণ্ডে জনম মাত্রেই তুমি বলি প্রদত্ত!

শেয়ার করুন:
  • 740
  •  
  •  
  •  
  •  
    740
    Shares

লেখাটি ৪,৩৯৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.