স্যানিটারি প্যাডে ভর্তুকি আনতে পারে নারী জীবনে স্বস্তি

0

লতিফা আকতার:

স্যানিটারি প্যাডের মূল্য কম হলে নারীর একটি অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনের সাথে আপোস করতে হবে না। যার সু-প্রভাব তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যেও ফেলবে।

নারী জন্মেছে কিছু ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য নিয়ে। এই ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের অধিকাংশই তাঁর শরীরকেন্দ্রিক। আর তা পরিলক্ষিত হয় জীবনের বিভিন্ন ধাপে। শৈশব হতে নারী হয়ে ওঠা, সন্তান ধারণ এবং নিকট পরবর্তীতে লালন পালনে শরীর ও মনে নানান পরিবর্তন আসে একটি নারীর। যা তাকে ধাপে ধাপে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করে। এবং এই ধাপগুলোতে তাঁকে মোকাবিলা করতে হয় অনেক সমস্যা। আর সেইসব সমস্যা নারীর একান্ত নিজস্ব হয়ে ওঠে।

শৈশব হতে কৈশোরে উত্তীর্ণ হওয়ার প্রথম ধাপে একজন নারী যে সমস্যা মোকাবিলা করে তাহলো পিরিয়ড। যদিও এটি বেড়ে ওঠার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তারপরও একে ঘিরে ধর্ম এবং সামাজিকভাবে নানান ট্যাবু রয়েছে। এই সময় নারীকে অচ্ছুত হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে আসছে সৃষ্টির শুরু হতে। আর তা কেন এর উত্তর খোঁজা বিতর্কিত। সে এক অন্যরকম চিন্তা যা হতে নারী বের হতে পারেনি। হয়তো সম্ভবও না। কিন্তু এই পিরিয়ডকালীন নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাবের সাথে সাথে তাঁর দৈনন্দিন জীবন যাপনে ও প্রভাব ফেলে। শরীর মনে একটা অস্বস্তি চলে আসে।

এই অস্বস্তি’র চরম একটি কাজ ঐ সময়ের প্রবাহিত রক্তকে সামাল দেওয়া। আর এই সামাল দেওয়া চলে একজন নারীর মেনোপজ শুরু হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। এবং অতি বাস্তবতা যে এই সময়টা নিজেকে বড়ই একা একা সামলাতে হয়। আর তা সামলানোর জন্য বাসার পুরানো কাপড় হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়। এবং মধ্যবিত্ত পরিবারে একাধিক কন্যা শিশুর পরিবারে কাপড়ই তাঁর জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা হিসেবে বরাদ্দ থাকে। আর বরাদ্দকৃত এই সব কাপড় ধুয়ে সংরক্ষণ নারীর মননে একটা বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। নানান সময় তাঁর পরিধেয় কাপড়েও ছাপ ফেলে। এই ছাপ একজন কিশোরীকে ভীষণভাবে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেনি এটা খুবই কম। “মাইখ্যা ফালাইছে” সমাজের ছুঁড়ে দেওয়া এই লাইন নারীকে আরো সংকুচিত করে তুলেছে বা তোলে বিভিন্ন সময়।

নারীর সংকুচিত হয়ে ওঠা বিপর্যয়ের সময়ে স্বস্তি এনেছে- স্যানিটারি প্যাড। যা তাঁকে শুধু সংকোচ হতে নয়- রক্ষা করেছে বিভিন্ন জীবাণুর হাত হতে। নারী পেয়েছে নির্ধারিত কয়েকদিনের অস্বস্তি হতে মুক্তি। বিভিন্ন এনজিও, সরকারি প্রচারণায় এবং উৎপাদনকৃত কোম্পানির আন্তরিক চেষ্টায় স্বল্প মূল্যে এবং বেশি মূল্যে বিক্রিত প্যাড হয়ে উঠেছে নারীর আপদকালীন সঙ্গী। সে পেয়েছে এক স্বস্তি। এক সময় স্বচ্ছল পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে এটা পৌঁছে গেছে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্তের দ্বারে দ্বারে।

স্যানিটারি প্যাডে নতুনভাবে মূল্য নির্ধারণ প্রয়োজন। প্রয়োজন মূল্য কমানোর। এর মূল্য কম হলে ভালো প্রভাব পড়বে সুদূরে। মনে হতে পারে এতো অল্প কিছু পয়সা কমলে কী আর এমন হবে? এদেশে এখনও নিম্নবিত্ত একাধিক কন্যা সন্তানের পরিবারের খরচ সামাল দিতে হয়তো মা কন্যাটির হাতে তাঁর ধোয়া পুরানো কাপড় নতুন করে ধরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। প্রতিমাসের সংসার খরচে ভারসাম্য রক্ষা করতে স্যানিটারি প্যাড ক্রয় অনর্থক খরচের তালিকার অন্তর্ভূক্ত এখনো অনেক পরিবারে।

এই অনর্থক খরচ নারীর মননে বাড়তি চাপ ফেলে বিভিন্ন সময়। একটি সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় নারীকে এমনিতেই বাড়তি বিভিন্ন মানসিক চাপ নিতে হয়। সেই সাথে আর একটি চাপ হলো সিজার পরবর্তী এই রক্ত প্রবাহ। অনেককে তো দীর্ঘ সময় ধরে এই ধাক্কা সামলাতে হয়। শিশুর যত্ন, সাথে নিজের বাড়তি রক্তের প্রবাহ সামলানো কঠিন হয়ে ওঠে। এ ছাড়া মেনোপজের আগ পর্যন্ত প্রকৃতির উল্টাপাল্টা আচরণ। তার উপর বহু নারীকে জীবনে একাধিক গাইনোকলজিক্যাল অপারেশনের সম্মুখীন হতে হয়। এই সময়গুলোতে স্যানিটারি প্যাড নারীর প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে।

শারীরিক গঠনের নানান বৈচিত্র্যের মধ্যে মানসিকভাবে সবচাইতে অস্বস্তিকর এই রক্ত প্রবাহের সময়ে একটু স্বস্তি দেয় এই প্যাড। ধোয়াধুয়ির ঝামেলা না থাকায় নারী অনেকটাই আরামবোধ করে। এবং বিভিন্ন ইনফেকশনও দূরে থাকে।

প্রশ্ন আসতে পারে যখন এই সামগ্রী ছিলো না তখনও তো নারী সামলে চলেছে। শতভাগ সত্য কথা। নারী তাঁর ব্যতিক্রম শারীরিক গঠনের কারণে জীবনে অনেক কিছুই সামলে চলতে বাধ্য হয়েছে, এখনও হয়। অপরিসীম ধৈর্য্যের অবতার এই নারী।

এক সময় স্যানিটারি প্যাড একটা নির্দিষ্ট স্ট্যাটাসে সীমাবদ্ধ ছিলো। একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের নারী হিসেবে আমরা পিরিয়ডকালীন ঝামেলা সয়েছি। মূল্য কম করা হলে আমাদের ফেলে আসা ঝামেলা হয়তো নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের বহু নারীর দরজা হতে চিরতরে বিদায় নিবে। এই সামগ্রীটি বিলাসদ্রব্য তো নয়। নিত্য প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠা এই দ্রব্যটিতে ভর্তুকি না হলেও ক্রয় মূল্য হাতের নাগালে পাওয়ার আশা করে আমাদের মতো বহু সাধারণ নারী। ব্যতিক্রম হলেই কেবল অনেক নারীর কষ্টের সময়টা আরো কষ্টকর হয়ে উঠবে।

শেয়ার করুন:
  • 409
  •  
  •  
  •  
  •  
    409
    Shares

লেখাটি ৪২১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.