নামমাত্র মূল্যে স্যানিটারি প্যাড চাই

0

রাজু নূরুল:

যেই দেশে প্যাড (স্যানিটারি ন্যাপকিন) কেনা কিংবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনো সচেতনতাই তৈরি হয়নি, সেই দেশে প্যাডের উপর ভ্যাট কীভাবে বসে? কোন যুক্তিতে? কার বুদ্ধিতে?

আমি প্রথম ‘প্যাড’ কিনতে গিয়ে তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলাম। এক প্যাকেট প্যাডের দাম ২৮০ টাকা। আমি সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়সূচক একটা লুক দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘২৮০ টাকা?’

দোকানদার উত্তরে বলেছিল, ‘আরও কম দামিও আছে। অন্য কোম্পানির নেন? দাম কম আছে। আবার ছোটটাও নিতে পারেন।’

আমি যেহেতু এত দামে প্যাড কিনতে রাজি হই নাই, অথবা ভড়কে গেছিলাম, অতএব কম দামি, ছোট একটা প্যাড নিয়ে বাসায় ফিরলাম। মনে আছে কি সাংঘাতিক বকাই না আমাকে খেতে হয়েছিল। কারণ, আমি যেই কোম্পানির প্যাড কিনে বাসায় গিয়েছিলাম, সেই প্যাডের মান নাকি ভালো না! কী আশ্চর্য! প্যাডের আবার ‘মান’ কী? এখানেও দুই নম্বরি হয়?

রাজু নূরুল

তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আপনি যখনই কোন ফার্মেসিতে গিয়ে প্যাড আছে কীনা জিজ্ঞেস করবেন, সঙ্গে সঙ্গে সেখানে উপস্থিত লোকজন আপনার দিকে একটা রহস্যজনক ‘লুক’ দিবে। তাদের ‘লুক’ দেখে মনে হবে, আপনি এইমাত্র কোন নিষিদ্ধ বস্তুর খোঁজ নিলেন। আফিম, সরস অথবা অন্য কিছু। অথবা আরও ভয়ানক কিছু…

যেমনটা হয় কনডম কেনার ক্ষেত্রে! যে কোনো ফার্মেসির সামনে নানা রকমের কনডমের প্যাকেট ঝুলানো থাকে। সুইট ড্রিম, রাজা, সেনসেশন, ইত্যাদি। কিন্তু যখনই আপনি কনডম কিনতে চাইবেন, অলিখিত নিয়ম হলো, আপনাকে খুব আস্তে কথা বলতে হবে, দোকানদার মোটামুটি টেবিলের নিচে রেখে প্যাকেট করবে এবং খুব সন্তর্পণে আপনার হাতে প্যাকেটটা ধরিয়ে দেবে। যেন আপনি ভয়ানক কোনো নিষিদ্ধ পণ্য খরিদ করলেন।

অথচ কনডম কিনতে লজ্জা লাগার আগে, আপনার উচিত প্রেম করার আগে অথবা ঢাকঢোল পিটিয়ে বিয়ে করার আগে প্রবলভাবে লজ্জিত হওয়া। বাসর ঘরে ঢুকে দরজায় খিল দেয়ার আগে আপনার উচিৎ লজ্জায় মরে যাওয়া। কারণ সবাই জানে আপনি এখন কী করবেন!

প্যাড কেনার সময় যদি দোকানে অন্যান্য মানুষজন থাকে, তাহলে তো কোন কথাই নেই। সবাই আপনার চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকবে, মুখে থাকবে রহস্যময় হাসি। মনে হবে আপনি বিরাট কোন অপরাধ করতে যাচ্ছেন, অথবা পাশেই কোন পতিতালয় এবং আপনি এখনই এই মাল নিয়ে সেখানে গিয়ে ঢুকবেন।

এই অভিজ্ঞতার গোটাটাই পুরুষের। তাহলে একজন নারী যখন তার পিরিয়ডকালীন প্যাড কিনতে যান, তার অভিজ্ঞতা কেমন হয়? কনডম কেনার তো প্রশ্নই উঠে না। ভাবলেই গা শিউরে উঠে।

এসব ঘটনার পর আমি দেশের যেখানেই গেছি, প্যাড আছে কীনা দেখতে চেয়েছি। উপজেলা শহরগুলোতে কিছু কিছু দোকানে পাওয়া যায়, তাও অনেক পুরনো। ধুলোবালি পরে আছে। বুঝাই যায় যে অচল মাল। কিন্তু গ্রামের দোকানে পাওয়ার প্রশ্নই আসে না।

তাহলে মাসের এই পাঁচ দিন নারীরা কিভাবে তাদের রক্তস্রোত সামলান?

পুরনো কাপড়, ত্যানা, এটাসেটা প্যাঁচিয়ে, কোথাও কোথাও নাকি গাছের ছাল-বাকল, পাতাও ব্যবহার করা হয়। শুধু তাই না, এই পাঁচ দিন কারো সামনে আসা নিষেধ, কাজকর্ম করা নিষেধ, আলাদা ঘরে শুতে হয়। মোটামুটি একটা অচ্ছুত অবস্থায় জীবনযাপন করতে হয়। কিশোরীদের স্কুল যাওয়া বারণ। গেলে কুঁকড়ে থাকে। মাসে পাঁচ দিন করে হলে, এভাবে বছরে ৬০ দিন নারীদেরকে এক নির্মম পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়। মানে বছরে দুই মাস জীবন থেকে হারিয়ে যায়।

যারা পুরনো ধ্যান ধারণা থেকে বের হতে চান, তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো দাম। দরিদ্র, হতদরিদ্র মানুষের পক্ষে এতো টাকা দিয়ে প্রতিমাসে প্যাড কেনা সম্ভব? যার চাল কেনার টাকা নাই, তার কাছে প্যাড কেনার গল্প করা রীতিমতো হাস্যকর! ফলে নারীদেরকে প্রতিমাসে পাঁচ থেকে সাত দিন একটা ভয়াবহ অস্বাস্থ্যকর অবস্থার ভেতর দিয়ে যেতে হয়।

ভারতে মাত্র ১৮ শতাংশ নারী তার প্রতিমাসের পিরিয়ডের সময় প্যাড ব্যবহার করেন। যার প্রধান অন্তরায় অতিরিক্ত দাম এবং সচেতনতার অভাব। সচেতনতা অবস্থা এতোটাই নিম্ন পর্যায়ের যে, দরকার হলে জীবন দিয়ে দেবে, কিন্তু সবার সামনে প্যাডের মতো ‘ভয়াবহ জিনিষ’ ব্যবহার করবে না! মেয়ে ‘বড় হলে’ উৎসব করা হবে, কিন্তু প্যাডের মতো ‘বাইরের জিনিস’ ব্যবহার করা যাবে না।

আমি নিশ্চিত, বাংলাদেশেও পরিস্থিতি কোন অংশেই এর চেয়ে ভালো হবে না। কোথাও কোথাও হয়তো আরও খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

বাংলাদশের এনজিওগুলো এসব নিয়ে বহুদিন ধরে কাজ করছে। তবে সব কাজই হচ্ছে নারীদের সাথে। এবার পুরুষের ধ্যান ধারণা পাল্টানোর সময় এসেছে। সময় এসেছে সমস্বরে কথা বলার। পুরুষ না বদলালে কিচ্ছু বদলাবে না।

তার আগে, জিনিসটা সহজলভ্য হওয়া দরকার। ভ্যাট না, নামমাত্র মূল্যে প্যাড বিক্রি হওয়া উচিত।

(ফিচারের ছবিটি ভারতের একটি প্যাড সংক্রান্ত প্রজেক্ট থেকে নেয়া, যেখানে গ্রামে গ্রামে বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন দেয়া হয়)

শেয়ার করুন:
  • 5.5K
  •  
  •  
  •  
  •  
    5.5K
    Shares

লেখাটি ২,৫৫১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.