স্যানিটারি প্যাড থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করুন

0

সাজু বিশ্বাস:

পিরিয়ড মেয়েদের শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। ড. দেবী শেঠির সাক্ষাতকারটার কথা নিশ্চয়ই মনে আছে কারো কারো! সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করছিলেন, ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের হার্ট অ্যাটাক কম হয়, তার কারণ কী?
ডক্টর শেঠি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘কারণ পঁয়তাল্লিশ বছর পর্যন্ত প্রকৃতি নিজেই মেয়েদের সুরক্ষা দেয়’।

পিরিয়ড মেয়েদের জীবনের প্রকৃতিগত অংশ।
কিন্তু আমাদের দেশের মেয়েরা খুব কমই এই ব্যাপার নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে পারে। এমনকি নিজের মায়ের কাছেও পিরিয়ড নিয়ে খুব বেশি বলার মতো সুযোগ হয় না। বারো-তেরো বছরের মেয়ের পিরিয়ড শুরু হলেই মায়ের কপালে চিন্তার বলি রেখা পড়তে শুরু করে। — মেয়েতো বড় হয়ে গেল!

গ্রামে তো পিরিয়ডকে অছ্যুৎ হিসেবে ঘোষণা করা হয় প্রায়। এই কয়দিন রান্না ঘরে যাওয়া নিষেধ, গোয়ালঘরে যাওয়া নিষেধ, প্রার্থনা ঘরে যাওয়া নিষেধ, — পবিত্র জিনিসপত্র ছোঁয়াছুয়ি করা নিষেধ।
পুরো বাড়ির মহিলামহল মেয়ের পিরিয়ড নিয়ে তটস্থ থাকে। হা রে রে রে, কাসুন্দির বাটিতে হাত লাগাবি না, জায়নামাজ ধরবি না, গঙ্গা জলে হাত লাগাবি না… বাবার জামা কাপড়ে হাত দিবি না,… যে যেমনে পারে আর কী!

অথচ পিরিয়ডের মতো প্রত্যাশিত প্রাকৃতিক ব্যাপার আর মেয়েদের জন্য নেই। মনে করি, কারো পিরিয়ড হলো না কোনওদিন। সে কি স্বাভাবিক মেয়ে? নয়। তাহলে সেই প্রত্যাশিত ব্যাপারটি নিয়ে এতো অশুচি অশুচি ভাব কেন! হয়তো, শরীর নোংরা থাকার ভয়ে।

এইখানেই তো মানুষের জীবনে প্রযুক্তির যথাযথ সফলতা! স্যানিটারি ন্যাপকিন অনেক বড় কাজ করে মেয়েদের আত্মবিশ্বাস টিকিয়ে রাখার জন্য। আগে পিরিয়ড হলেই মায়েরা ঘরের কোণা থেকে পুরনো নরম কাপড় বের করে দিত। সবারটা পরিস্কারও থাকতো না। একটা নোংরা রক্তের স্রোত শরীর থেকে নেমে আসছে, তার জন্য আবার বিশেষ যত্ন কী!

যার পিরিয়ড শুরু হয়, সেই মেয়েটি এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটির সাথে সহজে মনে মনে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। মেয়েটি এতোদিন ছেলে বন্ধুদের সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়েছে। পড়ালেখা, দাপাদাপি, ঝাঁপাঝাপি কোনও কিছুতেই কোনও নিষেধ ছিল না। পিরিয়ড শুরু হলে নিজের শরীরই একটা বিশেষ সিগনাল দিতে শুরু করে। নিজেই মনে হয় যেন, — একটু ক্লান্ত, একটু অবসন্ন, — ঘন ঘন বাথরুমে যেতে হচ্ছে, — শরীর জুড়ে অস্বস্তি। এর মধ্যে আবার পরিবারের বিধি নিষেধ আর নজরদারিও আছে। এরপরে আসে পুরনো কাপড় বা তুলা ব্যবহারের অস্বস্তি।
ছোট্ট মেয়েটা কোথায় যায় তাহলে?

বেশিরভাগ মেয়েই এই সময় আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। কুঁচকে নিজেকে ঘরের এক কোণায় নিয়ে গুটিসুটি মেরে সেঁধিয়ে দেয়। যে মেয়ের আগে স্কুলে হান্ড্রেড পার্সেন্ট উপস্থিতি ছিল, সে গিয়ে নাইন্টিতে ঠেকে। দশ পারসেন্ট পিরিয়ড কেড়ে নিয়েছে।

বাংলাদেশে খুব বেশিদিন স্যানিটারি ন্যাপকিন আসেনি। এমনকি সেনোরা কনফিডেন্ট আর টিস্যু পেপারের গল্পটা মাত্র আমাদের জেনারেশন থেকে শুরু হইছে। আগের মেয়েরা কী করতো তাহলে!
কাপড়, তুলা, যে যেমন পারে ব্যবহার করতো। মেয়েদের শরীরে হার্ট অ্যাটাক না হোক, অন্য একটি রোগ বেশি হয়, জরায়ু ক্যানসার। এবং জরায়ু সংক্রান্ত যে কোনও রোগ।

সাজু বিশ্বাস

কত পরিবারের অন্দরমহলেই যে মেয়েদের জটিল জটিল রোগকে মেয়েলি সমস্যা বলে নাক উঁচিয়ে এক কোণায় ফেলে রাখা হয়, এবং কত পরিবারের কত কত মেয়েই যে এই মেয়েলি সমস্যায় নিরবে মৃত্যুবরণ করে, তার হিসেব নেই। এমনকি মেয়েদের রোগ নিরাময়ের জন্য যদি ভাল মেয়ে ডাক্তার না পাওয়া যায়, —ছেলে ডাক্তারের কাছে গিয়ে রোগের কথা বলতে হবে, এই কারণেই অনেক মেয়েলি রোগের চিকিৎসা আর ডাক্তারখানা অব্দি পৌঁছোয় না।
এবং এই চিন্তায় ইয়ং- বুড়ি- গুড়ি সকল মেয়ের সাথে বাড়ির কর্তাদেরও বেখুব মিল! বর্ষীয়ান পুরুষ অভিভাবকেরা মেয়েলি রোগের জন্য এখনো পুরুষ ডক্টরের হস্তক্ষেপ মেনে নিতে রাজি হোন না অনেক পরিবারেই।

স্যানিটারি ন্যাপকিনের গল্পে ফিরে যাই।
উপরে সুন্দর একটা কাভার মোড়ানো থাকে সেনোরা কনফিডেন্টের। তার ভিতরের ন্যাপকিনগুলো প্রত্যেকটা আলাদা করে আরেকবার প্যাকিং করা থাকে। সেই ছোট্ট প্যাকেটের মধ্যে টিস্যুটা আরেক দফা কাগজ দিয়ে আটকানো থাকে। তার পরেও দোকানির কাছে যখন ন্যাপকিনের প্যাকেট চাওয়া হয় সে দৌড়ে গিয়ে আরেকটা পুরাতন খবরের কাগজ নিয়ে আসে। দোকানের একদম কোনার তাক থেকে চোরের মতন মুখ করে ন্যাপকিনের প্যাকেটটা পাড়ে। তারপর সেই পুরাতন খবরের কাগজে ন্যাপকিন মুড়িয়ে তারপর নেটের ব্যাগের ভেতর পুরে দেয়।
যেন পুরোই পুরুষ নিষিদ্ধ জিনিস। অথচ কোন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ মেয়েদের এই প্রাকৃতিক নিয়মটির কথা জানে না!

তা প্রযুক্তির উন্নয়ন হচ্ছে, শিক্ষায় ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, চিকিৎসায় ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে,— আর মেয়েদের এই অতি প্রয়োজনীয় জিনিসটিতে কেমন করে কার নজর লেগে গেল!

সাধারণত, বারো থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী মেয়েরা স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করে। মানে বারো থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী মেয়েদের প্রতি মাসেই কিছু না কিছু ব্যবহার করতে হয়, সে স্যানিটারি ন্যাপকিন হোক, বা টিস্যু বা কটন, বা পুরনো কাপড়।

আমরা যদি গভীর করে দেখি, এই বয়সী মেয়েরাই কর্মক্ষম বেশি। এই বয়সী মেয়েরা স্কুলে যায়, খেলাধুলা করে, চাকরিবাকরি করে। জীবনের সমস্ত উন্নয়ন এবং সবচেয়ে বেশি কাজ করার সময় এই বয়সে। শুধুমাত্র পিরিয়ড নিয়ে কেউ জবুথবু হয়ে ঘরে বসে থাকবে, শুধুমাত্র মেয়েলি একটা ছোট্ট ঘটনার জন্য কেউ পিছিয়ে থাকবে, — এটা তো আর রাষ্ট্রের কাম্য হতে পারে না, — তাই না?

স্যানিটারি ন্যাপকিন কোনও বিলাসদ্রব্য নয়।
এমনকি স্যানিটারি ন্যাপকিন নেশার দ্রব্যও নয়।
মেয়েদের অতি প্রয়োজনীয় এবং আত্মবিশ্বাসের জিনিস। তাহলে স্যানিটারি ন্যাপকিনের উপর আমদানি শুল্ক বাড়ানো হবে কেন!

অথচ আমরা উন্নয়নের কথা বলি।
অথচ আমরা মেয়েদের বেশি করে অর্থনৈতিক কাজে যুক্ত হবার কথা বলি। মায়েদের সুস্বাস্থ্য নিয়ে কত শত ক্যাম্পেইন থাকে!

ন্যাপকিন বিলাসদ্রব্য মানে পুরনো কাপড় আর গজ তুলাকে উৎসাহিত করা। বরং উচিৎ ছিল স্যানিটারি ন্যাপকিনের উপর থেকে আমদানি শুল্ক উঠিয়ে দিয়ে একে সর্বস্তরের মেয়েদের হাতের নাগালের পণ্য হিসেবে তৈরি করা। যাতে করে মেয়েদের মেয়েলি স্বাস্থ্যঝুঁকি কিছুটা কমে। এই উন্নয়ন, সেই উন্নয়ন শুনি, সেসব কার জন্য কে জানে!

সামান্য বাথরুমে ফ্লাশ করা কাগজের দামের উপরেও যদি ছুরি-কাঁচি চালিয়ে টাকা আদায় করা লাগে, তাহলে সেই পোড়ার উন্নয়ন দিয়ে মানুষ কী কী করবে কে জানে!

শেয়ার করুন:
  • 6.6K
  •  
  •  
  •  
  •  
    6.6K
    Shares

লেখাটি ৩,৩৫৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.