একটা তীব্র ব্যথার জন্য যখন আমি অপেক্ষা করি

0

সুচিত্রা সরকার:

ব্যথার জন্য অপেক্ষা করছি। তীব্র একটা ব্যথা। সাইড কাটা সেলাই করতে যে ব্যথা পাওয়া যায়, তা নাকি এ ব্যথার কাছে কিছ্ছু না। জানি না কী সে ব্যথা। ব্যথা তো ছোট থেকে আজ ইস্তক পেয়েই যাচ্ছি।

ক্লাস টুতে হাম উঠলো। কাঁপিয়ে জ্বর। গায়ে সে কী ব্যথা!

ক্লাসের সবচে ভালো ছেলেটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো মেঝেতে। তখনো সাত হয়নি। দাঁত পড়ার সময়ও নয়। মুখে রক্তারক্তি অবস্থা।
কারো প্রতি ঘেন্না হলে তাকাতে কষ্ট হয় তার দিকে। কথা বলতে পারি না। ওর সঙ্গে আবার কথা বলার ভয়ে স্কুলই পালটে ফেললাম বাবাকে বলে!

সুচিত্রা সরকার

মুকুলিকা শিক্ষালয়ে ভর্তি হলাম। ইনজেকশানে ভয়। টিকা দিতে এলো বাক্স পেটরা নিয়ে একদল। সেই যে পালালাম, আর ওই স্কুল নয়।
ব্যথার ভয়ে।

ব্যাপক রকম বোকা বানিয়ে কানের দুল নিয়ে নিয়েছিল এক অপরিচিত ছেলে। সেই প্রথম মনে ব্যথাটা তীব্র ছিল।

বাবা না থাকার কারণে প্রতিবেশী, স্বজনদের হেলাছেদ্দার ব্যথায় কতো কেঁদেছি!

রাস্তার এপার থেকে ওপার নিমিষে পার হতে গিয়ে মোটর সাইকেলে ধাক্কা। যে পার থেকে দৌঁড়েছিলাম, বাইকের ধাক্কায় সে পারেই এসে পড়লাম আবার। হাঁটু চিচিং ফাঁক! পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের নখ হাওয়া।
সে কী ব্যথা!

বাবরি মসজিদ ভাঙার ঢেউ এপারেও। তীব্রতর ঢেউ। এক বাসায় চৌদ্দটা সমবয়সী শিশু খেলাধুলা করি। তেরোজন মিলে মেরেছিল। দোতলা তিন তলার আন্টিরা চিৎকার করছিল, মালাউনটারে মার!

গলির মাঝখানে পাইপ বসবে। বিরাট লম্বা গর্ত খোড়া হলে হলো। রাস্তা পার হবো, পাশের বাড়ির বড়ভাই বলল, দে মাওড়াটারে গাড়ায় ফালায়া!
এরকম প্রচুর ব্যথারা ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে।

প্রথম হরতালের পিকেটিং এ বা পায়ের হাড়ে পুলিশে লাঠির ছোঁয়া!
এখনো দাগটা আছে। ব্যথা নেই।

একা একা পিজিতে গিয়ে ডান চোখ অপারেশন করে এলাম। অ্যানেসথেসিয়ার ব্যথাটা ছাড়া আর কিছু মনে নেই।

মনে আছে চিকেন পক্সের ব্যথা। যন্ত্রণা। তখন কামনা করেছিলাম আমার শত্রুরও যেন এমন না হয়! এ ব্যথা ভোলার নয়।

বন্ধু হারানোর ব্যথা। প্রিয় কলম, প্রেমিক, জামা, মোবাইল, ব্যাগ হারানো আর বিশ্বাসঘাতকতার ব্যথা কখনো ভীষন, কখনো মৃদু।

গল্ডব্লাডার অপারেশনটা হেলথ অ্যান্ড হোপে হয়েছিল। ইনফেকশন হয়ে গেল। টানা এক মাস পেটের চারটা ছিদ্র থেকে পুঁজ বের করি। নিজে ড্রেসিং। কখনো বর করে দেয়। ব্যথার তীব্রতায় দম বন্ধ হয়ে আসতো!

একটা ফুল গাছ লাগালাম ছাদে। মে ফ্লাওয়ার। তাও জুন মাসে। এক বছর প্রায় জল হাওয়া দেয়া হলো তাকে। প্রবল বর্ষায় টব আলো করে ফুটলো ফুল। আনন্দে চোখে জল। পরদিন গিয়ে দেখলাম ফুলটা নেই।
সেও তো ব্যথাই।

এরকম লাল, নীল, হলুদ প্রচুর ব্যথারা স্মৃতিজুড়েই ঘিরে রয়েছে আমায়!

আরো একটা ব্যথার জন্য অপেক্ষা করছি। এ কি সুখের ব্যথা, না বাস্তবতার জানি না। তবে জীবন পরিবর্তনের ব্যথা নিশ্চিত।
জীবনের এক পর্ব থেকে আরেক পর্বে উত্তরণের ব্যথা।
আর যদি এই পর্যায়কে মহিমান্বিত না করি, তবে জীবনের গতি বদলের ব্যথা!

অ্যাজমা আর কাশিতে কাবু হয়ে আছি। ডাক্তার ইনহেলার নিতে নিষেধ করেছে।

ভোর হয়ে এসেছে। আলোটা ফুটতে শুরু করেছে। যাই তৈরি হই। মায়ের সঙ্গে সুগার ঝরানোর হাঁটা শুরু করতে হবে।

শেয়ার করুন:
  • 25
  •  
  •  
  •  
  •  
    25
    Shares

লেখাটি ৬২৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.