প্রশ্নগুলো একবার করে দেখো তো মেয়ে!

0

কাজী তামান্না কেয়া:

শোনো মেয়ে, তুমি কী পোষাক পরবে, চুল খুলে রাখবে না পার্লার থেকে উঁচু করে বেঁধে আসবে, লেগিংস পরবে না প্যান্ট পরবে, নাকি ৭ গজ কাপড়ের সালোয়ার কামিজ পরবে– তার সব সিদ্ধান্তই তোমার৷ যা পরলে তোমার স্বস্তি হয়, সময় বাঁচে, আরাম লাগে, তোমার মন ভালো লাগে, তাই পরো৷ এ ব্যাপারে তোমার মা-বাবা, ভাই-বোন, পাড়ার আন্টি-চাচি কী বলে তা শোনার কোনো অর্থ নেই৷

জীবন যেমন তোমার, এই জীবনের সুখ দু:খের চাবিও থাকা চাই একান্তই তোমার হাতে৷ তাই আগে নিজেকে সুখী করো৷ এরপর অন্যান্য মানে বয়ফ্রেন্ড, জামাই বা অন্য কারো রুচি পছন্দ কী, তা ভেবে নিও৷

কারণ? ওই যে বললাম–পোষাক, সাজ, রুপ কিংবা প্রসাধন নিয়ে কারো কথা শোনার প্রয়োজন নেই৷ তুমি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ৷ তোমার পোষাক পছন্দ করার স্বাধীনতাও তাই তোমার৷ দিনশেষে তোমার প্রয়োজন কেবল তুমি, নিজেকে ভালবাসার, সম্মানের প্রয়োজন তাই সর্বাগ্রে৷

স্বামী কিংবা বয়ফ্রেন্ড এর কথা নাই বলি, বাপ বা ভাই দিয়ে শুরু করি৷ যাও তো ওদের বলো, কোন পোষাকে তাদের দেখতে তোমার ভালো লাগে, সেসব পরে চলতে ফিরতে৷ দেখো দেখি, ক’জন তোমার কথার মূল্য দেয়! ক’জন তোমার বেঁধে দেয়া পোষাকে নিজেকে মোড়ায়! লিখে রাখো মেয়ে, কেউ তোমার কথা শুনবে না৷ কেউ তোমার পছন্দ অনুযায়ী তাদের দাঁড়ি গোঁফের কাটছাঁট বদলাবে না, লুজ কাটের প্যান্ট পরা পুরুষ তোমার জন্যে স্লিম কাটের নতুন প্যান্ট পরা শুরু করবে না৷ গায়ে ঘামের গন্ধ ঢাকতে ডিও বা কোলন লাগাবে না৷ যারা ডিও/কোলন অলরেডি মাখে, তাদের অন্য কোনো পোষাক আষাক বা টয়লেট্রিযে পরিবর্তন আনতে বলে দেখতে পারো৷ সফল হবার চান্স ক্ষীণ৷

কেন জানো? সমস্যা মগজে, সমস্যা সিস্টেমে৷ ওরা ধরেই নিয়েছে, ওরা ১০০ ভাগ ঠিক, আর তুমি ঠিক নও৷ আর তোমাকে সে কথা বলার সুযোগ খানিকটা বা পুরোটা তুমি, আমি, সমাজ এবং ধর্ম মিলে তৈরি করে দিয়েছে৷ তোমার কথা শোনার সময় তাই তাদের না থাকলেও তুমি কী পরবে, কী করবে, কোথায় যাবে, কখন যাবে, সে সব তারা ঠিক করে রেখেছে৷ তাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলো, বলে দাও, তুমি যা খুশি তাই পরবে, যেমন কাজ বা স্বাধীনতা ভোগ করতে চাও, তেমনটাই করবে৷ কিংবা তাদেরকেও পরতে হবে বা চলতে হবে, যেমন করে তুমি তাদের দেখতে চাও বা চালাতে চাও৷

এবার তাকিয়ে দেখো, কী প্রতিক্রিয়া হয়! তুমি মেয়ে হয়ে এতো কথা কেন বলছো, তা নিয়ে ঠিক ঠিক প্রশ্ন তুলবে, তোমাকে দু’কথা শুনিয়ে দেবে, কিংবা তোমাকে পাত্তা না দিয়ে যা পরছিল, তাই পরতে থাকবে৷ আর যদি বেশি ক্যাচাল করো, কালকেই তোমার হাত খরচ বা পড়ার খরচ বন্ধ করে দেবে৷ আরো দুই পা এগিয়ে গিয়ে তোমার বাইরে যাবার উপরেও নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দিবে বা এমন কিছু করবে, যাতে তোমাকে শাসন করা হয়েছে বলে মনে হয়৷

কী, বিশ্বাস হচ্ছে না? আচ্ছা বাদ দাও৷ এখন বলো, যে মেয়েরা নিজের পছন্দসই জামা জুতো পরছো, তাদের ক’জনের বান্ধবীদের বাসায় কালে ভাদ্রে দু এক রাত কাটানোর সুযোগ আছে? ক’জন নিজের পছন্দমতো চাকুরি বা কাজ করতে পারো? আর সেসব কাজ বা চাকুরি যদি ভদ্র পেশা বলে গণ্য না হয়, যথেষ্ট পরিমাণ পারিশ্রমিক পাওয়া না যায়৷ কিংবা ধরো, যদি সেসব পেশায় মাঝে মাঝে ফিল্ড ট্রিপে দুই-তিন দিন বাড়ির বাইরে থাকতে হয়, বাড়ির লোকে কি মেনে নেয়? বাবা, ভাই, মা, চাচী, বয়ফ্রেন্ড, স্বামী এসে বলে না, আমার মেয়ে হয়ে, বউ হয়ে, বোন হয়ে, বান্ধবী হয়ে— তুমি এই কাজ করবে? লোকে কী বলবে? তোমার টাকা কামাই করে কী হবে, ক’টা টাকাই আর কামাই করছো? সেসব প্রশ্ন তোলে না? আর কামাই করলেও কয় টাকা নিজের পছন্দমতো খরচ করছো, সেসব খেয়াল করেছো? নিজেকে জিজ্ঞেস করেছো সে সব কথা?

আচ্ছা বাদ দাও৷ সংগী পছন্দ করার কথা বলো৷ তোমাদের ক’জন বাড়িতে জানাতে পারো যে প্রেম করছো, বা কাউকে দেখছো৷ প্রেমের কথা শুনে বেশির ভাগের বাড়ির সদস্যরা কেমন আচরণ করছে? বয়স ১৬-১৭ পেরোলে সংগী নিয়ে ভাবা বা সংগী খোঁজা যে স্বাভাবিক ব্যাপার–সেটা কি জানো? আর পরিবার যদি প্রেম করা মেনে নেয়, ছেলে বিয়ে করার যোগ্য কিনা, সেই প্রশ্ন করেছে? কয়টা বাড়ির সদস্যরা বুঝেছে যে বিয়ে করতে পারবে, এমন দেখেশুনে সব প্রেমের শুরু হয় না৷ তাছাড়া সব প্রেম বিয়ে করার জন্যেও শুরু হয় না৷ অথবা বিয়ে করার উদ্দেশ্যে সম্পর্ক শুরু হলেও, কিছুদিন মিশে বোঝা গেল যে এই ব্যক্তিকে বিয়ে করা চলবে না৷ এই কিছুদিন মেলামেশাও যে ভালো সংগী খুঁজে পাবার একটা ধাপ, এটা ক’টা মেয়ের পরিবার জানে বা মেনে নিচ্ছে?

সবার পরিবার না হোক, অন্তত, বেশিরভাগ পরিবার কি মেনে নিচ্ছে, নিশ্চয়ই নয়! তবে কী করবে?নিজের পছন্দমতো সংগী খোঁজ করা যাবে না? স্বাধীনমতো পোষাক পরা যাবে না? স্বাধীনভাবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা যাবে না? পরিবারের সবার ইচ্ছেমতো সবকিছু করতে হবে?

তুমি আসলে কী প্রমাণ করতে চাইছো? কাকে বোকা বানাচ্ছো মেয়ে? নিজের জীবনের কথা আগে না ভেবে, তুমি আসলে নিজেকেই বোকা বানাচ্ছো৷ পছন্দমতো পোষাক পরা, জীবিকা নির্বাহ করা, সংগী বেছে নেওয়া, সংগী পরিবর্তন করা, জীবন দক্ষতারই একটি অংশ৷

জেনে রেখো, এর প্রতিটি ধাপেই ভুল হতে পারে৷ ভুল হওয়া, ভুল করা জীবনেরই অংশ৷ তাই একটা কাজে একবার ভুল করলে, সে ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়৷ আর সেসব নিয়েই মানুষের জীবন। তুমি মানুষ সমাজের অংশ, নারী সমাজ বলে আলাদা কিছু নেই৷ তাই নিজেকে ভালবাসো। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, তুমি আরেকটি মানব জীবন পৃথিবীতে আনতে পারো, যা পুরুষ পারে না। সেদিক থেকে তুমি পুরুষের চেয়ে অধিক সম্মানের দাবিদার।

জেনে রেখো, নষ্ট সমাজের নষ্ট মানসিকতা মেয়েদের পায়ে বেড়ি দিতে এক পায়ে খাড়া৷ তাদের বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে এগিয়ে যেতে হবে তোমার নিজেকেই৷ লেখাপড়া শেখো, বিশেষ করে এমন লেখাপড়া যা দিয়ে উপার্জন করে খেতে পারো৷ চ্যালেঞ্জিং পেশাকে গ্রহণ করতে শেখো৷

মনে রেখো, ভালো উপার্জন করা স্বামী, ভালো মানুষ নাও হতে পারে, তোমাকে সম্মান নাও দিতে পারে৷ তাই তোমার রাস্তা বেছে নিতে হবে তোমার নিজেকেই৷ দিনশেষে মেয়ে তুমি আর কারো নও, তুমি শুধু তোমার৷

শেয়ার করুন:
  • 479
  •  
  •  
  •  
  •  
    479
    Shares

লেখাটি ২,১৪১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.