অপরাধীকে রক্ষাই যখন সংস্কৃতি হয়ে উঠে!

0

দিলশানা পারুল:

একটা বিষয় খেয়াল করেছেন? বাঙলাদেশে যখনই কোন ভয়ংকর অপরাধ সংগঠিত হয় যেইটা যুক্তি মতে এবং আইনের চোখে দণ্ডনীয় অপরাধ, তখনই আশ্চর্যজনকভাবে সেই অপরাধের পক্ষে একটা পাল্টা সামাজিক সুর তৈরি হতে থাকে। ভিকটিম ব্লেইমিং এর একটা সামাজিক ক্ষেত্র তৈরি হতে থাকে।

ভিকটিম ছেলে কী মেয়ে তা কোন বিষয় না। ঘটে যাওয়া অপরাধকে আড়াল করার জন্য আশ্চর্য এবং অদ্ভুতভাবে এক ধরনের বক্তব্য হাজির হতে থাকে। যেই বক্তব্যের আড়ালে অপরাধ যত ভয়ংকর এবং জঘন্যই হোক না কেন, তা ঢাকা পড়ে যেতে থাকে।

গুরুতর অপরাধকে হালকা করার জন্য এক ধরনের চেষ্টা চলতে থাকে। আশ্চর্য এবং দুঃখজনকভাবে জঘন্য অপরাধীর পক্ষেও জনমত তৈরি হতে থাকে। অনেকটা ধরেন এক গ্লাস খাঁটি দুধের মধ্যে যদি এক ফোঁটা লেবুর রস দিয়ে দেন তাহলে দুধটা তার পানের গ্রহণযোগ্যতা হারায়। ওই রকমই একটা নির্ভেজাল খুনের ঘটনার মধ্যে আসামীপক্ষের লোকজন এমন একটা টুইস্ট আনবে যে সেই ঘটনাকে আর আপনি স্রেফ খুন এর বিচার করো, রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিতে পারছে না, সরকার নিরাপত্তা দিতে যেমন ব্যর্থ, বিচার করতেও ব্যর্থ, এই কথাগুলা সহজে বলতে পারবেন না। আপনার সমস্ত শক্তি তখন ব্যয় করতে হয়, ব্যয় করতে হবে এইটা যে একটা খুনের ঘটনা, আইনের ভাষায় দণ্ডনীয় অপরাধ শুধুমাত্র এই একটা বিষয় প্রতিষ্ঠা করতেই।

দিলশানা পারুল

তার ওপরে ঘটনার মধ্যে যদি কোনো একটা মেয়েকে সম্পৃক্ত করা যায় তাহলে সোনায় সোহাগা, কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। ঘটনাকে খুব সহজেই মেনুপুলেট করা যায়, টুইস্টেড করা যায়। বিষয়টা কিন্তু এরকম না যে একটা মেয়ে জড়িত ছিলো তাই ঘটনাটা টুইস্টেড হয়েছে। বেশির ভাগ সময়ই দেখা যায় হত্যার ঘটনাটাকে বিকৃৃত করা প্রয়োজন ওইজন্যই একটা মেয়ে চরিত্র এনে হাজির করা হয়। ঘটনাকে মেনুপুলেট করা হয়। হত্যাকারীর পক্ষে জনমত তৈরি করা হয়।

ধরেন রিফাত হত্যার ক্ষেত্রেই এখন একটা বিরাট জনমত তৈরি হয়ে গেছে এবং তারা বলছে, হত্যা ঠিক আছে এই রকম দুই নাম্বার মেয়ের পরকীয়ার ফল এই হত্যা। ছেলেটি রাগ ঠিক রাখতে পারেনি কাজেই সে হত্যা করতেই পারে। খেয়াল করেন, প্রথম দুই দিন মানুষের যে হতবিহবল অবস্থাটা ছিলো সেইটা কিন্তু আর নাই। এখন পরকীয়ার মতো একটা অন্যায় এবং চাপাতি দিয়ে দিনে-দুপুরে একটা মানুষকে হত্যা করার মতো অপরাধ এই দুইটাকে মোটামুটি একই ওজনে নামিয়ে আনা গেছে।

এখন প্রশ্ন হলো, ঘটনা টু্ইস্টেড আসলে কেন করা হয়? আগেই বলেছি গুরুতর অপরাধকে লঘু করার জন্য, অপরাধ এবং অপরাধীকে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দেয়ার জন্য। আরেকটা প্রশ্ন হলো, এই যে অপরাধ এবং অপরাধীকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য এতো ব্যস্ত, এরা আসলে কারা? খেয়াল করে দেখেন প্রত্যেকটা হত্যা ঘটনার আসামী কোন না কোনভাবে ক্ষমতাসীন দলের সাথে যুক্ত। প্রথম আওয়াজটা সব সময়ই আসে উচ্চ পর্যায় থেকে। মানে মন্ত্রীদের কাছ থেকে। হয় স্পষ্ট ডিনায়াল অথবা মন্ত্রীর মতো পদে থাকা একজন ব্যক্তি বলবে, “শুনেছি ব্যক্তিগত প্রেমঘটিত বিষয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে”।

ব্যস হয়ে গেলো। এইটা আসলে একটা সিগনাল, যেই সিগনালটা আঞ্চলিক পর্যায়ের নেতাকর্মিরা সাথে সাথে রিড করে নেয়। এবং তারপর মহা উৎসাহে ঘটনায় রং চড়াতে থাকে। আসল বিষয় তখন ঢাকা পড়ে যায়। সরকারের দিকে আঙুল তোলা বন্ধ করে বদমাইশ লোক আঙুল তোলা শুরু করে ভিকটিমের দিকে। আর একদল বুদ্ধিকম লোক এদের ফাঁদে পা দেয়। তারপর একদল বদমাইশ আর একদল আইকিউ কম বুদ্ধিহীন লোক মিলে হত্যার পক্ষে জাস্টিফিকেশন দিতে থাকে।

… এই পুরা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অপরাধীদের জন্য বাঙলাদেশেকে একটা অভয়াশ্রম বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এতোদিন বিচার না পেলেও সমাজের মানুষ খুনিকে ঘৃণার চোখেই দেখতো। এখন ঘৃণার পরিবর্তে খুনির মতো অপরাধীকে সামাজিকভাবে গ্রহণ করার, ডিফেন্ড করার সংস্কৃতি তৈরি করা হচ্ছে।

(এই লিখাটা লিখার এক ঘন্টা পর দেশ রুপান্তরে একটা লিখা এসেছে সেইটা পড়লাম। কাছাকাছি বক্তব্য, তবে দুইটা সম্পূর্ণ্ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লিখা। উল্লেখ করে দিলাম, নাহলে প্রায় নকলের দোষে দুষ্ট হতে পারে এই লিখাটা।)

শেয়ার করুন:
  • 121
  •  
  •  
  •  
  •  
    121
    Shares

লেখাটি ২১৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.