সন্তান যখন ধর্ষণের শিকার, আমি তো সুশীল মা হতে পারি না

0

সালমা লুনা:

নারায়ণগঞ্জ সিদ্ধিরগঞ্জে মিজিমিজির অক্সফোর্ড ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষক আরিফুল ইসলাম। তিনি এই স্কুলে এবং তার কোচিং সেন্টার মিলিয়ে ক্লাশ ফাইভ থেকে টুয়েলভ ক্লাশ পর্যন্ত প্রায় বিশজন মেয়েকে ধর্ষণ করে এসেছেন নির্বিবাদে।

কদিন আগে নবম শ্রেণির এক ছাত্রীকে এধরনেরই একটি প্রস্তাব দিলে মেয়েটি আর চুপচাপ বসে থাকেনি। সে বাড়িতে জানিয়েছে এবং মূলতঃ তখনই কানাঘুষায় মানুষজন জানতে পেরেছে এখানে কোনো ঘাপলা আছে। শিক্ষকের ফোনে একটা কিছু আছে।

অতঃপর লোকজন দলবেঁধে তার কাছে যায় এবং ফোন চেক করে কিছুই পায় না।
পাপের চিহ্ন আপাত নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন মহান শিক্ষক! অস্বীকারও করেছিলেন, ভেবেছিলেন বেঁচে গেছেন।

সালমা লুনা

কিন্তু না। অভিভাবকরা আর তাকে বিশ্বাস করেননি। প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই ফোন থেকেই অবশেষে উদ্ধার করেছেন পিতার পরেই যে শিক্ষক, তার পাপের সকল চিহ্ন।
তিনি ধর্ষণ করেছেন তার ছাত্রীদের এবং তা ভিডিও-ও করে রেখেছিলেন।

তিনি কেন ভিডিও করতেন জানেন?
যাতে সেই ভিডিও দেখিয়ে ছাত্রীটিকে পুনরায় ধর্ষণ করা যায়। এবং কিছু টাকাপয়সাও হাতিয়ে নেয়া যায়।
না, বিষয় এতো সোজাও না। তিনি ওসব ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ছাত্রীদের মাকেও ধর্ষণ করেছেন।
বুঝলেন কিছু?

ধর্ষকের আলাদা জাত নাই পেশা নাই ঘর নাই সমাজ নাই দেশ নাই।

তারা আমাদেরই মাঝে থাকা পুরুষ জাত। তারা যেকোনো পেশাতেই থাকে। তারা আমার আপনার মতোই ঘরে সমাজে রাষ্ট্রে আমাদের সাথেই বসবাস করে। আমাদের সামনেই ঘোরে। আমরা তাদের না জেনে না বুঝে তাদের সাথে একসাথে চলিফিরি খাই-দাই, তাদের প্রয়োজনমতো সম্মানও করি। ঘুণাক্ষরেও বুঝি না যে এরাই ধর্ষক।

তবে একটু চেষ্টা করলেই বুঝবেন। মাথা খাটাবেন, বুঝবেন সুযোগ পেলেই কে ধর্ষকে পরিণত হয়।
যখন দেখবেন আপনার সামনে দাঁড়ানো পুরুষটি কথা বলছে আপনার সাথে, কিন্তু তার চোখদুটি পেতে রেখেছে বুকের উপর। উড়না বা শাড়ির আঁচল ভেদ করে যাচ্ছে সেই দৃষ্টি। ঠিক বুঝবেন ইনি সুযোগের অভাবেই সাধুটি সেজে থাকেন, সুযোগ পেলে ধর্ষক হবেন।

যখন অনুভব করবেন ভীড়ের মাঝে আপনার শরীরের স্পর্শকাতর স্থান ছুঁয়ে গেলো যে নরাধমের হাতটি সেও ধর্ষক।

আপনার সামনেই যেকোনো নারীকে নিয়ে নারীর শরীর নিয়ে যে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি বা কুৎসিত মন্তব্য করে যে পুরুষটি, সেও সুযোগের সদ্ব্যাবহার করতে ছাড়বে না।

দিনরাত পর্নে বুঁদ হয়ে থাকা আপনার স্বামী ভাই কিংবা পুত্র সময় এবং সুযোগ পেলে কে জানে কী করে বসে!

অনলাইনে যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে নারীকে নিয়ে কটূক্তি করে, নারী শরীর নিয়ে বাজে কথা বলে, প্রকাশ্যে ধর্ষণের ইচ্ছা প্রকাশ করে, নারী বা পুরুষকে শায়েস্তা করতে তাদের বোন-মাকে যে সম্ভোগ করতে চায়, আপনার কথা পছন্দ না হলে আপনাকে যে _দে দিতে চায়, রাগ উঠলে যে রাস্তার মানুষকে _দে দিতে চায়, যারা মনে করে নারীর কাপড় যথাস্থানে না থাকাই ধর্ষণ বৃদ্ধির কারণ, এরা প্রত্যেকেই একেকজন সম্ভাব্য ধর্ষক।
আপাতত হয়তো মনে মনে। কিংবা সে নিজেও জানে না যে ধর্ষণেচ্ছা তার মনের কালো কুঠুরির গভীর স্থানে সুপ্ত।
কখনো সময় ও সুযোগ মিলে গেলে সেই ঘুমিয়ে থাকা ধর্ষক বেরিয়ে আসবে এবং সামনে যেকোনো নারী পেলে সে যে বয়সেরই হোক তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।

ধর্ষকরা ভেবে দেখতে পারে নারী পুরুষকে প্রলুব্ধ করলেও কিন্তু কখনো ধর্ষণ করে না। গোবেচারা পুরুষকে নারীরা কাপড় কম পরে, চুল খুলে, লাল লিপস্টিক আর টিপ পরে প্রলুব্ধ করে শারীরিক সম্পর্কের জন্য কিন্তু ঝাঁপিয়ে পড়ে না কেন?

উত্তর তো জানাই আছে। কী করে করবে? তার শরীর যে ধর্ষণোপযোগীই নয়!
সেজন্যই যে অঙ্গটির জন্য ধর্ষকের নয় মাসের শিশুর উপরেও ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রতি এতো ঝোঁক, সেই ক্ষতিকর অঙ্গটিই সবাই কেটে দিতে চায়। অঙ্গটি কেটে দিলেই বা সমস্যা কী!
বাঁশ রইলো না, বাঁশিও বাজলো না।

আমি মনে করি ধর্ষণ একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে সবার একতাবদ্ধ হওয়া উচিত। কেউ লিখলে তার লেখার গলা টিপে ধরা অনুচিত। এতে ধর্ষকের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ না হোক আয়নায় নিজের চোখে চোখ রাখা যায় না।
প্রতিবাদ করুন ধর্ষণের বিরুদ্ধে। এবং সম্ভব হলে সমাজের ধর্ষকদের চিনে তাদেরও প্রতিহত করুন।

শুধু প্রতিবাদ, প্রতিরক্ষা এবং সম্ভব হলে প্রতিরোধ।

আর প্রতিশোধ?

হ্যাঁ, আমি ধর্ষণের বিচারহীনতার এই কালো কুৎসিত সময়ে গুলি করে ধর্ষক মেরে ফেলার পক্ষে, তাকে তেমাথায় সর্বসমক্ষে ফাঁসি দেয়ার পক্ষে।
যখন আমার দেশেরই এক স্কুলে এক শিক্ষকের কাছে আমারই বিশজন বাচ্চা ধর্ষিত হয়, তখন আমি বিচার চেয়ে কেঁদে বেড়ানোর মতো সুশীল মা না।
মায়েরা এইসব ক্ষেত্রে সুশীলগিরি ফলায় না। প্রয়োজনে মা-ই তো যুদ্ধসাজ পরিয়ে সন্তানকে যুদ্ধে পাঠায়। দেবী মা-ই তো অসুর নাশ করে।

আমি ধর্ষককে শ্যুট করার পক্ষে এবং আমি এজন্য বিন্দুমাত্র দুঃখিতও না।

শেয়ার করুন:
  • 668
  •  
  •  
  •  
  •  
    668
    Shares

লেখাটি ১,১৩৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.