কতোটা ‘স্বাভাবিক’ হলেই এমনটা সম্ভব!

0

ইলা ফাহমি:

রিফাত হত্যায় ভিডিও ফুটেজ বলছে হত্যাকারী দুজন পুরুষ, কিন্তু সোশ্যাল মোরাল পুলিশ বলছে, এই ঘটনার জন্য দায়ী নারীটি যে কীনা স্বামীকে বাঁচাতে চেয়েছিলো। ঘটনা কী? ঘটনা হচ্ছে, খুনির সাথে নারীটির আগে প্রেমের সম্পর্ক ছিলো এবং নারীটি যখন সম্পর্ক ছেদ করে রিফাতকে বিয়ে করেছে তখন খুনি মেনে নিতে পারেনি। তাই প্রকাশ্যে বড় বড় রামদা দিয়ে তার স্বামীকে কুপিয়ে মেরে ফেলেছে।

বাংলাদেশের এই মোরাল পুলিশদের জন্য মুখভর্তি যে বিশ্রি গালিটি আসছে, তা বলা উচিত হবে না৷ একজন নারীর সম্পর্ক ছিলো, সে সেই সম্পর্ক শেষ করে আরেকজনকে বিয়ে করেছে। এখন প্রাক্তনের মাথায় খুনের নেশা চাপে কী কারণে? তাও প্রেমিকাকে না, প্রেমিকার স্বামীকে? ‘প্রেমিকা সে প্রাক্তন হোক আর বর্তমান, সে একদা আমার ভোগের সম্পত্তি ছিলো’ এই চিন্তা থেকে? নাকি ‘তুই আমার হোসনি, আর কারো হতে পারবি না’ এই চিন্তা থেকে? নাকি ‘তুই আমাকে ছাড়া অন্য কারো সাথে সুখী থাকতে দেখলে আমার নিজেকে হেরে যাওয়া ব্যর্থ মনে হয়’ এই চিন্তা থেকে?

আমার কাছে প্রথমটা বেশি গ্রহণযোগ্য। যাকে একবার ছুঁয়েছিল একদিন, তাকে ছুঁয়ে দিচ্ছে আরেক পুরুষ, সেটা মানাটা খুব কষ্টকর! নারী মানেই তো একজনের ভোগের সম্পত্তি, তার আর কারো সাথে সম্পর্ক হওয়া মানে আরেকজন ভোগ করছে। স্বামীর সাথে তাকে দেখলে অতীতের স্মৃতি মনে পড়ে যাবে, আর মনে চলে আসবে সেই তিন হাজার বছরের চলমান চিন্তা-‘এই শরীর শুধু একজনের ভোগের বস্তু’। এ সম্পত্তি এমন সম্পত্তি, যা হারানোর পর এবং আরেকজনকে তা ভোগ করতে দেখলে পৌরুষে আঘাত লাগে, ইগোতে লাগে, অপমান লাগে, ব্যর্থ মনে হয়! যার ফলশ্রুতিতে প্রতিশোধস্পৃহা জেগে ওঠে! সেই প্রতিশোধস্পৃহা কখনো স্বয়ং ‘সম্পত্তি’র গায়েই আগুন দেয়, এসিড দেয়, খুন করে কিংবা কখনো সম্পত্তির ভোগকারীকে! এই চিন্তায় যারা বিশ্বাস করে তারাই তো মেয়েটিকে দোষী সাব্যস্ত করছে!

মেয়েদেরকে দোষী করা তো খুব সহজরে ভাই, যাই কিছু করুক জাস্ট ওতে দু’চামচ ইজ্জত/যৌনতা মিশিয়ে ঘুটা দিলেই দোষের দুর্গন্ধ ছড়ানো সম্ভব! নারী মানেই তো যৌনবস্তু, নারীর সকল দোষ, লজ্জা, গুণ মিলেমিশে ওই এক মোহনায় মিলেছে!

আর আপনারা যারা ফুটেজে দর্শকসারি দেখে অবাক হতবাক, নির্বাক হচ্ছেন, তাদেরকে বলবো চোখের ডাক্তার দেখান। না পারলে আপাতত ছবি আর ফুটেজ ভালো করে দেখেন। এতো সহজ নির্ভার হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওরা খুন হতে দেখছে, নাকি খুনিকে পাহারা দিচ্ছে? যদি খুন দেখে থাকে আর সত্যিই এগিয়ে না আসে, তাহলেও এদের নিয়ে মনোবিজ্ঞানী/সমাজবিজ্ঞানীদের ভাববার সময় এসেছে, যদি খুনিকে পাহারা দিয়ে থাকে, তবেও ভাববার সময় এসেছে।
একটা সমাজে খোলা রাস্তায় কোপের পর কোপ দিয়ে মানুষ মেরে ফেলা হচ্ছে, এটা কতোটা স্বাভাবিক হলে করা যায়? কতোটা বিচারহীনতার স্বাদ উপভোগ করলে করা যায়?

আপনারা যারা ছবি কিংবা ভিডিও দেখতে পারেননি, তারা পুরোপুরি সুস্থ। কিন্তু আমি দেখেছি। বার বার ভিডিও দেখেছি, ছবি দেখেছি৷ একদম চোখের পলক না ফেলে পুরো ভিডিও দেখেছি, দেখে ঘুমাতে গেছি। ঘুমে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠে ভিডিও দেখে আবার ওপাশ ফিরে ঘুমিয়েছি। সারাদিন হাসিমুখে অফিস করে এখন ফেসবুকিং করতে বসেছি এবং আবারো ভিডিওটি দেখছি৷ কারণ আমি নিজেকে সুস্থই মনে করি না, আমি অসুস্থ।

আমি জানি আমার নিজেরও আজ বা কালকের জীবনের ভরসা নেই। আমি মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করি মৃত্যুকে দেখতে দেখতে।

শেয়ার করুন:
  • 106
  •  
  •  
  •  
  •  
    106
    Shares

লেখাটি ৭৩১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.