পুরুষের সকল অপকর্মের দায়ভার কেবলই নারীর!

0

লতিফা আকতার:

বরগুনায় খুন হওয়া এবং খুনি উভয়ই পুরুষ। একজন পুরুষ প্রকাশ্যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আর একজনকে সমানে আঘাত করছে। আর কাজটি সুষ্ঠুভাবে হওয়া নিশ্চিত করার জন্য আরও কিছু ছেলে চারদিকে নানান ভঙ্গিমায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। আঘাতপ্রাপ্ত ছেলেটিকে বাঁচানোর চেষ্টাকারী একমাত্র ব্যক্তিটি – নারী। নির্মম এক দৃশ্য! নির্মমতার ভিডিওটি আমি দেখিনি। কিছু স্টিল ফটো দেখেছি।

কিন্তু পরবর্তী নির্মমতাটা ভালোভাবে দেখছি। আর এই নির্মমতা হলো- ঐ খুন হওয়ার কারণ হিসেবে নারীটিকে বিবেচনা করার চেষ্টা। অনেকেই মনে করেন পুরোপুরি না হলেও এই খুনের পিছনে নিম্মি নামের মেয়েটা অনেকখানি দায়ী। একজনকে সে ex বানিয়েছে। আর একজনকে সে বিয়ে করেছে। একজন পুরুষকে ছেড়ে দিয়ে সে ঐ পুরুষের ইগোতে আগুন জ্বালিয়েছে। আর সেই আগুনে উত্তপ্ত হয়েই নয়ন খুনের মতো অন্যায় কাজ করে ফেলেছে। তো? দায়ী কে হলো?

পুরুষের অপকর্মের উপর পর্দা টানতে যুগের পর যুগ নারীকে বলি দেওয়া হয়েছে। সে বলির আসনে বসেছে নারীর শরীর, মন, নারীর চরিত্র। আর বলির জয়গান গেয়েছে পুরুষ, আর মননে পুরুষতান্ত্রিকতা ধারণ করা অসংখ্য নারী। আর তা ধীরে ধীরে নারী জীবনের আজন্ম পরিহাসে পরিণত হয়েছে।

লতিফা আকতার

‘জন্মই যাঁর আজন্ম পাপ’- এই এক লাইনের মাধ্যমে নারীর উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে দোষের বহু বোঝা। বেহেশতের আরাম আয়েস এর জীবন হতে বিতাড়িত হওয়ার দোষ। পুরুষ গায়ের ওড়না টান দিয়েছে তো নারীটিরই দোষ। এসিডে মুখ পুড়িয়েছে- যুক্তিযুক্ত কোনো কারণ ছিলো। মিস ক্যারেজ হওয়া তো অনেক আকাজ কুকাজের ফলাফল। ধর্ষণের শিকার হওয়া মানে তো নারীর তথাকথিত ‘ইজ্জত’ ‘সম্ভ্রম’ হারানোর শামিল। মেয়েটিরই দোষ। শুধু তাই নয়, পাশাপাশি পুরো পরিবারের ‘ইজ্জত’ যাওয়ার জন্যও সে-ই দায়ী। ধর্ষণ যে করে তার ইজ্জত যায় না। কেননা সে পুরুষ।

নারীকে দোষী সাব্যস্ত করার বিচারিক আসনে পুরুষের পাশাপাশি মন ও মগজে পুরুষতন্ত্র ধারণ করা নারীও উপবিষ্ট। আর এদের তালমিলে ভয়াবহ এক অবস্থা। পুরুষ ধর্ষণ করে আর নারী সহযোগী হিসেবে বিচার চাওয়া নারীটির গায়ে আগুন লাগায়। আর কিছু না হলেও চরিত্রহীনা প্রমাণে পুরুষের হ্যাঁ’তে হ্যাঁ মিলায়। তাই তনু, নুসরাত, মিতু, নিম্মির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আর নিজের সাথে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অন্যায়ের দায়ভার নারীকেই নিতে হচ্ছে।

সমাজের দীর্ঘ ইতিহাসে যুগের পর যুগ এই ধরনের নৃশংসতা ঘটার পিছনে নারী দায়ী নয়। দায়ী পুরুষের নোংরা মস্তিষ্ক। যে মস্তিষ্ক নারীর প্রাণখোলা হাসির মধ্যে প্রাণ নয়, যৌন আবেদন দেখে। এ ধরনের দেখাদেখির কারণে উপমহাদেশের নারীর পার্সোনাল এটায়ারস এখনও আড়াল করে শুকাতে হয়, রাখতে হয়। অসাবধানতাবশত তার ফিতা বের হয়ে গেলে নারীর চরিত্র নিয়ে সন্দেহ করা হয়। আর এসব কিন্তু পুরুষের কারণেই করতে বাধ্য হয় নারী। এবং নিজেকে সেফ রাখার প্রাথমিক চেষ্টা হিসেবে। রসিয়ে রসিয়ে হওয়া আলোচনা- যা তাঁকে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে, তা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য।

এই শোনা না শোনায় একটা বিষয় বুঝেছি- উপমহাদেশের পুরুষের মস্তিষ্কে বাসা বাঁধা নানান অসঙ্গতি যুগের পর যুগ ধরে চর্চিত ধর্মের অপব্যাখ্যা, অপসংস্কৃতির ফলাফল। কেননা সতীত্বের পরীক্ষায় নারীকে অবতীর্ণ হতে হয়ছে। সতীত্ব হারানোর ভয়ে যুদ্ধের সময়ে নারী আগুনে পুড়ে আত্মহুতি দিয়েছে। নারীর শরীরকেন্দ্রিক হাজারও ট্যাবু নারীকে শরীর ঢাকতে বাধ্য করেছে। স্বামীর মৃত্যুর পর নারী চুল কেটে, নিরামিষ খেয়ে জীবনযাপনে মনোযোগী হতে বাধ্য হয়েছে। আর পুরুষের জীবনে একাধিক বিয়েসহ বাঁদী, উপপত্নী অবাধে মিলেছে। আর এইভাবে গড়ে ওঠা কালচার খোলা দৃষ্টিভঙ্গি’র অপমৃত্যু ঘটিয়েছে।

কালচার মানুষের মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে। উপমহাদেশের লোকজনও ব্যতিক্রম নয়। আজ আমরা যা দেখছি, মোকাবেলা করছি- তার পিছনে এখানকার অপসংস্কৃতি অনেকটা দায়ী। নারীর আত্মঅহংকারকে ভেঙ্গে চুরমার করে নিজের পায়ের কাছে ভুলুন্ঠিত করতে পারা পুরুষটি নায়ক। আর তাই যুগে যুগে নয়নরা এভাবেই নায়ক হওয়ার চেষ্টা করে।

আর নিজেকে এভাবে অপমানিত হতে দেওয়ার পিছনে নারী নিজেই দায়ী। তার হাতে রোপিত বীজটি হতে জন্ম নেওয়া চারাটি পুরুষের হাতে তুলে দিয়েছে এই নারী। বীর পুরুষকে সাজানো, তাঁর মনোরঞ্জনে নিজেকে নিয়োজিত রাখার কারণে নারী আজ পরিচয় সংকটে ভুগছে। আজ তাঁর কাজ আনপ্রোডাক্টিভ খাত হিসেবে বিবেচিত। পুরুষের দৃষ্টিতে তৈরি নির্ধারিত কাঠামো হতে ব্যতিক্রম নারী, সমাজের দৃষ্টিতে নানান বিশেষণে বিশেষায়িত। নানান প্রতিকুলতার সম্মুখীন।

আর এই প্রতিকুলতার একটি বড় রূপ হলো- পুরুষের দ্বারা অনেক নিকৃষ্ট কাজের দায়ভার নারীর উপর চলে আসা। স্বামীর বেশ্যালয়ে গমন কিংবা পরকীয়া, সন্তানের প্রতি অমনোযোগ, পিতা মাতার প্রতি দায়িত্বহীনতা সব কিছুর কারণ হিসেবে নারীকে বিবেচনা করা।

যাই হোক, রজনীকান্তের “রোবট” সিনেমা দেখে আবারও নিশ্চিত হলাম- নারীর ছোঁয়া মেশিনের ভেতরে ও প্রেম জাগ্রত করে। আর মানুষের ভেতরে তো অবশ্যই। তবে সে প্রেমকে হিংসায় রূপান্তর করে পুরুষের মস্তিষ্ক। এবং ব্যর্থ প্রেমের কারণে আপনার দ্বারা সংঘটিত অমানবিক কাজটির দায়ভার একান্তই আপনার। কোনও নারীর নয়।

শেয়ার করুন:
  • 2.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.2K
    Shares

লেখাটি ৩,৪৫০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.