স্রেফ সাহস নিয়ে দাঁড়ান

0

দিলশানা পারুল:

আমারও মনে হচ্ছে সাহস করে দাঁড়ানোর গল্পগুলা আসলে বলা দরকার। নইলে এই প্রজন্ম জানবে কীভাবে!
আমার সমস্ত জীবনে আমার সামনে কাউকে মারা হচ্ছে, কিন্তু আমি থামানোর চেষ্টা করিনি এখন পর্যন্ত এরকম ঘটনা ঘটেনি। সেই স্কুল জীবন থেকে। আমাদের ক্লাসে ফাজিল কতগুলো ছেলে ছিলো। সবুজ নামে ক্লাস নাইনে একটা ছেলে ভর্তি হলো ভালো ছাত্র, দেখতে ভালো, ব্যাস ওকে জ্বালানো শুরু করলো অন্যরা। তিন-চারজন মিলে একদিন ক্লাসের মধ্যেই ওকে মারা শুরু করলো। আমি তখন সোজা গিয়ে সবুজকে পিছনে ফেলে ওদের মাঝখানে দাঁড়ালাম। সহজ হিসাব, ওকে মারতে হলে আমাক মেরে তারপর আগাতে হবে। এরপর একটা টোকাও সবুজের গায়ে লাগেনি।

বিশ্ববিদ্যালয় ফার্স্ট ইয়ারে ছাত্রফ্রন্টের প্রেসিডেন্ট মাসুম ভাইকে ছাত্রলীগ হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়েছিলো আমার সামনে। সেই গল্প একদিন বলেছি। আবারো বলি। আমি একা একটা মেয়ে আমার সবটুকু দিয়ে প্রতিহত করেছিলাম ছাত্রলীগের চারজন গুণ্ডাকে।

যখন মাস্টার্সে পড়ি, ছাত্রদল তখন ক্ষমতায়। ছাত্রদলের ১৭ টা ছেলে তখন সাংবাদিক এবং ছাত্র ইউনিয়নের স্বপনকে একা সমাজ বিজ্ঞান চত্বরে ঘিরে ধরেছিলো। আগেরদিন ও কোন একটা রিপোর্ট করেছিল ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। ওইদিন ওদের প্ল্যান অন্যরকম ছিলো। আমি একা স্বপনের হাত ধরে, স্বপনকে পিছনে ধাক্কা মেরে সরিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম। ছেলেগুলোর হাতে লাঠিসোটা ছিলো। খুব ঠাণ্ডা কণ্ঠে শুধু বলেছিলাম, ‘দেখেন, মারতে হলে আমাকে মেরে আগাতে হবে’।

গাধা একটা বলে, আমি ছাত্রদলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ওমুক, আপনি কে? আমি বললাম, আমি পরিসংখ্যানের ২৮ তম ব্যাচের পারুল। সাধারণ ছাত্র। কিন্তু ওরে মারতে পারবেন না। সেদিন স্বপনের গায়ে কোনো টোকা ওরা দিতে পারেনি।

ছাত্রফ্রন্ট আর ছাত্রদলের দেয়াল লিখন নিয়ে ধাক্কাধাক্কি লেগেছে। ফট করে ছাত্রদলের আর্মস ক্যাডার পকেট থেকে পিস্তল উঁচিয়ে আসে আমদের দিকে। আমি সোজা গিয়ে ওর পিস্তল উঠানো হাতটা ধরে ফেলেছিলাম। সবাই মিলে ভীষণ চিৎকার, চেঁচামেচি হচ্ছে। আমি ছাত্রদলের আর্মস ক্যাডারের হাত ধরে শুধু চিৎকার করছি, ‘এইটারে আটকা, এইটারে আটকা’। কারণ ও খুব ভালো করেই জানে, অস্ত্রসহ ধরা খেলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সোজা বহিষ্কার।
ওর প্রচণ্ড ভয় পাওয়া চোখ এই এতো বছর পরও একটুও ভুলিনি। আমার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ওই যে দৌড় প্রায় সাত দিন ক্যাম্পাসে আসে নাই। অথচ ওর হাতে অস্ত্র ছিলো, আর আমার হাত খালি।

আমি যখন গুলশানে চাকরি করি, উত্তরা বাসায় ফেরার সময় বাসে ড্রাইভারকে পেটাচ্ছিলো, সারা বাসের মধ্যে আমি একা সেইটা থামিয়েছি। উত্তরা জসিমউদ্দিন মোড়ে আমি রিকশাওয়ালা মামাদের মারামারি থামিয়েছি। আমার সহজ একটা রাস্তা আছে মারামারির মধ্যে সোজা গিয়ে মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাই।

এই ঘটনাগুলো এই কারণে বললাম না যে, ‘দেখো, আমার কত সাহস, আমাকে বাহবা দাও’।

এই কথাগুলো এই কারণে বললাম, আমি একটা মেয়ে, পাঁচ ফুট সাড়ে তিন ইঞ্চি উচ্চতা, ওই সময় ওজন ছিলো ৫২ কেজি, কিন্তু রাজনৈতিক দলের সতেরো জন মাস্তানকে একা থামাতে পেরেছি। শুধুমাত্র আমার সাহস ছিলো বলে।

স্রেফ সাহস নিয়ে দাঁড়ান, বাকিটা আপনাআপনি হবে।

(এরকম বা আরও ভয়াবহ রকমের সাহসের গল্প নিশ্চয়ই আছে অনেকের। ইচ্ছা করলে শেয়ার করতে পারেন: উইমেন চ্যাপ্টার)।

শেয়ার করুন:
  • 217
  •  
  •  
  •  
  •  
    217
    Shares

লেখাটি ৭২০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.