অকারণে ‘পরকিয়া’র অপবাদ দেবেন না নারীকে!

0

আরজুমান্দ আরা বকুল:

পবিত্র কোরানে পরিষ্কার বলা আছে, পুরুষের তিনটি সামর্থ্যের মধ্যে যদি একটি সামর্থ্য অনুপস্থিত থাকে, তবে বিবাহের যোগ্য নন তিনি। কোন সুরা কোন আয়াত নাইবা বলি, আপনারা পণ্ডিত ব্যক্তি, আমার চেয়ে ভালো জানেন। আশির দশকে পরিবার পরিকল্পনা অফিসেও এই বাণী অনেকেই ঝুলতে দেখেছেন জানি।

১. শারীরিক সঙ্গতি
২. সামাজিক সঙ্গতি
৩. অর্থনৈতিক সঙ্গতি

এবার আসি পরকিয়া কী, এবং কারা এই পরকিয়া করে?

তখন যশোরে থাকি, কোন এলাকায় বলবো না। পাশেই একটি মেস ছিল। চারটি ছেলে ছিল। তার মধ্যে একজন মুখচোরা। যেমন কথা কম বলতো, তেমনি চোখ নামিয়ে থাকতো সারাক্ষণ। দেখতে একেবারে কার্তিক ঠাকুর।
একদিন হঠাত দেখি মেস খালি। ছেলেটির মা পান খাওয়া মুখে একগাল হেসে বললো, ভালো চাকুরী পেয়েছে, এবার বউ আনবো।

বাহ খুব ভালো, আমারও গল্প করার প্রতিবেশি মিললো। যথা সময়ে দিনক্ষণ, কোষ্ঠি মিলিয়ে বিয়ে হলো, বউ এলো। অপরূপ কবিতার মুখ।
বেশ হাসি খুশি। গেলে আপ্যায়ন করে। আমার ছেলেকে খুব আদর করে কোলে বসিয়ে খাওয়ায়। আমিও মাঝে সাঝে ছেলেকে তার কাছে দিয়ে ঘর সামলাই।

একদিন সেই মেসের পুরোনো বন্ধুদের দাওয়াত দিল, আমিও সাহায্যকারী ছিলাম। তারা বউ দেখে বউ এর রূপ ও রন্ধনের প্রশংসা করে চলে গেল।
শাশুড়িও সংসার গুছিয়ে চলে গেলেন। যাবার আগে আমাকে বললেন, মাগো, দেখে রেখো। গ্রামের মেয়ে শহরে এই প্রথম। আমি যদিও বধুটির চেয়ে বয়সে ছোট ছিলাম, তবুও গিন্নিমার মতো সামলে রাখতাম।

কিন্তু যত দিন যায়, বধুটি লাবণ্য হারায়।
মুখ শুকনো। কী যেন ভাবে। আমার বাসায় আসাও কমে যায়। আমি গেলেও উদাস ভাব কাটে না। আমার রাজপুত্র শুধু খানিকটা অনুকম্পা পায়।
হঠাত দেখি একদিন মেইন দরজায় তালা। নক করে ফিরে আসবো, এমন সময় ভেতর থেকে বধুটি বললো, দিদি একটু জানালায় আসো।
গেলাম। সেকী! সারা মুখে কালশিটে। এতো প্রণয়ের দাগ নয়! তারপর যা শুনলাম, তার খানিকটা বুঝলাম, খানিকটা বুঝলাম না। আমি নিজেও তখন জীবন সম্পর্কে, যৌবন সম্পর্কে অতটা ওয়াকিবহাল না।

যাই হোক, ছেলেটি নপুংসক। মা জানতেন পুরো বিষয়টা, শুধুমাত্র সমাজ কী বলবে তাই গরীব ঘরের একটি মেয়ে এনেছে বাবাকে পটিয়ে। চার মেয়ের গরীব পিতা, সব জেনেই মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন।ভেবেছেন, খেয়ে পরে তো বেঁচে থাকবে!

মেয়েটিও খেয়ে পরে বেঁচে থাকতেই চেয়েছিল। কিন্তু পুরুষটি ছিল উদ্ধত। কারণ সে তার ত্রুটি গায়ের জোরে ঢাকতে চেয়েছিল। কোনো একদিন মেসের কোনো একটি বন্ধু ছেলেটির অবর্তমানে এসেছিল। আর মেয়েটি নাকি তার সাথে হেসে কথা বলেছিল। আর তাই তার এখন বন্দিদশা। আর কথায় কথায় হাত তুলে পুরুষত্ব জাহির করে। অথচ মেয়েটি তার ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে বলেছিল, সে কোনো পাপ করেনি। আর করবেও না।যদি একটু মায়া পায়, তবে এখানেই থেকে যায়। সে তার বাসনাকে দমনের নিমিত্তে প্রায়ই উপবাস থাকতো, সেদ্ধ ভাত খেত। এক কথায় বিধবার জীবন।

তাইতো বলি, এমন ঢল ঢল মুখ প্রতিদিন কৃশকায় হচ্ছে কেন, লাবণ্য উধাও হয়ে পড়ছে কেন! তো, কিছুদিন পর মেয়েটি অত্যাচার সইতে না পেরে গ্রিল কেটে কী করে যেন এক কাপড়ে পালালো।চারিদিকে রব উঠলো, পরকিয়া। সকলেই বললো, এমন বর রেখে কেউ রাস্তার পুরুষের সাথে পালায়! নিশ্চয় আগে থেকে ‘ভাও’ (তৈরি) করা ছিল। মিথ্যা আরো অপবাদ জুটলো চুরির। অথচ তার শাশুড়িই আমাকে বলেছে, আপদ বিদেয় হয়েছে। ঠাকুর রক্ষা করেছেন সোনা দানা হারায়নি কিছু।

প্রসঙ্গ ২: এই ছেলেটির ছিল অন্যরোগ। তখনও সমকামিতা কী জানিনি। সে তার বিয়ের আগে এক বন্ধুর সাথে এক বাড়িতে থাকতো। বিয়ের পরও বন্ধুটি এলে ছেলেটি তার সাথেই ঘুমাতো। মেয়েটি কিছুই না মনে করে তাদেরকে বেডরুম ছেড়ে দিয়ে গেস্ট রুমে ঘুমাতো। এটি ঢাকায় আসার পরের ঘটনা। শান্তিবাগে থাকি তখন। এর মধ্যে তাদের একটি সন্তানও আসে। দারুণ হাসি-খুশি পরিবার। বাচ্চার হাগু হচ্ছে না ডেকে পাঠায়। আমি গিয়ে সাবান গুলে পানের বোঁটা দিয়ে হাগু করাই। কান্না করছে, দুধ মুখে নিচ্ছে না, আমি গিয়ে সাহায্য করি।

এর মধ্যেই হঠাত দেখি একদিন বাচ্চার কান্না থামে না। সাথে মায়ের গলার চাপা আওয়াজের কান্না। দরজা ধাক্কাই, দরজা খোলে না। চিন্তায় পড়ে যাই। আমারও আর ডাক পড়ে না। ব্যস্ত সংসারের ব্যস্ত মানুষ আমি ভুলেও যাই। যাই হোক, একদিন দুপুরে বাথরুমে পানি ধরছি, কল ছাড়া থাকায় শব্দ শুনিনি বোধ হয়। দেখি বাইরের দরজায় দুড়ুম দুড়ুম। ভয় পাই। বাইরে দেখার কোন ছিদ্র নাই দরজায়। তবুও ভয়ে ভয়ে দরজা খুলি।

দেখি, বউটি বাচ্চাকে কাপড়ের পুটলি বানিয়ে বোরকার মধ্যে ঢুকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢোকে। আমার হাতে চাবি দিয়ে বলে, চললাম। আমি বলি, চললাম মানে?
বলে, আর সম্ভব নয়। আমার স্বামীর আমার প্রতি মনোযোগ নাই, তাতে কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু গত সপ্তাহে আমি আমার স্বামী ও তার বন্ধুর সহবাস দেখে ফেলি, আর এটাই আমার অপরাধ। কথায় কথায় গায়ে হাত তুলছে। আর দুই বন্ধু মিলে আমাকে গায়ে আগুন লাগিয়ে মেরে ফেলার পরামর্শ করছে। আমি মরলে আমার সন্তানের কী হবে?
ভাবী, আমি বাঁচতে চাই।

আর কথা বাড়ায় না, দুদ্দাড় নেমে যায়। ভদ্রলোক ঘরে ফিরে চাবির খোঁজে আমার কাছে আসে। বলি, ভাবী কী যেন কিনতে গেল। আপনার দেরি দেখে চাবি আমাকে দিয়ে গেল। লোকটি সন্দেহের চোখে আমাকে দেখে চাবি নিয়ে চলে গেল।
আবারো রব উঠলো পরকিয়া..

প্রসঙ্গ ৩: মেয়েটির বিয়ের বয়স ৪/৫ বছর। একটি বিবাহ বার্ষিকীর দাওয়াত আমিও খেয়েছি। বউ বাঁজা বলে শাশুড়ির আক্ষেপের শেষ নাই। ডাক্তার, কবিরাজ সব বউকে ঘেঁটে খাওয়ায়, ছেলে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। সে তো পুরুষ। তার কি দোষ থাকতে পারে? এরপর একদিন মহা হই চই, আরে অফিসার মানুষ বউ পেটায়?

আমি ভাবতেই পারি না, যথারীতি স্যুটকোট পরে বাবু সেজে বেরিয়ে যান ভদ্রলোক।
বউটি চোখ মুছতে মুছতে আমার বাসায় আসে। কী হলো ভাবী, মুখ শুকনো কেন?
আর বলবেন না, বলে গড় গড় করে যা বলে তার অর্থ হলো, এতোদিন মিথ্যা অপবাদ সহ্য করেই ঘর সংসার করছি ভাবী, শুধু মা বাবার মুখ চেয়ে। এখন আর সম্ভব নয়।

কেন ভাবী, কী হয়েছে?
এতোদিন বাইরে বাইরে যা খুশি করেছে, আমি শুনেও না শোনার ভান করেছি। এখন ঘরের মধ্যে ছিঃ
আহা ভাবি বলবেন তো..
সবটা না বুঝে বলি কী করে?
তার কোন সামর্থ্য নাই, অথচ আমার গায়ে হাত তোলে, তাও সহ্য করেছি, কিন্তু এখন…
আহা ভাবী বলুন। আমার ধৈর্য্যেরও তো সীমা আছে। বউটিকে আমার ন্যাকা ন্যাকা লাগে। গা ভর্তি গয়না, ঘরে দামি আসবাব, সরকারি চাকুরে বর। তাহলে কীসের সামর্থ্যের কথা বলে?

যা বলে তার সমাধানে তার বাসার বুয়াকে বলি, এই তুমি যার খাও তারই ক্ষতি করতে চাও? কেন? তুমিও তো মেয়ে মানুষ। উত্তরে মেয়েটি ঝামটা মেরে মুখের ঘোমটা খুলে যা বলে তার অর্থ হলো, আমার স্বামী সমর্থবান, অভাব টাকার। খালুজান লাইড়া চাইড়া ছাইড়া দেয়। টাকা তো পাই। স্বামীর সোহাগের অভাব নাই, আপনি খ্যাচ খ্যাচান ক্যান? থাকেন ক্যান এমন স্বামীর লগে? আপনি মাইয়া না হিজড়া?
ঘটনা টাঙ্গাইলের। অর্থাৎ ক্ষমতা না থাকলে কী হবে!
কুস্বভাবের অভাব নাই। অনেক পরে জেনেছি সেই ভাবী চাকুরী নিয়েছিল। অত্যাচারে অতীষ্ট হয়ে তালাক দিয়ে এক কলিগকে বিয়ে করেছে। এবং সন্তানও হয়েছে। কিন্তু পরকিয়ার অপবাদ মাথার পরে আছে। তার শাশুড়ি বলেন, এই ছেলের সাথে তার আগেই সম্পর্ক ছিল, তাই বাচ্চা নেয়নি এতোদিন। অথচ চাকুরীর আগে এই স্বামীকে মেয়েটি চিনতোই না কোনদিন।

অতএব সামর্থ্য থাক আর না থাক, তারা বিয়ে করবে এবং পৌরুষ ফলাবে গায়ের জোরে।
আর মেয়েরা নিষ্কৃতি চাইলেই পরকিয়া। তারা একাধিক নারীসঙ্গ করবে, টাকায় অনৈতিক সংযোগ ঘটাবে, ফুর্তি করবে, নামাজও পড়বে, কিন্তু নারীরা সঙ্গত কারণে নতুন জীবন চাইলেই তা পরকিয়া।

মানলাম এক্ষেত্রে নারীই দায়ী, কেন ভাত মাছের সাথে লাঞ্ছনা-গঞ্জনাও হজম করলো না!

আরে ভাই হজম তো করতোই, ক্ষমাও করতো। শুধু যদি মায়া আর সম্মানটুকু দিত, তবে এই তিনজনের একজনও ঘর ছাড়তো না। শেষের জন অবশ্য সন্তান পালক নিতে চেয়েছিল, স্বামী প্রবর নেয়নি। মানে লেগেছিল বড্ড।

তাই বলি, ভাই, আর কতকাল পরকিয়ার পর্দায় ঢাকবেন নিজেদের অক্ষমতা?
খুন খারাবি সেও আরেক অক্ষমতারই নাম।
উদারতা দিয়ে অক্ষমতা ঢাকুন। গাড়লগিরি বন্ধ করুন। আর সুন্দরী মেয়ে দেখে লালা ঝরাবার আগে নিজের যোগ্যতার মাপকাঠিটি দেখুন।
প্রেম সে তো আরো মহান।

…রবীন্দ্রনাথের গান শুনুন,

“তুমি সুখ যদি নাহি পাও..
যাও সুখের ও সন্ধানে যাও..
অথবা নজরুলের গানের সাথে সুর মেলান,” কহিব তারে আমার প্রিয়ারে আমারো অধিক ভালবাসিও..
মোদ্ধা কথা সামর্থ্যবান পুরুষ কি দেহে কি মনে,কখনই সন্দেহ করবেনা,হুমকি ধামকি করবেনা,খুন খারাবি সে তো বহুদুর।
মানিক পড়েছেন? অতসী মামি-
কী সুখে তিনি যক্ষ্মা রোগীর জন্য তপস্যা করেছিলেন, তিনি কিন্তু শারিরিকভাবে অসমর্থই ছিলেন। হর্ষ দত্তর ‘শিখর থেকে শিখরে’ পড়ুন, একজন পর্বত আরোহী, যার পর্বত থেকে পড়ে কোমরের নিচ পর্যন্ত অবশ হয়ে গিয়েছিল। মা বাবার অমত সত্ত্বেও মেয়েটি কিন্তু ওই হুইল চেয়ারসমেত নায়ককে বিয়ে করে তার সাথেই ছিল। তারা কিন্তু শরীরের চাহিদায় পরকিয়া করেনি, কারণ তাদের মন দিয়ে মন বাধা ছিল।
বই পড়ার অভ্যেস না থাকলে “পরমা” দেখুন।
এখনো সময় আছে, অকারণ পরকিয়ার অপবাদ না দিয়ে ভালবাসার মানুষটিকে চিনতে শিখুন। ভালবাসুন মন দিয়ে, শরীর সেখানে তুচ্ছ।

জানেন তো, আবার বলি, অপবাদ দেয় যারা নপুংসক পুরুষ তারা, আর ঈর্ষান্বিত নারী যারা তারা।
ভাবে, আমি সুখি নই, ও সুখি হবে কেন?

শেয়ার করুন:
  • 6.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
    6.3K
    Shares

লেখাটি ১২,৩৫৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.